নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা, সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণের ঘটনায় বাংলাদেশের রাজনীতি হঠাৎ করেই সরগরম হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সৃষ্টি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।

ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগে বিএনপিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন ব্যরিষ্টার মইনুল হোসেন। এ সময়ে তার গ্রেপ্তারের  ঘটনাটি  জনমনে উদ্বেগও  বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক মহল। গতকাল সোমবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা  জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরায় বাসা থেকে মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।  রংপুরে একজন মানবাধিকার কর্মীর দায়ের  করা একটি মানহানির মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ১৬ অক্টোবর মধ্যরাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো অংশ নিয়ে একজন  মহিলা সাংবাদিকের প্রশ্নে  ক্ষিপ্ত হয়ে ব্যারিস্টার মইনুল তাকে “চরিত্রহীন” বলায় নানা মহল থেকে এর প্রতিবাদ আসে  এবং ব্যারিষ্টার মইনূলের বিরুদ্ধে একের পর এক মানহানি মামলা দায়ের করা হয়।

আজকেও  ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে কক্সবাজারে এবং ময়মনসিংহের আদালতে মানহানি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে।কক্সবাজারের মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। এ ছাড়া ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ভোলা ও কুড়িগ্রামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মইনুল হোসেন কয়েকটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিনও নিয়েছেন।

এদিকে, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ সুপ্রিমকোর্টে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আইনজীবীরা। মিছিলটি নিয়ে মাজারগেট, কদম ফোয়ারা ও মৎস্য ভবন মোড় হয়ে সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে ফিরে অসে। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে আইনজীবিরা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার জোর দাবি জানান। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ার দেন আইনজীবীরা। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা শিক্ষকগণ ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেনের নিন্দা জানিয়ে আজ  কলাভবন চত্তরে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।

বিএনপির প্রতিক্রিয়া:

এদিকে, মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভেআকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে ব্যাহত করতেই এই গ্রেপ্তার।মানহানি মামলায় মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা নজিরবিহীন ঘটনা।

সংবাদ সম্মেলনে রিজভী ( ফাইল ফটো)

তাছাড়া, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু অভিযোগ করেছেন,প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মলনে ব্যারিষ্টার মইনুল হেসেনের  সমালোচনা করার ৫ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘মাসুদা ভাট্টি মানহানির মামলা করেন। আরো দুজন মহিলা মামলা করলেন সম্পূর্ণভাবে বেআইনিভাবে। আমি মনে করি, এটা মানহানির মামলা না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য দেশের গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি হিসেবে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন

আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া:

তবে ব্যরিষ্টার মইনুল হোসেনের প্রেপ্তার জরুরী হয়ে পড়েছিল বলে মন্তব্য  করেছেন  আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যে ঘটনা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি রোধেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মইনুলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে মামলার কারণে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এখানে কোনো বিষয় নয়।

আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া:

ওদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আজ বলেছেন, নারী-অসন্তোষ রুখতেই ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার না করলে নারী সমাজ ক্ষুব্ধ হতো এবং শ্লীলতাহীন বক্তব্যকে উৎসাহিত করা হতো।

Image Caption

আনিসুল হক বলেন, যুক্তফ্রন্ট গঠনের আগ থেকেই ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে টকশোতে অনেক কথা বলতেন, তখন কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে- টকশোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে যা বলেছেন তাতে শুধু তার মানহানি হয়েছে তা নয়, বাংলাদেশের নারী সমাজ মনে করে তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাটি পুরো নারী সমাজকে অপমানিত করেছে। সেখান থেকে মামলা হয়েছে। কোর্ট যখন ওয়ারেন্ট দিয়েছে তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি গ্রেফতার না করতো, তাহলে নারী সমাজ ক্ষুব্ধ হতো এবং এ ধরনের শ্লীলতাহীন বক্তব্যকে উৎসাহিত করা হতো। সে জন্য গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ড. কামাল হোসেনের প্রতিক্রিয়া:

মঈনুল হোসেনের গ্রেফতার প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ড. কামাল হোসেন বলেন, যে ঘটনায় গ্রেফতার তাকে করা হয়েছে, সেই ঘটনার অারেকটি মামলায় তিনি অাজ জামিন নিয়েছেন। এরপরও একের পর এক মামলা এবং গ্রেফতারের ঘটনা নিঃসন্দেহে অাতঙ্কের। মানহানির মামলায় নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তাঁর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। গতকাল সোমবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন তিনি।

ড. কামাল হোসেন

এর আগে গতকাল বিকেলে গণভবনে সংবাদ সম্মেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, একজন (ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন) নারীর বিরুদ্ধে বলেছেন, একটা মামলা না হয় হয়েছে, আরও তো মামলা হতে পারে। এর প্রতিবাদ আপনারা করতে পারেন। আপনারা প্রতিবাদ করুন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা করার করবে।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার দলের নারী সংগঠনগুলোকে এ ইস্যুতে প্রতিবাদ করারও নির্দেশ দেন।#

পার্সটুডে/আব্দুর রহমান খান/বাবুল আখতার/২৩

 

 

ট্যাগ

২০১৮-১০-২৩ ২১:১৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য