ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর ইরানের পরিবর্তিতে পরিস্থিতিতে ইরাকের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল আট বছরের যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের পরেও বিপ্লব পরবর্তী ইরানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতি যেভাবে হয়েছে তা এক কথায় বিস্ময়কর। আমরা তাই 'বিপ্লব পরবর্তী ইরানের উন্নয়ন ও অগ্রগতি' শিরোনামে দুই পর্বের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।

এই অনুষ্ঠানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খান। 'ইসলামি বিপ্লব পরবর্তী ইরানের উন্নয়ন'নামে এই অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় রয়েছি।

ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ইরানের জনগণ ইসলামি আদর্শে উজ্জীবিত এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী খোদাদ্রোহী রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং বিজাতীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার মুহাম্মদ রেযা শাহ ও তাঁর সরকারকে উৎখাত করে। বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল-অভ্যন্তরীণ স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি,বহিঃশক্তির তাঁবেদারি থেকে স্বাধীনতা,নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণকে নিজেদের হাতে গ্রহণ,জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নিজস্ব স্বকীয় সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ইত্যাদি। এ লক্ষ্য কতোটা অর্জিত হয়েছে জানতে চাইলে ড. সিদ্দিকুর রহমান খান বললেন:

যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে,আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপ করে শত্রুরা চেয়েছিল ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু করে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে নতজানু ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে। কিন্তু সেই অপচেষ্টা ইরানি নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিয়েছে। ফলে বিপ্লব-পরবর্তী গত ৩৯ বছরে ইরানে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,পারমাণবিক বিজ্ঞান,তথ্যপ্রযুক্তি ও ন্যানোটেকনোলজিসহ সকল ধরনের জ্ঞান-গবেষণা,সুস্থ সংস্কৃতি ও শিল্পকলা চর্চা ইত্যাদিসহ জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি-অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। গত প্রায় চার দশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের অভাবনীয় উন্নতি ও অগ্রগতির ধারা বিন্দুমাত্র থেমে থাকে নি বরং অনিবার গতিতে অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমান সময়ে মুসলিম দেশগুলোর বেশিরভাগ যখন পরাশক্তি ও তাদের দোসর পশ্চিমা এবং অন্য বৃহৎ শক্তির তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে সেখানে ইরান স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে পশ্চিমা দেশগুলোকে যারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলাফেরা করছে ইরান তাদের অন্যতম। বস্তুত ঈমানী শক্তি, সুযোগ্য নেতৃত্ব,মেধার অনুশীলন ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের অনুসারীরা একের পর এক বাধা অতিক্রম করে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর কারণ হলো ইরানের সংবিধান তাগুতি রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এর ফলে শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্বের পথ সুগম হয়- যা রাজতান্ত্রিক যুগে অসম্ভব ছিল। ড. সিদ্দিকুর রহমান ইরানের সংবিধান এবং সরকার সম্পর্কে যেমনটি বললেন:

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার নাগরিকদের মৌলিক মানবিক অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে সামাজিক নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু। যে কোনো দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর। গত চার দশকে ইরানের সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এক্ষেত্রে ইরানের অর্জন অন্য অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত দেশের মানুষ সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে,আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয় অস্ত্র বহন করতে, বর্ণবৈষম্য,সামাজিক বৈষম্য,সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ,খুন,ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চরম নৈতিক অবক্ষয়,গভীর পারিবারিক সংকট প্রভৃতি যেখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার সেখানে ইরানে বিরাজ করছে উল্টো চিত্র। শিশু ও নারী নির্যাতন, লুটপাট, খুন-খারাবি,সাইবার ক্রাইম ইত্যাদি থেকে ইরান অনেকটা মুক্ত। ইরানে বর্তমানে সামাজিক অপরাধ প্রবণতার হারও অনেক কম। ড.সিদ্দিকের ভাষ্যমতে:

বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ বর্তমান বিশ্বের এক মূর্তিমান আতংক। একসময় ইরানকে সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ধর্মের নামে যে সন্ত্রাস মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র সভ্যতাকে গ্রাস করতে চাচ্ছে তার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বের শান্তিকামী জাতিসমূহকে জাগ্রত করতে ইরান সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। আফগানিস্তান,ইরাক,সিরিয়া,ইয়েমেন, ফিলিস্তিনসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে আজ সেই সত্য সহজেই বাস্তব হয়ে ওঠে। ইসলামের শত্রুরা সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছিল ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে। কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র সফল হয় নি। ইরান এখন  উদীয়মান অর্থনীতির এক সম্ভাবনাময় দেশ।

ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রও ইরানের ওপর নানা রকমের বিধি-নিষেধ ও বাধা-বিপত্তি আরোপ করতে থাকায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও লক্ষ্য অর্জন সহজসাধ্য ছিল না।

এতদসত্ত্বেও ইরান চার দশকের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে দেশটি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ। এক সময় তেল ও খনিজ গ্যাস ছিল ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। ইরান সরকার বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা এবং সময়ের দাবি মোতাবেক তেলনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে নতুন নতুন খাত নির্ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে ইরানি অর্থনীতিতে ক্রমশ শিল্প,কৃষি ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটছে। ফলে দেশটির অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে।

এ বিষয়ে কথা হবে পরবর্তী পর্বে। মুসলিম বিশ্বের গর্বে পরিণত হোক ইরানের সমৃদ্ধি। এ প্রত্যাশায় পরিসমাপ্তি টানবো আজকের আসরের।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/০২

 

২০১৮-০৮-০২ ২০:২৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য