• ইরাকের জনপ্রিয় গণ-বাহিনী হাশদ আশ শাবি
    ইরাকের জনপ্রিয় গণ-বাহিনী হাশদ আশ শাবি

২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে (বৃহস্পতিবার ২২-৬-২০১৭) রয়টার্সে প্রকাশ করা হয় একটি প্রবন্ধ। ‘Khamenei warns Iraq not to trust US’– তথা ‘মার্কিন সরকারকে বিশ্বাস না করতে ইরাকের প্রতি খামেনেয়ীর হুঁশিয়ারি’ শীর্ষক এ প্রবন্ধে লেখা হয়েছিল:

২০১৪ সালে যখন ইরাকী সেনাবাহিনী ও পুলিশের ডিভিশনগুলো গণহারে পালিয়ে গিয়েছিল তখন  ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী যা পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (গণ বাহিনী বা আরবিতে আল-হাশদুশ শাবী) নামে প্রসিদ্ধ তা বাগদাদকে আইএস আইএস বা দায়েশের হাত থেকে ইরাককে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে।ঠিক তখন থেকেই ইরান সমর্থিত এই মিলিশিয়া বাহিনী যা ৬০০০০এরও বেশী সংখ্যক যোদ্ধার সমম্বয় গঠিত তারা সবসময় যে দায়েশ (আইএসআইএস) ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগ দখল করে নিয়েছিল তাদের উপর নিরবচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।

   CNN –এ ২৯-৬-২০১৭ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল Theodor Schleifer’র লেখা একটি নিবন্ধ। ‘John Kerry: Iran is helpful in fighting ISIS in Iraq’ তথা ‘জন কেরি:ইরাকে আইএসআইএস অর্থাৎ দায়েশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান সহায়ক ভূমিকা পালন করছে’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল:

   জন কেরি বলেন: দেখুন সবাই জানে যে ইরানের সাথে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং আমরা ঐ সব চ্যালেঞ্জ নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি। আমি বলতে পারি যে, ইরান সুনির্দিষ্টভাবে ইরাকে বেশ কিছু সহায়ক ভূমিকা রাখছে এবং তারা (ইরানীরা) ইরাকে নিজেদেরকে স্পষ্টতঃ আইএসআইএস-দায়েশের উপর নিয়োজিত রেখেছে।

   আইএসআইএসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সংক্রান্ত দায়িত্বভারপ্রাপ্ত বিশেষ মার্কিন দূত ব্রেন্ট ম্যাক গুর্ক (Brent Mc Gurk) (মঙ্গলবার) বলেছেন: ইরাকে ইরান সমর্থিত অধিকাংশ শিয়া মিলিশিয়াই হচ্ছে সহায়ক। আমরা মনে করি যে, এ সব পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (গণ বাহিনী) অধিকাংশই ইরাক সরকারের অধীনেই কাজ করছে। তবে তাদের ১৫-২০শতাংশ কার্যত: তা করছে না (অর্থাৎ তারা ইরাক সরকারের অধীনে নেই)।

    ২৫-৩-২০১৫ তারিখে প্রকাশিত The National Interest-এর সহকারী সম্পাদক Akhilesh Phillamari প্রণীত Four Iranian weapons of war ISIS should fear-শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছিল:

     ইরান আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে............যখন আইএস (আইএসআইএস বা দায়েশ) মোসুল নগরী দখল করে তখন এ গোষ্ঠীটি শিয়াদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল এবং এর চেয়েও আর জঘন্য কিছু করারও হুমকি দিয়েছিল।

     দায়েশ প্রদত্ত এ হুমকি আরও অধিক বিপজ্জনক আকার ধারণ করা পর্যন্ত অপেক্ষা না করার চেয়ে বরং আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা ইরাক ও সিরিয়ার অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারেই ইরান খুব সক্রিয়।সম্প্রতি একজন ইরানী জেনারেল স্পষ্ট বলেছেন: আজ আমরা ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি যাতে করে যেন আগামীকাল আমাদেরকে তেহরানে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে না হয়।

  মিলিশিয়াঃ

  প্রক্সি গ্রুপ ও গোষ্ঠীগুলো হচ্ছে আইএসের বিরুদ্ধে অনেকটা ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও  প্রভাবশালী অস্ত্র বা হাতিয়ার।কারণ,এ সব গ্রুপ ও গোষ্ঠী ঐ বিশাল জনশক্তির  অতি নিকটবর্তী যারা হচ্ছে ইরাকের জনসংখ্যার ৬০-৭০শতাংশ।

   ইরাকে শিয়া মিলিশিয়ারা প্রধানতঃ ইরানের সহায়তায় সাফল্যের সাথে আইএসের (দায়েশ) মোকাবেলা করা শুরু করে।

   গত বছর (২০১৪) আইএসের (দায়েশ) আকস্মিক উত্থানের পরপর শিয়া মিলিশিয়াদের সমর্থন,পুনর্গঠন ও অস্ত্রে সুসজ্জিত করনের মাধ্যমে ইরান ইরাকে আইএসের (দায়েশ) বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়ে।

    ইরানের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক।কারণ,এদেশ(ইরান) ইরাকের বিভিন্ন শিয়া গ্রুপ ও দলগুলোকে সংগঠিত ও সমন্বিত করেছে এবং বর্তমানে(২০১৫) চলমান তিকরিত যুদ্ধে ইরান খুব ভীষণভাবে জড়িত হয়েছে।শিয়া মিলিশিয়াদের মুখপাত্র মুহাম্মদ আল-ইকাবীর উদ্ধৃতি দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে উল্লেখিত হয়েছে: ইরানই হচ্ছে একমাত্র দেশ যে কিনা ইরাকে যা ঘটছে সে ব্যাপারে প্রকৃত সাড়া ও জবাব দিচ্ছে। রিপোর্টে প্রকাশ, ইরান ইরাকী মিলিশিয়াদেরকে কামান ও গোলাবারুদ (আর্টিলারি)এবং রকেট সরবরাহ করছে।

    বলা হয় যে,ইরানের কুদস আর্মি প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সুলাইমানী তিকরিতের বিরুদ্ধে ৩০০০০ যোদ্ধার সমন্বয় গঠিত শক্তিশালী বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন যাদের অধিকাংশই হচ্ছে শিয়া মিলিশিয়া।আইএসের (দায়েশ অর্থাৎ আইএসআইএস) অগ্রযাত্রা প্রতিহত ও গুড়িয়ে দেয়ার লক্ষে কুর্দি পেশমার্গা বাহিনীকে সহায়তা দানের জন্য দুই প্লেন-ভর্তি অস্ত্র ও সামরিক সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে কাসেম সুলাইমানী গতবছর(২০১৪)ইরাকী স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানের রাজধানী আরবিল গমন করেন। আর ঠিক তখন থেকেই কুর্দি পেশমার্গার যোদ্ধারা ইরানের উপর বেশি বেশি  নির্ভর করা শুরু করেছে এ অভিযোগ করে যে, তারা পাশ্চাত্য ও তুরস্কের কাছ থেকে কোন সাহায্য ও সহায়তা  পায় নি।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 

 

     ড্রোনঃ

     ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আধুনিক ড্রোন বিমান বহর রয়েছে।আর এটা হচ্ছে এমন এক ফ্যাক্টর (নিয়ামক) যা আইএসের বিরুদ্ধে সাফল্যের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের জন্য সহায়ক হচ্ছে।

     ইরান মোহাজের-৪ সার্ভিল্যান্স এয়ারক্রাফট এবং এর আরও উন্নত সংস্করণের ড্রোন ব্যাবহার করছে। আর যখন ইরানের ড্রোন প্রসঙ্গ আসে তখন ইরান যে বেশ ভালোভাবে নিজস্ব প্রযুক্তির উন্নত মান প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে এ সব ড্রোন।

     ন্যাশনাল ইন্টারেস্টে রবার্ট ফার্লি লিখেছেন: ইরান সিরিয়া ও ইরাকে ব্যাপক পরিসরে ড্রোন ব্যাবহার করে ইরাকি ও সিরিয় সরকারকে ময়দানি (ফিল্ড) মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স তথ্যাদি সরবরাহ এবং বিমান হামলা চালানোর টার্গেটগুলোও চিহ্নিত করেছে।

     সর্বতোভাবে, ইসরাইল অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য যে কোন দেশের চাইতে সম্ভবতঃ ইরানের রয়েছে ড্রোন ব্যাবহারের বেশি অভিজ্ঞতা। তবে কৌশলগত আক্রমণ (ট্যাকটিকাল অ্যাটাক) পরিচালনার জন্য এখনো ইরানের ড্রোন ব্যাবহারের  আরও কোন পথ থাকতে পারে। ড্রোনের দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন এবং এয়ারফ্রেম নির্মাণে ইরান বেশ ভালো কাজ সম্পন্ন করেছে।

     মসুলের পতনের পরে ইরান ইরাকী রাজধানীর কাছাকাছি শহর ও নগরগুলোর উপর সতর্ক দৃষ্টি (নজরদারি) ও পর্যবেক্ষণের জন্য বাগদাদে ড্রোন পাঠিয়েছিল। ‘মোহাজের-৪’ ড্রোন ছাড়াও ইরানের ‘আবাবিল-৩’ নামের কতকগুলো পাইলট-বিহীন ড্রোন সিরিজ রয়েছে যেগুলো ইরাকে আইএস টেরোরিস্টদের শনাক্তকরণ ও কড়া নজরদারির ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানি এফ-৪ ফ্যান্টম জঙ্গি বিমান দিয়ে ইরাকে বোমা বর্ষণের টার্গেটগুলো নির্ধারণ ও শনাক্তকরণের কাজে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। (ইরান এখন মোহাজের-৬ ড্রোনও তৈরি করছে যা ১২ কিলোমিটার দূর থেকে টার্গেটকে শনাক্ত করে তা ধ্বংস করতে সক্ষম)

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ইরান গত বছরের (২০১৪) ডিসেম্বরে আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করেছে। আর এই ড্রোনগুলো  ক্যামিক্যাজ (জাপানি) স্টাইলে টার্গেটের উপর আঘাত হানার জন্য বিধ্বস্ত করা হয়।.....

     এফ-১৪

     চার দশক আগে ইরান মার্কিন নির্মিত ৭৯ টি এফ-১৪  টমক্যাট জঙ্গি বিমান কিনেছিল। যা হোক, ইরানের ইসলামি বিপ্লব ও মার্কিন অবরোধ আরোপের কারণে  অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ইরান এ সব জঙ্গি বিমানে কাঠামোগত পরিবর্তন আনে। ১৯৮০’র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে ৩.৫ টন বোমা বহনের মতো বিভিন্ন ধরণের আকাশ থেকে ভূমিতে (এয়ার টু গ্রাউন্ড)  বোমা ও গোলা বহনের উপযোগী করার জন্য এ সব বিমানে পরিবর্তন এনেছিল।

     যা হোক জঙ্গি বিমানগুলোতে আরও ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তন ও রূপান্তর ছিল ইরানের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব সাধনা, উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা। সাম্প্রতিক উন্নয়ন বা আপগ্রেডকরণ ও আধুনিকায়নের মধ্যে রয়েছে এসব এয়ারক্রাফটে ইরানের নিজস্ব তৈরি রাডার সিস্টেম ও ইঞ্জিন সংযোজন এবং ইরানের নিজস্ব উৎপাদিত ২০০০ পাউন্ড (৯০০ কে.জি.) স্মার্ট বোমা বহনে সক্ষম করা।  ফলে এখন ইরানি বিমান বাহিনীর হাতে রয়েছে এক নতুন প্রজন্মের এফ-১৪ বোমারু বিমান।

    অতীতে (ইরান-ইরাক যুদ্ধে) ইরান তার এফ-১৪ জঙ্গি বিমানগুলোকে উঁচুমানের কার্যকারিতা ও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছে এবং আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বোমা ফেলার জন্য  এফ-১৪ বোমারু বিমান ব্যবহারেরও আগ্রহ প্রকাশ করেছিল ইরান। ইরাকে আইএসের (দায়েশ) অবস্থানগুলোর উপর বোমাবর্ষণে ইরান তার মার্কিন নির্মিত এফ-৪ এয়ারক্রাফট ব্যবহার করেছে। আর ইরান যদি তার এফ-১৪ জঙ্গি বিমানগুলো ব্যবহার করে তাহলে আইএস ব্যাপক ও মারাত্মক ধ্বংসের শিকার হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছিলেন।

  ইরানের নানা ধরনের  প্রিসাইশন গাইডেড মিসাইল (যথার্থ ও সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র):

তেহরানের কাছে বিপুল সংখ্যায় নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।  এসব ক্ষেপণাস্ত্র আইএসের টার্গেটগুলো সূক্ষ্ম ও যথার্থভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম। ইরানের সূক্ষ্ম ও যথার্থভাবে নিয়ন্ত্রিত মিসাইল প্রোগ্র্যাম চমৎকারভাবে উন্নত ও অগ্রসর। যেমন, ২০১৩ সালে ইরান তার খালিজ-ই ফার্স সুপারসনিক এ্যান্টিশিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল পরীক্ষা করেছিল যা হচ্ছে মনে দাগ কাটার মতো। এসব ক্ষেপণাস্ত্র টার্গেট বা লক্ষ্যবস্তুর কেন্দ্র থেকে ৮.৫ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত নির্ভুল, সূক্ষ্মও যথার্থ।

   যে সব মিসাইল আইএসের (দায়েশ)বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে সেসবের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হচ্ছে ‘ফাতেহ-১১০’ যা বাশার আল-আসাদ সরকার ও হিজবুল্লাহ ইরানের কাছ থেকে পেয়েছে। ইরান ২০১২ সালে ‘ফাতেহ-১১০’ স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের এক উন্নত সংস্করণের পরীক্ষা করেছিল। এই মিসাইলটি ঐ একই সূক্ষ্মতা, যথার্থতা ও নির্ভুলতায়  জল ও স্থলের টার্গেটগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম।

ইরানের একটি ড্রোন 

 

  আইএস ও অন্যান্য অনুরূপ গ্রুপের বিরুদ্ধে এসব মিসাইলের কার্যকারিতা ও দক্ষতা সিরিয় সরকারের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যা তারা (সিরিয় সরকার) বিরোধী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। যা হোক, ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন সালামির মতে: আমাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল গতিশীল ও চলমান টার্গেটগুলোকেও অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় শনাক্ত করে নির্ভুলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম।

    যদি এ দাবি সত্য হয় তাহলে ইরান আইএসের কনভয় (সাঁজোয়া যান বহর) ধ্বংস এবং তাদের লজিস্টিক ও রসদপত্র সরবরাহের উপর আক্রমণ চালিয়ে আইএসের মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম। আর এ দাবি যদি অতিরঞ্জিত বলে ধরা হয় তাহলেও ইরানের কাছে সূক্ষ্ম ও নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রিত আরও অন্যান্য  মিসাইল আছে যেগুলো মোতায়েন ও ব্যবহার করলে ইরান আইএসের মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম হবে।

    পরিশেষে ইরানের রয়েছে মারাত্মক অস্ত্র ও সমর কলা-কৌশলের ভাণ্ডার যা ইরান ব্যবহার করতে পারে দায়েশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করতে। যদিও ইরান দায়েশের বিজয়ের ব্যাপারে ভীত তবুও দায়েশকেই পরিণতিতে ইরানের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করতে হবে। কারণ,ইরান হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সক্রিয় (proactive) মুসলিম রাষ্ট্র।

    ওসামা শরিফ (আম্মানভিত্তিক জর্ডানি সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার) প্রণীত Arab news-এ ১৫-৫-২০১৭ তাং-এ প্রকাশিত Tehran’s land corridor  through Syria is now a reality শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে:

    এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও (সিরিয়া-ইরাক)সীমান্তে (বাশার আল-আসাদ) সরকারের এক ধরণের প্রতীকী উপস্থিতি মেনে নিয়েছে।কিন্তু সিরিয় সরকারী সেনাবাহিনী একাই সেখানে অপারেশন চালাচ্ছে না। তারা (সিরিয় সরকারী সেনাবাহিনী) আলেপ্পো এবং আরও অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও (অর্থাৎ সিরিয়া-ইরাক সীমান্তবর্তী অঞ্চলে) ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের উপর ভীষণভাবে নির্ভর করছে। ইরানের সাথে টেনশনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে  আম্মান (জর্ডান) এবং ইসরাইল তাদের সীমান্তের কাছে হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য শিয়া মিলিশিয়ার উপস্থিতি সহ্য করবে না।

    আবারও এসব ময়দানি অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রগতি ও উন্নতি দক্ষিণ ও পূর্ব সিরিয়ায় মার্কিন স্ট্র্যাটেজির কার্যকারিতা ও সক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্নোদয় করেছে এবং এ প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে যে, কেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন জোট নির্ধারিত রেড লাইন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হল? যদি সিরিয় সরকারি সেনাবাহিনী আল-তানফের চারপাশে মোতায়েন এবং সিরিয়া-ইরাক সীমান্তে ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের (যারা ইরাকে দায়েশ বা আইএসআইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তারা অর্থাৎ আল-হাশদুশ শাবী বা ইরাকী গণ বাহিনী)সাথে যুক্ত হতে পারে তাহলে আল-তানফে মার্কিন,ব্রিটিশ এবং অন্যান্য বাহিনী ও শক্তির উপস্থিতির আর কী কার্যকারিতা থাকতে পারে ? (এখানে অন্যান্য বাহিনী ও শক্তি বলতে এ অঞ্চলে তৎপর সকল সন্ত্রাসী জঙ্গি দল ও গোষ্ঠী যেমনঃ আইএসআইএস (দায়েশ),আল-কায়দা ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে।)

     বাগদাদ ও দামেস্কের মধ্য দিয়ে বৈরুতের সাথে তেহরানকে সংযোগকারী স্থল করিডোর বাস্তবায়নের লক্ষ গত কয়েকদিনে অনেক দুর এগিয়ে গেছে।মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন জোট এ করিডোর বাস্তবায়নে খুব সামান্যই বাধা দিতে পেরেছে। এখন এ অঞ্চলের দেশগুলোকে এই করিডোরের  ভয়াবহ পরিণতি মেনে নিয়েই এখানে বসবাস করতে হবে।

     গত সপ্তাহে  কাজাখিস্তানের রাজধানী আস্তানায় আরেক দফা  কারিগরি পর্যায়ের অর্থাৎ কৌশলী(প্রায়োগিক) আলোচনা স্থগিতকরণ- এ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে যে,রাশিয়া বাশার আল আসাদ সরকারকে ময়দানে আরও নতুন নতুন বাস্তবতা তৈরির সুযোগ দিতে চাচ্ছে। আর বর্তমানে এ কারণেই মনে হচ্ছে যেন দক্ষিণ সিরিয়ায় অথবা এ দেশের যে কোন স্থানে স্থায়ী নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব মরে গেছে নতুবা স্থগিত করা হয়েছে।

     দামেস্ক ও ইরানই এখন ময়দানে তাদের এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়েছে আর এ ক্ষেত্রে রাশিয়া নিছক এক অনুঘটকের(Facilitator)ভূমিকা পালন করছে মাত্র।(২০১৭ সালের মে মাসে উক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি তবে তা  ওই একই বছরের  জুলাই মাসের প্রথমভাগে কাজাখিস্তানের রাজধানী আস্তানায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।)

              প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে,ওসামা শরিফ হচ্ছেন ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি অক্ষ সমর্থনকারী সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত বিধায় তার লেখায় ইরাক ও সিরিয়ায় ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি অশুভ খবিস ইবলীসী শয়তানী অক্ষ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান-ইরাক-সিরিয়া-হিজবুল্লাহ প্রতিরোধ সংগ্রামী অক্ষের সাফল্যকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা দেখা যায়। তাই তিনি বলতে চেয়েছেন যে বাগদাদ ও দামেস্কের মধ্য দিয়ে বৈরুতের সাথে তেহরানকে সংযুক্তকারী করিডোর বাস্তবায়নের পথে এখন ইরান অনেক দূর এগিয়ে গেছে।আর তিনি দেখাতে চাচ্ছেন যে এখন ইরাক সিরিয়া ও লেবাননসহ এ অঞ্চলে ইরান তার ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য ও  সার্বিক হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে।এভাবে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে নয় বরং ইরানকেই এ অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক বলে পরিচিত করাতে চাচ্ছেন যা সত্যি সত্যের অপলাপ ও দুঃখজনক বই আর কিছুই নয়। সাম্রাজ্যবাদী এই চক্র সন্ত্রাসবাদ এবং মারাত্মক গণ-বিধ্বংসী অস্ত্রের ধুয়ো তুলে মার্কিন বাহিনীর মাধ্যমে  আফগানিস্তান ও ইরাকে জবর দখল প্রতিষ্ঠার করে। আর এভাবেই তারা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বজুড়ে নিজেদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা,মদদ ও তত্ত্বাবধানে এবং সজ্ঞানে উগ্র হিংস্র সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের যে প্রসার ঘটিয়েছে তা সবার কাছে দিবালোকের মত পরিষ্কার।

আজ ইরাক ও সিরিয়ায় ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি অশুভ অপবিত্র চক্র সমর্থিত সালাফী-তাকফীরী- ওয়াহহাবী জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদের হাতে লক্ষ লক্ষ ইরাকী সিরিয় নিরীহ জনগণ প্রাণ হারিয়েছে এবং হারাচ্ছে।শুধু ইরাক সিরিয়ায় নয় আজ বিশ্বের কোন দেশ বা অঞ্চলই উক্ত শয়তানী অক্ষ কর্তৃক সৃষ্ট এ সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের কালো নখর ও থাবার আঘাত থেকে অক্ষত থাকতে পারছে না। এই ভয়াল হিংস্র পাশবিক হারামি সালাফী তাকফীরী ওয়াহহাবী সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদ সৃষ্টির পেছনে ইরানের কোন হাতই নেই। বরং ইরান এ অশুভ জারজ হারামি সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে ইরাক ও সিরিয়ার মজলুম জনগণ ও সরকারকে নিষ্ঠার সাথে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে মাত্র যা অত্র আলোচনায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকারের লেখা ও মন্তব্য থেকে বেশ ভালোভাবে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে।

ইরান ইরাক ও সিরিয়ায় সেদেশগুলোর জনগণের মধ্যে জাগরণ এনে তাদের মধ্যকার সুপ্ত শক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে জাগ্রত করেছে। তাই আমরা দেখতে পাই যে ইরাকের আল-হাশদুশ শাবী (গণবাহিনী)এবং সিরিয়ার গণ-প্রতিরোধ শক্তি ইরাকী ও সিরিয় সরকারি বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিদেশী ভাড়াটে সালাফী-তাকফীরী-ওয়াহহাবী সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে আজ তাদের পরাস্ত করছে। আর যদি এ গণবাহিনী ইরাকে ও সিরিয়ায় গঠিত না হত তাহলে শুধু ইরান ইরাকে একা এবং সিরিয়ায় ইরান,সিরিয় সরকার ও রাশিয়া কিছুই করতে পারত না। ইরাক ও সিরিয়ায় সে দেশগুলোর সরকারের পক্ষে গণবাহিনীগুলোর উত্থান প্রমাণ করে যে ইরাক সরকার বিশেষ করে  সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গণ-ভিত্তি রয়েছে।

  দায়েশ অর্থাৎ আইএসআইএস ও তাকফীরী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম ও যুদ্ধে যোগদানে ইরাকী জনগণকে আহবান জানিয়ে পবিত্র নগরী নাজাফের মারজা আলেমদের বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ সিস্তানীর ঐতিহাসিক ফতোয়া প্রদান এবং ইরানের আন্তরিক প্রচেষ্টা যদি না থাকত তাহলে ইরাকে ইরানের বাসিজ বা গণবাহিনীর আদলে প্রতিরোধকারী গণবাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হত না।

পাশ্চাত্য ও আরব প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সমর্থনপুষ্ট সাদ্দাম কর্তৃক ইরানের উপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ থেকে অর্জিত বাসিজ অর্থাৎ গণবাহিনী গড়ার ধারণা ও অভিজ্ঞতা যেমন ইরানকে যুদ্ধে বিজয়ী করেছে ঠিক তেমনি প্রতিরোধকারী গণবাহিনী ইরাক ও সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদ বিরোধী যুদ্ধে সাফল্য ও বিজয় বয়ে আনছে। এ কারণেই এ দুদেশের প্রতিরোধকারী গণ-যোদ্ধারা ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি অশুভ খবিস শিরকী কুফরী ইবলিসী শয়তানী অক্ষের চক্ষুশূল এবং সবসময় এ অক্ষ এ সব গণ-বাহিনী  ও গণ-যোদ্ধাদেরকে ইরানী  বা ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া বলে অভিহিত করে এদের ভেঙ্গে দেয়ার আহ্বান জানায়। আর এ কারণেই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ইরানে ইরাকী প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদীর সাথে সাক্ষাৎকালে তাকে ইরাকী গণবাহিনী আলহাশদুশ শাবীকে দুর্বল করা সংক্রান্ত যে কোন পদক্ষেপের ব্যাপারে সাবধান করে দেন এবং বলেন যে এ ধরণের পদক্ষেপ আসলে বাগদাদের স্থিতিশীলতাই নষ্ট করবে। (দেখুনঃArab News-এ ২৩-৬-২০১৭ এ প্রকাশিত এবং ২২-৬-২০১৭ এ রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদন: Khamenei warns Iraq not to trust US)। 

প্রতিবেশী দেশগুলোয় ইরান হস্তক্ষেপ করছে বলে যে অভিযোগ সবসময় পাশ্চাত্য বিশেষকরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের বশংবদ সৌদি,আমিরাতি ও আরব প্রতিক্রিয়াশীল শাসক-চক্র করছে তার প্রকৃত রহস্য আসলে ইরাক সিরিয়া লেবাননে সন্ত্রাস-বিরোধী সংগ্রাম ও যুদ্ধে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সৃজনশীল গাঠনিক ভূমিকার মধ্যেই সন্ধান করতে হবে। কই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক  আফগানিস্তান ও ইরাক জবর দখল করার আগে ইরাক,সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের তেমন কোনো প্রসার তো ছিল না। তখন ইরাকেও ইরানের কোন সামরিক উপস্থিতি ছিল না। ইরাক দখল করলে ইরাকের জনগণ এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধ ও সংগ্রামের মুখে টিকতে না পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে সে ওই দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইরাকী জনগণের এ প্রতিরোধ আন্দোলনে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকার এবং লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহসহ ইরানের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাই মনের জ্বালা ও ক্ষেদ মেটানোর জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন,ইসরাইল ও তাদের বশংবদ সেবাদাসরা ইরাকে ও সিরিয়ায় সালাফী তাকফীরী ওয়াহহাবী সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের (কুখ্যাত আইএসআইএস,আল-কায়দা,জাবহাতুন্ নুসরা, ইত্যাদি) ফিতনার আগুন প্রজ্জ্বলিত করে।

[  এ বিষয়ে দেখুন   21ST century wire : team america: isis is mc cain’s army(আইসিস অর্থাৎ দায়েশ হচ্ছে মার্কিন সিনেটর ম্যাক কেইনের সেনাবাহিনী) শীর্ষক প্রবন্ধ। ]#

লেখক: মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান গবেষক, চিন্তাবিদ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ।     

 

 

২০১৮-০৩-১৮ ১২:৪৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য