• বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডে করণীয় সম্পর্কে বুয়েটের অধ্যাপক ড.সরোয়ার জাহানের বক্তব্য

বাংলাদেশের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সরোয়ার জাহান বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপন করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব  অধ্যাপক ড. সরোয়ার জাহান, প্রতি বছর বাংলাদেশে বিশেষ করে শীতকালে বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর কারণ কী? এর সঙ্গে আবহাওয়ার কী কোনো সম্পর্ক আছে?

ড. সরোয়ার জাহান: দেখুন অগ্নিকাণ্ডের অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। শীতকালে আ‌বহাওয়াগত একটা কারণ তো আছেই। এ সময় আবহাওয়াটা একটু শুষ্ক হয়ে যায়। অন্যদিকে বর্ষাকালে ভিজা ভাব থাকে। ফলে অবশ্যই আবহাওয়া শুষ্ক হয়ে যাওয়া আগুন লাগার ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। তবে একথা ঠিক নয়-শীতকালে বলেই আগুন লাগে। এখানে আগুন লাগার অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে- আমাদের এখানে বেশ কয়েকধরনের বিল্ডিং আছে। কাচা, সেমি পাকা এবং পাকা। সাধারণভাবে কাচা স্ট্রাকচারে আগুন লাগার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তুলনামূলকভাবে পাকাতে কম থাকে।

তবে পাকা স্ট্রাকচারে যেটা হয়ে থাকে সেটা হচ্ছে- আসালে আমাদের ফায়ার প্রোটেকশনের তেমন ব্যাবস্থা থাকে না। যেমন দেখা যায় কোনো ভবনে স্মোক ডিটেক্টর পাওয়া যাবে না। তাছাড়া বৈদ্যুতিক লাইন যেটা টানা হয় সেখানেও খুব একটা সেফটি মেজর নেয়া হয় না। ফলে প্রায়ই দেখা যায় শর্টসার্কিট হয়ে থাকে। বলা চলে খুবই অপরিকল্পিতভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ওয়েরিংয়ের কাজ করা হয়ে থাকে। এসব কারণে দেখা যায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুন লাগে। ফলে একথা স্পষ্ঠভাবে বলা যায় পাকা ভবনে আগুন লাগার প্রধানত দুটো কারণ। শর্টসার্কিট ও ফায়ার প্রটেকশন। মূলত অপরিকল্পিতভাবে ভবন বানানোর ফলে সেখানে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও যন্ত্রপাতি ঢুকানোও সম্ভব হয়ে ওঠে না।

রেডিও তেহরান: শীতকালে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড এড়ানোর জন্য আসলে করণীয় কী? এ ক্ষেত্রে  জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো প্রশ্ন রয়েছে কিনা?

ড. সরোয়ার জাহান: অবশ্যই এ ক্ষেত্রে  জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রশ্ন রয়েছে। এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আগুন কেন লাগতে পারে এ বিষয়টি হয়তো অনেকে বোঝেন না। এ ব্যাপারে অনেকেই সচেতন না। বিশেষ করে মার্কেটগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেড়ে ওঠে অপরিকল্পিতভাবে। তাছাড়া বিদ্যুতের কানেকশন কিভাবে নিতে হবে, কিভাবে ওয়েরিং করতে এ বিষয় সম্পর্কে অনেকের সচেতনার অভাব রয়েছে। জনসচেতনার পাশাপাশি ফায়ার ডিটেক্টরের যে বিষয়টি বল্লাম- এটা যদি থাকে ভবনে তাহলে আগুন লাগলেও খুব তাড়াতাড়ি তা নেভানো সম্ভব।

এছাড়া মনিটরিং থাকা দরকার। এক্ষেত্রে সরকারের একটা বড় ভূমিকা আছে। যেমন ধরুন রাজধানী ঢাকার প্রতিটি ভবনের অনুমতি দেয় রাজউক।  প্লানসহ যাবতীয় বিষয়ের অনুমতি রাজউকের কাছ থেকে নিতে হয়। ফলে সেখানে কর্তৃপক্ষের একটা দায়িত্ব আছে আগুন লাগা সম্পর্কিত বিষয়টি ভেবে দেখা এবং সে হিসেবে মনিটর করা। কাজেই জনসচেতনা এবং কর্তৃপক্ষের মনিটরিং একান্ত দরকার। এর পাশাপাশি প্রতিটি ভবনে ফায়ার প্রোটেকশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

রেডিও তেহরান: গুলশানের এনডিসিসি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিসের সেবা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আসলে আমাদের দেশে অগ্নিনির্বাপনের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা কতটা কার্যকর?  

ড. সরোয়ার জাহান: আমাদের দেশে অগ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা একেবারে কার্যকর না একথা বলব না। তবে একইসাথে একথা বলব যে-এর কার্যকারিতা খুবই কম। কম এই অর্থে বলছি-ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য পরিকল্পিত লোকেশন পাওয়া যায় না। অর্থাৎ আমি বলতে ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা কোথায় থাকবে। তাদের আয়ওতাধীন এলাকা কতটা থাকবে। কিভাবে যাবে-এসব বিষয়। নানারকম গবেষণা করে এ ধরনের লোকেশন ঠিক করা উচিত।

এর আগে বাংলাদেশ একসময় পুকুরে ভরা ছিল। যেকোনো রাস্তার পাশে পুকুর বা পানির ব্যবস্থা থাকত। কোনো জায়গায় আগুন লাগলে তখন যেকোনো জায়গা থেকে পানি পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে সে ব্যবস্থা নেই। ফলে পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া মার্কেট এবং আবাসিক ভবন এলাকায় যত দ্রুত পানি পাওয়া যায় এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু দেখা যায় বর্তমান বাস্তবতায় সেরকম কোনো ব্যবস্থা নেই।

তাছাড়া ফায়ার ইকুইপমেন্ট বা যন্ত্রপাতি যা আছে সেগুলো ঠিকভাবে ব্যবহার করার মতো কর্মীর সংখ্যা কম। বড় বড় শহরে বা মাল্টি স্টরয়েড বিল্ডিং আগুন লাগলে সেখানে কিভাবে আগুন নেভানো যাবে, ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করে-সেটাই জানা নেই। অগ্নিনির্বাপন কর্মীদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। একইসাথে যন্ত্রপাতিরও অভাব রয়েছে। তাছাড়া কত লক্ষ মানুষের জন্য কতটা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন দরকার এবং কোন জায়গায় সেটা হবে এধরনের কোনো সঠিক স্টাডি করা হয় না এবং পরিকল্পনাও করা হয় না। ফলে এককথায় বলতে গেলে, প্লানিং, ট্রেনিং এবং যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং যদি না বানানো হয়, লোকেশনাল প্লানিং যদি না করা হয় একইসাথে পানির যদি সুব্যবস্থা না করা হয় তাহলে অবস্থার খুব একটা উন্নতি হবে বলে মনে হয় না।

রেডিও তেহরান: অগ্নিনির্বাপনের সক্ষমতা অর্জন বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আপনার কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ আছে যা সরকার বিবেচনা করতে পারে এবং দেশ ও জাতি তাতে উপকৃত  হতে পারে?

ড. সরোয়ার জাহান: আমার পরামর্শ হচ্ছে- নলেজ গ্যাদারিং করা। একেক শহর একেক রকম। কোনোটা বড় শহর আবার কোনোটা মাঝারি আবার কোনোটা ছোট। এসব শহর নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে। তবে সরকারের উচিত এসব বিষয়ে ভালোভাবে গবেষণা করে কোন জায়গায় কি ব্যবস্থা নিতে হবে, কোন জায়গায় এবং কেন বেশি আগুন লাগছে এসব খুঁজে বের করে পলিসি ফরমুলেট করতে হবে। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একটা যথার্থ নীতি যদি না করা হয় তাহলে এ বিষয়ে খুব ভালো ফল পাওয়া যাবে না।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর গুলশানের এনডিসিসি মার্কেটে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল সে ব্যাপারে কেউ কেউ নাশকতার প্রশ্ন তুলছে আবার ভিন্ন মতও পাওয়া যাচ্ছে। তো এ বিষয়ে কি বলবেন।

ড. সরোয়ার জাহান: দেখুন, নাশকতার বিষয়টিও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে সুস্পষ্ট প্রমাণও আবার সবসময় পাওয়া যায় না। শোনা যায় অনেক বস্তিতে আগুন লাগে বস্তি উচ্ছেদ করার জন্য। এখানেও অভিযোগ উঠছে মার্কেট উচ্ছেদের জন্য আগুন লাগানো হয়েছে। এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে অভিযোগটি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ অনেক নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নাশকতা কিনা সেটা নিরূপণের জন্য আধুনিক যে প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা সেটাও আমরা এখনও করতে পারছি না। নাশকতা নাকি অন্য কিছুর কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে সেটা নির্ধারণের বিভিন্ন ধরনের পন্থা আছে। সেগুলোও জানতে হবে।#

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১১

 

২০১৭-০১-১১ ১৯:৫৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য