• সু চি নৃশংস বৌদ্ধ-মগ-ঘাতকদের চেয়েও বেশি অপরাধী: বিশ্লেষক

রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান যুগের অতি দীর্ঘ-সময়-ধরে-চলা সংকটগুলোর অন্যতম। বেশ কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত হয়ে আছে এই সংকট। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, লাওস ও থাইল্যান্ড মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ।

কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশই এ সংকটের সাথে বিশেষভাবে ও সবচেয়ে ব্যাপক মাত্রায় জড়িয়ে গেছে।

সাবেক বার্মা অর্থাৎ মিয়ানমারে রয়েছে ১৫০-এরও বেশি জাতি। এই জাতিগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখন বিশ্বের সবচেয়ে মজলুম ও নির্যাতিত জাতিতে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই হচ্ছে মুসলমান। তারা মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দেশটির সরকার, সশস্ত্র বাহিনী ও বর্ণবাদী উগ্র বৌদ্ধদের হাতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার।

জাতীয়, রাষ্ট্রীয়, নাগরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাও সংস্থানের অধিকারসহ সব ধরণের মানবিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, পৃথিবীতে সবচেয়ে অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, হতভাগ্য ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় হচ্ছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অন্যতম প্রাচীন জাতি, বহিরাগত নয় 

স্মরণাতীত কাল থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রাখাইন ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছিল।রাখাইন অতীতে আরাকান নামে পরিচিত ও মশহুর ছিল।  মধ্যযুগে মাগন ঠাকুরের মত বহু রোহিঙ্গা মুসলিম মনীষী,পণ্ডিত ও ব্যক্তিত্ব স্বাধীন আরাকান রাজ্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ সরকারী রাজপদে অধিষ্ঠিত হয়ে সেদেশের জনগণের খেদমত করেছেন। শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারে ও বিশেষ করে আরাকান অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবি আলাওল এই আরাকান রাজ্যেই বাংলা ভাষার চর্চা করে চির-প্রসিদ্ধ হয়েছেন। আরাকান রাজের পৃষ্ঠপোষকতায় আরাকান রাজসভায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যার স্রষ্টা ও রচয়িতা ছিলেন আরাকানের অধিবাসী মুসলিম রোহিঙ্গা কবি সাহিত্যিকরা। প্রখ্যাত গবেষক ও সাহিত্যিক ডঃ এনামুল হক তাঁর রচিত আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য শীর্ষক গবেষণামূলক প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

স্বাধীন আরাকান রাজ্যের রাজা বাদশাহরা বাঙ্গালী বা রোহিঙ্গা ছিলেন না। তবে তারা স্বাধীন মুসলিম সুলতানদের শাসিত বাংলার উন্নত সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষায় আকৃষ্ট ও প্রভাবিত হয়েই তাদের রাজ্যের কবি সাহিত্যিকদের বাংলা সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করতেন। সম্ভবত: এ কারণে এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলার সাথে রোহিঙ্গা ভাষার  মিল থাকার সুবাদে রোহিঙ্গাদেরকে বাঙ্গালী ও বহিরাগত অর্থাৎ পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ থেকে আগত ও মিয়ানমারে অবৈধভাবে বসবাসকারী বলে অভিহিত করছে মিয়ানমারের জালিম শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক জান্তা। অথচ মিয়ানমারের শাসকচক্র ও সামরিক জান্তার এ দাবীর কোন  ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কারণ রোহিঙ্গারা নিজেদেরকে বাঙ্গালী বলে দাবী করে না বরং তারা নিজেদেরকে স্বতন্ত্র রোহিঙ্গা জাতিসত্তা বলেই অভিহিত করে থাকে।

সুদূর অতীতকাল তথা বহু শতাব্দি ধরে রোহিঙ্গাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম  আরাকান অঞ্চলে বসবাস করে আসছে বিধায় এ কথা বলার ও প্রমাণ করার অবকাশ নেই যে তারা পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) বিশেষকরে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে অথবা এর পরে দলে দলে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে এসে বসবাস করছে। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে অতি অল্প সংখ্যক  বাঙ্গালি আরাকান ও মিয়ানমারের অন্যান্য শহর ও অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করে থাকতে পারে। আর এ বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই হচ্ছে জন্মসূত্রে আরাকানের স্থানীয় ও স্থায়ী অধিবাসী এবং তারা বহিরাগত নয়। ব্রিটিশ শাসনামলে শুধু বাংলা থেকে কেন ভারতবর্ষের অনেক অঞ্চল থেকেও অনেকে চাকুরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যোপলক্ষ্যে মিয়ানমারের রাজধানী রেঙ্গুনসহ (ইয়াঙ্গুন) বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে  গিয়ে বসবাস করেছে। আর এদেরই কেউ কেউ ভারতীয় উপমহাদেশ ও মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পরেও মিয়ানমারে থেকে গেছে। তারা মাতৃভূমিতে ফিরে যায়নি বলে তাদেরকেও কি মিয়ানমার সরকার অবৈধ ও বহিরাগত  বলে চিহ্নিত করে সেদেশ থেকে বহিষ্কার করে দেবে?

পূর্বপুরুষদের জাতীয়তার সনদ দেখানোর দাবি অসভ্য জঙ্গলি আইন! 

রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ শাসনামলের পরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ করেছিল বলে মিয়ানমারের মুসলিম-বিদ্বেষী চক্রগুলো অপবাদ প্রচার করছে। এই মিথ্যা ও অলীক প্রচারণার আলোকে বলা হচ্ছে,  ব্রিটিশ শাসনামলে অথবা এর আগে সেখানে আসার সনদ (অভিবাসন সনদ) দেখানোর ভিত্তিতে বৈধ বসবাসকারী বলে বিবেচনা করার শর্তে রোহিঙ্গাদেরকে জাতীয়তা দেয়া হবে।

 কিন্তু এইসব দাবি আর প্রস্তাব পুরোপুরি অবাস্তব। কারণ ব্রিটিশ আমল বা এর আগে কোন দেশেই বিশেষকরে পাক-ভারত উপমহাদেশ এবং অত্র অঞ্চলের দেশগুলোয় এ ধরণের অভিবাসন সনদ প্রদানের রেয়াজ ছিল না এবং এর কোন প্রয়োজনও ছিল না। কারণ ব্রিটিশ শাসনামলে সমগ্র ভারতবর্ষ,শ্রীলংকা,নেপাল ও মিয়ানমার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল বিধায় এক দেশ বলে গণ্য হত। জাতীয়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এ ধরণের শর্ত জুড়ে দিলে মিয়ানমারসহ সব দেশের অধিবাসীরা আসলে এ ধরণের কোন সনদই দেখাতে পারবে না। যেমন, বাংলাদেশের  নাগরিকরা কি দেখাতে পারবে যে  ব্রিটিশ বা প্রাক-ব্রিটিশ আমলে তাদের পূর্বপুরুষদেরকে জন্মসূত্রে স্থানীয় অধিবাসী অথবা বৈধ বহিরাগত হওয়ার সনদ প্রদান করা হয়েছে? তৃতীয় বিশ্ব কেন উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর অধিকাংশ নাগরিকও কয়েক পুরুষ আগে প্রাপ্ত এ ধরণের কোনো সনদ দেখাতে পারবে না।

অং সান সু চি ও মিয়ানমারের সেনাপ্রধান

মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী ও ক্ষমতাধর সামরিক জান্তার এ ধরণের অযৌক্তিক শর্ত মানা হলে বহু দেশেই ভয়াবহ জাতি-গোষ্ঠীগত দাঙ্গা, খুন-খারাবী,গণহত্যা ও গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যকার সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে প্রতিটি দেশের জাতীয় ঐক্য ও সংহতি হবে হুমকির সম্মুখীন। আর তখন সর্বত্র দেখা দেবে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা।

মিয়ানমারের এ জংলী আইন কার্যকর হলে ইন্দোনেশিয়ার জাভা এবং সুমাত্রার বালি অঞ্চলে,মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করে-আসা চীনা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেরা সংকটের শিকার হবে।  কারণ, এসব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনী এই জঙ্গলি আইনের বলে কয়েক পুরুষ আগের অভিবাসন সনদ না থাকার কারণে  চীনা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকদের নাগরিকত্ব বাতিল করে বলপূর্বক তাদেরকে চীন ও ভারতে ঠেলে পাঠাবে! কিন্তু আধুনিক সভ্য জগতে কি এ ধরনের জঙ্গলি আইন বা যুক্তি ও বিবেক-বিরোধী আইনের কোনো স্থান হতে পারে?

আর ব্রিটিশ শাসনাবসানের পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে দলে দলে বাঙ্গালীদের আরাকান তথা মিয়ানমারে আসার প্রশ্নই উঠে না। কারণ তখন মিয়ানমার স্বাধীন স্বতন্ত্র দেশে পরিণত এবং পূর্ব বাংলাও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। বরং ভারতবর্ষ বিভাগের পর প্রধানত: ভারতের পশ্চিম বাংলা,বিহার থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান অধিবাসী বাংলাদেশে চলে আসে এবং বাংলাদেশ তথা পূর্ব বাংলা অর্থাৎ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু অধিবাসী ভারতে চলে যায়। কই তখন তো মিয়ানমারের সঙ্গে এ ধরণের অধিবাসী আদান-প্রদান ও স্থানান্তর তদানীন্তন পূর্ব বাংলা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে হয়নি।  আর এর পর থেকে পাকিস্তান আমলে এবং এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার সময় বা এর পরেও এদেশ থেকে বাঙ্গালি কিংবা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের  উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা মিয়ানমারে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে সেদেশে বসবাস করেনি বা করছেও না।

আর প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে হানাদার দখলদার পাক বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা থেকে জীবন রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ থেকে এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল অথচ ঐ সময় শরণার্থী হিসেবে মিয়ানমারে বাংলাদেশীদের অনুপ্রবেশের কোন নজির নেই। বরং ১৯৭০ এর দশক থেকে এ (২০১৭ সাল)পর্যন্ত  মিয়ানমারের স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা ও সরকারই সেদেশের আরাকান (বর্তমান রাখাইন) প্রদেশের অধিবাসী সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অন্যায়ভাবে বাতিল করে ও বাংলাদেশ থেকে সেদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গাকে বিভিন্ন সময় বহুবার বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে(push in)।

রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও অসহায় জাতি 

মিয়ানমারের স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা ও সরকারের উৎপীড়ন,নির্যাতন ও পরিকল্পিত নৃশংস গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের কারণে মিয়ানমারের লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা অধিবাসী বাংলাদেশ ছাড়াও  থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরব,ভারত,আরব-আমিরাতে চলে গেছে যারা আর কোন দিন হয়তো তাদের জন্মভূমি আরাকানে(রাখাইন প্রদেশ)ফিরতে পারবে না।১৯৭০এর দশক থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বলপূর্বক বের করে দিয়েছে স্বৈরাচারী জালেম মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তা।এই দেড় মিলিয়ন মিয়ানমারি রোহিঙ্গার অর্ধেকাংশ (প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার)বাংলাদেশে বসবাস করছে (দ্রঃ Aljazeera'র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রবন্ধ:Myanmar: Who are Rohingya?)। 

মিয়ানমারে বাংলাদেশীদের অনুপ্রবেশ ঘটেনি বরং মিয়ানমারের অবহেলিত বঞ্চিত নিপীড়িত অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সেদেশের সামরিক জান্তা ও সরকারের হাতে বাস্তু ভিটামাটি থেকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ, বিতাড়ন ও গণহত্যার শিকার হওয়ায় বাপ-দাদার এই দেশ থেকে নিরুপায় হয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। স্বদেশে সব ধরনের অধিকার-হারা এ মানবগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ সীমিত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের জনগণ কখনো মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেনি বরং মিয়ানমারের স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা ও সরকারই অন্যায়ভাবে নিজ দেশের অধিবাসীদেরকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করে ও বাংলাদেশের দিকে বহুবার ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও হস্তক্ষেপ করেছে এবং আজও তা করা অব্যাহত রেখেছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও ড্রোন  ১৯ দফারও বেশি বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে যা বিনা উস্কানিতে  বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর স্থল-মাইন পুঁতে রেখেছে যাতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে না পারে। আর স্বৈরাচারী মানবতা-বিরোধী মিয়ানমার সরকারের এসব কাজ ও কর্মতৎপরতা মোটেও সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোবৃত্তি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিচায়ক নয়। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও সরকারই রোহিঙ্গা সমস্যাকে সেদেশের একান্ত আভ্যন্তরীণ সমস্যার গণ্ডী  থেকে বের করে এনে আঞ্চলিক তথা আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে এবং সব প্রতিবেশী দেশ যেমনঃ বাংলাদেশ,ভারত,থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বহু দেশ ও রাষ্ট্রকে এ সমস্যার সাথে জড়িয়ে ফেলেছে। ব্যাপক নির্যাতন,ধর্ষণ ও গণহত্যার মত মানবতা বিরোধী মারাত্মক নানা অপরাধের শিকার করে আতঙ্কগ্রস্ত লাখ লাখ অসহায় রোহিঙ্গা শিশু ও নারী-পুরুষকে বলপূর্বক বিতাড়নের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলো বিশেষকরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ঠেলে দেয়াই হচ্ছে জল্লাদ মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তা কর্তৃক রোহিঙ্গা সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণের উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়ার দৃশ্য (ফাইল ছবি) 

পৃথিবীর বহু দেশেই আয়-উপার্জন ও রুজি-রোজগারের জন্য বহু  অবৈধ অভিবাসী রয়েছে। কই তাদেরকে তো ঐসব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনী মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তার মত  হত্যাকাণ্ড,ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়ে গণহারে বহিষ্কার করেনি বা করছেও না। আর রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে অবৈধ অভিবাসী তো নয়ই বরং তারা হচ্ছে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মত আরাকান বা রাখাইন অঞ্চলের ভূমিপুত্র বা আসলেই জন্মসূত্রে স্থানীয় ও স্থায়ী অধিবাসী যা আমরা আগেও উল্লেখ করেছি।

নিছক বিদ্রোহ ও গুটিকতক চোরাগোপ্তা হামলায় কতিপয় নিরাপত্তা বাহিনী,পুলিশ বা সেনাসদস্যের প্রাণহানি কোন অবস্থায়ই হাজার হাজার নিরীহ নিরপরাধ শিশু,নারী ও সাধারণ জনগণকে হত্যার বৈধতা প্রদান করে না; এমনকি যদি  সেই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র তৎপরতা স্বৈরাচারী সরকার,প্রশাসন ও সামরিক জান্তার বৈষম্য,নির্যাতন,নিষ্পেষণ,অন্যায়,অবিচার,অত্যাচার এবং সার্বিক নাগরিক ও মানবিক অধিকারগুলোর হরণ ও বঞ্চনা-প্রসূত নাও হয়।

যেভাবে বিগত ছয় দশক ধরে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ও জান্তা এবং পরবর্তীতে তথাকথিত নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সূচির নেতৃত্বাধীন সরকার ও প্রশাসনের কঠোর রোহিঙ্গা দমন নীতি,সার্বিক বৈষম্য ও বঞ্চনা এবং সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিকে মিয়ানমারের ম্যাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে দেওয়া, চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে তাদের ওপর গণহত্যা ও জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কারণে রোহিঙ্গা অঞ্চলে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ নিতান্ত স্বাভাবিক, বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়। আর তা না হলে বিশ্বের সব স্বাধীনতা ও অধিকার আন্দোলন অবৈধ ও নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে যদিও স্বৈরাচারী সরকার ও প্রশাসনগুলো এধরণের সব আন্দোলন ও তৎপরতাকে অবৈধ এবং বৈধ অধিকার আন্দোলনের কর্মী ও সমর্থকদেরকে বিপথগামী,সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারী বলে অভিহিত করে থাকে। স্বৈরাচারী মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে এধরণের বিষ-বাষ্প ও অপপ্রচারই চালিয়ে যাচ্ছে। অপপ্রচারের সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৫শে আগস্ট রাখাইনে পুলিশ ও সেনা-চৌকির উপর কথিত(এলেজড) হামলায় কতিপয় পুলিশ ও সেনাসদস্যের নিহত হওয়ার বাহানায় মিয়ানমার সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেদেশের ধর্মান্ধ মগ বৌদ্ধ জঙ্গি মিলিশিয়া (যাদেরকে বৌদ্ধ আইসিস বা বৌদ্ধ দায়েশ Buddhist ISIS or Buddhist Daesh বলাই শ্রেয়)  নিরীহ নিরস্ত্র অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নতুন করে ব্যাপক ভয়াবহ আক্রমণ,গণহত্যা,ধর্ষণ,লুণ্ঠন,শুদ্ধি অভিযান ও জাতিগত নিধন শুরু করেছে এবং তা আজও অব্যাহত রেখেছে।তারা রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে এবং ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত তারা ৩০০০ থেকে ৬০০০এরও বেশি নিরীহ নিরস্ত্র রোহিঙ্গা শিশু ও নর-নারীকে হত্যা করেছে এবং এ হত্যাকাণ্ড,গণহত্যা ও জাতিগত নিধন(ethnic cleansing)অব্যাহত রেখেছে। তাই নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। জীবন বাঁচাতে সম্প্রতি লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শিশু ও নর-নারী নিজেদের সহায় সম্পদ ও বাস্তুভিটা এবং জন্মভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশে চলে এসেছে এবং এর আগে চল্লিশ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা ভারতেও আশ্রয় নিয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঠিক সংখ্যা রেকর্ড করা উচিত বাংলাদেশ সরকারের 

জাতিসংঘের প্রদত্ত তথ্যে (১৭-৯-২০১৭ তাং-এ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত) চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।১৮-৯-২০১৭ তাং-এ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশঃ এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছেঃ মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।জাতিসংঘের বরাত দিয়ে ওই সংবাদে বলা হয়  বাংলাদেশে প্রবেশ করা শরণার্থীদের অর্ধেকই শিশু।......'সেভ দ্য চিলড্রেন' বাংলাদেশের প্রধান মার্ক পিয়ার্স বলেছেন,যদি এভাবে শরণার্থী বাংলাদেশে আসতে থাকে তাহলে বছরের শেষ নাগাদই ওই ছয় লাখ শিশুসহ শরণার্থীদের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০ লাখে।আর অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেছেনঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার পরিচয় দিয়েছেন (দ্রঃ দৈনিক যুগান্তর,২২-৯-২০১৭)। তার মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় চলে আসা চার লাখের উপর রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা যোগ করলে মোট রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় দশ লাখেরও বেশি।

রোহিঙ্গা শরণার্থী

বাংলাদেশ সরকারের উচিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকৃত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা প্রকাশ এবং তা জাতিসংঘের উদ্বাস্তু ও শরণার্থী বিষয়ক কমিশন কর্তৃক অনতিবিলম্বে অফিসিয়ালি নিবন্ধন (রেকর্ড) করা যাতে ভবিষ্যতে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে তাদের মিয়ানমারে জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে টাল-বাহানা ও সময় ক্ষেপণ করার সুযোগ না পায়।  মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা এলাকায় এ অভিযানকে বলছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং বেসামরিক রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের চেষ্টার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।    তথাকথিত নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বর্মী নেত্রী সু চিও সামরিক বাহিনীর এ অভিযানকে আসলে সমর্থনই করেছেন এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধ চলমান সহিংসতা,গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপারে চুপ থেকেছেন। আর তাঁর অতি সাম্প্রতিক বক্তব্যও কার্যতঃ সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নিধন,গণহত্যা ও জাতিগত নিধন ও নির্মূলের চেষ্টার পক্ষেই গেছে যদিও তিনি তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে রাখাইন অঞ্চলে কিছু গোলযোগ হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন মাত্র এবং সেখানে যে গণহত্যা ও জাতিগত নিধন চলছে সে ব্যাপারে কোন কথা বা ইশারা-ইঙ্গিতও তিনি করেন নি।

কিন্তু মিয়ানমার থেকে অতি সম্প্রতিও নিজেদের ঘরবাড়ী সহায় সম্পত্তি ও মাতৃভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশে চলে এসেছে চার লক্ষাধিক নিরীহ,আতঙ্কগ্রস্ত, নির্যাতিত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত,অসহায়, মানসিকভাবে সাংঘাতিক বিপর্যস্ত,আঘাতপ্রাপ্ত ও ভেঙ্গে পড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী। এই শরণার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে শিশু।  এই শরণার্থীদের অনেকের  আত্মীয়-স্বজন,সন্তান-সন্ততি ও আপনজনদেরকে চোখের সামনে  নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে চরম বর্বর-নরপিশাচ মিয়ানমার সেনাবাহিনী আর দায়েশ-সদৃশ বা আইএস-সদৃশ জঙ্গি ও চরমপন্থী বৌদ্ধ মগ গুণ্ডা বাহিনী ও মিলিশিয়ারা।  বাংলাদেশে এই রোহিঙ্গাদের প্রবেশ এবং আশ্রয় গ্রহণ প্রমাণ করে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী চরম যুদ্ধাপরাধী,মানবতাবিরোধী ও মানবাধিকার পদদলন ও হরণকারী সন্ত্রাসী। আর অং সান সু চি'র নেতৃত্বাধীন প্রশাসন হচ্ছে চরম মানবতা-বিরোধী,মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী,জালেম এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের(state terrorism) পৃষ্ঠপোষক।

এতসব জাজ্বল্যমান প্রমাণ  থাকার পরেও যদি তথাকথিত নোবেল শান্তি-পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি-সরকার ও সেনাবাহিনীকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী,যুদ্ধাপরাধী,মানবতাবিরোধী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বলে আখ্যায়িত করা না হয় তাহলে চেঙ্গিস,হালাকু,নেপোলিয়ন,হিটলার-মুসোলিনিকে জালেম,স্বৈরাচারী,নরঘাতক,যুদ্ধাপরাধী,মানবতা-বিরোধী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বলা যাবে না বরং তাদের জন্যও মরণোত্তর নোবেল শান্তি পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

গণহত্যা ও মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে সু চি'র অবস্থা হতে পারে ভুট্টোর মত 

আসলে সু চি নোবেল শান্তি পুরস্কারের অবমাননাই করেছেন এবং প্রমাণও করেছেন যে তা আসলে অন্তঃসারশূন্য এক  মাকাল ফল ছাড়া আর কিছুই নয়। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সু চি আজ নিঃসন্দেহে মিয়ানমার তথা গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অশান্তির বিষবাষ্প ও আগুন ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাই তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভের উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে গেছে। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন কি বরং তাঁর নীতি অবস্থানই অশান্তির কারণ। সত্যিই যদি তিনি অন্যায়,অবিচার,স্বৈরাচার,অত্যাচার,শোষণ ও বৈষম্য  বিরোধী এবং মানবতাবাদী,মানবদরদী,সত্য ও ন্যায়পন্থী, নির্ভীক হতেন এবং সত্য ও ন্যায্য কথা বলার জন্য সেনাবাহিনীর রোষানলে পড়া এবং জনপ্রিয়তা হারানোর ভয় না করতেন তাহলে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া সার্থক হত। কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করার পর কি তা আর ছাড়া যায়? তাই তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রোহিঙ্গাদের নির্মূল ও জাতিগত নিধনের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভিত্তিহীন অবৈধ অভিলাষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তিনি আসলেই যদি প্রকৃত শান্তিকামী,সত্যাশ্রয়ী ও ন্যায়পন্থী হতেন তাহলে তাঁর কর্তব্য ছিল এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সরকার থেকে পদত্যাগ করা। অথচ তার পদক্ষেপ ও নীতি-অবস্থান সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মগ সন্ত্রাসীদেরকে আরও মরিয়া ও বেপরোয়া করেছে এবং তাদের স্পর্ধা শত গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এসব জঘন্য পাপিষ্ঠ নরাধম ও ভয়ংকর অপরাধীরা ভাবছে যে তারা যত বড় অন্যায় ও অপরাধ করুক না কেন তাদের এ অন্যায় অপরাধ ঢাকার জন্য বড় এক উপায় রয়েছে। আর তা হচ্ছে অং সান সু চি ও তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারের তকমা।

এটা সুস্পষ্ট যে, তথাকথিত  নোবেল পিস লরিয়েট সু চি মিয়ানমারের সন্ত্রাসী নরঘাতক,গণহত্যাকারী,যুদ্ধাপরাধী সেনাবাহিনী ও দায়েশসদৃশ জঙ্গি, সন্ত্রাসী, চরমপন্থী বৌদ্ধ-মগ মিলিশিয়ার সব অপরাধ ও অপকর্মের অংশীদার এবং তাদের সমান অপরাধী। বরং তিনি ঐসব পিশাচ ও নরপশুর চেয়েও বেশি অপরাধী। কারণ তিনি সত্য গোপনকারী এবং তাঁরই রাজনৈতিক ছায়াতলে মিয়ানমারে মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। 

সার্বিয়ার কসাই বলে খ্যাত স্লোবদান মিলোসেভিচের মত যুদ্ধ-অপরাধী মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ চরমপন্থী সন্ত্রাসী-মগ মিলিশিয়াদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পাশাপাশি কথিত এই নোবেল শান্তি-বিজয়ী অশান্তির প্রতীক অং সান সু চি-কেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। অথবা ভবিষ্যতে এই সুচি- যে কিনা নারী জাতিরও কলংক (কারণ নারীদের মাতৃত্ব ও মমত্ববোধ আছে বিধায় তারা নরম দিলের অধিকারী হয় অথচ তার অন্তরে বিন্দুমাত্র দয়া-মায়া নেই। এতসব নিষ্ঠুর গণহত্যা,ধর্ষণ,লুট-পাট তার চোখের সামনে ঘটা সত্বেও সম্পূর্ণ নির্বিকার তিনি।)- তাঁকে হয়তো পাক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নস্যাৎ এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যায়  পাক সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল ইয়াহইয়া খানের সহযোগী হয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ কুক্ষিগত করার লোভে।

যদিও এ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধ চলাকালে এদেশবাসীদের ওপর চাপিয়ে-দেয়া গণহত্যা,ধর্ষণ ও জাতিগত নিধনের হোতা যুদ্ধাপরাধী পাক সেনানায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কারোই আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হয়নি কিন্তু ক্ষমতালিপ্সু জুলফিকার আলী ভুট্টোকে সেই পাক সেনাবাহিনীই ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। যদিও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘাতক পাঠিয়ে হত্যা করার অভিযোগে ভুট্টোকে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল জেনারেল জিয়াউল হক তবুও তাতেই ১৯৭১ সালে পাক সেনাদের অপরাধের অংশীদার ভুট্টোর পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছিল যা হয়তো অনেক নির্যাতিত বাংলাদেশীর অন্তরকে খানিকটা হলেও শীতল করে থাকতে পারে।

সু চি মিয়ানমারের স্বৈরাচারী যুদ্ধাপরাধী সেনাবাহিনীকে তাদের পাপ,অপরাধ ও অন্যায়ের ক্ষেত্রে যে এতসব সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর পরিণতিও যদি ভুট্টোর মত হয় তাহলে তাতে অবাক হবার কিছু থাকবে না। (চলবে) #

লেখক: মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষক। 

 

২০১৭-১১-০১ ১৯:০০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য