কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাশার আসাদ সরকার ও  সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী আলোচকদের সংলাপ ইতিবাচক অগ্রগতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

জাতিসংঘের এক প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে গত ২৩ জানুয়ারি এই সংলাপ শুরু হয়। একটি যৌথ-বিবৃতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের ওই আলোচনা। আস্তানা বৈঠকে সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য যৌথ তদারকি করতে সম্মত হয়েছে ইরান, রাশিয়া ও তুরস্ক। আস্তানার ওই বৈঠক ছিল সম্প্রতি সিরিয়া বিষয়ে মস্কোয় ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফসল।আস্তানা বৈঠকের ফলাফলকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবেই দেখছেন নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা।

তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ বা আইএসএল ও আননুসরাকে যুদ্ধ-বিরতি চুক্তির বাইরে রাখা  ছিল মস্কো বৈঠকের এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। সিরিয়ার জটিল সংকটের প্রেক্ষাপটে মস্কোয় ও পরে আস্তানায় যে এমন একটি সমঝোতা হবে তা খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছেন। ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার ধারাবাহিকতায় আগামী মাসে তথা ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে জেনেভায় একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এ আলোচনাও হবে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এবং এই বিশ্বসংস্থার প্রস্তাবগুলোর আলোকে।

ইরান ও  রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়া সিরিয়ার আসাদ সরকার-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, চলমান সংকটের সামরিক সমাধান সম্ভব নয়, তাই শান্তি চাইলে তাদেরকে আসাদ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতেই হবে।  তুর্কি সরকারও এখন এই সত্যকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। আসাদ সরকারকে বাদ দিয়ে যে সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় তা এখন ব্রিটেনসহ সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মদদদাতা পশ্চিমা শক্তিগুলোও উপলব্ধি করতে পারছে।আস্তানা বৈঠকের একটি বিশেষ দিক এটা যে এ বৈঠকে মার্কিন সরকারের উপস্থিতি ছিল দুর্বল বা অনুল্লেখযোগ্য। সিরিয়া বিষয়ক জেনেভা বৈঠকে মার্কিন উপস্থিতি ছিল বেশ উজ্জ্বল ও তা ছিল  পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের। অথচ আস্তানার বৈঠকে কাজাখস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। 

আস্তানা বৈঠকের আরেকটি বড় সাফল্য হল এ বৈঠকে উপস্থিত সব পক্ষ সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগলিক অখণ্ডতাকে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে সমর্থন দিয়েছেন। এ বিষয়টি আস্তানা বৈঠকের সমাপনী ইশতিহারে স্থান পেয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে যে, আলোচনার সব পক্ষই তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ তথা আইএসআইএল ও জেবহাতুন নুসরা বা ফাতহুশশামের বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আস্তানার বৈঠক সিরিয়ার আসাদ সরকার ও তার বিরোধী গ্রুপগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে সরাসরি আলোচনা শুরু করার জন্য একটি ভূমিকা বা পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং এই বৈঠক জেনেভা বৈঠকের সাফল্যেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

 সিরিয়ার শান্তি খুব শিগগিরই ফিরে আসবে কিনা তা এখনই খুব জোর দিয়ে বলে দেয়ার সুযোগ নেই। শান্তি-আলোচনায় অংশ নেয়া সিরিয়ায় সক্রিয় সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ নীতি ও আচরণের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করছে শান্তি এবং যুদ্ধ-বিরতির ভবিষ্যৎ। সিরিয়ায় সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মদদদাতা পশ্চিমা শক্তিগুলো অতীতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি বা শান্তি-আলোচনায় অংশ নেয়া সত্ত্বেও বার বার নীতি বদলের ডিগবাজি খেয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে বার বার যুদ্ধ-বিরতি লঙ্ঘন করেছে।

 যাই হোক, আস্তানায় ইরান ও রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কিছুটা হলেও শান্তি-প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি বয়ে এনেছে। জেনেভায় সিরিয়ার আসাদ সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিরা কেমন আচরণ করবেন সেটা দেখার জন্য বিশ্ববাসীকে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।  সিরিয়ায় সক্রিয় পশ্চিমা মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগী সরকারগুলো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং আঞ্চলিক কৌশল স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার ও ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করবে বলে মনে হচ্ছে।

 অন্যদিকে রাশিয়া সিরিয়া বিষয়ে কূটনীতির মাঠে ও যুদ্ধক্ষেত্রে যে সাফল্য পেয়েছে তার আলোকে ইউরোপকেও নিজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালা বদলের প্রক্রিয়ায় সিরিয়া বিষয়ে মার্কিন নজরদারির ক্ষেত্রে যে শূন্যতা দেখা দিয়েছিল রাশিয়া সেই সুযোগকে আস্তানায় পুরোপুরি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।   এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থান এবং সিরিয়ায় আঙ্কারার নীতির ব্যর্থতা ও দেশটিতে সন্ত্রাসী তৎপরতা জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তুর্কি সরকারকে সিরিয়ার যুদ্ধ-ফ্রন্ট থেকে বের করে আনতে সফল হয়েছে। এখন তুর্কি সরকার সেখানে কেবলই মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করতে চায়। ফলে সম্প্রতি তুর্কি সরকার বলেছে, আসাদ সরকারের পতন এখন আর তুরস্কের দাবি নয়। এর আগে তুর্কি সরকার বলতো, সিরিয়া সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হল আসাদের পদত্যাগ। 

কিন্তু সিরিয়া বিষয়ে তুরস্কের এই পরিবর্তিত নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়েছে সৌদি সরকার। তুরস্কে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আদেল বিন সিরাজ এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,তুর্কি সরকার সিরিয়া বিষয়ে নিজেরই রেড-লাইন বা লাল-সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং দেশটিতে অর্জিত নানা সাফল্য থেকে নিজেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।  তিনি আরও বলেছেন, তুর্কি সরকার এখন সিরিয়াকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং এখন থেকে দেশটিতে মানুষের প্রাণহানি ও লাখ লাখ সিরিয় নাগরিকের শরণার্থী হওয়ার জন্য আঙ্কারাই দায়ী হবে।

তবে তুর্কি সরকারের ডিগবাজির আশঙ্কা এখনও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তুর্কি সরকার গায়ের জোরে যা করতে পারেনি এখন তা কূটনীতির মাধ্যমে অর্জনের কৌশল নিয়েছে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। আর এ জন্যই আস্তানা বৈঠকে সিরিয়ার আসাদ সরকারের প্রধান আলোচক বাশার আল জাফারি বলেছেন, এই সরকার কখনও তুর্কি সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবে না। কারণ, তুর্কি সরকারই সিরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল সহযোগী।

যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায় সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে রাক্কা ও দেইর আজজুউর ও উত্তরাঞ্চলে আলবাব শহর এখনও দায়েশ তথা আইএসআইএল-এর দখলে রয়েছে। অন্যদিকে ফাতহুশশাম নাম ধারণকারী গোষ্ঠী জেবহাতুন নুসরা দখলে রেখেছে উত্তর সিরিয়ার হোমস ও ইদলিব অঞ্চল। তাই যুদ্ধ-বিরতি ও আস্তানা সমঝোতার অর্থ এই নয় যে খুব শিগগিরই সিরিয়ায় যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে। এ ছাড়াও মার্কিন সরকার ও দখলদার ইসরাইল এবং সৌদি ও কাতার সরকার আবারও সিরিয়া বিষয়ে আগের ভূমিকায় ফিরে আসতে পারে। 

সৌদি সরকার গত ৫ বছরে সিরিয়ার তথাকথিত বন্ধু হিসেবে দেশটির বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসীদের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। তাই এ সরকার সিরিয়ার চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে বলে মনে হয় না। রিয়াদ হয়তো ট্রাম্পের সিরিয়া-নীতি কি হয় তা দেখার জন্যই অপেক্ষা করছে আপাতত।  মার্কিন সরকারসহ অন্য সরকারগুলো সিরিয়া নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকলে ইয়েমেনে সৌদি ধ্বংসযজ্ঞের দিকে বিশ্ব-জনমতের নজর কম পড়বে বলে মনে করে রিয়াদ। তাই রিয়াদ সিরিয়ায় অশান্তির আগুন জিইয়ে রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা জোরদার করতে পারে।

 ট্রাম্পের সিরিয়া নীতিতে ওবামার সিরিয়া নীতির চেয়ে খুব একটা পরিবর্তন আসবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। অবশ্য এরিমধ্যে ট্রাম্প বলেছেন তিনি সিরিয়ায় নো-ফ্লাই জোন করতে চান। কিন্তু রাশিয়া এর বিরোধিতা করে বলেছে, এ ধরনের পরিকল্পনা হবে সন্ত্রাসী-বান্ধব। তাই এটা স্পষ্ট ভবিষ্যৎ রুশ-মার্কিন সম্পর্কও সিরিয়া পরিস্থিতির ওপর প্রভাব রাখবে। #  

পার্সটুডে/মু.আ. হুসাইন/২৯

২০১৭-০১-২৯ ১৮:১২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য