ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খানের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। প্রথম পর্ব নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। গত পর্বে আমরা ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গের অবতারণা করে আসর গুটিয়ে নিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা এবং সময়ের দাবি মোতাবেক তেলনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে নতুন নতুন খাত নির্ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে ইরান। যাই হোক আজকের পর্বেও আমাদের সঙ্গে থাকছেন ড. সিদ্দিকুর রহমান খান।

বন্ধুরা! ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইরান বর্তমানে একটি সফল দেশ। রপ্তানি খাতে ইরানের অর্জন উল্লেখ করার মতো। ইরানের শীর্ষ দশ শ্রেণির রপ্তানি পণ্যসামগ্রীর তালিকায় প্রথমেই রয়েছে তেলসহ খনিজ জ্বালানি। মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগই অর্জিত হয় এ খাত থেকে। ইউরোপের বাজারেও ইরানের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগে ইরানের বৈচিত্র্য আনার ক্ষমতাও রয়েছে যথেষ্ট। গত বছর ২২টি বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তি করতে সমর্থ হয় ইরান। ইতোমধ্যে দেশটির পানি ও বিদ্যুত খাতে ৮ বিলিয়ন ডলারের অধিক বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট স্থিতিশীল বলে ইউরোপ, চীন, আমেরিকা,আফ্রিকা, ভারতসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো দেশটিতে বিনিয়োগে ছুটছে। ড. সিদ্দিকের ভাষ্য শোনা যাক:        

তেল সম্পদের বাইরেও বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান এবং সফলও হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। যেমনটি ড. সিদ্দিক বললেন। আসলে বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে ইরান। বিপ্লব-পূর্ব সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে ইসলামের চেতনায় ঐশী আলোয় আলোকিত হয় ইরান। বলাবাহুল্য ইরান ইতোমধ্যেই পৃথিবীর সচেতন ও আলো প্রত্যাশী মানুষকে আরো বেশি সত্য ও সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে ইরান এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত হয়।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবং শিক্ষাবিদ ড. সিদ্দিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে। তিনি বললেন:

শিক্ষাক্ষেত্রে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থানে রয়েছে। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে যেসব বৈশিষ্ট্য কাজ করেছে তা হচ্ছে শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি। ইসলামি শিক্ষা-দর্শনের ভিত্তিতে দেশের প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রেখে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ফলে ইসলামি দর্শনের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি এখন এককথায় বিস্ময়কর। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নানা রকমের বাধা-বিপত্তি,পাশ্চাত্যের অসহযোগিতা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ইরানি বিজ্ঞানীরা চরম আত্মত্যাগ ও সাধনার পরিচয় দেয়ায় দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক উন্নতি ও সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৭ ‘হাইলি সাইটেড রিসারচারস’ শীর্ষক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ইরানি বিজ্ঞানীরা। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে রয়েছে ইরান।

মহাশূন্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সক্ষম দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান নবম এবং মহাকাশযানে প্রাণী পাঠানোর ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এর সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইরানে বিগত দু’দশকে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে লক্ষণীয় উন্নতি সাধিত হয়েছে।

ভ্যাকসিন উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যে ১ম। স্টেমসেল গবেষণার ক্ষেত্রে ইরান প্রথম সারির ১০টি দেশের মাঝে অবস্থান করছে। স্টেমসেল রিপ্লেস করার ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান দ্বিতীয়। হাড়,হার্টভাল্ভ ও ট্যানডন রিপ্লেস করার ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান তালিকার শুরুর দিকে। ন্যানোটেকনোলজি খাতে ইরানের প্রবৃদ্ধি বিস্ময়কর।

বিদ্যুৎ,জ্বালানি খাত এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানেও একইরকমভাবে  সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।গত প্রায় চার দশকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইরানের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ইরানের নাম এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাধুনিক ও জটিল। ইরানি বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত জরুরি এ ক্ষেত্রে দর্শনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। ইরানি বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী মৌলিক কোষ তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় ইরান এ ক্ষেত্রে বিশ্বের ৫টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসায়ও ইরানি বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে মেডিক্যাল ট্যুরিজম ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় ইরানের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে।

একইভাবে শিল্প ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও ইরানের অগ্রগতি থেমে নেই। সংস্কৃতি মানুষের জীবনবোধ বিনির্মাণের কলাকৌশল। এটি মানুষের জীবনের একটি শৈল্পিক প্রকাশ। ইসলাম সুস্থ ও মানবিক চিন্তার বিকাশের পথে সাংস্কৃতিক চর্চার বিরোধী তো নয়ই,বরং সংস্কৃতির উন্নত সংস্করণ উপহার দিতে সক্ষম- এটাই প্রমাণ করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।  এ বিষয়ে ড. সিদ্দিকুর রহমান বললেন:

সংস্কৃতির উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবতার কথাটিও বলা যায়। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে,বিশ্বমানবতা ও বিশ্ব-মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বর্তমান অর্জনের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আজ বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের অনন্য মডেল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/০৮

২০১৮-০৮-০৮ ১৮:৪৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য