• শত্রুরা যেভাবে ইরানের সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছিল

ইরানে সম্প্রতি কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছোটখাট বিক্ষোভ হয়। কিন্তু বাইরের কিছু মহলের উস্কানিতে কিছু ব্যক্তি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। এ ঘটনাকে আমেরিকা ইরানে হস্তক্ষেপের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যে নাটক শুরু করেছিলেন তাতে ব্যর্থ হয়ে আবারো ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন উপায়ে ইরানের জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু এবারও আমেরিকা ব্যর্থ হয় এবং ইরানের মানবাধিকার ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়। পরমাণু ইস্যুতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রশ্নে যখন ইউরোপীয় মিত্ররা আমেরিকা থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে তখন ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল অন্তত মানবাধিকার ইস্যুতে মিত্রদের সমর্থন পাবে।

জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি

ইরানের জনগণের মাঝে আমেরিকা অত্যন্ত ঘৃণিত একটি দেশ এবং আমেরিকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ ছাড়া, সম্প্রতি আমেরিকার অস্ত্রে পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মুসলমান নিহত হয়েছে এমনকি আমেরিকার অভ্যন্তরেও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বর্ণবিদ্বেষ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় সেই দেশটির পক্ষে মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা মানায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ বৃহৎ শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল কিন্তু ইরান তার নিজস্ব শক্তিমত্বার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামি বিপ্লবের প্রতি অনুগত ইরানের জনগণের সমর্থন নিয়ে ইরান সরকার বিশ্বে তার মর্যাদা ও অবস্থান ধরে রেখেছে। এ কারণে প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের কোনো দেশের পক্ষেই ইরানের ক্ষতি করা সম্ভব নয়। একই কারণে ওই দেশগুলো ইরানেও বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনো সুযোগ পাবে না।

যে দেশগুলো সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়ে, নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে প্রতিনিয়ত ইরানের ক্ষতি করার চেষ্টা করে আসছে তারা ইরানে সম্প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি থেকে এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, ইরান ইরাক কিংবা সিরিয়া নয় যে কিছু বিক্ষোভ ও সহিংসতা উস্কে দিয়ে ইরানের নিরাপত্তা বিনষ্ট করা যাবে। এ অবস্থায় ইরানের শত্রুদের এটা বোঝা উচিত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে।

ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের দিকে নজর দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বহুবার কর্মকর্তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি এক বছরের বেশি আগে প্রেসিডেন্ট ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতে বলেছেন, অর্থনৈতিক সংকট বর্তমানে দেশের প্রধান সংকট যা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধমূলক অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারি।  

মার্কিন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের বিক্ষোভ

এতে কোনো সন্দেহ নেই, যেকোনো সমস্যা তুলে ধরা জনগণের ন্যায্য অধিকার এবং এটা একটি সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতির পরিচায়ক। আইনের আওতায় স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করে সমাবেশ করার অধিকার একটি সমাজের মৌলিক অধিকার। তবে এ সংক্রান্ত দু'টি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক অপরিপক্বতা বা অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতিবাদ স্বাভাবিক বিষয় এবং এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও সরকারের। দ্বিতীয়ত, এ ধরণের প্রতিবাদের ঘটনায় বাইরের প্রতিক্রিয়া। ইরানে সম্প্রতি কিছু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের ঘটনায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও হোয়াইট হাউজ যে উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়েছিল তা একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ। ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন দেয়া থেকে শুরু করে সম্প্রতি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হোয়াইট হাউজের দেয়া বিবৃতি কী অর্থ বহন করে তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে।

কিছু পণ্যের মূল্য বাড়ার প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হলেও তৎক্ষণাৎ কোনো কোনো গণমাধ্যম বিক্ষোভের সঙ্গে রাজনৈতিক রং লাগানোর চেষ্টা করেছিল যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থায় আঘাত হানা। ন্যায্য দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে বিদেশি মদদপুষ্ট কোনো কোনো ব্যক্তি সহিংসতা চালায়। ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ী ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান এলাকার আরবিলে অনুষ্ঠিত ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠককে ইরানে সম্প্রতি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি ইরানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, কয়েক মাস আগে আর্বিলে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখান থেকে ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইরান বিরোধী ওই বৈঠকে সিআইএ'র সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল ডি অ্যান্ড্রি, ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের নিহত পুত্র কোসাই সাদ্দামের দফতরের প্রধান, সাদ্দামের শেলক হানি তালফা, ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠী এবং সৌদি আরবের প্রতিনিধিরাও উপস্থিতি ছিল।

ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ী

ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ী আরো বলেছেন, আরবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ইরান বিরোধী ব্যাপক প্রচারণা অভিযান শুরু করবে তারা এবং এরই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সারা ইরানে বিক্ষোভ, দাঙ্গা ও সহিংসতা এমনভাবে ছড়িয়ে দেয়া হবে যাতে সব শহরের পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইরানের এ কর্মকর্তা আরো জানান, ষড়যন্ত্রকারীরা এভাবে ইরানে বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে দেয়ার পর বিক্ষোভকারীদেরকেই হত্যা করার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করতে চেয়েছিল। যাতে ওই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সহিংসতা ও গণঅসন্তোষকে আরো দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়া যায়।

ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ী আরো জানান, ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তানের আরবিলের বৈঠকে আরো পরিকল্পনা করা হয়েছিল, ইরানে গোলযোগ ছড়িয়ে দেয়ার পর আমেরিকা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদকে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলবে এবং এর পরের ধাপে ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মুনাফেকিন গোষ্ঠী বা এমকেওকে মাঠে নামানো হবে। সবশেষে ইরানের ওপর আরো কঠিন নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্য ইউরোপকে ডাকা হবে।

ইরানের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, এত ষড়যন্ত্রের পরও ইরানের কর্মকর্তারা ও জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে শত্রুদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। তিনি বলেন, ইরানের বিক্ষোভকারী জনতা যখনই বুঝতে পেরেছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ রয়েছে তখনই তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে যা ছিল শত্রুদের প্রতি চপেটাঘাত।

যাইহোক, ইরানের জনগণ বহুবার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছে এবং শত্রুর ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে। শত্রুরা সবসময়ই ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু ইরান তার উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখায় শত্রুরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। বাস্তবতা হচ্ছে, ইরান আজ পর্যন্ত বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে সামান্যতম মাথা নত না করে আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে ও বিশ্ব অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে  এবং যে কোনো সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা দেশটির রয়েছে।#

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন

 

২০১৮-০২-২২ ১৮:৪৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য