নওরোজ,মানে ইরানি নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন গ্রহণ করুন। ইরানে বসন্তের সূচনাই নওরোজ। বসন্ত আর নতুন বছর একসঙ্গে শুরু হয় বলে আনন্দের জোয়ারটাও দ্বিগুণ হয়ে যায়।

নির্জীব প্রকৃতিও হয়ে উঠতে শুরু করে সজীব সবুজ। কত আয়োজন, কত আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যে বরণ করা হয় এই নওরোজকে, তা না দেখলে উপলব্ধি করা সত্যিই দুষ্কর। চারদিকে প্রাণের মেলা, আনন্দের বিচিত্র আয়োজন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এবং অবস্থার ইতিবাচকতা কামনা করে সূচনা হয় সকল আয়োজনের।

নওরোজ আসে সবুজের বার্তা নিয়েই। এ যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে নওরোজের এক অনন্য উপহার। তার মাঝেই পাওয়া যায় বসন্তের নতুন ঘ্রাণ, তরতাজা প্রাণ। কেবল ইরানের ভেতরেই মানে শহর গ্রামেই নয় বরং দেশের বাইরেও যারা বসবাস করেন তারাও এই নওরোজ উদযাপন করার লক্ষ্যে একইরকম আয়োজনে মেতে ওঠেন। ফার্সি ভাষায় আনন্দ উল্লাস মানেই ঈদ। আর নওরোজ হলো ইরানের সবচেয়ে আনন্দঘন উৎসব। সে কারণে এই নওরোজকে বলা হয় ঈদে নওরোজ। তো ঈদের আমজেই আসলে অতিক্রান্ত হয় নওরোজের আগের দিনগুলো। বাজারঘাটে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। প্রায় মাসব্যাপি চলে এই কেনাকাটার প্রাণময় আয়োজন।

 

নওরোজ উপলক্ষে ঘরবাড়ি সাজাবারও ধুম পড়ে যায়। সাজাতে গেলেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হয় সবকিছু। সেই পালা চলে বেশ কিছুদিন ধরে। ইরানিরা এমনিতেই পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যপ্রিয় জাতি। এই নওরোজ উপলক্ষে পরিচ্ছন্নতা এক ধরনের আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সুতরাং নওরোজে ইরানিদের কারও ঘরবাড়ি অপবিত্র বা দূষিত থাকার সুযোগ নেই। সেইসঙ্গে সামর্থ অনুযায়ী নতুন জিনিসপত্র কেনার ব্যাপার তো রয়েছেই। ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্নতার একটা ইতিবাচক প্রভাব যেন অন্তরগুলোর ওপরে পড়ে। যেন হিংসা বিদ্বেষ থেকে পবিত্রতা লাভ করে সবার মন। নওরোজের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই এই পরিচ্ছন্নতার অভিযান চলে। ফার্সি ভাষায় এই অভিযানের পারিভাষিক শব্দ হলো "খনে থেকনি"। থেকন শব্দের অর্থ হলো নাড়া দেওয়া বা ঝাঁকুনি দেওয়া। একটা গাছকে ঝাকুনি দিলে যেমন মরা পাতা ঝরে পড়ে গিয়ে গাছটা তরতাজা রূপ নেয়, তেমনি ঘরবাড়ি থেকে ময়লা আবর্জনা ঝেড়ে দূর করা হলে পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।                                  

শব্দ ছিল সেই চিরচেনা

শাখা-প্রশাখা আর শেকড়ের শব্দ

বসন্ত, আহা বসন্ত! কতো চেনা সে নাম

তোমার শব্দ ভেসে আসে কিন্তু তুমি কোথায়।

জানালাগুলো কি খুলে দেবো, নাকি না

স্মৃতির দেরাজ খুলবো নাকি খুলবো না

জানালাগুলো কি খুলে দেবো, নাকি না

স্মৃতির দেরাজ খুলবো নাকি খুলবো না

………

এলো সেই বসন্ত নতুন পোশাক পরিয়ে গায়

বসন্তের চেয়ে তরতাজা যেন হয়ে গেলাম তণুকায়

এসেছে বসন্ত সঙ্গে নিয়ে একরাশ তাজা আমেজ

এনেছে ঈদ গলি থেকে ঘরে,যেন আনন্দের শেজ

উঠোন আমাদের এক গারবিল যেন,বাগিচা ফুলদানি

ঘর আমাদের অতিথির জন্য অপেক্ষায় সারাক্ষণই

 

কী চমৎকার বসন্ত গীতি। মন কেড়ে নেয়। এ গানের ভেতরেই আছে প্রকৃতির সাজসজ্জার কথাও। যাই হোক বলছিলাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা। খনে থেকনি। না, খনে থেকনি কেবল ঘরবাড়ির ক্ষেত্রেই নয় এই সংস্কৃতির চর্চা সকল অফিস আদালতের জন্যও প্রযোজ্য। অফিসগুলোকেও সুন্দর করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করা হয়। এ যেন পুরোনো বছরের ময়লা আবর্জনা ঝেড়ে বিদায় করার পালা চলে। কোনো প্রাচীন ম্লানিমারই যেন অস্তিত্ব না থাকে। ভাবা যায় নওরোজ উপলক্ষ্যে পুরো শহর-গ্রাম এককথায় পুরো দেশের চেহারা কেমন হয়ে যায়! ভবনের দেয়ালগুলো সব নতুন রঙে সাজানো, দরজা জানালা কিংবা কাঁচগুলো স্বচ্ছ-ভাবতেই একটা পরিচ্ছন্ন আমেজে ভরে ওঠে মন। অন্যদিকে এই স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হয় নওরোজকে। পরিচ্ছন্ন বাসাবাড়ি অতিথি বরণের উপযোগী হয়ে ওঠে। সুতরাং নওরোজ আসে অতিথির শুভাগমনের আনন্দ নিয়ে।

 

এই পরিচ্ছন্নতা যে কেবল নওরোজেই হয় তা নয় বরং সারাবছর জুড়েই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। তবে নওরোজে ঘটা করে চলে এ আয়োজন। ইসলাম তো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলেছে। সে দিক থেকে ইরানিরা ইসলামের এই বিধানটিকে ভালোভাবেই পালন করেছে। চমৎকার এই নওরোজ উৎসব শুধু ইরানেই পালিত হয় না, আফগানিস্তান,তাজিকিস্তান,আজারবাইজান,তুর্কমেনিস্তান,উজবেকিস্তান তুরস্ক ও ইরাকেও এ উৎসব জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়। এ উৎসব কম-বেশি পালিত হচ্ছে জর্জিয়া,পাকিস্তান ও ভারতেও। সাধারণত ২০ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন থেকে শুরু হয় নওরোজ।

 

এলো বনান্তে পাগল বসন্ত।

বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে,চঞ্চল তরুণ দুরন্ত।

বাঁশীতে বাজায় সে বিধুর পরজ বসন্তের সুর,

পান্ডু-কপোলে জাগে রং নব অনুরাগে

রাঙা হল ধূসর দিগন্ত।।

কিশলয়ে-পর্ণে অশান্ত ওড়ে তা’র অঞ্চল প্রাস্ত।

পলাশ-কলিতে তা’র ফুল-ধনু লঘু-ভার,

ফুলে ফুলে হাসি অফুরন্ত।

এলো মেলো দখিনা মলয় রে প্রলাপ বকিছে বনময় রে।

অকারণ মন মাঝে বিরহের বেণু বাজে।

জেগে ওঠে বেদনা ঘুমন্ত।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার অংশবিশেষ শুনলেন। আশা করি ভালো লেগেছে আপনাদের। যাই হোক আমরা আবারও ফিরে যাই ইতিকথায়। ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। তবে কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য শাহনামা ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের প্রাচীন কিংবদন্তীতে উল্লেখিত বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন,ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন। পারস্য সম্রাট প্রথম দারিউশের শাসনামলে এ উৎসব পার্সপোলিস প্রাসাদ কমপ্লেক্স বা তাখতে জামশিদে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এ উৎসবে উপস্থিত হয়ে ইরানি সম্রাটকে নানা উপহার সামগ্রী দিতেন। এই উপহার সামগ্রী বিনিময়ের প্রথা এখনও চালু আছে।

সেজন্য নওরোজ এলেই কেনাকাটার ধুম পড়ে যায় পুরো ইরানজুড়ে। নওরোজ নিয়ে আরও কথা হবে পরবর্তী আসরে। চলুন অনুষ্ঠান শেষ করা যাক বসন্ত সংগীতের বাকি অংশ শোনার মধ্য দিয়ে। সংগীতটি রচনা করেছেন মুহাম্মাদ আলি বাহমানি আর সুরকার ও শিল্পী তুরাজ শাবনখনি।

 

বসন্ত! বসন্ত এক পুরোনো কুটুম

সহজ,চিরচেনা,একান্তই অনুপম

চেনা একেবারে কিসসার মতো যেন

শিশুদের ঘুম পাড়ানিয়া কিংবা স্বপ্ন হেন

মাটির জমানো ব্যাংক দ্রুতই ভেঙ্গে গেল

ব্যাংকের সাথে মনটাও হলো এলোমেলো

                    ......

বসন্ত এলো! বরফগুলো হলো বিন্দু বিন্দু

মাটির মৃত অন্তরে ফোটালো হাসির সিন্ধু

বসন্ত ঋতুকে কী যে ভালো বাসে এ অন্তর

খোলা জানালাকেও বাসতো ভালো নিরন্তর

এলো বসন্ত, জানালাগুলো খুলে দিলো

কী যে অনন্য এক অনুভবে নিয়ে গেল 

কত কথা কত প্রশ্নের পাহাড়ে গ্রন্থ অমলিন

আফসোস!সকল প্রশ্নই রয়ে গেল উত্তরহীন

মিথ্যে নয় তখনও এ মন ছিল তরুণ সঙ্কাশি

রুটিরুজির পেছনেই পড়ে ছিল দিবানিশি

             ♫♫♫♫♫♫

  • তো বন্ধুরা!আবারও নওরোজের শুভেচ্ছা রইলো। #

 

২০১৮-০৩-২৫ ১৯:২২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য