• পবিত্র আশুরা ও গণহত্যায় আরাকানের আর্তনাদ

“তোমাদের কী হইল যে, তোমরা যুদ্ধ করিবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী এবং শিশুগণের জন্য, যাহারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ-যাহার অধিবাসী জালিম, উহা হইতে আমাদেরকে অন্যত্র লাইয়া যাও; তোমার নিকট হইতে কাহাকেও আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট হইতে কাহাকেও আমাদের সহায় কর।” (সূরা নিসা ৪ : আয়াত ৭৫, আল-কুরআনুল করীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা)

If Husain had fought to quench his worldly desire then I do not understand why his sister, wife and children accompanied him. It stands for reason therefore, that he sacrificed purely for Islam."  --Charles Dickens

“যতদিন পর্যন্ত না ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ ধ্বনি সমগ্র পৃথিবীতে ধ্বনিত হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। পৃথিবীর যেখানেই জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম সেখানেই আমরা আছি।”   --ইমাম খোমেইনী (রহ.)

কাব্যগুচ্ছ

ইরানে আশুরার শোকানুষ্ঠানে কারবালার ঘটনাবলীর দৃশ্যায়ন

পবিত্র আশুরা

মানুষকে ভালোবাসার মূল্য :

‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’

 

মানুষকে ভালোবাসার মূল্য রক্তস্নাত কারবালা,

রিসালতের বার্তাবাহী আহলে বাইতের শাহাদত।

মানুষ ‘প্রভু’-‘ভৃত্য’ নয়, আল্লাহ ছাড়া নেই ইলাহ্,

চিরকালের মাতম জাগে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’।

 

নবীশ্রেষ্ঠ রাসূলশ্রেষ্ঠ-কুরআনে তাঁর শান ‘সালাম’।

মানবতার মুক্তি লক্ষ্যে জীবন দানের চড়া এ দাম,

ইসলামী নীতি রক্ষায় অনন্য শাহাদতের নাম-

রাসূলের পতাকাবাহী ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’।

 

মা ফাতেমার অন্তরাত্মা বার্তা ছড়ান বিশ্বময় :

রিক্ত-নিঃস্ব সর্বহারা মযলুমানের এই বিজয়।

শপথের আজ শ্রেষ্ঠ সময়-ফিতনা এজিদ, তফাৎ যাও,

শহীদী ঈদগাহে মাতম ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’।

 

মানুষকে ভালোবাসার মূল্য জান কুরবান খলীলুল্লাহ্,

মানুষকে ভালোবাসার মূল্য যবীহুল্লাহর ‘ইনশাল্লাহ্’।

বিশ্বনবীর সেই পতাকার যাত্রা-ভোরে গো আল্লাহ

শাহাদতের খুশবু ছড়ান ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’।

 

ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায় বাদশাগিরির খায়েশ সেই

কুচক্রী দুর্বুদ্ধি জনের শঠতা ইসলামে নেই,

আলী হায়দার শেরে খোদার দু’সন্তানে ফুল ছড়াও,

যুগল শাহাদতের রোনা ‘হায় হাসান! হায় হোসেন’।

 

পার্থিবতার বৈষয়িকের  কূটচক্রী ধান্ধাবাজ :

এদের জন্য খিলাফতের ইমামতের হোসেন ত্রাস,

শাহাদতের আবেহায়াত অবলীলায় পান করেন,

‘মৃত্যু নেই’ ‘নেই মৃত্যু’ ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’।

 

বিফল ভাই এই প্রেম সবক

গোটা বিশ্বে একই দৃশ্য--নির্মূলকরণ,

আগুন নিয়ে খেলা এবং আকাশ ভেঙে পড়া!

‘ঢেঁকির কচকচি’র গোষ্ঠী কী হর্ষে নিধন!

গণহত্যা ছড়ায় এবং গড়ায় শতক বেলা।

তারপরও ছেঁড়া  চুলে খোঁপা বাঁধে কবি,

কবির জন্য নিয়তি এই--ভবিতব্য এই!

আপন পায়ে কুড়াল মারার দাঁও মারারা সবি,

অকূল পাথার সাঁতার এবং অকূলে কূল নেই।

 

সব শিয়ালের এক রা রাতের কালো ফুঁড়ে,

পশুর স্বরাজ, দাপট এবং দম্ভী বিচরণ!

কিল খেয়ে কিল চুরি করার জাতি মাথা খুঁড়ে,

কুশাগ্রবুদ্ধি ঝাড়ে ‘শান্তি’ সুবচন!

 

অরণ্যে রোদন জানি স্বপ্ন ফেরি হায়!

রাবণ-চিতায় সে অন্বেষায় কবি ভস্ম হয়,

অভ্যন্তরীণ দৃশ্যাবলি আদায়-কাঁচকলায়,

অহি-নকুল আবাহনে চরম বিপর্যয়।

 

অদ্ভুত এক এঁড়ে তর্ক, সে-ও কলকে পায়!

বিশ্বের কপালে চোখ--অবৈধ ’ভিবাসী!

শত বছর দিচ্ছে পাড়ি এ গণহত্যায়

লাখো ভিটেয় ঘুঘু চরার দৃশ্য সর্বনাশী।

 

গণহত্যার হিংস্রতার ধারাবাজির কাল,

হামলে পড়া পশুগুলোর ‘ক্লিনজিং এথনিক’

ধারাবাহিক নিধনযজ্ঞে তারা বেসামাল

নারীর সম্ভ্রম লুটে! ধিক ’শান্তি’ ধিক!

 

গভীর জলের মাছটাকে জালেই আটকাও,

কান্নাকাটির মহড়াতে সে দেবে না কান,

জাতীয় সব বিভাজনে চির কবর দাও,

সংহতি ও ঐক্যে নেই পরাজয়ের স্থান।

আত্মঘাতী স্বজন-হনন ফিরকা ভুলে যাও,

‘আল্লার রজ্জু’ সংহতিতে মুশকিল আসান।

 

জাতীয় কবির বার্তা অবশ্য মোক্ষম:

‘দন্ত-নখর’ধারী  বাঘে ‘প্রেম সবক’ নয়!

মানবিক এপ্রোচে নেই পশু নরাধম,

যেমন কুকুর তেমন মুগুর--সুনিশ্চিত জয়।

(সাপ্তাহিক রোববার, ঢাকা, ২৪ সেপ্টেম্বর ’১৭)

মগের মুল্লুক

নোবেল ‘শান্তি’ পদক

লেডি ম্যাকবেথ

 

অনুতাপের দৃশ্য দেখুন লেডি ম্যাকবেথের

ডানকান হত্যা শেষে ঘষে জোড়া হাত!

“আরবের সব সুগন্ধিতে পাক হবে না ফের”,

হা-হুতাশে জীবনে তার যবনিকাপাত।

 

মায়ানমারে আসীন নারীর নেই সে অনুতাপ,

ছত্রছায়ায় হাজার হাজার হত্যা পায় পার;

লক্ষ লক্ষ পরিবারের ধ্বংস এবং শাপ-

মানবতার হত্যাকারী নারী শুভ্রতার!

‘শুচি-শুভ্রতার’? সু চি শুভ্রতার?

 

মগের মুল্লুক মাৎস্যন্যায় গণহত্যার ধুম!

ঠগ-বর্গী-মগকুলে মনুষ্যত্ব নেই।

নেই সুতরাং হন্তা নারীর ‘আরব পারফিউম’

হাহাকারে মনুষ্যত্ব উদ্বোধনী সেই!

 

আরাকান গণহত্যার নির্বিঘ্ন আশ্রয়

অগণিত লেডি ম্যাকবেথ মস্তিষ্ক-কোষ

সামরিক ও সন্তদের পোড়ামাটিময়

নির্মূলে সুরক্ষা দিয়ে ঘোষে সে নির্দোষ!

নোবেল ‘শান্তি’ পদক ভূষিত অং সান

বিশ্ব-ঘৃণা কুড়িয়েও নির্বিকার ‘অম্লান’!

 

শেক্সপিয়ার সাম্প্রতিক নবনাট্যে তাঁর

রোহিঙ্গাদের গণহত্যার এই হিংস্রতায়

একবিংশের এ জঘন্য তাণ্ডব হিংসায়

লেডি ম্যাকবেথ নতুন করে মূর্ত ভাবনার!

কারণ সে হত্যায়  প্ররোচনা সহযোগিতায়

ছিল বলে অনুতাপে বুক চাপড়ে যায়।

কিন্তু এই নারী দেখো ভাবলেশহীন!

হাজার হাজার খুনের পরও সুখ-হাস্যে ভিন!

মনুষ্যত্বের বিন্দুমাত্র থাকলে তা তো নয়!

লেডি ম্যাকবেথ ‘মানুষ’ ছিল মেনে নিতে হয়।

 

জাতিসংঘের কাঠগড়ায়

ঘৃণা প্রকাশ শব্দপ্রয়োগ রকমফেরের কাল,

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার সে কী কপট কসরৎ!

কী নৃশংস গণহত্যায় বিশ্বটা উত্তাল!

কোদালকে কোদাল বলছে বিবেক জনমত।

 

অসহায় এক জনগোষ্ঠী বারে বারে শেষ!

ভাষণ জুড়ে শব্দগুচ্ছ কেমন? ‘নির্যাতন

কী হয়েছে দেখছি, দেখি’: দায়সারা বেশ,

নির্মূলী এ গণহত্যা, ধর্ষণ গোপন!

 

তেমন কিছু না বোঝাতে ব্যস্ত এ তস্যরা,

বক্তৃতার ফাঁক-ফোকরে ভাষা-ভাষ্য এই,

হাজার হাজার মানুষ হত্যা লুকাচ্ছে বশ্যরা,

শান্তি-বাণী উচ্চারণে লাজ-লজ্জা নেই।

 

মূর্খস্য লাঠ্যৌষধি- ওরা মূর্খ নয়,

আদমসুরত এ পশুরা বিরল প্রজাতির।

ধারাবাহিক হিংসাশ্রয়ী পাষ- নির্ভয়,

হননযজ্ঞের দৃশ্য এই দুটি শতাব্দীর।

 

ভাবছে তারা অবশ্যই এ জেনোসাইড স্টপ

করতে পারার সাধ্য যাদের, আসবে না সে কেউ,

আত্ম-হানাহানির গোষ্ঠির সবান্দোলন ফ্লপ,

সুতরাং সে পাড়ার দাপট চিল্লায় ঘেউ ঘেউ।

 

তা হলে কি এভাবেই গোটা আরাকান

মুসলিম জনশূন্য হবে অবাধ হত্যায়?

গরীয়ান হেরিটেজ এ শূন্য বিয়াবান

‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে’ হায়?

 

‘শান্তি’তে নোবেল-ভূষণ আজ যে অশোভন,

বর্বরতা সংঘটিত ঘৃণ্য আস্কারায়,

পদক ফিরিয়ে নেয়ার পুনর্মূল্যায়ন-

হচ্ছে, হোক; না হলে যে লাই এবং সায়।

 

ভূমিকা তার রহস্যময় মার্শাল ছায়ায়,

নির্মূল প্রক্রিয়া চলে দৃষ্টিসীমায় তার,

বিশ্ববিবেকের বার্তা এ আর্তি জানায়-

আন্তর্জাতিক আদালতে হোক তার বিচার।

 

বিশ্ব গণআদালতে এই গণহত্যায়

দোষী সাব্যস্ত হলো ধূর্ত অং সান

সেনা, পুলিশ, মিলিশিয়া সহযোগিতায়;

রায়-সুপারিশ বাস্তবতা হোক দৃশ্যমান।

 

অ্যামনেস্টি, হিউম্যান রাইট্স-তাবত সংগঠন,

জাতিসংঘের  বার্তায় পরোয়া নেই তার।

বিশ্বসংস্থার ধিক্কারে স্বরূপ উন্মোচন,

সর্বাত্মক অবরোধই শ্রেষ্ঠ ‘উপহার‘।

 

‘শঠে শাঠ্যং’ কপটাশ্রয়ী : ‘প্রেম দিবো না ?’ নয়,

প্রতিপক্ষী পাশবিকে  দেয়া চাই জানান-

ফাঁকা মাঠে গোলের জন্য বিশ্ব প্রতিকূল,

জাতিসংঘের কাঠগড়ায় দাঁড়াক অং সান।

 

লেখক: আবদুল মুকীত চৌধুরী, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। 

 

২০১৭-১০-১৯ ১৭:১৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য