সিরিয়ায় কথিত রাসায়নিক হামলা সম্পর্কে আমেরিকা ও তার মিত্ররা ব্যাপক চিৎকার চেচামেচি করলেও ইরানি জনগণের ওপর ইরাকের সাবেক সাদ্দাম সরকারের রাসায়নিক হামলার ব্যাপারে তার সবসময়ই চুপ ছিল। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ইরাকি বাহিনী বহুবার ইরানে রাসায়নিক হামলা চালিয়েছিল। ওই সময় হামলায় ইরানের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার সেনা সদস্য ও সাধারণ নাগরিক মারা যায়।

ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের ‘সারদাশত’ এলাকায় ১৯৮৭ সালের ২৮ ও ২৯ জুন ভয়াবহ রাসায়নিক হামলা চালিয়েছিল তৎকালীন ইরাকি স্বৈরশাসক সাদ্দাম সরকার। সেটি ছিল বিশ্বে প্রথম রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার। এ ছাড়া, জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের পর ইরানের সারদাশত ছিল তৃতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার শহর যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হামলা হয়।

ওই হামলায় অন্তত ১১০ জন নিহত ও ৫,০০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। রাসায়নিক হামলা চালানোর কারণে সাদ্দামকে শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে পশ্চিমা দেশগুলো ওই স্বৈরশাসককে গণবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল 

৩০ বছর আগে ১৯৮২ সালে সিআইএ'র ২৭ নম্বর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকিদেরকে রাসায়নিক বোমাবিরোধী মাস্কসহ বিচিত্র সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে এবং ইরাকের আর্টিলারি ডিপার্টমেন্টকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন রাসায়নিক উপাদান পুনরায় গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করে।

১৯৮৩ সালে অতি গোপন নথিপত্রে দেখা গেছে, ইরাক যুদ্ধ চলাকালে লেথাল এবং নন লেথাল রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

ইরাক যে নার্ভ গ্যাস ব্যবহার করেছে তা সিআইএ'র ১৯৮৪ সালের নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা হয়েছে। এমনকি ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে: "যুদ্ধক্ষেত্রে নার্ভ গ্যাস মাস্টার্ড কেমিক্যাল বা সরিষার গ্যাসের চেয়েও অনেক বেশি প্রভাবশালী।" এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে আমেরিকা জানতো ইরাক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। তারপরও আমেরিকা চুপ করে ছিল।

১৮৯৯ সাল থেকে হেগের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি মার্কিন অভ্যন্তরীণ নীতিতেও রাসায়নিক অস্ত্র শুধুমাত্র রাসায়নিক অস্ত্রের জবাবে ব্যবহারের বিধান রয়েছে। নিজেরা সূচনাকারী হিসেবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা অভ্যন্তরীণ নীতিমালারও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  বহুবার এই নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম এবং ইরানে।

ইরাকের হালাবজায় সাদ্দাম বাহিনীর রাসায়নিক হামলা

ইরান-ইরাক যুদ্ধের তিন দশক পর ২০১৩ সালের ২৬ আগস্ট সিরিয়ায় ওবামার যুদ্ধ ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে মার্কিন এক সামরিক কর্মকর্তা 'ফরেন পলিসি'কে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে গোপন রহস্য ফাঁস করে দেন। মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রিক ফ্রাঙ্কোনা (যিনি ১৯৮০ এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের ঘটনায় জড়িত ছিলেন) ফরেন পলিসিকে বলেন, আমেরিকা জানতো যে, সাদ্দাম হোসেন ইতিহাসের ভয়াবহতম রাসায়নিক হামলা চালাতে যাচ্ছে ইরানে। এসব তথ্য জানা সত্ত্বেও আমেরিকা ইরাককে সহযোগিতা করে গেছে।

প্রশ্ন করা হয়েছিল- "ইরাককে সহযোগিতা করা কি অব্যাহত রাখা হবে? জবাবে রিক ফ্রাঙ্কোনা বলেন: যে দেশটি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অধীনেই তা নিশ্চিত হয়। আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, ইরান এই যুদ্ধে বিজয়ী হবে না। হয় ইরাকের প্রতি সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নেব অথবা ইরানের অগ্রগতি ও ঐতিহাসিক বিজয় দেখব। ইরাককে সাহায্য করার মানে সাদ্দামকে সাহায্য করা ছিল না বরং আমাদের লক্ষ্য ছিল ইরানকে স্তব্ধ করে দেয়া।"

আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ। এখন প্রশ্ন হলো, এইসব রাসায়নিক অস্ত্র কি আত্মরক্ষার জন্য? নাকি এগুলো মানবতার প্রতি হুমকি।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো. আবুসাঈদ/আশরাফুর রহমান/৩

২০১৮-০৭-০৩ ২১:২৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য