• ইরানের বিমান বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশটির সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন

ফার্সি ১৯ বাহমান তারিখটি হচ্ছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের প্রাক্কালে দেশটির ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী (র)’র প্রতি ইরানি বিমান বাহিনীর স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ঘোষণার দিন।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ৩৮তম বার্ষিকী। ইসলাম বিপ্লবের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল ওই ঘটনা। তাই ঘটনাটিকে মহান আল্লাহর এক অদৃশ্য মদদ বলে মনে করা হয়।  এ উপলক্ষে  ইরানের বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা প্রতি বছরের এই দিনটিতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর প্রতি ও ইসলামী বিপ্লবের আদর্শের প্রতি এই বাহিনীর আনুগত্য নবায়ন করেন।

গত সাত ফেব্রুয়ারিও একই লক্ষ্যে ইরানি বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তাদের সমাবেশে হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, ১৯৭৯ সালের এই দিনটিতে বিমান-সেনারা দলে দলে প্রকাশ্যেই শ্লোগান দিতে দিতে ইমামের বাসভবনের দিকে আসতে থাকে। তাদের হাতে ছিল আইডেন্টি-কার্ড। ঘটনাটি ছিল খুবই বিস্ময়কর।  এ ঘটনা যেন সুরা হাশরের ২ নম্বর আয়াতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: এরপর আল্লাহর শাস্তি তাদের উপর এমন দিক থেকে আসল, যার কল্পনাও তারা করেনি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে ইমাম খোমেনী (র)’র প্রতি ইরানি বিমান বাহিনীর স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ঘোষণার ঘটনাটি খোদাভীরুদের প্রতি মহান আল্লাহর সহায়তার ওয়াদা বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত। মানুষের চিন্তায় ও সহজ-হিসাব-নিকাশে সাধারণত যা ঘটবে বলে মনে হয় না, মু’মিন ও বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তা-ই করেন। ৮ বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধে ইরানের বিজয়ও এর আরেকটি বড় প্রমাণ। তাই মু’মিনদের উচিত এ ধরনের খোদায়ী সাহায্যে আস্থা রাখা।

সে যুগে সাদ্দামের প্রতি মার্কিন সরকার ও বড় বড় পরাশক্তিগুলোসহ বিশ্বের ২৬টি সরকারের সর্বাত্মক সহায়তা ছিল। ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর এক বছর না যেতেই সাদ্দাম ইরানে হামলা শুরু করে। সে সময় ইরানের নিয়মিত বাহিনী হয়ে পড়েছিল অগোছালো ও অসংঘবদ্ধ। সামরিক সাজ-সরঞ্জামেরও অভাব ছিল ব্যাপক। দক্ষ বিশেষজ্ঞ ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং মেরামতের সুযোগ না থাকায় মনে করা হত ইরানের বিমান বাহিনীর জঙ্গি বিমানগুলো মাত্র ১৮ দিন উড়তে সক্ষম হবে। কিন্তু মহান আল্লাহর অনুগ্রহে ইরানের বিমান বাহিনী ৮ বছরের যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সক্রিয় ছিল এবং তারা বহু অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। আর এইসব অদৃশ্য খোদায়ী সাহায্যের সম্ভাবনা কখনও বস্তুগত হিসাব-নিকাশ বা চিন্তা-ভাবনার মধ্যে স্থান পায়নি।  

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে করেন, মহান আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি আমরা যদি বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগাই তখন অদৃশ্য সাহায্যের এই পথ আমাদের জন্য খুলে যাবে। বুদ্ধিবৃত্তি ও বস্তুগত হিসাব-নিকাশকেও বন্ধ রাখার দরকার নেই। এসবই জরুরি। তবে এসবের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসাও করা উচিত এবং খোদায়ী সাহায্যের কথাও হিসাবের একাংশে রাখতে হবে। ইসলামী বিপ্লবের সূচনা থেকে বিগত ৩৭-৩৮ বছরে বিপ্লবের সব বিষয়ই ছিল এমন এবং সব ক্ষেত্রেই খোদায়ী সাহায্য দেখা গেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর মতে ইসলামী এই দেশের বিমান বাহিনী ইসলামী বিপ্লবের নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে মূল্যবান অবদান রেখেছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মাত্র কয়েক মাস পর ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ‘নুজ্বে-সামরিক অভ্যুত্থানের’ যে ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল তা ব্যর্থ করেছিল বিমান বাহিনীর বিচক্ষণতা ও আনুগত্য। হামেদানের নুজ্বে অঞ্চলটি ছিল মার্কিন সরকারের পরিকল্পিত ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থান পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলামী এই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর যে শাখা সর্বপ্রথম সামরিক যন্ত্রাংশ নির্মাণের কাজ শুরু করে ও তাতে স্বনির্ভরতার পথ খুলে দেয় তা হল, বিমান বাহিনী। তিনি ৮ বছরের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ জয়ে ইসলামী ইরানের  বিমান বাহিনী ও বিশেষ করে তার বিমান-বিধ্বংসী ইউনিটগুলোর ভূমিকাও স্মরণ করিয়ে দেন। তাদের সেইসব ভূমিকা শত্রু ও মিত্রকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিল। তিনি সেইসব দিনের মত বর্তমান ও ভবিষ্যতেও সাহসিকতা ও দৃঢ়-উদ্যম নিয়ে নানা সংকট মোকাবেলা করতে এবং শক্তি বাড়াতে ইরানি বিমান বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মহান আল্লাহর ওপর ভরসার ছায়াতলে বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়ে আবারও বলেছেন, আমরা যদি বুদ্ধিবৃত্তিকে শয়তানের ওপর ভরসার আলোকে প্রয়োগ করি তাহলে হতাশা ও পরাজয় ছাড়া আর কিছুই আমাদের ভাগ্যে জুটবে না। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন:

 শয়তানের ওপর ভরসা করার অর্থ হল এমন কাউকে বিশ্বাস করা যে আপনার অস্তিত্বেরই বিরোধী। তাই এমন কারো ওপর ভরসা করা মারাত্মক ভুল। যে শক্তি ইসলাম-ভিত্তিক জন-শাসন-ব্যবস্থারই বিরোধী এবং ইসলামের অগ্রগতিকে সহ্য করতে পারে না তার ওপর বিশ্বাস করা যায় না।  পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী যদি কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাহলে আল্লাহ অচিন্তনীয় স্থান থেকে তাকে রিজিক দেন আর যারা শয়তানের ওপর ভরসা করে তাদের অবস্থা হয় মরুভূমির মরীচিকাকে পানির উৎস বলে ভুল করার মত মহা-বিভ্রান্তি। 


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান-বিদ্বেষী মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেছেন,

‘ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে সদ্য-আসীন এই লোকটি তথা ট্রাম্পের  দাবি হল ইরানের উচিত ছিল ওবামার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ও তাকে তথা নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ভয় করা! কিন্তু আমরা কেন ওবামার প্রতি কৃতজ্ঞ হব? নিষেধাজ্ঞাগুলো আরোপের জন্য? দায়েশ তথা আইএসআইএল গড়ে তুলেছে বলে? এ অঞ্চলে অশান্তির আগুন ছড়ানোর কারণে? ওবামা সিরিয়াতে যুদ্ধের আগুন লাগিয়েছেন ও ইরাকেও ছড়িয়েছেন যুদ্ধের আগুন; তাই কেন তাকে ধন্যবাদ জানাবো? ২০০৯ সালে আমাদের দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে দাঙ্গা তৈরি করা হয়েছিল তাতে সমর্থন দেয়ার জন্যও কি ওবামাকে ধন্যবাদ জানাবো? আর নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিও আমরা ভীত থাকবো না। আগামী ২২ বাহমান তথা ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকীর শোভাযাত্রায় ইরানি জনগণ তার এইসব মন্তব্য ও হুমকির জবাব দিবে সড়কগুলোতে এসে।’  

ইসলামী বিপ্লবের এই আহ্বানের আলোকে বিপ্লবের বিজয়-বার্ষিকীর মিছিলে ইরানি জনগণের অংশগ্রহণ ছিল অতীতের এই বার্ষিকীর মিছিলের চেয়ে অনেক বেশি। ইরানি জনগণ এবার ট্রাম্প-বিরোধী নানা শ্লোগান দেন এবং তার ছবির ওপর দিয়ে হেটে যান। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ট্রাম্পের মন্তব্য প্রসঙ্গে আরও বলেছেন: ‘আমরা কারো হুমকিতে ভয় পাই না। হ্যাঁ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে সদ্য-আসীন এই লোকটির প্রতি আমরা এক দিক থেকে কৃতজ্ঞ। কারণ, তিনি আমাদের কষ্ট কমিয়ে দিয়েছেন মার্কিন সরকারের আসল নোংরা চেহারা তুলে ধরে। মার্কিন সরকারের রাজনৈতিক অসততা, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, নৈতিক অসততা ও সামাজিক অনাচারগুলোর কথা আমরা সব সময়ই বলে আসতাম। আর এই লোকটা এসে নির্বাচনের সময় ও নির্বাচনের পরে এসব বিষয়ই প্রকাশ এবং সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। এই লোকটি এখনও যা করছে তা থেকেও মার্কিন সরকারের আসল চেহারা ফুটে উঠছে, বোঝা যাচ্ছে যে মার্কিন মানবাধিকারটা আসলে কী! ৫ বছরের বাচ্চাকে হাতকড়া পরাচ্ছে! এই হল ওদের মানবাধিকার!’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শত্রুদেরকে বিশ্বাস না করতে ও বিশেষ করে মার্কিন সরকারের প্রতি আস্থাশীল না হতে ইমাম খোমেনী (র)’র  কণ্ঠে বহু বার উচ্চারিত জোরালো উপদেশটির  কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘ইরানি জাতি তার এই পথটি তথা শত্রুদের ওপর নির্ভর না করার পথটি খুঁজে পেয়েছে।   তারা যুক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং প্রবল শক্তিমত্তা ও গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এ পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব স্তরের ইরানিরা নানা সাফল্য পাচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সৃষ্টিশীল চিন্তা ও উদ্ভাবনের বৈচিত্র্যে ভরপুর। ইরানে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা-ভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তির আসন রয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এভাবে ইরানের মুসলিম জাতি তার  কাঙ্ক্ষিত আদর্শিক স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করবে।'  #

পার্সটুডে/মু.আ. হুসাইন/১৬
 
 


 

২০১৭-০২-১৬ ১৭:৫৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য