• পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে হযরত আলী (আ)'র মর্যাদা

ঐতিহাসিক ২১ রমজান বেদনা-বিধুর একটি দিন। ১৩৯৯ বছর আগে এই দিনে শাহাদত বরণ করেন আমিরুল মু’মিনি হযরত আলী (আ)। বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় মহাশোকের এই দিবস।

হযরত  আলী (আ) জন্ম নিয়েছিলেন পবিত্র কাবা ঘরে হিজরতের তেইশ বছর আগে ১৩ ই রজব এবং শাহাদত বরণ করেছিলেন কুফার পবিত্র মসজিদের মেহরাবে হিজরি ৪০ সনের একুশে রমজানে।

আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র মহৎ ও সুন্দর ব্যক্তিত্ব এত বিশাল বিস্তৃত ও এত বিচিত্রময় যে একজন মানুষের পক্ষে তাঁর সব বৈশিষ্ট্য ও পরিধি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করাও সম্ভব নয়। মানুষ কল্পনার ফানুস উড়াতে পারবে কিন্তু এর কিনারার নাগালও পাবে না।

ভারত উপমহাদেশের বিশিষ্ট সূফী সাধক ও চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা খাজা মুঈনউদ্দিন চিশতি (র.) বলেছেন, সমুদ্রকে যেমন ঘটিতে ধারণ করা অসম্ভব তেমনি বর্ণনার মাধ্যমে আলী (আ.)'র গুণাবলী তুলে ধরাও অসম্ভব।

বিশ্বনবী (সা.)'র একটি হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আলী (আ.)-কে পুরোপুরি বা পরিপূর্ণভাবে চেনেন কেবল আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূল (সা.) এবং আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূল (সা.)-কে ভালভাবে চেনেন কেবল আলী (আ.)।

তবুও আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই মহামানবের মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে কিছু বর্ণনা এখানে তুলে ধরছি:

ইরাকের নাজাফ আল আশরাফ শহরে আমিরুল মুমিনি হযরত আলীর  (আ) পবিত্র মাজারের ভেতর ও বাইরের একটি দৃশ্য

পবিত্র কুরআনের আলোকে হযরত আলী (আ)

এক :من المؤمنین رجال صدقوا ماعاهدوا الله علیه فمنهم من قضی نحبه ومنهم من ینتظر وما بدلوا تبدیلا

“মুমিনদের মধ্যে এমন পুরুষ রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতির (আল্লাহর রাস্তায় আত্মত্যাগ) উপর অবিচল রয়েছে। তাদের মধ্যে কিছুলোক তাদের ওয়াদা পূর্ণ করেছে। আর কিছু লোক অপেক্ষায় আছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতিতে কোনরূপ পরিবর্তন করেনি।” (সূরা আহজাব : ২৩)

এ আয়াতে কাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয়েছে তা নিয়ে মুফাসসীরদের বিভিন্ন মত রয়েছে। নিশ্চিতভাবে শাহাদাতের জন্য অপেক্ষমান লোকদের মধ্যে হযরত আলী (আ.) অন্যতম। আহলে সুন্নাতের কোন কোন মুফাসসীর এ মতটির কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন- (১) হাকেম আবুল কাসেম হেসকানী হানাফী ‘শাওয়াহেদুত্ তানযীল’ কিতাবের ১ম ও ২য় খ-ে ৬২৭ ও ৬২৮ নম্বর হাদীসে হযরত আলী (আ.) থেকে এ মর্মে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন :رجال صدقواআয়াতটি আমাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। খোদার কসম, আমি কি সেই ব্যক্তি যে শাহাদাতের জন্য অপেক্ষা করছি! আমি কখনো নিজের কর্মপন্থা পরিবর্তন করিনি, আমি আমার প্রতিশ্রুতির উপর অবিচল রয়েছি।’(২) কান্দুযী হানাফী প্রণীত ‘ইয়ানাবিউল মুওয়াদ্দাত’ ইস্তম্বুলে মুদ্রিত পৃষ্ঠা : ৯৬ এবং হায়দারিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত, পৃ: ১১০।(৩) মানাকেবে খাওয়ারেজমী হানাফী, হায়দারিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত, পৃষ্ঠা : ১৯৭।(৪) তাযকেরায়ে ইবনে জাওযী হানাফী- পৃঃ ১৭।(৫) আসসাওয়ায়েকুল মুহরেকা পৃঃ ৮০।(৬) শাবলাঞ্জী নূরুল আবসার, সাদীয়া প্রেসে মুদ্রিত- পৃঃ ৭৮(৭) তাফসীরে খাজেম ৫ম খ-, পৃষ্ঠা ঃ ২০৩।(৮) ফাজায়েলুল খাম্সা মিনাস সেহাহ আস্ সিত্তা ১ম খ-, পৃঃ ২৮৭।

আয়াতটি খন্দকের যুদ্ধ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ। ঐ সময় কাফের ও মুশরিকদের বিশাল বাহিনী মদীনার দিকে অভিযান পরিচালনা করে।রসূলে খোদা (সা.) তাদের অভিযান সম্পর্কে অবহিত হয়ে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন যে, মদীনার চার পাশে খন্দক খনন করা হবে, যাতে দুশমন মদীনার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে। খন্দক খননের পর শত্রু বাহিনী এ অবস্থায় মুখোমুখি হয়ে হোঁচট খায়। এরপর মাত্র কয়েকজন ব্যতীত শত্রুসৈন্যরা খন্দক বেষ্টনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি। অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে আমর ইবনে আবদু ছিল প্রচ- বীরত্বের অধিকারী। সে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে প্রতিদ্বন্দীর জন্য হাঁক দিতে থাকে। মুসলমানরা তখন ইতস্তত বোধ করছিলেন। এ সময় হযরত আলী (আ.) তার সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত হন। ঠিক ঐ সময় নবী করিম (সা.) হযরত আলীর জন্য দোয়া করেন এবং এ বিখ্যাত উক্তিটি করেন-برز الایمان کله الشرک کلهঅর্থাৎ “সমগ্র ঈমান (আলী) সমগ্র কুফরের মুখোমুখি হয়েছে।”আলী যদি পরাজিত হয় প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও ঈমান পরাজয় বরণ করবে আর যদি আমর ইবনে আবদু পরাজিত হয় তাহলে সমস্ত কুফরই যেন পরাজিত হবে। শেষ পর্যন্ত হযরত আলী (আ.) জয়লাভ করেন। তিনি আমর ইবনে আবদুকে হত্যা করেন। এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) বলেন,

لضربة علی یوم الخندق افضل من عبادة الثقلینঅথবাضربة علی یوم الخندق افضل من اعمال امتی الی یوم القیامة

“খন্দকের দিন আলীর আঘাতের মর্যাদা মানব ও জ্বিন উভয় জাতির ইবাদতের চাইতে উত্তম।” অথবা “খন্দকের দিন আলীর একটি আঘাতের মর্যাদা উম্মতের কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের ইবাদতের চাইতে উত্তম।”শত্রুর উপর হানা হযরত আলীর একটি আঘাতের এতখানি মূল্য কেন সে বিষয়টিও পরিষ্কার। কেননা, হযরত আলীর এ আঘাত যদি সেদিন না হত তাহলে হয়ত কুফরী শক্তি জয়লাভ করত। পরিণামে ইসলামের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যেত। অন্যদের ইবাদত-বন্দেগী করার অবকাশ তখন কিভাবে থাকত? এ বর্ণনাটি সুন্নী আলেমগণ তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন-(১) আল্লামা ইযযুদ্দীন ঈজী প্রণীত ‘কিতাবে মুওয়াফেক’ ইস্তামবুলে মুদ্রিত-পৃঃ ৬১৭।(২) ফখরুদ্দীন রাজী প্রণীত নেহায়াতুল উকুল ফি দেরায়াতিল উসুল। পা-ুলিপি-পৃঃ ১১৪।(৩) আল্লামা তাফতাযানী প্রণীত সারহুল সাকাসেদ ২য় খ-, পৃঃ ২৩০(৪) আল্লামা কান্দুযী প্রণীত “ইয়ানাবিউল মুওয়াদ্দাত’ ৯৫ ও ১৩৭ পৃষ্ঠা। ইস্তামবুলে মুদ্রিত।(৫) আল্লামা মওলভী আদ দেহলভী প্রণীত ‘তাজহীযুল যাহিশ-পা-ুলিপি পৃঃ ৪০৭।(৬) আল্লামা বেহজাত আফিন্দী প্রণীত “তারিখে আলে মুহাম্মদ’ পৃঃ ৫৭।

দুই :“লোকদের মধ্যে এমন অনেক আছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির বিনিময়ে নিজেদের প্রাণকে বিক্রি করে, আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি দয়াশীল।” (সূরা বাকারা - ২০৬)

ومن الناس من یشری نفسه ابتغاء مرضات الله والله رؤف بالعباد

এ আয়াতও হযরত আলী (আ.) প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। পয়গাম্বর (সা.) যখন মক্কা থেকে মদীরায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মক্কার মুশরিকরা রাতে হযরতের উপর হামলা করে তাঁকে হত্যার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন আল্লাহ তায়ালা পয়গাম্বর (সা.)কে মুশরিকদের নীল নকশা সম্পর্কে অবহিত করেন। তখন হযরতের বিছানায় শুয়ে থাকার জন্য হযরত আলী (আ.) তৈরী হন।সে রাতটি ‘লাইলাতুল মুবিত’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। কোন কোন সুন্নী আলেমও সে বর্ণনাটি সমর্থন করেছেন। যেমন-(১) হাসকানী হানাফী প্রণীত শাওয়াহেদুত তানযীল ১ম খ-, পৃঃ ১৩৩ থেকে ১৪১।(২) ইবনে সাব¦াগ মালেকী প্রণীত “ফসুলুল মুহিম্মাত” হায়দারিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত-পৃঃ ৩১।(৩) সাবত ইবনে জাওযী প্রণীত ‘তাযকিরাতুল খাওয়াস’ হায়দারিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত- পৃঃ ৩৫ ও ২০০।(৪) কান্দুযী হানাফী প্রণীত ‘ইয়ানাবিউল মুওয়াদ্দাত’ ইস্তামবুলে মুদ্রিত, পৃঃ ৯২।(৫) ফাখরুদ্দীন রাযীর তাফসীরে কবীর ৫ম খ- পৃঃ ২২৩। মিশরে মুদ্রিত।(৬) শাবলাঞ্জী প্রণীত ‘নূরুল আবসার’ ওসমানিয়া জাপাখানায় মুদ্রিত, পৃঃ ৭৮(৭) মুসনাদে আহমদ ১ম খ- পৃঃ ৩৪৮।

তিন :انما انت منذر ولکل قوم هاد

“হে নবী! তুমি ভয় প্রদর্শনকারী ঃ প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে পথ প্রদর্শক (সূরা রা’দ- ৭)

শিয়া ও সুন্নীদের অনেক কিতাবে পয়গাম্বর (সা.)-এর নিকট থেকে বর্ণিত যে, পয়গাম্বর (সা.) বলেছেন, আমি ভয় প্রদর্শনকারী আর হযরত আলী পথপ্রদর্শক। আহলে সুন্নাতের যে সব সূত্রে এ বর্ণনাটি এসেছে তন্মধ্যে রয়েছে ঃ(১) ফখরে রাযী প্রণীত তাফসীরে কাবীর- ৫ম খ- পৃঃ ২৭১। দারুত তাবাআহ আমেরাহ্, মিশরে মুদ্রিত এবং এছাড়া অন্য এক সংস্করণের ২১তম খ-, পৃষ্ঠা ঃ ১৪(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর- ২য় খ-, পৃষ্ঠা ঃ ৫২(৩) দুররুল মানসুর-সুয়ূতী ৪র্থ খ-, পৃষ্ঠা ৪৫।(৪) আলুসী প্রণীত রুহুল মায়ানী ১৩তম খ-, পৃঃ ৭৯।(৫) হাসকানী হানাফী প্রণীত “শাওয়াহেদুত তানযীল” ১ম খ- পৃঃ ২৯৩ ও ৩০৩, হাদীস নং ৩৭৮-৪১৬।(৬) তাফসীরে শওকানী ৩য় খ-, পৃঃ ৭০।(৭) ইবনুস সাব¦াগ মালেকী, ফসুলুল মুহিম্মাত পৃঃ ১০৭।(৮) শাবলেবখী প্রণীত ‘নূরুল আবসার’ পৃঃ ৭১। ওসমানিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত, মিশর।(৯) কান্দযী হানাফী প্রণীত ‘ইয়ানাবিউল মুওয়াদ্দাত’ পৃঃ ১১৫ ও ১২১ হায়দারিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত।

চার :انما ولیکم الله و رسوله والذین أمنوا الذین یقیمون الصلوة ویؤتون الزکوة وهم راکعون

“নিশ্চয়ই তোমাদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং যারা ঈমান এনেছে আর রুকু অবস্থায় যাকাত দান করে।” (সূরা মায়েদা - ৫৫)

হযরত আলী (আ.)-এর ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। ঘটনাটি ছিল এই যে, একজন ভিখারী মসজিদে প্রবেশ করে সাহায্যের প্রার্থনা জানায়। কিন্তু কেউ তাতে সাড়া দেয়নি। ঐ সময় হযরত আলী (আ.) নামাযে রুকুতে ছিলেন। ঐ অবস্থাতেই তিনি আঙ্গুলের ইশারা করেন। ভিখারী কাছে আসে এবং হযরত আলীর হাত থেকে তাঁর আংটিটি খুলে নেয়।এ আয়াতের শানে নযূল যে হযরত আলী (আ.) তা আহলে সুন্নাতের মুফাসসীরগণও সমর্থন করেছেন এবং তাদের তাফসীরের কিতাবে তা উদ্বৃত করেছেন।যেমন-মুুহিউদ্দীন তাবারী প্রণীত যাখায়েরুল ওকবা পৃঃ ৮৮, কায়রোর মাকতাবাতুল কুদসী হতে মুদ্রিত।১. তাফসীরে রুহুল মাআনী ৬ষ্ঠ খ-, পৃঃ ১৪৯ মিশরের মুনিরিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত।২. তাফসীরে ইবনে কাসীর ২য় খ-, পৃঃ ৭১, মিশরে মুদ্রিত।৩. শেখ আবুল হাসান আলী ইবনে আহমদ আল ওয়াহিদ আন নিশাপুবী আসবাবুল নুযূল পৃ ১৪৮ হিন্দিয়া প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত (১৩১৫ হিজরী) মিশর।৪. জালালুদ্দীন সুয়ূতী প্রণীত লুবাবুন নূকুল মুস্তাফা আল হালাবী ছাপাখানা হতে মুদ্রিত, পৃঃ ৯০।৫. তাফসীরে বায়যাভী-আনোয়ারুত তানযীল প্রাচীন মিশরে মুদ্রিত, পৃঃ ১২০।৬. তাফসীরে তাবারী ৬ষ্ঠ খ-, পৃষ্ঠা ১৬৫, মিশরে মুদ্রিত।৭. আল্লামা নাসাফী ১ম খ- পৃঃ ২৮৯।৮. আল্লামা যামাখশারী প্রণীত ‘আল কাশশাফ’ ১ম খ- পৃঃ ৩৪৭। আত্তেজারাত ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত,৯. মিশর।১০. ফাখরে রাযীর তাফসীরে কাবীর ১২তম খ-, পৃঃ ২৬-নতুন মুদ্রণ, মিশর হতে।১১. শেখ আবু বকর আহমদ ইবনে আলী আর রাযী হানাফী প্রণীত আহকামুল কুরআন ২য় খ-, পৃঃ ৫৪৩ মিশর হতে মুদ্রিত।১২. কুরতুবী প্রণীত আল জামে লি আহকামিল কুরআন-৬ষ্ঠ খ- পৃঃ ২২১, মিশরে মুদ্রিত।১৩. তাফসীরে আদদুররুল মানসুর ২য় খ- পৃঃ ২৯৩, প্রথম প্রকাশ ঃ মিশর।

পাঁচ :الذین ینفقون اموالهم بالیل والنهار سرا وعلانیة فلهم اجرهم عند ربهم ولاخوف علیهم ولاهم یحزنون

“যারা রাতে ও দিনে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে প্রতিদান রয়েছে। তাদের জন্য কোন ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।” (সূরা বাকারা -২৭৪)

আহলে সুন্নাতসহ বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, এ আয়াত হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। যেমন-(১) কাশশাফে যামাখশারী ১ম খ- পৃঃ ৩১৯। বৈরুতে মুদ্রিত, ১ম খ-, পৃষ্ঠা ঃ ১৬৪ মিশর হতে মুদ্রিত।(২) ইবনে জাওজী হানাফী প্রণীত তাযকেরাতূল খাওয়াস’ পৃঃ ১৪।(৩) ফখরে রাযীর ‘তাফসীরে কবীর’ ৭ম খ-, পৃঃ ৮৯, মিশরে মুদ্রিত(৪) তাফসীরে কুরতুবী ৩য় খ- পৃঃ ৩৪৭।(৫) তাফসীরে ইবনে কাসীর ১ম খ- পৃঃ ৩২৬।(৬) আদ দুররুল মানসূর ১ম খ- পৃঃ ৩৬৩।(৭) কান্দুযী হানাফী প্রণীত ‘ইউনাবিউল মুওয়াদ্দাত’ পৃঃ-৯২ ইস্তামবুলে মুদ্রিত পৃঃ ২১২।

ছয় :والذی جاء بالصدق وصدق به ألاءک  هم المتقون

‘যিনি সত্য বাণী নিয়ে এসেছেন এবং যিনি তা সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা পরহেযগার।’-(সূরা যুমার- ৩৩)

এ আয়াতের তাফসীরে কোন কোন মুফাসসীর বলেছেন যে, ‘যিনি সত্য বাণী নিয়ে এসেছেন বলতে এখানে পয়গাম্বর (সা.)- এর কথা বলা হয়েছে। আর যিনি তা সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি হযরত আলী (আ.)। নিঃসন্দেহে প্রথম যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপর ঈমান আনেন তিনি ছিলেন হযরত আলী (আ.)। আহলে সুন্নাতের কোন কোন মুফাসসীরও তাদের তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখিত আয়াতটি হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে বলে অভিমত দিয়েছেন।(১) হাসকানী হানাফী প্রণীত শাওয়াহেদুত তানযীল ২য় খ-, পৃঃ ১২০(২) সূয়ূতী প্রণীত দুররুল মানসূও ৫ম খ- পৃঃ ৩২৮।(৩) তাফসীরে কুরতুবী, পঞ্চদশ খ-, পৃঃ ২৫৬।(৪) কিফায়াতুত তালিব কুঞ্জী শাফেয়ী পৃঃ ২৩৩ হায়দারিয়া ছাপাখানায় মুদ্রিত।

সাত :یایها الذین امنوا اتقوا الله وکونوا مع الصادقین

“হে ঈমানদাররা তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।” (সূরা তওবা - ১১৯)

কোন কোন মুফাসসীর বলেছেন যে, আয়াতে সাদেকীন বা সত্যবাদী বলতে হযরত আলী (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের বুঝানো হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এর উজ্জ্বল প্রতিপাদ্য (মিসদাক) হচ্ছেন হযরত আমীরুল মুমেনীন (আ.)(১) ইবনে জওযী হানাফী প্রণীত তাযকেরাতুল খাওয়াস পৃঃ ১৬।(২) মানাকেবে খাওয়ারেজমী হানাফী পৃঃ ১৭৮।(৩) দুররুল মানসূর-সূয়ুতী ৩য় খ-, পৃঃ-৩৯০।(৪) আলূসী প্রণীত তাফসীরে রুহুল মাআনী ১ম খ-, পৃঃ ৪১।

আট :انما یرید الله لیذهب عنکم الرجس اهل البیت و یطهرکم تطهیرا

“আল্লাহ কেবল চান যে, তোমাদের আহলে বাইত থেকে গোনাহ ও অপবিত্রতা দূর করবেন এবং তোমাদেরকে পুরোপুরি পবিত্র করবেন।”-সূরা আহজাব - ৩৩

শিয়া মুফাসসীরগণ এবং কোন কোন সুন্নী মুফাসসীর বলেছেন যে, আহলে বাইত বলতে হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতেমা (আ.), ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হোসাইন (আ.)। কাজেই হযরত আলীও তাদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে গোনাহ ও অপবিত্রতা থেকে আল্লাহ পাক দূরে রাখতে চেয়েছেন এবং সম্পূর্ণ পাক রেখেছেন। আহলে সুন্নাতের সূত্রে বহু রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, আহলে বাইত মানে সেই পাঁচজন। উদাহরণস্বরূপ-ছহীহ মুসলিম ৪র্থ খ- ১৮৮৩ পৃষ্ঠায় আহলে বাইতের ফজিলত অধ্যায়ে উম্মুল মু’মেনীন আয়েশা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, পয়গাম্বর (সা.) হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতেমা (আ.), হযরত ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসাইন (আ.)-কে আহলে বাইত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। রেওয়ায়েতের মূল পাঠ নিম্নরূপ-حدثنا ابو بکر بن ابی شیبة و محمد بن عبد الله بن نمیر (واللفظ لأبی بکر) قالا : حدثنا محمد بن بشر عن زکریا عن مصعب بن شیبة عن صفیة بنت شیتة قالت: قالت عایشة : خرج النبی ص غداة و علیه مرط مرحل من شعر أسود فجاء الحسن بن علی فأدخله ثم جاء الحسین فأدخله معه ثم جاءت فاطمة فادخلها ثم جاء علی فأدخله ثم قل انما یرید الله لیذهب عنکم الرجس اهل البیت و یطهرکم تطهیرا

মহানবীর স্ত্রী আয়েশা বিনতে আবুবকর  বলেন, পয়গাম্বর (সা.) ভোরে ঘর থেকে বের হন। তার সাথে ছিল কালো পশমের মোটা ‘আবা’। তখন হাসান ইবনে আলী (আ.) আসলেন, পয়গাম্বর (সা.) তাকে ‘আবা’র ভেতর ঢুকিয়ে নিলেন, এরপর হুসাইন আসলেন তিনি তাকেও ‘আবা’র মধ্যে ঢুকিয়ে নিলেন। এরপর ফাতেমা আসলেন পয়গাম্বর (সা.) তাকেও ‘আবা’র মধ্যে ঢুকিয়ে নিলেন। এরপর আলী (আ.) আসলে পয়গাম্বর (সা.) আলীকেও ‘আবা’র মধ্যে ঢুকিয়ে নিলেন। এরপর পয়গাম্বর (সা.) এ আয়াত পাঠ করলেন।انما یرید الله لیذهب عنکم الرجس اهل البیت و یطهرکم تطهیرআহলে সুন্নাতের আলেমগণ তাদের কিতাবে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।১. ছহীহ মুসলিম ৫ম খ-, পৃঃ ১৮৮৩ বৈরুতে মুদ্রিত।২. শাওয়াহেদুত তানযীল হাসকানী হানাফী ২য় খ-, পৃঃ-৩৩৩. মুস্তাদরাকে হাকেম ৩য় খ-, পৃ- ১৪৭।৪. আদদুররুল মানসুর ৫ম খ-, পৃঃ- ১৯০।৫. ফতহুল কাদীর শাওকানী ৪র্থ খ-, পৃঃ- ২৭৯।৬. যাখায়েরুল ওকবা পৃঃ ২৪।

নবীপত্নী উম্মে সালমা বলেন, ‘পবিত্রতার আয়াত’ আমার ঘরে নাযিল হয়। এর পর পয়গাম্বর (সা.) এক লোককে হযরত ফাতেমার ঘরে পাঠান। যাতে আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইনকে তাঁর কাছে নিয়ে আসা হয়। তাঁরা আসলেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বাইত। উম্মে সালামা বলেন, আমি বললাম, ইয়া রসুলুল্লাহ আমি কি আপনার আহলে বাইতের মধ্যে শামিল নই? তিনি বললেন, তুমি আমার পরিবারের ভালো লোকদের মধ্যে শামিল। কিন্তু এরা আমার আহলে বাইত। আহলে সুন্নাতের আলেমরাও এই রেওয়ায়েতটি তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন-১. ফতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী ৩য় খ-, পৃ-৪২২।২. তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩য় খ-, পৃঃ- ৪৮৪, ৪৮৫।৩. যাখায়েরুল ওকবা পৃঃ ২১, ২২।৪. উসদুল গাবা (ইবনে আসীর প্রণীত) ২য় খ-, পৃ-১২, ৩য় খ-, পৃ-৪১৩, ৪র্থ খ-, পৃঃ-২৯।৫. সহীহ তিরমিযী ৫ম খ-, পৃ-৩১ ও ৩৬১।৬. হাসকানী হানাফী প্রণীত শাওয়াহেদুত তানযীল ২য় খ-, পৃ-২৪।৭. তাফসীরে তাবারী ২২তম খ-, পৃ-৭ ও ৮। মিশওে মুদ্রিত।৮. ইয়ানাবিউল মুওয়াদ্দাত পৃ-১০৭ ও ২২৮ ইস্তামবুলে মুদ্রিত।৯. সুয়ূতীর দুররুল মানসুর ৫ম খ-, পৃ-১৯৮।এছাড়াও আহলে সুন্নাতের বহু কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, আহলে বাইত হচ্ছেন হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন।যেমন-১. মাসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল ১ম খ-, ১৯৩ ও ৩৬৯ পৃষ্ঠা। মিশরে মুদ্রিত।২. মানাকেবে খাওয়ারেজমী হানাফী পৃঃ ২৩।৩. তাফসীরে কাশশাফ-যামাখশারী ১ম খ- পৃঃ ১৯৩ এবং মিশরে ছাপা ১ম খ-, পৃষ্ঠা ৩৬৯।৪. তাযকিরাতুল খাওয়াস ইবনে জওযী হানাফী পৃঃ- ২৩৩।৫. তাফসীরে কুরতুবী ১৪ তম খ-, পৃ ১৮২ প্রথম প্রকাশ কায়রো, মিশর।৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩য় খ-, পৃঃ ৪৮৩, ৪৮৪ ও ৪৮৫ মিশরে মুদ্রিত।৭. তাফসীরে এতকান সুয়ূতী ৪র্থ খ- পৃষ্ঠাঃ ২৪০, মিশরে মুদ্রিত।৮. উসদুল গাবা-ইবনে আসীর ২য় খ- পৃঃ ১২। ৩য় খ-, পৃঃ ৪১৩, ৪র্থ খ-, পৃ- ২৬, ২৯।৯. আসসাওয়ায়েকুল মুহরেকা ঃ ইবনে হাজার আসকালানী পৃঃ ১১৭, ১৪১ মিশরে মুদ্রিত।১০. তাফসীরে কাবীর ফখরে রাযী ২য় খ- পৃঃ-৭০০।

নয় :قل لا اسءلکم علیه اجرأ الا المودة فی القربی

“হে নবী! তুমি বলে দাও, আমি রেসালাতের বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না, একমাত্র আমার নিকটাত্মীয়দের সাথে ভালোবাসা পোষণ ছাড়া।” (সূরা শূরা - ২৩)

আহলে সুন্নাত ও শিয়া সূত্রে বহু বর্ণনা আছে যে, আয়াতে কুরবা বা নিকটাত্মীয় বলতে হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতেমা, হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ তাঁদের সাথে ভালোবাসা পোষণ করা অবশ্য কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এখানে আহলে সুন্নাতের সূত্রগুলো উল্লেখ করা গেল-১. তাফসীরে তাবারী ২৫ খ-, পৃঃ ২৫ মিশওে মুদ্রিত।২. তাফসীরে কাশশাফ ৩য় খ- পৃঃ- ৪০২/৪র্থ খ-, পৃঃ ২২০, মিশরে মুদ্রিত।৩. তাফসীরে কাবীর ২৭ তম খ- পৃঃ-১৬৬ মিশকুরআন ও হাদীসের আলোকে হযরত আলী (আ.)-এর পরিচয় মুদ্রিত।৪. তাফসীরে বায়যাভী ৪র্থ খ-, পৃঃ ১২৩ মিশকুরআন ও হাদীসের আলোকে হযরত আলী (আ.)-এর পরিচয় মুদ্রিত।৫. তাফসীরে ইবনে কাছির ৪র্থ খ-, পৃষ্ঠা ঃ ১১২।৬. তাফসীরে কুরতুবী ১৬তম খ-, পৃষ্ঠা ঃ ২২।৭. দুররুল মানসুর ৬ষ্ঠ খ-, পৃঃ ৭৮. ইয়ানাবিউল মুওয়াদ্দাত-কান্দুযী হানাফী পৃঃ ১০৬, ১৯৪, ২৬১ ইস্তামবুলে মুদ্রিত।৯. তাফসীরে নাসাফী ৪র্থ খ-, পৃঃ ১০৫।

উল্লেখিত সব বর্ণনাতেই একথা বলা হয়েছে যে, যখন পয়গাম্বর (সা.)-এর কাছে ‘কুরবা’ বা নিকটাত্মীয় কারা তা জানতে চাওয়া হয় তখন তিনি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, তারা হলেন হযরত আলী (আ.), ফাতেমা (আ.), ইমাম হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.)। 

কুফার ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মসজিদ। এ মসজিদেই নামাজরত অবস্থায় এক ধর্মান্ধ খারিজির তরবারির আঘাতে আহত হন হযরত আলী। ১৯ রমজানের ওই হামলার ফলেই ২১ রমজান শাহাদত বরণ করেন তিনি 

 

হাদিসের আলোকে আমিরুল মু'সিনিন হযরত আলী (আ)

রাসূলে আকরামের (সা.) পরে আলী (আ.)-এর চেয়ে উত্তম ব্যক্তি তো নাই-ই বরং নবীর উম্মতের মধ্যে এমন কেউ নেই যে অনুরূপ মর্যাদায় আলী (আ.)-এর নিকটবর্তী হতে পারে। আলী (আ.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সা.) ও তার সাহাবীগণ হতে যে সমস্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তা অন্যান্য সকল সাহাবীর মর্যাদায় বর্ণিত হাদীসের তুলনায় অধিক। যদিও শুধু ক্ষমতার জোরেই অনেক সত্যকে দমিয়ে রাখা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। রাজনীতির ধ্বংসাত্মক হাত যতদূর সম্ভব হয়েছে তার মর্যাদাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং নিজের অবস্থানকে রক্ষা করার জন্য তার (আলীর) সম্পর্কে কুৎসা পর্যন্ত রটনা করেছে, তারপরেও তার মর্যাদা এত অধিক যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন- রাসূল (সা.)-এর সাহাবীগণের মধ্যে অন্য কারো সম্পর্কে আলী (আ.)-এর মত এত অধিক মর্যাদা বর্ণিত হয়নি।(মুনতাহাল আমাল, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২০ ও তারিখে হাবিবুস সাঈর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪১১।)

এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসের উপস্থিতিতে বললঃ সুবহানাল্লাহ! আলী (আ.)-এর মর্যাদায় বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত অধিক যে, আমার ধারণা তা তিন হাজারের মত হবে। ইবনে আব্বাস বললেন- কেন তুমি বললে না যে, আলীর মর্যাদায় বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ত্রিশ হাজারের কাছাকাছি।(সীরাতে হালাবী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০৯)

আব্বাসীয় খলিফা মনসুর দাওয়ানিকী, সুলাইমান আমেশ’কে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, আলী (আ.) সম্পর্কে তুমি কতগুলো হাদীস বর্ণনা করেছ?

জবাবে সুলাইমান আমেশ বলেছিলঃ সামান্য সংখ্যক হাদীসই আমি তার সম্পর্কে বর্ণনা করতে পেরেছি, যার সংখ্যা প্রায় দশ হাজার অথবা কিছুটা বেশী হবে।(সীরাতে হালাবী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০৯।)

ইবনে হাজার তার সাওয়ায়েক নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ আলী (আ.)-এর শানে (সম্পর্কে) যত কোরআনের আয়াত নাজিল হয়েছে, অন্য কোন ব্যক্তির শানে এত পরিমাণ আয়াত নাজিল হয়নি।(ইমতাউল আসমা, পৃষ্ঠা-৫১০)

তার ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ (সা.)থেকে বর্ণিত অসংখ্য হাদীসের মধ্যে অল্প কিছু হাদীস নিম্নে আলোচনা করা করব। যা তাকে মুসলমানদের নেতা এবং রাসূল (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার যোগ্যতা দান করেছেঃ

১। রাসূল (সা.) আলী (আ.)-এর কাঁধে হাত রেখে বলেছেন :

هذا إمام البررة قاتل الفجرة منصور من نصره,مخذول من خذله

“এই আলী সৎ কর্মশীলদের ইমাম,অন্যায়কারীদের হন্তা,যে তাকে সাহায্য করবে সে সাফল্য লাভ করবে (সাহায্য প্রাপ্ত হবে) এবং যে তাকে হীন করার চেষ্টা করবে সে নিজেই হীন হবে।”

হাদীসটি হাকিম নিশাবুরী তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১২৯ পৃষ্ঠায় জাবের বিন আবদুল্লাহ্ আনসারী হতে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন,“এই হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে তদুপরি বুখারী ও মুসলিম তা বর্ণনা করেন নি।”

২। নবী (সা.) বলেছেন,“আলী সম্পর্কে আমার প্রতি তিনটি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে :

إِنَّهٌ سیّد الْمسلمین و إمام الْمتّقین و قائد الغرّ الْمُحجّلین

নিশ্চয়ই সে মুসলমানদের নেতা,মুত্তাকীদের ইমাম এবং নূরানী ও শুভ্র মুখমণ্ডলের অধিকারীদের সর্দার।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১৩৮ পৃষ্ঠায় হাদীসটি এনেছেন ও বলেছেন,“হাদীসটি সনদের দিক হতে বিশুদ্ধ কিন্তু বুখারী ও মুসলিম তা বর্ণনা করেন নি।”

৩। নবী (সা.) বলেছেন,“আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে যে,আলী মুসলমানদের নেতা,মুত্তাকীদের অভিভাবক এবং শুভ্র ও উজ্জ্বল কপালের অধিকারীদের (সৌভাগ্যবানদের) সর্দার।” ইবনে নাজ্জার ও অন্যান্য সুনান লেখকগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

৪। মহানবী (সা) হযরত আলীকে বলেন,

مرحبا بسیّد المسلمین و إمام المتقین

“হে মুসলমানদের নেতা ও মুত্তাকীদের ইমাম! তোমাকে সাধুবাদ।” আবু নাঈম তাঁর ‘হুলইয়াতুল আউলিয়া’ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন।

৫। একদিন রাসূল (সা.) ঘোষণা করলেন,“প্রথম যে ব্যক্তি এ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে সে মুত্তাকীদের ইমাম,মুসলমানদের নেতা,দীনের মধুমক্ষিকা (সংরক্ষণকারী),সর্বশেষ নবীর প্রতিনিধি ও উজ্জ্বল মুখমণ্ডলের অধিকারীদের সর্দার।” তখন আলী ঐ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে নবী (সা.) তাঁকে এ সুসংবাদ দানের উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কোলাকুলি করলেন ও তাঁর কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন,“তুমি আমার ঋণ পরিশোধ করবে,আমার বাণী মানুষের নিকট পৌঁছে দেবে,যে বিষয়ে তারা মতদ্বৈততা করবে তুমি তা ব্যাখ্যা করে বোঝাবে।

৬। নবী (সা.) বলেছেন,“আল্লাহ্ আমার নিকট আলীকে এভাবে বর্ণনা করেছেন-আলী হেদায়েতের ধ্বজাধারী,আমার আউলিয়া অর্থাৎ বন্ধুদের ইমাম,আমার আনুগত্যকারীদের আলোকবর্তিকা এবং সে এমন এক আদর্শ মুত্তাকীদের উচিত অপরিহার্যরূপে যার পদাঙ্কনুবর্তী হওয়া।”

লক্ষ্য করুন এই ছয়টি সহীহ হাদীস তাঁর ইমামত ও আনুগত্যের অপরিহার্যতাকে কিরূপে সুস্পষ্ট করছে! তাঁর ওপর সালাম বর্ষিত হোক।

৭। নবী (সা.) আলীর প্রতি ইশারা করে বলেন,“এই প্রথম ব্যক্তি যে আমার প্রতি ঈমান এনেছে ও প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সে কিয়ামতে আমার সঙ্গে হাত মিলাবে,সে সিদ্দীকে আকবর ও ফারুক (এই উম্মতের সত্যপন্থী ও অসত্যপন্থীদের মধ্যে পার্থক্যকারী),সে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সীমারেখা টানবে এবং সে মুমিনদের সংরক্ষণকারী।”

৮। নবী বলেছেন,“হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা কি চাও তোমাদের আমি এমন বিষয়ের প্রতি নির্দেশনা দেব যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো গোমরাহ ও বিপথগামী হবে না? সেটি হলো আলী। আমাকে তোমরা যেরূপ ভালবাস তাকেও সেরূপ ভালবাস। আমাকে যেরূপ শ্রদ্ধা কর তাকেও সেরূপ শ্রদ্ধা ও সম্মান কর এবং আমি তোমাদের যা বলছি তা আল্লাহ্ জিবরাঈলের মাধ্যমে আমাকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন।”

৯। নবী (সা.) বলেছেন,

أنا مدینة العلم و علیّ بابُها فمن أراد المدینة فلیأت الباب

“আমি জ্ঞানের শহর ও আলী তার দ্বার এবং যে কেউ শহরে প্রবেশ করতে চাইলে দ্বার দিয়েই প্রবেশ করবে।”

১০। নবী (সা.) বলেছেন,أنا دار الحکمة و علیّ بابُها “আমি প্রজ্ঞার ঘর আলী তার দরজা।”

১১। নবী (সা.) বলেছেন,“আলী আমার জ্ঞানের প্রবেশ দ্বার ও আমি যে বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি আমার পরে আমার উম্মতের জন্য সে তার ব্যাখ্যাকারী। তার ভালবাসা ও বন্ধুত্বই ঈমান এবং তার শত্রুতাই নিফাক।”

১২। নবী (সা.) আলীকে বলেন,“তুমি আমার পর উম্মত যে বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পতিত হবে সে বিষয়ে ব্যাখ্যাদানকারী।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১২২ পৃষ্ঠায় আনাস ইবনে মালিক হতে হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন যে,বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে হাদীসটি বিশুদ্ধ তদুপরি তাঁরা তা বর্ণনা করেন নি।

যে কেউ এই হাদীস এবং এর অনুরূপ অন্যান্য হাদীস নিয়ে চিন্তা করলে দেখবেন (বুঝবেন),আলী (আ.)-এর সঙ্গে রাসূলের সম্পর্ক রাসূলের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্কের ন্যায়। কারণ নবীকে উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ্ বলেছেন,“আমি আপনার প্রতি এ জন্যই গ্রন্থ নাযিল করেছি যাতে আপনি সরল পথ প্রদর্শনের জন্য যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছে সে বিষয় পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেন এবং এই কোরআন মুমিনদের জন্য রহমত ও হেদায়েতের উপকরণ।” নবীও আলীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,“তুমি আমার পর যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করবে সে বিষয়ে ব্যাখ্যাদানকারী (তাদের জন্য পরিষ্কারভাবে তা বর্ণনাকারী)।”

১৩। নবী (সা.) হতে আরেকটি হাদীস যা মারফু (অবিচ্ছিন্ন) সূত্রে ইবনে সাম্মাক আবু বকর হতে বর্ণনা করেছেন,علیّ منّی بِمنْزلتی من ربّیঅর্থাৎ আলীর স্থান আমার নিকট আমার প্রতিপালকের নিকট আমার স্থান ও মর্যাদার ন্যায়।

১৪। দারে কুতনী তাঁর ‘কিতাবুল আফরাদ’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস সূত্রে রাসূল হতে বর্ণনা করেছেন,“আলী ইবনে আবি তালিব ক্ষমার দ্বার। যে কেউ এ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে সে মুমিন,আর কেউ তা হতে বের হয়ে গেলে সে কাফের।”

১৫। নবী (সা.) বিদায় হজ্বের সময় আরাফাতের ময়দানে বলেন,“আলী আমা হতে এবং আমি আলী হতে। আমার পক্ষ হতে ঐশী বাণী পৌঁছানোর অধিকার কারো নেই একমাত্র আলী ব্যতীত।”

এই হলো সম্মানিত রাসূলের কথা যিনি শক্তিমান ও আরশের অধিপতির নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ্ তাঁর সম্পর্কে যেমনটি বলেছেন,তিনি বিশ্বস্ত,তোমাদের নবী উন্মাদ নন,তিনি প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কিছু বলেন না,বরং তিনি তাই বলেন যা তাঁর প্রতি ওহী হিসেবে অবতীর্ণ হয়। যেহেতু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই সেহেতু এই সহীহ হাদীস সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? এ বিষয়ে আর কোন প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ আছে কি? যদি আল্লাহর মহান বাণী প্রচারের এই গুরু দায়িত্বের বিষয়ে আপনি চিন্তা করেন এবং বড় হজ্বের সময়ে তা বর্ণনার পেছনে যে হেকমত লুকিয়ে রয়েছে সে বিষয়ে যথাযথ দৃষ্টি দেন তাহলে সত্য আপনার নিকট তার প্রকৃতরূপে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।

যদি এই বাণীর শব্দগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেন,দেখবেন বাণীটি কতটা অর্থবহ এবং উন্নত ও গভীর। কারণ রাসূল (সা.) সবদিক বিবেচনা করে দেখেছেন বিষয়টির গুরুত্বের কারণে আলী ব্যতীত অন্য কেউ সঠিকভাবে এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয় এবং নবীর পক্ষ হতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধি,খলীফা ও প্রশাসনিক দায়িত্বসম্পন্ন একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি তিনি ব্যতীত অন্য কেউ নন।

সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর যিনি আমাদের হেদায়েত করেছেন এবং তিনি হেদায়েত না করলে আমরা কখনো হেদায়েত পেতাম না।

১৬। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,“যে আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো,আর যে আমার বিরোধিতা করলো সে আল্লাহরই বিরোধিতা করলো। আর যে আলীর আনুগত্য করেছে সে যেন আমারই আনুগত্য করেছে,আর যে তার বিরোধিতা করেছে সে আমারই বিরোধিতা করেছে।” হাকিম নিশাবুরী তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১২১ পৃষ্ঠায় এবং যাহাবী তাঁর ‘তালখিসে মুসতাদরাক’-এ হাদীসটি এনে বলেছেন যে,বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে হাদীসটি সহীহ।

১৭। নবী (সা.) বলেছেন,“হে আলী! যে আমা হতে বিচ্ছিন্ন হলো সে আল্লাহ্ হতেই বিচ্ছিন্ন হলো আর যে আলী হতে বিচ্ছিন্ন হলো সে আমা হতেই বিচ্ছিন্ন হলো।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাকুস্ সহীহাইন’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১২৪ পৃষ্ঠায় হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন যদিও হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে তদুপরি বুখারী ও মুসলিম তা বর্ণনা করেননি।

১৮। উম্মে সালামাহ্ রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন,“যে কেউ আলীকে মন্দ নামে সম্বোধন করলো সে যেন আমাকেই মন্দ নামে সম্বোধন করলো।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১২১ পৃষ্ঠায় হাদীসটি বর্ণনা করে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে হাদীসটি বিশুদ্ধ বলেছেন। যাহাবীও তাঁর ‘তালখিস’ গ্রন্থে হাদীসটি বিশুদ্ধ বলে স্বীকার করেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৩২৩ পৃষ্ঠায় এবং নাসায়ী তাঁর ‘খাসায়েসুল আলাভীয়া’ গ্রন্থের ১৭ পৃষ্ঠায় উম্মে সালামাহ্ হতে এবং অন্যান্য হাদীসবিদগণও এটি বর্ণনা করেছেন। এরূপ অপর একটি হাদীস যা আমর ইবনে শাশ নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন তা হলো : যে কেউ আলীকে কষ্ট দিল সে আমাকেই কষ্ট দিল।

১৯। নবী (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি আলীকে ভালবাসে সে যেন আমাকেই ভালবেসেছে,আর যে আলীর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে সে আমার সঙ্গেই শত্রুতা পোষণ করেছে।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১৩০ পৃষ্ঠায় হাদীসটি বর্ণনা করে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে সহীহ বলেছেন। যাহাবীও তাঁর ‘তালখিস’ গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে বিশুদ্ধ বলেছেন।

আলী নিজেও বলেছেন,“সেই সত্তার শপথ,যিনি বীজ অঙ্কুরিত এবং মানুষের আত্মাকে সৃষ্টি করেন,উম্মী নবী (সা.) এই কথা বলেছেন যে,মুমিন ব্যতীত আমাকে (আলীকে) কেউ ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ব্যতীত কেউ আমার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে না।”

২০। নবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-কে বলেন,

يا عليّ أنت سيّد في الدّنيا و سيّد في الآخرة,حبيبك حبِيبِي و حبيبِي حبيب الله و عدوّك عدوّي و عدوّي عدوّ الله و الويل لمن أبغضك بعدي

“হে আলী! তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে নেতা,তোমার বন্ধু আমার বন্ধু এবং আমার বন্ধু আল্লাহর বন্ধু। তোমার শত্রু আমার শত্রু এবং আমার শত্রু আল্লাহর শত্রু। ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য যে আমার পর তোমার সঙ্গে শত্রুতা করবে।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১২৮ পৃষ্ঠায় হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।

কুফার ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মসজিদের ভেতরের একটি দৃশ্য। এ মসজিদে বসেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন হযরত আলী (আ)

 

২১। নবী (সা.) বলেছেন,“হে আলী! সৌভাগ্য সেই ব্যক্তির যে তোমাকে ভালবাসে ও তোমার বিষয়ে সত্য বলে এবং দুর্ভাগ্য সেই ব্যক্তির যে তোমার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে ও তোমার নামে মিথ্যা ছড়ায়।”

হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১৩৫ পৃষ্ঠায় হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন যদিও হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত তবুও বুখারী ও মুসলিম তা বর্ণনা করেন নি।

২২। নবী (সা.) বলেছেন,

من أراد أن يحيى حياتي و يموت ميتتي و يسكن جنّة الخلد الّتي وعدني ربّى فليتول عليّ بن أبي طالب فإنّه لن يخرجكم من هدى و لن يدخلكم فيضلالة

“যে চায় তার জীবন আমার জীবনের মত ও মুত্যু আমার মৃত্যুর মত হোক এবং চায় যে চিরস্থায়ী বেহেশতের প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ আমাকে দিয়েছেন সেখানে থাকতে,তার উচিত আলী ইবনে আবি তালিবের অভিভাবকত্বকে মেনে নেয়া। সে তাকে কখনোই হেদায়েতের পথ হতে বিচ্যুত করবে না এবং গোমরাহীর পথেও নিয়ে যাবে না।”

২৩। নবী (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান এনেছে ও আমাকে সত্যায়ন করেছে তার প্রতি আমার উপদেশ হলো সে যেন আলীর অভিভাবকত্বকে গ্রহণ করে। যে কেউ তার বেলায়েতকে গ্রহণ করবে সে প্রকৃতপক্ষে আমার অভিভাবকত্বকেই মেনে নিল। আর যে আমার অভিভাবকত্ব মেনে নিল সে আল্লাহরই অভিভাবকত্বকে গ্রহণ করে নিল। যে ব্যক্তি তাকে ভালবাসল সে যেন আমাকেই ভালবাসল আর যে আমাকে ভালবাসল সে আল্লাহকেই ভালবাসল। যে ব্যক্তি তার প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে সে মূলত আমার প্রতিই বিদ্বেষ পোষণ করে আর যে আমার প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে সে আল্লাহর প্রতিই শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে।”

২৪। নবী (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি আশা করে আমার ন্যায় জীবন যাপন ও আমার ন্যায় মৃত্যুবরণ করার এবং সেই চিরস্থায়ী বেহেশতে বসবাসের আকাঙ্ক্ষী হয় যার বৃক্ষসমূহকে আমার প্রতিপালক বপন করেছেন,সে যেন আমার পর আলীর অভিভাবকত্বকে গ্রহণ করে ও তার উত্তরাধিকারীর বেলায়েতকেও মেনে নেয়। সে যেন আমার পর আমার আহলে বাইতের অনুসরণ করে কারণ তারা আমার ইতরাত (রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়) ও আমা হতেই তাদের সৃষ্টি। আমার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আল্লাহ্ তাদের রিযিক হিসেবে দিয়েছেন। দুর্ভাগ্য আমার উম্মতের সেই লোকদের যারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করে এবং আমার ও তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের সৃষ্টি করে। আল্লাহর শাফায়াত হতে তারা বঞ্চিত।”

২৫। নবী (সা.) বলেছেন,“যে কেউ পছন্দ করে আমার মত জীবন যাপন করতে ও আমার ন্যায় মৃত্যুবরণ করতে এবং সেই চিরস্থায়ী বেহেশত যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ আমাকে দিয়েছেন তার অধিবাসী হতে সে যেন আমার পর আলী ও তার বংশধরদের অভিভাবকত্বকে মেনে নেয়। তারা তোমাদেরকে হেদায়েতের দ্বার হতে বহিষ্কার করবে না এবং গোমরাহীর পথেও পরিচালিত করবে না।”

২৬। নবী (সা.) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে বলেন,“হে আম্মার! যখন দেখবে আলী এক পথে চলছে আর লোকেরা অন্য পথে। আলীর সঙ্গে যাও ও অন্যদের ত্যাগ কর। কারণ সে তোমাকে পতনের পথে পরিচালিত করবে না এবং হেদায়েতের পথ হতেও বের করে দেবে না।”

২৭। রাসূল (সা.) হতে প্রথম খলিফা আবু বকর বর্ণনা করেছেন,“রাসূল (সা.) বলেছেন : আমার ও আলীর হাত ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সমান।”

২৮। নবী (সা.) ফাতিমা (আ.)-কে বলেন,“হে ফাতিমা! তুমি এই বিয়েতে (আলীর সাথে) সন্তুষ্ট কি? (জেনে রাখ) আল্লাহ্ পৃথিবীবাসীদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং দু’ব্যক্তিকে তাদের হতে মনোনীত করলেন,যার একজন তোমার পিতা,অন্যজন তোমার স্বামী।”

২৯। নবী (সা.) বলেছেন,

أنا المنذر و عليّ الهاد وبك يا عليّ يهتدي المهتدون من بعدي

“আমি ভয়প্রদর্শনকারী এবং আলী হেদায়েতকারী। হে আলী! আমার পর তোমার মাধ্যমেই হেদায়েতপ্রাপ্তগণ হেদায়েত পাবে।”

৩০। নবী (সা.) বলেছেন,

يا عليّ لا يحل لأحد أن يجنب في المسجد غيري و غيرك

“হে আলী! আমি ও তুমি ব্যতীত মসজিদে কারো অপবিত্র হওয়া জায়েয হবে না।”

অনুরূপ একটি হাদীস যা তাবরানী হযরত উম্মে সালামাহ্ এবং সা’দের সূত্রে নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন,“আমি ও আলী ব্যতীত এ মসজিদে কারো অপবিত্র হওয়া বৈধ হবে না।” 

৩১। নবী (সা.) বলেছেন,

أنا و هذا يعني عليّا حجة على أمّتي يوم القيامة

“আমি ও এই ব্যক্তি (আলী) কিয়ামত দিবসে আমার উম্মতের জন্য দলিল।”

খাতীব বাগদাদী হযরত আনাস হতে হাদীসটি বর্ণনা করছেন। কিরূপে সম্ভব যে,আবুল হাসান আলী ইবনে আবি তালিব রাসূলের মত উম্মতের জন্য দলিল হবেন অথচ তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও অভিভাবক হিসেবে উম্মতের পরিচালক ও নির্দেশক হবেন না?

৩২। নবী (সা.) বলেছেন,“বেহেশতের দ্বারে লেখা রয়েছে :

لا إله إلّا الله محمّد رّسول الله عليّ أخو رسول الله

আল্লাহ্ ব্যতীত উপাস্য নেই,মুহাম্মদ তাঁর রাসূল এবং আলী রাসূলের ভ্রাতা।”

৩৩। নবী (সা.) বলেছেন,“আরশের পাদদেশে লেখা রয়েছে আল্লাহ্ ছাড়া উপাস্য নেই,মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁকে আমি আলীর মাধ্যমে সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছি।”

৩৪। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি নূহের লক্ষ্যের দৃঢ়তা,আদমের জ্ঞানের গভীরতা,ইবরাহীমের সহিষ্ণুতা,মূসার বুদ্ধিমত্তা ও ঈসার আত্মসংযম (দুনিয়া বিমুখতা) দেখতে চায় সে যেন আলীর প্রতি লক্ষ্য করে।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে এবং বায়হাকী তাঁর ‘সহীহ’তে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

৩৫। রাসূল (সা.) আলীকে বলেছেন,“হে আলী! তোমার মধ্যে ঈসার নিদর্শনসমূহ রয়েছে,যে নিদর্শনের কারণে ইহুদীরা তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণ করতঃ তাঁর মাতাকে অপবাদ দিয়েছে ও নাসারারা তাঁর প্রতি ভালবাসার বশবর্তী হয়ে তাঁকে আল্লাহর স্থানে বসিয়েছে।”

৩৬। নবী (সা.) বলেছেন,

 السّبق ثلاثة السّابق إلى موسى يوشع بن نون و السّابق إلى عيسى صاحب ياسين و السّابق إلى محمّد عليّ بن أبى طالب

“অগ্রগামীরা তিন ব্যক্তি : মূসার অনুগামীদের মধ্যে অগ্রগামী হলেন ইউশা ইবনে নূন,ঈসার অনুগামীদের মধ্যে অগ্রগামী হলেন ইয়াসীনের অধিকারী এবং মুহাম্মদের অগ্রগামীদের প্রধান হলো আলী ইবনে আবি তালিব।” 

৩৭। নবী বলেছেন,“তিন ব্যক্তি সিদ্দীক : হাবীব নাজ্জার (আলে ইয়াসীনের মুমিন ব্যক্তি) যিনি বলেছিলেন : হে আমার জাতি! আল্লাহর রাসূলদের আনুগত্য কর;হিযকীল (ফিরআউন বংশের মুমিন ব্যক্তি) যিনি বলেছিলেন : ঐ ব্যক্তিকে এ কারণেই কি তোমরা হত্যা করতে চাও যে,সে বলে : আমার প্রভু একমাত্র আল্লাহ্ এবং আলী ইবনে আবি তালিব যে তাঁদের সকল হতে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ।”

৩৮। নবী (সা.) আলীকে বলেন,“আমার উম্মত অচিরেই তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে যদিও তখন তুমি আমার বিধানের ওপর জীবন যাপন করবে ও আমার সুন্নাহর ওপর মুত্যুবরণ করবে। যে কেউ তোমাকে ভালবাসবে সে যেন আমাকেই ভালবাসল আর যে তোমার সঙ্গে শত্রুতা করবে সে যেন আমার সঙ্গেই শত্রুতা করল। আমি দেখতে পাচ্ছি খুব নিকটেই তোমার শ্মশ্রু তোমার মস্তকের রক্তে রঞ্জিত হবে।” হযরত আলী (আ.) বলেন,“নবী (সা.) আমাকে যেসব বিষয়ে অবহিত করেন তার অন্যতম হলো এ উম্মত তাঁর পর আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।”

ইবনে আব্বাস বলেন,“নবী (সা.) আলীকে বলেছেন : আমার পর খুব নিকটেই তুমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে। আলী প্রশ্ন করলেন : তখন কি আমি দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকব? রাসূল (সা.) বললেন : হ্যাঁ,তখন তুমি সঠিক দীনের ওপরই থাকবে।”

৩৯। নবী (সা.) একদিন সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন,“তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি রয়েছে যে কোরআনের ব্যাখ্যার জন্য যুদ্ধ করবে যেমনটি আমি এর অবতীর্ণ হবার জন্য যুদ্ধ ও প্রচেষ্টা চালিয়েছি।” প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা আবু বকর ও উমরও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সকলেই ঘাড় সজাগ করে অপেক্ষা করতে লাগলেন। প্রথম খলিফা আবু বকর বললেন,“আমি কি সেই ব্যক্তি?” রাসূল (সা.) বললেন,“না।” উমর ইবনে খাত্তাব বললেন,“আমি কি?” তিনি বললেন,“না,বরং সেই ব্যক্তি যে এখন তার জুতায় তালি দিচ্ছে (তখন আলী [আঃ] তাঁর জুতা সেলাই করছিলেন)।”

আবু সাঈদ খুদরী বলেন,“আলীর নিকট গিয়ে এ সুসংবাদ দিলাম। তিনি তাঁর মাথা নীচু করেই রইলেন যেন তিনি রাসূল (সা.) হতে অসংখ্যবার একথা শুনেছেন।”

অনুরূপ হাদীস আবু আইউব আনসারী দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনে খাত্তাবের সময় বলেছেন,“রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আলীকে ‘নাকেসীন’ (প্রতিজ্ঞাভঙ্গকারী),‘মারেকীন’ (ধর্মচ্যুত) এবং ‘কাসেতীন’দের (সীমালঙ্ঘনকারী ও বিদ্রোহী) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ও তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,“রাসূল (সা.) বলেছেন :

يا عليّ ستقاتلك الفئة الباغية و أنت على الحق فمن لم ينصرك يومئذ ليس منّي

হে আলী! শীঘ্রই একদল সীমালঙ্ঘনকারী (বিদ্রোহী) তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে যদিও  তখন তুমি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যে ব্যক্তি তখন তোমাকে সাহায্য করবে না সে আমার অনুসারী নয়।”

অনুরূপ একটি হাদীস হযরত আবু যর রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন,“সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ নিবদ্ধ,তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি রয়েছে যে আমার পরে কোরআনের ব্যাখ্যার জন্য যুদ্ধ করবে যেমন আমি মুশরিকদের বিরুদ্ধে তা অবতীর্ণ হবার জন্য যুদ্ধ করেছি।”

মুহাম্মদ ইবনে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে আবি রাফে তাঁর পিতার সূত্রে তাঁর দাদা আবু রাফে হতে বর্ণনা করেন,রাসূল (সা.) বলেছেন,“আমার পর একদল আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে,তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা ঈমানী দায়িত্ব হিসেবে সবার ওপর বাধ্যতামূলক। যে ব্যক্তি অস্ত্র হাতে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অক্ষম সে যেন জিহ্বার দ্বারা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে,তাতেও অক্ষম হলে সে যেন অন্তর দ্বারা (ঘৃণার মাধ্যমে) যুদ্ধ করে।”

আখদ্বার আনসারী বলেন,“নবী করিম (সা.) বলেছেন : আমি কোরআন অবতীর্ণ হবার জন্য যুদ্ধ করেছি এবং আলী এর ব্যাখ্যার জন্য যুদ্ধ করবে।”

হযরত আলীর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণের একটি দৃশ্য 

 

৪০। নবী (সা.) বলেছেন,

 يا عليّ أخصمك بالنّبوّة فلا نبوّة بعدي و تخصم النّاس بسبع أنت أوّلهم إيْمانا بالله و أوفاهم بعهد الله و أقسمهم بالسّويّة و أعدلهم في الرّعيّة و أعظمهمعند الله مزية

“হে আলী,তোমার ওপর আমার শ্রেষ্ঠত্ব হলো নবুওয়াতের কারণে এবং আমার পরে কোন নবী ও রাসূল নেই। আর সকল মানুষের ওপর তোমর সাতটি শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে,তুমি সর্বপ্রথম ব্যক্তি যে ঈমান এনেছ,তুমি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে অগ্রগামী,তুমি সকল মানুষ হতে প্রত্যয়ী এবং আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে সবার হতে অগ্রগামী,বায়তুল মাল বণ্টনে সর্বাধিক সমতা রক্ষাকারী,বিচার ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সকল হতে ন্যায় বিচারক,আল্লাহর নিকট সম্মানের ক্ষেত্রে সকলের চেয়ে নৈকট্যের অধিকারী।”

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেছেন,“রাসূল (সা.) বলেছেন : হে আলী! সাতটি বৈশিষ্ট্যের কারণে তুমি অন্যদের হতে শ্রেষ্ঠ,তুমি সর্বপ্রথম ঈমান আনয়নকারী,তাঁর প্রতি প্রতিশ্রুতি পালনকারী,তাঁর নির্দেশের ক্ষেত্রে সর্বাধিক দৃঢ়,জনগণের প্রতি সবচেয়ে দয়ালু,বিচারের ক্ষেত্রে পারদর্শী এবং জ্ঞান,বিদ্যা,দয়া,উদারতা ও সাহসিকতা ইত্যাদি যাবতীয় সৎ গুণের ক্ষেত্রে অন্য সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম।”

এ হাদীসগুলো ছাড়াও সমার্থক ও সমমর্যাদার বিপুল সংখ্যক হাদীস রয়েছে। এসব হাদিস থেকে বোঝা যায় এই উম্মতের মধ্যে রাসূলের পর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আলী ইবনে আবি তালিব এবং এ উম্মতের নেতৃত্বের দায়িত্ব রাসূলের পর একইভাবে আলীর ওপর অর্পিত হয়েছে।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/৬

 

২০১৮-০৬-০৬ ২১:৩৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য