২০১৯-০২-০৯ ১৫:২৪ বাংলাদেশ সময়
  • (বামে) মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্ (ডানে) ইরানের আজাদি টাওয়ার
    (বামে) মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্ (ডানে) ইরানের আজাদি টাওয়ার

মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্: বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লব ইরানের ইসলামি বিপ্লব। মরহুম আধ্যাত্মিক নেতা, আপসহীন সংগ্রামী, ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে সংঘটিত সফল এ বিপ্লব। বর্তমান পৃথিবীর স্বঘোষিত পরাশক্তিগুলোর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সংঘটিত এ বিপ্লব ঝিমিয়েপড়া মুসলমানদের জাগ্রত করেছিল সার্বিকভাবে।

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আড়াইশ' বছরের পুরোনো রাজতান্ত্রিক পাহলভী বংশের রাজত্বকে তছনছ করে দিয়ে রক্ত সাগরের মধ্য হতে ফুটেছিল ইরানে ইসলামি বিপ্লবের গোলাপফুল। পুরো আশি, নব্বই ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে সারা পৃথিবীকে এর সুঘ্রাণে সুরভিত করেছিল। ইরানের মজলুম জনগণ রেজা শাহ্ পাহলভীর শত অত্যাচারকে মাথা পেতে নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের জন্য কাজ করেছিল। যাবতীয় জেল-জুলুম, হত্যা-গণহত্যা তাদেরকে বিপ্লবের পথ হতে বিচ্যুত করতে পারেনি। তারা ইসলামি বিপ্লবের সফলতার জন্য রাজপথে হাসিমুখে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছিল। একদিন সে রক্ত কথা বলে উঠেছিল। জনতার মুষ্ঠিবদ্ধ গগণবিদারী আওয়াজ স্বৈরশাসক রেজা শাহ্ পাহলভীকে ইরান ত্যাগে বাধ্য করেছিল। আর নিজ মাতৃভূমি হতে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত ফ্রান্সের প্যারিসে নির্বাসিত ইমাম খোমেনীকে তারা হৃদয় গোলাপ দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল। সেদিন থেকে দুনিয়ার বুকে ইরানবাসী আল কুরআন ও সুন্নাহ'র আদর্শকে সমুন্নত করার লক্ষ নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।

ইমাম খোমেনী ও আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী

বিপ্লবের অব্যবহিত পর হতে ইহুদী-খ্রিস্টান, ইঙ্গ-মার্কিন-রুশ শক্তি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে দেবার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অন্যের প্ররোচনায় পরিচালিত ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের যুদ্ধকে ইরানবাসী অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ করেছিল। প্রতিরোধ করেছিল অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লব। প্রতিদিন খুন ঝরেছে ইসলামি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের। কত আয়াতুল্লাহ্, কত ওলামা-মাশায়েখ, কত সরকারি কর্মকর্তা এ বিপ্লবের জন্য জীবন দান করেছেন তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। একইদিন একই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীসহ ৭০ জন পার্লামেন্ট সদস্যকে হত্যা করে ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার অপপ্রয়াসও ব্যর্থ হয়। বার বার ইরানের ইসলামি বিপ্লব রক্ত সাগর থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।

২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ইহুদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিগত ৪০ বছরের প্রতিটি দিন ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার জন্য তাদের কামান আর মিসাইলের ট্রিগারে আঙ্গুল চেপে বসে আছে। কিন্তু হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বীর জাতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ইহুদি-মার্কিন আক্রমণ ও অবরোধ আগ্রাসনের হুমকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সফলভাবে টিকে আছে ৪০ বছর। টিকে থাকবে শত সহস্র বছর।

ইরানি জাতির টিকে থাকার মূলে রয়েছে তাদের সুনেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্য। আছে একটি সুলিখিত সংবিধান। অটুট আছে ইমামের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য। রয়েছে বিপ্লবের পর হতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মজলিশ ও অভিভাবক পরিষদ। সবার উপরে মূল রহস্য, টানা ১০ বছর (১৯৭৯-১৯৮৯) বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ্ রূহুল্লাহ্ খোমেনীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ্ খামেনীকে পরবর্তী ইমাম হিসেবে নিয়োগ প্রদান। অভিভাবক পরিষদের সুনেতৃত্বে যাবতীয় ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লব টিকে আছে।

কারো দয়ার ওপর নির্ভর করে নয়, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে আল কুরআন ও আল সুন্নাহকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করে ইমাম হুসাইন (রা.) এর দৃঢ়চিত্ততাকে অবলম্বন করে ইসলামি ইরান সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে। কী কৃষি, কী শিল্প, কী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কী সমর সম্ভারের বিকাশ, কী শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র, কী অভ্যন্তরীণ সার্বিক উন্নয়ন- প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পৃথিবীর শিল্প উন্নত দেশগুলোকে টেক্কা দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ইরাক কর্তৃক ৮ বছরের চাপিয়ে দেয়া অন্যায় যুদ্ধ, ৪০ বছরব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন-কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধকে ইরান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও সফল কূটনীতি বিশ্বব্যাপী নন্দিত; পক্ষান্তরে পারমাণবিক চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা নিন্দিত।

ইরানের তৈরি জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানে সবচাইতে সফলতা সামরিক ক্ষেত্রে। ইহুদী-মার্কিন আগ্রাসনের প্রত্যহ হুমকির মুখে আত্মরক্ষার লক্ষে অস্ত্র-শস্ত্র তৈরি ও মজুদে নিজেদের সক্ষমতা ইরান বিশ্ববাসীকে প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। আর ইরানের সেই অন্তর্নিহিত বিপুল সামরিক শক্তি ও কৌশলকে পদানত করা দুনিয়ার কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর হাত দিতে সাহস করছে না। যদি ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দুর্বল কোন দেশ হতো তাহলে বহু পূর্বেই মার্কিনীরা তুড়ি মেরে ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিত। সম্প্রতি আইএস (দায়েশ) দমনে ইরাক ও সিরিয়াকে ইরান অত্যন্ত সুকৌশল ও সফলতার সাথে সার্বিক সহায়তা করেছে। ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক সাফল্যে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। দুঃখজনক যে, বিশ্ব মুসলিমের ঘোরতর শত্রু ইসরাইল আজ আল্লাহর রাসূলের দেশ সৌদি আরবের বিশস্ত বন্ধু!

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সফলতা বিশ্বনন্দিত। শুধুমাত্র পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় নয়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বাণী ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জগতময়। যেখানেই স্বৈরাচার আছে সেখানেই ইমাম খোমেনীর প্রদর্শিত গণজাগরণ ও গণজোয়ারে জনতার নিরস্ত্র বিপ্লব সশস্ত্র স্বৈরাচারকে পদানত করেছে। দেশে দেশে মুসলিম ছাত্র-জনতা তাদের ঘুমঘোর ভেঙে আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দেয়ার দীক্ষা পেয়েছে বিপ্লব হতে। ফিলিপাইনে মার্কোসের দুঃশাসনের অবসান, বাংলাদেশের স্বৈরশাসক এরশাদের পতন এবং আরব বসন্তে যুবক-তরুণ ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রেরণা অবশ্যই স্বর্ণাক্ষরে লেখা ইরানের ইসলামি বিপ্লব। শাসনে-ত্রাসনে, শোষণ ও নিপীড়নে বিপর্যস্ত জনপদের উদ্বেগাকুল জনতা হৃদয় মথিত আরাধনায় আল্লাহর দরবারে কামনা করেছে ইমাম খোমেনী (রহ.) এর মত একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। কারণ নিকট অতীতে তাঁর মতো কোন শাসকের কীর্তি সাধারণ মানুষের হৃদয়-মনকে এত ব্যপকভাবে আলোড়িত করতে পারেনি। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী খোলাফায়ে রাশেদীনের স্বর্ণযুগের কাহিনী শুনেছে কিন্তু বাস্তবে দেখেনি। ইমাম খোমেনী এবং তার পরবর্তী শাসকবৃন্দ দুনিয়ার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নিজেদের ধর্ম, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও নিজেদের জাতিকে স্বয়ম্ভরতার মাধ্যমে যেভাবে রক্ষা করেছে তা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বিরল।

চেচনিয়া-বসনিয়া, কসোভো, গাজা, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, আরাকান, ইয়েমেন, মধ্যএশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলমানদের জন্য ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মানবিক সাহায্য উদাহরণযোগ্য। বিশেষ করে ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও লেবানানের মজলুম মুসলমানদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একমাত্র অনুপ্রেরণা ইরান। অস্ত্রে নয় মানসিক উজ্জীবনে দক্ষিণ লেবানান ও গাজার মজলুম মুসলমানগণ নিজেদের অধিকার আদায়ে যে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ্কে যুদ্ধবাজ অবৈধ ইসরাইল আজ সমীহ করে চলতে বাধ্য হয়েছে। গাজার জানবাজ মুজাহিদদের ভয়ে ইহুদীরা ভীত-সন্ত্রস্ত। একথা আজ দিবালোকের মত সুস্পষ্ট যে মুসলমানদের শত-সহস্র ব্যর্থতার মাঝে একমাত্র ইরান মুসলিম বিশ্বের মুখ উজ্জ্বল করেছে। নিজ পায়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবার প্রেরণা জুগিয়েছে। মুসলিম দেশসমূহের জনগণ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের এ থেকে শিক্ষা নেয়া অতি জরুরি।

আমরা ইরানের জনগণ, ইরানের সরকার এবং বিশ্বব্যাপী ইরানের বন্ধু ও সমর্থকদের ৪০তম ইসলামি বিপ্লব বার্ষিকীতে আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ্ ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে চিরঞ্জীব করুন। আমীন।#

লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া।

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৯

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য