ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও নীতি নির্ধারনের প্রধান আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানির আকস্মিক মৃত্যু এবং ইরানের জনগণের মধ্যে তার প্রভাব ও নানা ক্ষেত্রে তার অবদান নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণে মশগুল হয়েছে বিশ্বের অনেক সংবাদ মাধ্যম।

গত রোববার ৮২ বছর বয়স্ক ইরানের এই প্রভাবশালী নেতার হৃদযন্ত্রে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে সেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আজ ইরানের এক বিশাল জনসমুদ্র তার জানাজায় উপস্থিত হয়ে ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম প্রধান এই নেতার প্রতি গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন যাকে জাতীয় ঐক্যেরও এক বড় প্রদর্শনী বলা যায়।

দেশি-বিদেশী বহু গণমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থা ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রে ও বিপ্লবে তার অসাধারণ আর গুরুত্বপূর্ণ অনেক অবদানের কথা স্মরণ করছে এবং তার মৃত্যুকে অপূরণীয় ক্ষতি বলে মন্তব্য করছে।

অবশ্য সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্যের প্রভাবিত ও ব্রিটেনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা বিবিসি এক উস্কানিমূলক বিশ্লেষণে বলেছে, হাশেমি রাফসানজানির দাফন অনুষ্ঠানকে দুই দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়: একটি দিক হল সরকারি আনুষ্ঠানিকতা ও অন্য দিকটি হল যারা ইরানের ইসলামী সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট কিংবা রাফসানজানির অনুসারী তাদের জন্য এই নেতার জীবনাবসানের সময়ে সৃষ্ট সুযোগ...।  

বিবিসি’র সঙ্গে মিল রয়েছে এমন অনেক পশ্চিমা সংবাদ-মাধ্যমই আয়াতুল্লাহ রাফসানজানির মৃত্যুতে যেসব মতামত ও বিশ্লেষণ প্রচার করছে সেসবে মূলত ইরানের ইসলামী সরকারের অন্য অনেক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা বা নেতার সঙ্গে পরলোকগত এই শক্তিশালী নেতার নানা মতভেদের বিষয়কে তুলে ধরা হচ্ছে।

বাস্তবতা হল ইরানের ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিত্বদের মধ্যে কোনও কোনও বিষয়ে মতভেদ থাকাটা দুর্বলতা নয় বরং এই ব্যবস্থার শক্তিমত্তা ও পরিপক্বতারই পরিচয়। এ ধরনের মতভেদ সত্ত্বেও ইরানের নেতৃবৃন্দ ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান ও ইসলামী বিপ্লবের মূল নীতিকে আঁকড়ে ধরে জাতীয় ঐক্য বজায় রেখেছেন। তাই দেখা গেছে যখন রাফসানজানির পুত্রকে আইনি কোনও কারণে কারাগারে নেয়া হয়েছে তখনও তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেছেন।

বিভিন্ন সময়ে ও বিশেষ করে ২০০৯ সালের নির্বাচন নিয়ে ইরানে যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছিল সেই ঘটনার সময়ও তিনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্ব ও মূলনীতিগুলোর প্রতিও আনুগত্য দেখাতে ভোলেননি দূরদর্শী এই নেতা। নানা সময়ে আয়াতুল্লাহ রাফসানজানির বিচক্ষণ ও সময়োচিত পদক্ষেপ ঘরে-বাইরে ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রকে সংহত এবং ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। ব্যক্তিগত বা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও রুচির ভিন্নতার চেয়েও তার কাছে বড় ছিল রাষ্ট্র আর জনগণের স্বার্থ।   

হাশেমি রাফসানজানি নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বিষয়ে কোনও কোনও অস্পষ্টতা দূর করা সম্পর্কে ও মতামত প্রকাশের অধিকার রক্ষার বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কিছু বক্তব্য আইনানুগ এবং যৌক্তিক কাঠামোর আওতায় উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন।  

আর এরই প্রেক্ষাপটে কোনও কোনও মহল ও বিজাতীয় গণমাধ্যম এটা দেখাতে চায় যে ইরানি নেতৃবৃন্দের মধ্যে গ্রুপিং ছিল ও এখনও তা রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের একপেশে ব্যাখ্যা মোটেই বাস্তব নয়।  একজন সংগ্রামী ও বিপ্লবী নেতা হিসেবে দেশের  অর্থনীতি ও নেতৃত্বের ধরনের প্রতি তিনি সব সময়ই আন্তরিক ছিলেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনীয়ও তাঁর শোক বাণীতে নানা বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ বছরের পুরনো বন্ধু আয়াতুল্লাহ রাফসানজানির প্রখর মেধা ও নজিরবিহীন আন্তরিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং চির-অটুট এই বন্ধুত্বের সূচনা পবিত্র কারবালায় দুই মাজারের মধ্যস্থলে হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। #

পার্সটুডে/মু.আ. হুসাইন/১০

 

২০১৭-০১-১০ ১৮:৪৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য