২০১৮-১২-০৯ ১২:৩২ বাংলাদেশ সময়
  • বাংলাদেশে ব্যাংক থেকে ২২,৫০২ কোটি টাকা লোপাট: দুই রাজনীতিকের প্রতিক্রিয়া

গত ১০ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গতকাল (শনিবার) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আমাদের করণীয় কী’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরে সিপিডি। পাশাপাশি এই খাতে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করণের কথাও বলেছে সংস্থাটি।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যর সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরের সূত্র ধরে তিনি জানান, গত দশ বছরে ব্যাংক খাতে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল অবধি সরকারি-বেসরকারি ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলিয়ে ১৪টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব অর্থ খোয়া গেছে। বাড়তি খেলাপি ঋণ, যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ অনুমোদন, ঋণ দেওয়ায় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ব্যাংকারদের পেশাদারিত্বের অভাব- এসব কারণে এখন দেশের ব্যাংক খাতে চরম সংকটাপন্ন অবস্থা বিরাজ করছে।  

মূল নিবন্ধে ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত ১০ বছরে জনতা ব্যাংক থেকে অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপ মিলে ১১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা হাতিয়েছে। বেসিক ব্যাংক থেকে বের হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক থেকে হল-মার্ক নিয়ে গেছে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। বিসমিল্লাহ গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া রিজার্ভ চুরির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হারিয়েছে ৬৭৯ কোটি টাকা। নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এবি ব্যাংক থেকে পাচার হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা।

সিপিডি'র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন

সিপিডি বলেছে, ব্যাংক খাতের এই ১০টি বড় কেলেঙ্কারিতে লোপাট হওয়া ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের ৭৮ শতাংশ বা পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পের ৬৪ শতাংশ ব্যয় নির্বাহ করা যেত। আবার সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে প্রায় ৪১ শতাংশ টাকার জোগান দেওয়া সম্ভব ছিল।

এ প্রসঙ্গে, বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়কারী সাইফুল হক রেডিও তেহরানকে বলেন, সরকারের ছত্রছায়ায় ব্যাংকিং সেক্টরে যে লুটপাট চলছে তার দায়িত্ব সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় তথা সরকারকেই বহন করতে হবে। তিনি মনে করেন, বিরাট অংকের লুটের টাকা উদ্ধার করা এবং আর্থিক খাতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনা আগামী সরকারের জন্য একটি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।

অনুরূপ মন্তব্য করে বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন রেডিও তেহরানকে বলেন, আগামীতে সরকারে যে-ই আসুক না কেন, আর্থিক খাতের লুটপাটের করুণ শিকার হতে হবে সাধারণ জনগণকে। তাই তাদের দুর্ভোগ থেকে বাঁচার লড়াইটা তাদেরকেই করতে হবে। 

রাজেকুজ্জামান রতন

এদিকে, শেষ মুহূর্তে সরকার একের পর এক প্রকল্প অনুমোদন করেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া এবং বৈদেশিক অনুদান বৃদ্ধি না পাওয়ার  ফলে এসব প্রকল্পের অর্থায়নে ঋণ নির্ভলশীলতা বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-সেপ্টেম্বর সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে,  চলতি অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে নগদ টাকার সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলো পড়েছে মহাবিপাকে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এমনিতেই তারল্য সঙ্কট, এর ওপর সরকারের ঋণগ্রহণের হার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ আরও সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের ওপর।

ওদিকে গতকাল  সিপিডি’র সংলাপ অনুষ্ঠানে  দেশের আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ, সাবেক ব্যাংকার ও আমলারা নানা সমস্যা তুলে ধরে তা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা সবাই ব্যাংক খাত ঠিক রাখতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন ভূমিকার আশা করেন।

আলোচকরা বলেছেন,  রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিকদের যুক্ত করা, পরিচালকদের দুর্বৃত্তায়ন, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও সবশেষে ঋণ দেওয়ায় সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ভঙ্গুর হচ্ছে দেশের ব্যাংকগুলো।

এ অবস্থায় ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ, নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দেওয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিচারিক ব্যবস্থাসহ জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৯

ট্যাগ

মন্তব্য