ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, তার দেশের বিরুদ্ধে শত্রুদের নানা পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় যে ইসলামী এ রাষ্ট্রের শক্তিমত্তার কারণে ওরা হতাশ ও বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। 

তিনি গতকাল বিকেলে (সোমবার) ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র.)'র ২৯তম মৃত্যু-বার্ষিকী উপলক্ষে তার মাজার প্রাঙ্গণে এক বিশাল সমাবেশে এই মন্তব্য করেছেন।

ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেছেন, শত্রুদের এসব পদক্ষেপের ফলে ইরানের বিপ্লবী মুসলিম জাতির অগ্রযাত্রা হয়তো কিছুটা মন্থর হবে, কিন্তু তাদের অগ্রযাত্রা চলতেই থাকবে। 

তিনি বলেছেন, ইসলামী ইরান এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (র.)'র আদর্শের পথ ধরেই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে ঠিক যেভাবে ওই মহান নেতা শত্রুদের নানা ষড়যন্ত্র বা চাপের মুখে কখনও দুর্বল বা উদ্বিগ্ন হননি বরং ধীর-স্থিরভাবে বুদ্ধিমত্তায়-উদ্দীপ্ত সুচিন্তিত পদক্ষেপ ও প্রবল শক্তিমত্তা নিয়ে সব শত্রুতার মোকাবেলা করতেন।

এটা স্পষ্ট নানাভাবে সর্বশক্তি দিয়েও ন্যায়পরায়ন বা ইসলামী আদর্শ-ভিত্তিক কোনো প্রবল প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে বস্তুবাদী ও ধর্ম-বিরোধী তাগুতি  বা খোদাদ্রোহী শক্তিগুলো হতাশ ও বেপরোয়া হয়ে নানা ধরনের অযৌক্তিক, বলদর্পি ও তাড়াহুড়োমুলক আচরণ করে থাকে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তার দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন শত্রুদের তৎপরতাকে সে ধরনের আচরণ বলেই মনে করছেন।

মরহুম ইমাম খোমেনীর মাজার-প্রাঙ্গণে সমবেত সর্বস্তরের জনতা 

 

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, মরহুম ইমাম খোমেনী ছিলেন সব ক্ষেত্রেই শত্রুদের ওপর চরম আস্থাহীন, তিনি বরং জাতির নানা শক্তি ও ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দিতেন। 

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন শত্রুদের অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও দৃশ্যমান নানা চাপের আসল উদ্দেশ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ওরা কেবল ইরানের ইসলামী সরকারের ওপর নয়, ইরানি জনগণের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে যাতে জনগণ ইসলামী সরকার-ব্যবস্থার ওপর হতাশ হয়ে পড়ে, কিন্তু মহান আল্লাহর সহায়তায় সরকার ও জনগণের প্রচেষ্টার কারণে শত্রুরা এই লক্ষ্য অর্জনে কখনও সফল হবে না। 

তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ওদের একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ হল ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু শক্তিসহ ইসলামী এই রাষ্ট্রের নানা শক্তিমত্তাকে দুর্বল করা বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করা।

জনগণের নানা দাবি-দাওয়া বিষয়ক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলগুলোকে অপব্যবহার করে সেগুলোকে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় পরিণত করার পশ্চিমা ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও জনগণকে সতর্ক থাকতে বলেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়ের পক্ষে  এবং বিশ্বের মজলুম জাতিগুলোর প্রতি ও বিশেষ করে মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির প্রতি ইসলামী ইরানের সমর্থন অব্যাহত থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে আগামী শুক্রবারে অনুষ্ঠেয় এবারের বিশ্ব কুদস দিবসের মিছিলে মানুষের উপস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। 

সমবেত জনগণের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা 

 

মুসলমানদের প্রথম কিবলার শহর বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইসরাইলি দখল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মরহুম ইমাম খোমেনীর আহ্বানে প্রতিবছর রমজানের শেষ শুক্রবারে বিশ্ব-কুদস দিবসের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বব্যাপী। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পরের বছর থেকেই শুরু হয় এ দিবস উদযাপন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু-সমঝোতার শর্তের আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা এক লাখ ৯০ হাজার এসডাব্লিউইউতে উন্নীত করার প্রস্তুতি নিতে তার দেশের জাতীয় আনবিক শক্তি সংস্থার প্রতি নির্দেশ দিয়ে আরও বলেছেন, কোনো কোনো ইউরোপীয় সরকারের কথাবার্তা থেকে মনে হচ্ছে তারা চায় ইরানি জাতি নিষেধাজ্ঞাও সহ্য করবে আবার পরমাণু কর্মসূচিও বন্ধ রাখবে। কিন্তু ওই সব ইউরোপীয় সরকারের জেনে রাখা উচিত তাদের এই দিবা-স্বপ্ন কখনও সত্যি হবে না।

( SWU= Seperative Work Unit তথা এসডাব্লিউইউ হচ্ছে ইউরেনিয়াম ২৩৮ থেকে ইউনেয়িাম ২৩৫ -কে আলাদা করার শক্তি ও গতির একক )

সর্বোচ্চ নেতা বলেন, পরমাণু সমঝোতার ভিত্তিতে আগামীকাল থেকেই এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। নিশ্চিতভাবেই খুব শিগগিরই ইরানের জন্য পরমাণু তৎপরতার প্রয়োজন দেখা দেবে বলে তিনি জানান। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও পাশে মরহুম ইমাম খোমেনীর নাতি জনাব হাসান খোমেনী 

 

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ছিল না, এ কারণে সীমান্ত শহরগুলো থেকে শুরু করে রাজধানী তেহরান পর্যন্ত রাত-দিন ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়তো। কিন্তু বর্তমানে তরুণ বিশেষজ্ঞদের কল্যাণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে পরিণত হয়েছি। শত্রুরা এটা জানে যে, তারা যদি একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তাহলে আমরা দশটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এর জবাব দেব।

তিনি বলেন, শত্রুরা এ বিষয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালাচ্ছে যাতে আমরা আমাদের জাতীয় শক্তি ও দৃঢ়তার এই উপাদান হাতছাড়া করি এবং তারা সহজেই আমাদের দেশ-জাতি ও ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু ইরানি জাতি তাদের এ তৎপরতার মোকাবেলায় রুখে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা চলতি বছরে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ)'র শাহাদতের আঘাত প্রাপ্তির দিবস ও মরহুম ইমাম খোমেনী (র) মৃত্যু-বার্ষিকী একই দিনে (তথা ১৯ রমজান) হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে ইরানের এই মহান নেতার নেতৃত্বের মধ্যে হযরত আলীর নেতৃত্বের প্রভাব ও মিলের কিছু দিক তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, মরহুম ইমাম খোমেনীও ইসলামী বিপ্লব ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে হযরত আলীর যুগের মতই মহানবীর (সা) ভবিষ্যদ্বাণীর হাদিসে বর্ণিত 'নাকিসুন', 'কাসিতুন' ও 'মারিকুন 'জাতীয় তিন বিভ্রান্ত গোষ্ঠীর নানা বাধার শিকার হয়েছিলেন এবং তাদের মোকাবেলায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার হযরত আলীর নীতিই অনুসরণ করেছেন। 

উল্লেখ্য, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) হযরত আলীর (আ) প্রতি ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন যে তাঁর খেলাফতের সময় তিনি তিনটি বিভ্রান্ত গোষ্ঠী নাকিসুন, কাসিতুন ও মারিকুন-দের মুখোমুখি হবেন। নাকিসুন-রা ছিল হযরত আলীর প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়া সত্ত্বেও পরে শপথ বা আনুগত্য ভঙ্গকারী গোষ্ঠী তথা আলীর বিরুদ্ধে জামাল যুদ্ধে জড়িত তালহা, যুবাইর ও আয়শার মত সাহাবিরা, কাসিতুনরা ছিল আলীর বিরুদ্ধে  সিফফিনের যুদ্ধে জড়িত মুয়াবিয়ার মত বিভ্রান্ত গোষ্ঠী এবং মারিকুনরা ছিল ধর্মের সত্য  উপলব্ধিতে ব্যর্থ খারেজিদের মত অজ্ঞ বা নির্বোধ ব্যক্তিরা। এই শেষোক্তরা আলীর বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে জড়িত হয়েছিল।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/৫    
            

ট্যাগ

২০১৮-০৬-০৫ ১৮:৩৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য