• ইমাম মাহদি (আ.)’র বাবার কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা

১২০৬ চন্দ্রবছর আগে ২৩২ হিজরির ৮ রবিউসসানি মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদী (আ.)'র বাবা হযরত ইমাম হাসান আসকারি (আ.) জন্ম নিয়েছিলেন পবিত্র মদিনায়।

বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইতের বংশধারায় জন্ম-নেয়া ইমামদের মধ্যে তিনি ১১তম। আব্বাসীয় শাসকদের চাপের মুখে ইমাম আসকারি (আ.) ও তাঁর পিতা ইমাম হাদী (আ.) প্রিয় মাতৃভূমি মদিনা শহর ছেড়ে আব্বাসীয়দের তৎকালীন শাসনকেন্দ্র সামেরায় আসতে বাধ্য হন। তাঁর পিতা হলেন দশম ইমাম হযরত হাদী (আ.) ও মাতা ছিলেন মহীয়সী নারী হুদাইসা (সালামুল্লাহি আলাইহা)

সামেরায় তৎকালীন শাসকদের সামরিক কেন্দ্র তথা 'আসকার' অঞ্চলে কঠোর নজরদারির মধ্যে ইমাম আসকারি (আ.)-কে বসবাস করতে হয়েছিল বলে তিনি আসকারি নামেও পরিচিত ছিলেন। এই শুভ দিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি সালাম ও মুবারকবাদ এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানেও পেশ করছি অশেষ সালাম আর দরুদ। 

কঠোর প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) অশেষ ধৈর্য নিয়ে তাঁর অনুসারীদেরকে জ্ঞানগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকসহ সব ক্ষেত্রেই পথনির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।  

পিতা ইমাম আলী নাকী তথা হাদী (আ.)'র শাহাদতের পর ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ২২ বছর বয়সে ইমামতের দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি ৬ বছর ধরে ইসলামী জাহানের পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালনের পর  মাত্র ২৮ বছর বয়সে ২৬০ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন। 

ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র অনেক মু’জিজা ও অদৃশ্য কর্মকাণ্ডের কথা জানা যায়। যেমন, তিনি মানুষের মনের অনেক গোপন কথা বা বাসনা জেনে তাদের সেইসব বাসনা পূরণ করেছেন, অদৃশ্যের অনেক খবর দিয়েছেন, নানা ভাষাভাষী ভৃত্যদের সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ভাষায় কথা বলেছেন। ইমামের সবগুলো মু’জিজা তুলে ধরলে একটি বই লেখার দরকার হবে। আমরা এখানে ইমামের কয়েকটি মু’জিজা বা অলৌকিক ক্ষমতার ঘটনা তুলে ধরব। ইমামের একটি মু'জিজার ঘটনা এরূপ যে, মুহাম্মাদ ইবনে আইয়াশ বলেন, একদিন আমরা কয়েকজন একত্রে বসে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র মু'জিজা সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। আমাদের মাঝে অবস্থানরত এক এক নাসিবি তথা বিশ্বনবী (সা,)'র আহলে বাইতের বিদ্বেষী বলল: আমি কয়েকটা প্রশ্ন কালিবিহীন কলম দিয়ে লিখব। যদি ইমাম জবাব দিতে পারেন তাহলে বিশ্বাস করব যে তিনি সত্যিকারের ইমাম। আমরা সে কথা মত কতগুলো বিষয় লিখলাম নাসিবির কালিবিহীন কলমে। আর নাসেবি তার প্রশ্নগুলো লিখল একই কলমে। আমরা সেগুলো ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র কাছে পাঠালাম। ইমাম সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লিখে পাঠালেন এবং নাসেবির কাগজের ওপর তার নাম, তার বাবার নাম ও তার মায়ের নাম লিখে পাঠালেন। নাসেবি তা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। তাঁর হুশ ফিরে আসার পর সে ইমামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করল ও ইমামের একনিষ্ঠ অনুসারীদের মধ্যে শামিল হল। (কাশফুল গাম্ম, খণ্ড-৩, পৃ-৩০২) 

আবু হাশিম জা’ফরি বলেন: একবার চেয়েছিলাম ইমাম আসকারি (আ.)’র কাছে একটি আংটি তৈরি করার মত সামান্য রূপা সাহায্য চাইব। ইমামের সাক্ষাতে গেলাম, বসলাম। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। এরপর যখন আসার জন্য রওনা হলাম ইমাম আমাকে একটি আংটি দিয়ে বললেন, রূপা চেয়েছিলে, আমি নাগিন (মহামূল্যবান পাথর-বিশিষ্ট আংটি) দিলাম এবং আংটির মজুরি অতিরিক্ত লাভ হিসেবে পেলে। তোমার মঙ্গল হোক। বললাম: হে আমার মাওলা, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর অলি ও আমার ইমাম। আপনার অনুসরণ আমার ধর্মীয় কর্তব্য। তিনি বললেন: হে আবুল হাশিম, আল্লাহ তোমায় ক্ষমা করুক।  (উসুলে কাফি,  খণ্ড-১, পৃ-৫১২)

 মুহাম্মাদ ইবনে রাবি শাইবানি বলেছেন: একবার আহওয়াজে (ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ) এক দ্বিত্ববাদীর সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম। এরপর সামেরা গিয়েছিলাম। ওই দ্বিত্ববাদীর যুক্তির কিছু প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। ফলে একত্ববাদের ওপর কিছু সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। একদিন আহমদ ইবনে খুসাইব-এর বাড়িতে বসেছিলাম এমন সময় ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এক সভা থেকে এলেন। তিনি আমাকে লক্ষ্য করলেন এবং আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললেন: আল্লাহ এক এবং তাঁকে অদ্বিতীয় মেনে নাও। আমি বেহুশ হয়ে পড়লাম। (কাশফুল গাম্ম, ইমামগণের আধ্যাত্মিক অধ্যায়, খণ্ড-৩, পৃ-৩০৫)  

আবু হামজা বলেন, অনেকবার দেখেছি ইমাম তাঁর খাদেমদের সঙ্গে (যারা বিভিন্ন দেশী, যেমন, তুর্কি, রুমি, রাশিয়ান ও অন্যান্য ভাষাভাষী ছিল) তাদের নিজ নিজ ভাষায় কথা বলতেন। আমি অবাক হয়ে যেতাম এবং মনে মনে বলতাম... ইমাম মদীনার অধিবাসী অথচ কিভাবে তিনি এত ভাষায় কথা বলেন। 

ইমাম আমার দিকে ফিরে বললেন: মহান আল্লাহ তাঁর প্রতিনিধিদের অন্যান্য সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং সব কিছুর ওপর জ্ঞান দান করেছেন। (আল্লাহর মনোনীত) ইমামগণ নানা ভাষা, নানা বংশ পরিচয় ও জরুরি বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকেন। যদি এ রকম না হত তাহলে সাধারণ মানুষ ও ইমামগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকতো না। (ইরশাদ, শেখ মুফিদ, পৃ-৩২২) 

আবু হাশিম জাফরি বলেন: এক ব্যক্তি ইমামকে প্রশ্ন করেন নারী কেন অবহেলিত যে পিতার সম্পদের দুই ভাগ পায় ছেলে অথচ নারী পায় মাত্র এক ভাগ? ইমাম বলেন: এর কারণ, জিহাদ করা, সাংসারিক খরচাদি চালানো পুরুষের দায়িত্ব এবং ভুলবশত: কাউকে হত্যা করলে তার জরিমানা তথা দিয়া দেয়াও পুরুষের ওপর অর্পিত হয়। আর এসব কিছুই নারীর দায়িত্ব বহির্ভূত।  

আবু হাশিম বলেন, আমি মনে মনে বললাম  এর আগে শুনেছি যে ইবনে আবিল উজজা ইমাম সাদিক্ব (আ.)’র কাছে ঠিক একই প্রশ্ন করেছিল এবং ঠিক এরকম জবাবই পেয়েছিল।  ইমাম আসকারি (আ.) তখন আমার দিকে ফিরে বললেন: হ্যাঁ, ঠিক একই প্রশ্ন ইবনে আবিল উজজা করেছিল। আমাদের যে কারো কাছেই (বিশ্বনবী-সা. ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের) যখন একই প্রশ্ন করা হয় তার উত্তরও আমরা একই রকম দিয়ে থাকি। পরবর্তী ও পূর্ববর্তী ইমামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। জ্ঞানগত বিষয়ে আমাদের প্রথম ও শেষ সমমর্যাদার অধিকারী, তবে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)’র বিশেষত্ব ও মর্যাদা অতুলনীয়। (কাশফুল গাম্ম, খণ্ড-৩, পৃ-৩০৩)#

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/৭

২০১৭-০১-০৭ ১৭:৫৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য