২০১৯-০৩-২৫ ০০:৫৩ বাংলাদেশ সময়
  • ইরানে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবাহ উৎসব: বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয় মডেল

নূরে আলম মাসুদ : ‘জান্নাত পর্যন্ত সহযাত্রী’-এই শ্লোগানকে সামনে রেখে গত ১১ মার্চ তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২তম বিবাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৬০০ ছাত্রছাত্রী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিভিন্ন বাংলা সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে লেখা প্রকাশিত হলেও ঘটনাটি বাংলাদেশি তরুণদের মাঝে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে The Beauty of DU Campus নামের একটি ফেসবুকে পেইজে পোস্ট হওয়ার পর।

এখন পর্যন্ত সেই পোস্টে ১২ হাজার লাইক-কমেন্ট-শেয়ার হয়েছে; আর এই পোস্টটা এমন সময়েই করা হয়েছে, যার ঠিক আগেরদিনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রীহলে ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে নবজাতক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা আমাদেরকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে; একইসাথে আমাদের তরুণেরা ইরানের মতো এমন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবাহ উৎসব’-কে দেখছে এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াবার অন্যতম সুন্দর সমাধান হিসেবে।

সেই ফেইসবুক পোস্টটির বেশকিছু উল্লেখযোগ্য মন্তব্যের মাঝে ‘কানিজ ফাতেমা’ নামে একজন মন্তব্য করেছেন যে, “তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এমন একটা ক্যাম্পাস যদি বাংলাদেশে থাকত (যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ ও অর্থায়নে বিবাহ উৎসব হয়), তাহলে ছাত্রছাত্রীদের বিষণ্ণতা ৫০% কমে যেত।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউসুফ হাবীব মন্তব্য করেছেন, “এ ধরণের ব্যবস্থা থাকলে ছাত্রছাত্রীদের রেজাল্ট আরো ভালো হবে, কারণ রাত জেগে তাদেরকে প্রেম করতে হবে না।” ফ্লোরেন্স নামের একজন মন্তব্যে আফসোস করেছেন এভাবে, “এমন ব্যবস্থা চালু থাকলে ছাত্রছাত্রী প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা, কিংবা অবৈধ মেলামেশার সন্তানকে ডাস্টবিন, ট্রাঙ্ক, গলিতে ফেলে দেবার মত ঘটনা ঘটত না।” ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপির কাছেও অনেকে অনুরোধ করেছেন এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবার। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

দুনিয়ার আর কোনো দেশে এ ধরণের ব্যবস্থা চালু আছে কিনা আমি জানি না, তবে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হবার পর সেদেশের আলেমসমাজ তারুণ্যের নৈতিক উন্নতির প্রতি বিশেষ নজর দেন। যার ফলস্বরূপ বিগত প্রায় দুই যুগ ধরে এ ধরণের ‘বিবাহ উৎসব’ চলে আসছে। সাধারণত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অফিস ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে প্রতি বছর এই ‘বিবাহ উৎসবের’ আয়োজন করা হয়ে থাকে। এ বছর ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১২ হাজার ছাত্রছাত্রীর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা অবিবাহিত ছেলেমেয়েদেরকে পরস্পরের কাছাকাছি আসার অনেক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এখানে পরস্পর চিন্তা বিনিময়ের সুযোগ ঘটছে; যেসব বিষয়কে একটি ছেলে বা মেয়ে গুরুত্ব দেয়, তার ভিত্তিতেই অপরজনকে পছন্দ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এটি খারাপ কিছু নয়, কেবল এই বিষয়টিকে স্থায়ীবন্ধনে রূপ দিলেই তা সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনবে; যে প্রচেষ্টা ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পক্ষ থেকে করা হয়ে আসছে গত দুই যুগ যাবত। বিপরীতে আমাদের বাংলাদেশে ছেলে-মেয়েদের কাছাকাছি আসার সুযোগ ঠিকই ঘটছে কিন্তু বিয়েকে সামাজিকভাবে আরো কঠিন করে দেয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীদের দেখা যাচ্ছে একাধিক প্রেম, তাতে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার মতো কাজ কিংবা অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের সন্তানকে হত্যা করতে। যে সম্পর্কের কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেই প্রেমের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হচ্ছে তরুণদের, এতে যৌবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, প্রোডাক্টিভিটি কমে যাচ্ছে। যে তরুণ নিজের আবেগ ও যৌনজীবন সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সে কিভাবে দেশ ও জাতির জন্য অবদান রাখবে? এটা বাংলাদেশের লাখো তরুণের দুঃখজনক বাস্তবতার চিত্র, যা আমাদের অভিভাবক সমাজ দীর্ঘদিন যাবৎ উপেক্ষা করে আসছেন।

মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজারের বেশি স্বেচ্ছা-গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে, এর মাঝে ঠিক কয় হাজার অবৈধ সন্তানের গর্ভপাত তা আমার জানা নেই। তবে বিভিন্ন ক্লিনিকের সূত্রে যা জানা যাচ্ছে, তাতে এর মাঝে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অবিবাহিত ছাত্রীদের সংখ্যাই বেশি। এতো গেল গর্ভে সন্তান এসে যাবার পরিসংখ্যান। জন্মনিরোধক বিভিন্ন সামগ্রীর সহজলভ্যতার এই যুগে তাহলে প্রতিদিন কত হাজার কিংবা লাখ অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক ঘটছে ষোল কোটি মুসলমানের এই দেশে, তা আমাদের দেশের অভিভাবক মহলকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কোনো পিতামাতাই তার নিজের সন্তানকে চরিত্রহীন বলেন না কিংবা ভাবতে পছন্দ করেন না, এ কারণে তারা গোটা বিষয়টার দিকেই চোখ বুঁজে থাকেন। বড়জোর প্রসঙ্গক্রমে বলেন, “এ যুগের ছেলেমেয়েরা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।” অথচ তার নিজের সন্তানও যে ‘এ যুগেরই’ তরুণ, সেও যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে এবং হতে পারে যে সেও অবৈধ মেলামেশা করছে- তা ভেবে দেখেন না। বাবা-মা’র কাছে সে সন্তান পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি ভদ্র ছেলে-মেয়েটিই হয়ে রয়েছে কিন্তু তার জীবনসঙ্গীর চাহিদা তো আর থেমে নেই। আল্লাহতায়ালা তো আর আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পর অপেক্ষা করিয়ে রাখেননি যে, আদমের উন্নত ক্যারিয়ার হোক, তারপর হাওয়া (আ.)-কে এনে দেবো তার কাছে! তিনি আদমকে সৃষ্টি করেই হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন, এমনকি যৌবনপ্রাপ্তির আগেই তাদেরকে সঙ্গী করে দিয়েছেন, কেননা স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক তার চেয়েও বেশি কিছু: জীবনসঙ্গী। আজকের তরুণেরা, হোক বাংলাদেশের কি ইরানের, তারাও সেই আদম-হাওয়ার মতই। ‘নারী’ কিংবা ‘পুরুষ’ হিসেবে বৈশিষ্ট্য, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষায় তাদের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজ ব্যবস্থায় সেই আদম সন্তানদের গড়ে তুলছি, যেখানে মাঝখানে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার নামক জিনিসকে প্রবেশ করিয়ে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্ককে ব্যাহত করা হচ্ছে। এতে কি এই ছেলে-মেয়েরা ভালো থাকছে, নাকি আল্লাহ খুশি হচ্ছেন? কোনোটাই নয়। মাঝখানে কেবল অবাধ মেলামেশার সমাজে তাদেরকে যথাবয়সে বিয়ে না দিয়ে গুণাহের সুযোগই করে দিচ্ছি।

অতএব, আমি বাংলাদেশের সচেতন অভিভাবকদের অনুরোধ করব, ইরানের এই মডেলকে অনুসরণ করে আপনারাও উদ্যোগ নিন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাদের টাকায় আপনাদের সন্তানেরা পড়ছে, সে বিশ্ববিদ্যালয়কে বলুন বিবাহ উৎসবের আয়োজন করতে। আশা করা যায় যে, এতে আপনাদের সন্তানেরা মানসিকভাবে আরো স্থিতিশীল হবে; প্রেম, বিষণ্ণতা, আত্মহত্যা কিংবা অবৈধ মেলামেশা আর ট্রাঙ্কের ভিতরে সন্তান- এ ধরণের বিষয় থেকে আপনাদের সন্তানেরা বেঁচে যাবে। অসংখ্য ছেলেমেয়ে এমন অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, তারা আপনাদেরই কারো না কারো সন্তান; হয়ত আপনি চোখ বুঁজে রয়েছেন বলে দেখতে পাচ্ছেন না, কিন্তু আল্লাহ তো চোখ বুঁজে নেই।

অনেকেই বলেন, চাকরি পাবার আগে বিয়ে দিলে ছেলে বউকে খাওয়াবে কি? অথচ বাস্তবতা হলো, আপনার ছেলেও না খেয়ে থাকে না, আর যে মেয়েটিকে সে ভবিষ্যতে বিয়ে করবে, সেও না খেয়ে নেই। কেবল বিবাহের একটি চুক্তি হলেই দুইজনের খাবারের উৎস বন্ধ হয়ে যেতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। আপনার ছেলে আপনার টাকায় তিনবেলা খেয়ে, আর অপরদিকে আরেকজনের মেয়ে তার টাকায় তিনবেলা খেয়ে যখন অবৈধ মেলামেশা করে যাচ্ছে আর আপনারা চোখ বুঁজে আছেন- তখন এই পাপের দায় কিন্তু আপনাদের উপরেও আসবে। সেই ট্রাঙ্কের নবজাতকটি কিন্তু আপনাদেরই কারো না কারো নাতি/ নাতনি। ভেবে দেখছেন তো?#

 

লেখক: খণ্ডকালীন শিক্ষক, তালিন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, এস্তোনিয়া।

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪

 

 

ট্যাগ

মন্তব্য