ভারতের বিজেপিশাসিত মহারাষ্ট্রে দলিতদের ডাকা বনধে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। ভারিপ বহুজন মহাসঙ্ঘের ডাকে আজ (বুধবার) মহারাষ্ট্রের মুম্বাইসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েন।

ভারিপ বহুজন মহাসঙ্ঘের প্রধান প্রকাশ আম্বেদকর বলেন, মহারাষ্ট্রের ভীমা কোরেগাঁওতে দলিতদের ওপর হামলার সময় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদেই বনধের ডাক দেয়া হয়েছে।  

গতকাল এবং আজ মহারাষ্ট্রের পুণে, আওরঙ্গাবাদ মুম্বাইসহ বিভিন্ন স্থানে দলিতরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। এ সকল ঘটনায় বিভিন্ন যানবাহনে ভাঙচুর করা হয়। কয়েকটি এলাকায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্রের থানেসহ কয়েকটি এলাকায় আগামী ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

গত সোমবার দলিতদের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ভীমা কোরেগাঁও যুদ্ধের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপনের সময় অজ্ঞাত লোকজনের হামলায় দলিত এক যুবক নিহত হওয়ার পর থেকে সেখানে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ ওঠে এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এটিকে জাতিগত সহিংসতা অথবা দলিত ও উচ্চবর্ণের সংঘর্ষ বলে প্রচার হচ্ছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে একে মারাঠা ও দলিতদের মধ্যে সহিংসতা বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে।

কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে

জাতিগত দাঙ্গার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে: কংগ্রেস

আজ (বুধবার) লোকসভায় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিষয়টি উত্থাপন করে কেন্দ্রীয় সরকার ও হিন্দুত্ববাদীদের তীব্র সমালোচনা করা হয়। কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে সংসদে বলেন, ‘দেশে জাতিগত দাঙ্গার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ক্রমাগত সহিংসতা ছড়াচ্ছে এবং বিদ্বেষে ইন্ধন দিচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে নিশ্চুপ হয়ে আছেন। তার উচিত সংসদে দাঁড়িয়ে এ নিয়ে বিবৃতি  দেয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক বছর দলিত সম্প্রদায়ের মানুষজন এ ধরণের কর্মসূচি নিয়ে থাকেন। যেসব রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আছে সেসব জায়গায় দলিতদের বিরুদ্ধে এ ধরণের দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রধানমন্ত্রীকে ওই বিষয়ে বিবৃতি দেয়া উচিত, তিনি চুপ করে আছেন কেন?’

সরকারপক্ষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অনন্ত কুমার কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গের বিরুদ্ধে ওই ইস্যুতে উসকানি দেয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশে পরাজিত হওয়ার হতাশা থেকে কংগ্রেস এ ধরণের কথা বলছে। আজকের দিনে ব্রিটিশের পরিবর্তে কংগ্রেস 'ভাগ করে শাসন করো' নীতিতে কাজ করছে।

দলিত আন্দোলনের নেতা সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

'উচ্চবর্ণের হিন্দুরা দলিতদের ন্যূনতম অধিকার দেয় নি'

এ নিয়ে আজ পশ্চিমবঙ্গের ‘সাম্য শান্তি সম্প্রীতি মঞ্চ’-এর সভাপতি ও দলিত আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস রেডিও তেহরানকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘মহারাষ্ট্রের ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, হিন্দু বলতে যা বোঝায় একটা ইউনিফর্ম জনগোষ্ঠী- তা নয়। হিন্দুদের মধ্যে দলিত ও  উচ্চবর্ণের মধ্যে সুদীর্ঘকাল ধরে ব্যবধান হয়ে আছে। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা দলিতদের ন্যূনতম মানবিক অধিকার দেয় নি। আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়তো রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা হিন্দু ঐক্যের কথা বলছে, কিন্তু মনেপ্রাণে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা আমি যাদেরকে ব্রাহ্মণ্যবাদী বলছি, তারা এদেরকে (দলিতেদের) হিন্দু বলেই মনে করে না। ফলে, এরকম পরিস্থিতিতে আজ দলিতদের বুঝতে হবে যে আমাদের অবস্থানটা কোথায়? এবং সেই অনুসারে আজ বিশেষ করে দলিতদের মতো যাদের আর্থিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আছে সেই সমস্ত মানুষের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বিশেষ করে মুসলিমদের সঙ্গে।’  

তিনি বলেন, ‘মুসলিমদের অবস্থা ও দলিতদের অবস্থা একই। ড. বি আর আম্বেদকরও সেই একই কথা বলেছেন, এই দুটো সম্প্রদায়ের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা একই এবং তারা ঐক্যবদ্ধভাবে একটা লড়াই তারা পরিচালনা করতে পারে এবং ভারতকে ডেমোক্রেটিক ভারত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য।’

দলিত-মুসলিম ঐক্যকে ব্রাহ্মণ্যবাদ বা উচ্চবর্ণের মানুষদের বিরোধিতার জন্য নয়, বরং তা ভারতীয় সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষ ও বর্ণবিমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার জন্য প্রয়োজন বলেও সুকৃতিরঞ্জন বাবু মন্তব্য করেন।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/এআর/৩       

 

ট্যাগ

২০১৮-০১-০৩ ১৬:৪৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য