• রোহিঙ্গা বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া ও পাশ্চাত্যের ভণ্ডামি এবং সু চি’র অশুচি-জান্তার পক্ষ নেয়ার রহস্য

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানরা এখনও চরম সংকট ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি 'সু চি নৃশংস বৌদ্ধ-মগ-ঘাতকদের চেয়েও বেশি অপরাধী: বিশ্লেষক' শীর্ষক যে ফিচারটি প্রকাশ করা হয়েছিল এই ওয়েব-সাইটে তার দ্বিতীয় অংশ এখানে দেয়া হল:

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অং সান সু চির সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর এ ধারণা পোষণ করছে যে মিয়ানমারে এখনও সামরিক বাহিনী হচ্ছে সবচেয়ে ক্ষমতার অধিকারী এবং দেশটির প্রকৃত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদেরই হাতে। তাই সেদেশে আসলে গণতন্ত্র নেই এবং সু’চির হাতেও তেমন কোন ক্ষমতা নেই। আর  তার পক্ষে সেনাবাহিনী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ তা না হলে তাকে সেদেশের ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চ থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে। তাই দীর্ঘ সেনাশাসনের পরে যখন দেশে সু’চির নেতৃত্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হচ্ছে তখন কেন তিনি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে গণতন্ত্রকে  বিপন্ন ও এর প্রতিষ্ঠার পথকে চিরতরে দুর্গম করবে?

পশ্চিমা সরকারগুলোর দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের অর্থ যদি হয় সংখ্যালঘুর ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুদের উপর শত জোর-জুলুম চালালেও গণতন্ত্রের কোন ক্ষতি নেই তাহলে এমন ধরণের সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে নিঃসন্দেহে বাহবা ও প্রশংসাযোগ্য! তাই মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিসত্তার বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদের সাথে কথিত যোগ-সম্পর্কের ধুয়ো তুলে ও অজুহাত দাঁড় করিয়ে গণহত্যা চালানোয় আর কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।তাই রোহিঙ্গা গণহত্যা ও জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে না পারার জন্য সু’চি-কে দায়ী করা ঠিক হবে না বলে পাশ্চাত্যের কোন কোন দেশ মনে করছে। সু’চি-কে এজন্য দোষী সাব্যস্ত করা হলে মিয়ানমারে  গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়াই নাকি সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়বে এবং তা চিরতরে ব্যর্থ হবে !!!।..তাই সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যদি এ পথে অন্যায়ভাবে জালেম সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর হাতে কোরবানিও হয় তাহলে সেটাই করা উচিৎ!! টপ প্রায়োরিটি বা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মিয়ানমারে সু চি'র নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়াকে রক্ষা করা ও অব্যাহত রাখা! এমনকি সু’চি যদি মিথ্যা বলেও থাকেন যে, রাখাইনে  ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সব সেনা অভিযান বন্ধ হয়ে গেছে।পাশ্চাত্যের এসব দেশের কথা হচ্ছে হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের আগে সু’চি-কে রক্ষা করতে হবে এবং তাঁকে ঐ দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে টিকিয়ে রাখতে হবে। তাই পাশ্চাত্যের এ সব দেশ কোনো অবস্থায় এমনকি রাখাইনে ৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সেনা অভিযান বন্ধ হয়ে গেছে—এ ধরণের ডাহা মিথ্যা বলার পরেও সু’চি-কে বা তাঁর নিরুত্তাপ ভূমিকা ও নির্বিকার থাকার নিন্দা করছে না।

সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের কারণে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রস্তাব পাস করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলীয় সরকার ওই প্রস্তাবটিকে নমনীয় করার জন্য তদবির করছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া চাচ্ছে নমনীয় শব্দ দিয়ে মিয়ানমার সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করতে। খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে: মিয়ানমারে বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে সম্প্রতি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিপীড়নের যে সব খবর আসছে তাতে মানবাধিকার কাউন্সিল গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্য দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রস্তাব পাসের চেষ্টা করছে।কিন্তু অস্ট্রেলিয়া দাবি করছে, আগামী মার্চে জাতিসংঘ তদন্তকারীদের প্রতিবেদন দেয়ার আগে মিয়ানমার সরকারকে (মানবাধিকার) লঙ্ঘন ও নিপীড়নে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক হবে না। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ বলেছেন: রোহিঙ্গা সংকটের জন্য সু চি-কে দায়ী করা ঠিক হবে না। তাঁকে সমাধানের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় মিয়ানমার ফের পিছিয়ে যেতে পারে (দ্রঃ দৈনিক যুগান্তর,২৯-৯-২০১৭)। কিন্তু জালেম রক্তপিপাসু গণহত্যা ও জাতি-নিধনকারী মিয়ানমার সরকারকে কঠোর নিন্দার হাত থেকে বাঁচাতে অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ যে আসলেই নিন্দনীয় পদক্ষেপ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ:

 ১). এটা হচ্ছে জোর-জুলুম,অন্যায় ও পাপে জালিমকে সাহায্য ও সহযোগিতা করার শামিল যা ধর্ম,বিবেক ও নৈতিক নীতিমালার দৃষ্টিতে  ক্ষমার অযোগ্য জঘন্য অপরাধ।

২). কোমল নমনীয় শব্দ চয়নের মাধ্যমে  কঠোর নিন্দাবাদের ভাষা প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত মিয়ানমার সরকারের পক্ষাবলম্বন  অস্ট্রেলিয়ার মতো মানবাধিকারের ধ্বজাধারী দেশগুলোর জন্য শোভা পায় না এবং এটা তাদের কপটতা ও স্ববিরোধী নীতি অবস্থানেরই পরিচায়ক।

৩). অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ও মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধকারী মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে স্বয়ং জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের প্রদত্ত বক্তব্য এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিরও পরিপন্থী (দ্রঃদৈনিক যুগান্তর,২৯-৯-২০১৭)। যেখানে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিবৃতিতে বলেছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বেসামরিক লোকজনের ওপর পরিচালিত চলমান জাতিগত নিধন ও মানবতা-বিরোধী অপরাধ বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদকে সম্ভব সব কিছু করতে হবে এবং মিয়ানমারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ও ব্যাপক-ভিত্তিক অবরোধ আরোপ করার  আহ্বান জানিয়েছে সেখানে অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ সত্যি রহস্যময়,দুঃখজনক ও মানবতা-বিরোধীও বটে।(হতে পারে অস্ট্রেলিয়াও রক্তপিপাসু মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তার অস্ত্র যোগানদাতাদের অন্তর্ভুক্ত। তাই খরিদদার বা ক্ল্যাইন্টকে নিন্দা মানেই নিজেকেও নিন্দা করা এবং এ কারণে ক্ল্যাইন্টকে নিন্দার হাত থেকে  বাঁচানোর তদবিরে বিস্ময়ের কিছু নেই।)

৪). অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ ২১ জন মার্কিন সিনেটরের নীতি অবস্থানেরও পরিপন্থী। ঐ সিনেটররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনের কাছে পাঠানো চিঠিতে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের হোতাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং মিয়ানমারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে: মিয়ানমার সেনা বাহিনী জঙ্গি দমনের নামে অসঙ্গত শক্তি প্রয়োগ করছে। এজন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বিদেশে কেউ মানবাধিকার লঙ্ঘন করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার প্রেসিডেন্টকে দেয়া হয়েছে। প্রথমত: উল্লেখ্য যে, এত ভুরি ভুরি নজীর ও প্রমাণের পরেও কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিয়ানমারের গণহত্যাকারী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে সেই ব্যবস্থা নিচ্ছেন না এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার সিনেটরদের উক্ত চিঠি দেয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের ব্যাপারে নীতি পুনর্বিবেচনা করেনি। দ্বিতীয়ত: আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরব নির্বিচারে বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণ করে শিশু আর নারীসহ ১২ হাজারেরও বেশি নিরীহ ইয়েমেনি জনগণকে হত্যা করে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ করে যাচ্ছে! কই সৌদিদের বিরুদ্ধে তো যুক্তরাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বা নিচ্ছে না, বরং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র, সাজ-সরঞ্জাম, বোমা ও গোলাবারুদ বিক্রি করছে! সৌদিদের নির্বিচার বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণে হাজার হাজার নিরীহ নিরপরাধ ইয়েমেনি জনগণের প্রাণহানির বিষয়টি জাতিসংঘ পর্যন্ত গড়িয়েছে কিন্তু পেট্রোডলার আর মার্কিন প্রভাবের কারণে তা ধামাচাপা পড়ে গেছে।

৫). অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ স্বয়ং জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালির উক্তিরও বিরোধী। তিনি বলেছিলেন: আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। দেশটির সেনাবাহিনীকে অবশ্যই মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। রাখাইনে ত্রাণ-কর্মীদের অবশ্যই কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরৎ নিতে হবে। সেনা অভিযান এখনই বন্ধ করতে হবে। হ্যালি আরও বলেনঃ যুক্তরাষ্ট্র ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এখন রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন হচ্ছে তার নিন্দা জানাচ্ছে।

নিকি হ্যালির উক্তি থেকে বোঝা যায় যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সরকারি সেনারা নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং তাদের হাতে সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। এ ছাড়া ত্রাণ-কর্মীদেরও সেখানে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না যার অর্থ হচ্ছে রাখাইনে পরিস্থিতি যা শোনা যাচ্ছে তার চেয়েও অত্যন্ত ভয়াবহ ও মারাত্মক। আর তা না হলে সেখানে কেন মিয়ানমারের স্বৈরাচারী গণনিধনকারী সু চি-জান্তা  সরকার ত্রাণ-কর্মীদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না? কারণ তাতে তাদের সব অন্যায়, অপকীর্তি ও অপরাধের ভয়াল খবরাখবর আরও বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এতসব তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন মিয়ানমারের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী সু চি-জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে নিজ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না? অথচ পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বহুবার একতরফাভাবে কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে এই যুক্তরাষ্ট্র।আর ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে ভেটো পাওয়ারের অধিকারী পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কয়েকটি অবরোধ আরোপের কথা কারও কাছে অজানা নয়। শুধু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট উত্থাপন করে চীন-রাশিয়ার ভেটো দেয়ার ছুতো তুলে যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ক্ষান্ত থাকছে। ভাবসাব এরকম যে, চীন-রাশিয়া ভেটো দেয়ার সম্ভাবনা থাকায় এর চেয়ে আর বেশি কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, চীন রাশিয়া ভেটো দিলে দিক্ কিন্তু জাতি নিধনকারী মানবতা-বিরোধী অপরাধী সু-চি-জান্তার অশুচি সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের থেকে কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে কে বাঁধা দিচ্ছে? চীন-রাশিয়ার ভেটো যদি বাধাই হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিভাবে ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে ভেটো ক্ষমতার অধিকারী পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধেই বেশ কয়েক বার নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ঠুকে দিতে পারল অথচ পুঁচকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপ করতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য,ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন? এটা কি বিশ্বাস করা যায়?

৬). অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধির বক্তব্যেরও বিরোধী। তিনি বলেছেনঃ মিয়ানমার নেত্রীকে এখনই রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধ করতে হবে।এজন্য নিরাপত্তা পরিষদকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানায় যুক্তরাজ্য। (ব্যস্ এতটুকু বলেই ক্ষান্ত! নিরাপত্তা পরিষদ কিছু না করলে যেন ব্রিটেনের নিজের থেকে আর কিছু করার উপায় নেই। আসলে এটা হচ্ছে লোক দেখানো তথা আই-ওয়াশ বা ব্রেন-ওয়াশ পলিসি।)

৭). অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ ফ্রান্সের বক্তব্যেরও পরিপন্থী। ফ্রান্স বলেছে, রোহিঙ্গারা যাতে স্বেচ্ছায় নিরাপদে দেশে ফিরে যেতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।(খুব ভালো কথা।তবে ফ্রান্সের এ বক্তব্যে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে।নিপীড়নকারীরা এবং তাদের নেতারা কারা তা স্পষ্ট ?করে বলেনি ফ্রান্স।তবে বলার প্রয়োজনও নেই বিধায় হয়তো বা ফ্রান্স তা বলেনি। কারণ বিশ্বের সবার কাছে দিবালোকের মতো স্বচ্ছ ও স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গাদের ওপর  নিপীড়নকারীরা হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী,সেনাপ্রধান,সরকার প্রধান নোবেল পিস লরিয়েট নেত্রী সু চি এবং দায়েশ অর্থাৎ আইসিস-সদৃশ জঙ্গি ঘাতক বৌদ্ধ-মগ-মিলিশিয়া গুণ্ডা বাহিনী ছাড়া আর কেউ নয়। বিচারের কাঠগড়ায় সব ঘাতক অপরাধীসহ সর্বাগ্রে সু চি ও মিয়ানমার সেনা প্রধানকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দাঁড় করানো উচিৎ)

৮). অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ ওয়াকিবহাল মহল ও পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য বিরোধীও বটে। কারণ তাঁরা বলছেনঃ রাখাইনে এবার রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনা ও বৌদ্ধরা (মগ-চাকমারা) যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তা মুসলিম সংখ্যালঘু এ জাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন। হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে মগরা।রোহিঙ্গা নারী ও তরুণীদের ওপর চালানো হয় বীভৎস পাশবিক নির্যাতন। জীবন বাঁচাতে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা ৪ সপ্তা'র মধ্যে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। বাকিরাও চলতি বছরের মধ্যেই চলে আসবে বলে আশঙ্কা জাতিসংঘের।(শুধু জাতিসংঘ কেন সকল ওয়াকিবহাল মহলেরও এই একই ধারণা ও বিশ্বাস।)

তাই এত সব স্পষ্ট প্রামাণ্য দলিল থাকতে অস্ট্রেলিয়া কোন্ দুঃখে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের নিন্দা প্রস্তাবের খসড়ার কড়া নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ও বাক্যগুলোর স্থলে অধিক নমনীয় ও কোমল শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করারজন্য তদ্বির করেছে? এখনই হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এ ঘৃণ্য জঘন্য অপরাধে অপরাধী মিয়ানমার সরকারের কঠোর নিন্দা করার। আর আগামী বছরের মার্চ মাসে জাতিসংঘ তদন্তকারীদের প্রতিবেদন দেয়ার আগেই মিয়ানমার সরকারকে লঙ্ঘন ও নিপীড়নে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক হবে না বলে যে বক্তব্য অস্ট্রেলিয়া দিয়েছে তা হচ্ছে মানবতা-বিরোধী ঘাতক স্বৈরাচারী সু চি-সামরিক জান্তা সরকারকে নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে অনায়াসে তার সকল অপরাধমুলক মানবতা-বিরোধী কার্যকলাপ, অপকর্ম, রোহিঙ্গা নিধন কার্যক্রম এবং গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার অবারিত সুযোগদান ও সবুজ সংকেত স্বরূপ। আর ব্রিটেন নাকি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ-দান সংক্রান্ত সহযোগিতা স্থগিত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও নাকি মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর সাথে রাজনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক কমিয়ে এনেছে বা হ্রাস করেছে বলে যে সব কথাবার্তা সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ছড়ানো হয়েছে-এ সব কিছুই হচ্ছে লোক দেখানো আই-ওয়াশ পলিসি ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ন্যায্য, স্থায়ী কার্যকর কোন পদক্ষেপ নয়। তাই অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নিউজিল্যান্ড অর্থাৎ অ্যাংলোস্যাক্সোনীয় (ANGLOSAXONIAN) দেশগুলোর মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত আসল নীতি অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া,কানাডা ও নিউজিল্যান্ড কথিত স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও এগুলো হচ্ছে আসলে যুক্তরাজ্যের স্যাটেলাইট অথবা করদ-রাজ্যস্বরূপ।এগুলো হচ্ছে ব্রিটিশরাজ  বা রানীর ডোমেইনের অংশ। তাই যুক্তরাজ্যের ইঙ্গিতে হয়তো অস্ট্রেলিয়া এ ধরণের তদ্বিরের উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে। আর এ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দ্বিচারিতা ও কপটতামূলক আচরণ আঁচ ও আন্দাজ করা যায়।কারণ কিছুদিন আগে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরে এসে দুজন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেনঃ রোহিঙ্গা (শরণার্থী)দের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ায় আশ্বাস দিয়েছেন সু চি। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি সু চি'র নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সু চি'র সদিচ্ছার কারণে ব্রিটিশ সরকার আশা করে রোহিঙ্গা সংকটের সুরাহা হবে।

মার্ক ফিল্ড (উক্ত দুই ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রীর একজন) বলেনঃ রাখাইন রাজ্যে মানুষকে নিরাপদে রাখার মৌলিক চাহিদা পূরণে মিয়ানমার ব্যর্থ হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেনঃ রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে এটা গণহত্যা কিনা সেটি আইনগত প্রশ্ন। আমি একজন রাজনীতিবিদ হওয়ায় আইনি প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই।

মিঃ মার্ক ফিল্ডের এ উক্তি থেকে মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীকে গণহত্যার অপরাধ থেকে খালাস করার প্রয়াস বেশ লক্ষণীয়।আর এ কারণেই,উক্ত সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমার নেত্রী সু চি’রও অনেক প্রশংসা করেন উক্ত দুই ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী (দ্রঃ দৈনিক যুগান্তর ১৭-৯-২০১৭)। 

বিপর্যয়ের হাত থেকে সু চি সরকারকে বাঁচানোর নীতি দেখা যায় মার্কিন তৎপরতাতেও। কারণ যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব উত্থাপন করলেও আসলে মিয়ানমারের সু চি সরকার যাতে অসুবিধায় পতিত ও বিপদাপন্ন না হয় সে ব্যাপারেই সবচেয়ে বেশি খেয়াল যুক্তরাষ্ট্রের। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি গত ২ অক্টোবর নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত অধিবেশনে বলেনঃ মিয়ানমারে নৃশংসতা ও হিংসার শিকার হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো।কিন্তু এত সব বিষয় গোপন করছে মিয়ানমার সরকার।দেশটি গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে-সেটিও আমাদের মনে রাখতে হবে। অব্যাহত থাকতে হবে সেটাও(দ্রঃ দৈনিক যুগান্তর,২-১০-২০১৭)।
আবার গত সপ্তাহে (সেপ্টেম্বর ২০১৭-এর শেষ সপ্তাহে) মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ রাখতে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিজেদের নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের হুমকি দেয়া থেকে বিরত থাকছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছিল (দৈনিক যুগান্তর, ৩-১০-২০১৭)।

জাতিগত নিধনের অপরাধে অপরাধী মিয়ানমার সরকারকে বাঁচাতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের নিন্দার খসড়ায় কঠোর বক্তব্যের স্থলে কোমল নমনীয় শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত প্রস্তাব যে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষেই শোভা  পায় তা একারণে যে এ দেশটি (অস্ট্রেলিয়া) এ  ক্ষেত্রে পথিকৃৎ। কারণ,বিগত ২৩৯ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদেরকে (Aboriginals) মেরে কেটে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়ার নব্য ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অভিবাসীরা। এরা ঐ সময়ের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার দুই কোটি আদিবাসীকে হত্যা করেছে যা গণহত্যা,জাতিগত নিধন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।

১৭৮৮সালের ২৬ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম পা রাখে ব্রিটিশরা। সেই থেকে আদিবাসীদের কাছে ওই দিনটি অস্ট্রেলিয়ান ডে নয় বরং  ইনভেশন ডে বা আগ্রাসন দিবস বলে গণ্য হচ্ছে। ২০১২ সালে অস্ট্রেলীয় আদিবাসীরা তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী গিলার্ডের কাছে দাবি জানিয়েছিল তাদের যেন অস্ট্রেলিয়ার সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়।কিন্তু গিলার্ড তাদের এ দাবিকে কখনো গুরুত্বের সাথে দেখেন নি (দ্রঃ দৈনিক যুগান্তর২৭-১-২০১২)।

দেখুন অস্ট্রেলীয় সরকার এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে চিন্তা ও আচরণগত দিক থেকে কত বেশি মিল! অস্ট্রেলীয় সরকার আদিবাসীদেরকে তাদের বৈধ নাগরিক স্বীকৃতি ও অধিকার থেকে যেমন বঞ্চিত রেখেছে এবং ২৩৯ বছর ধরে আদিবাসীদের ওপর গণহত্যা, প্রজন্ম-হত্যা,নিপীড়ন,নির্যাতন ও অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমনি মিয়ানমার সরকারও রোহিঙ্গাদের নাগরিক স্বীকৃতি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে এবং কয়েক দশক ধরে তাদের উপর গণহত্যা,প্রজন্ম হত্যা,জাতিগতনিধন,নিপীড়ন ও অত্যাচার চালিয়েই যাচ্ছে। তাই অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশই পারে মিয়ানমারের মতো দেশকে নিন্দাবাদ থেকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে। আর এ কারণেই  মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সম্প্রতি যে প্রস্তাব আনতে যাচ্ছিল নমনীয় শব্দ ব্যবহার করে তা কোমল ও নমনীয় করার তদ্বির করেছে অস্ট্রেলিয়া।#

লেখক: মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষক।

 

২০১৭-১২-০৪ ১৩:১২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য