• ঈদ-ই গাদীরে মহানবীর (সা) ভাষণ : হযরত আলীর (আ.) বেলায়েতের অকাট্য প্রমাণ  

১৮ যিল হজ্জ ঈদ-ই গাদীর যা মহান আল্লাহ পাকের কাছে সবচেয়ে বড় ঈদ )عِیدُ اللهِ الأَکبَر )ُ) বলে গণ্য এবং হযরত মুহাম্মাদ ( সা.)-এর পবিত্র আহলুল বাইত (আ.) -এর ঈদ (عِید آلِ مُحَمَّد عَلَیهِمُ السَّلَام )। এমন কোনো নবী মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হননি যিনি এ দিবসটিকে ( ১৮ যিল হজ্জ ) ঈদ হিসেবে উদযাপন করেননি এবং এ দিবসের মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। আসমানে এ দিবসের নাম প্রতিশ্রুত প্রতিজ্ঞার দিবস ( রোয-ই আহদ-ই মওঊদ ) এবং জমিনে এর নাম রোয-ই মীসাক ( প্রতিশ্রুতির দিবস)। 

ইমাম জাফার আস-সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত:  ইমাম জাফার আস-সাদিক (আ.) কে জিজ্ঞেস করা হল যে, জুমা (শুক্রবার), ঈদুল আযহা এবং ঈদুল ফিতর ছাড়া মুসলমানদের আরও কোনো ঈদ বা উৎসবের দিন আছে কি ? তিনি (আ.) বললেন:  হ্যাঁ, একটি ঈদ আছে যার মর্যাদা অন্য সব ঈদের চাইতে বেশি। রাবী জিজ্ঞেস করল: তাহলে তা কোন্ ঈদ? তিনি (আ.) বললেন: এটা হচ্ছে ঐ দিন যে দিন মহানবী ( সা.) হযরত আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) কে খিলাফতে অধিষ্ঠিত করেন এবং বলেন:  আমি যার মওলা ও নেতা আলী তার মওলা ও নেতা ( مَن کُنتُ مَولَاهُ فَعَلِیٌّ مَولَاهُ ) (দ্র: মাফাতীহুল জিনান, পৃ: ৫০২)।

মহানবী (সা:) থেকে সহীহ (বিশুদ্ধ), প্রামাণিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রতিষ্ঠিত (সাবিত) এবং শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল ইসলামী ফির্কা ও মাযহাবের কাছে গৃহীত ( মুত্তাফাকুন আলাইহি ) হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: عَلِیٌّ مَعَ القُرآنِ و القُرآنُ مَعَ عَلِیٍّ لَن یَفتَرِقَا حَتَّی یَرِدَآ عَلَیَّ الحَوضَ  অর্থাৎ আলী পবিত্র কুরআনের সাথে এবং পবিত্র কুরআনও আলীর সাথে, আর এ দুটো আমার কাছে (কাল কিয়ামত দিবসে ) হাওয-ই কাওসারে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত কখনোই পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না। এই হাদীস থেকে একটি সর্বসাধারণ ও সর্বজনীন সূত্র বের হয়। আর তা হল: পবিত্র কুরআনের জন্য যে গুণ- বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা,বিষয় ও বিধান প্রমাণিত, প্রতিষ্ঠিত ও প্রযোজ্য হবে তা হযরত আলী (আ.) -এর ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠিত ও প্রযোজ্য হবে এবং বিদ্যমান থাকবে।

তাই এ হাদীসের আলোকে অতি উত্তমভাবে ইসমত ( নিষ্পাপত্ব ), শ্রেষ্ঠত্ব, সবচেয়ে জ্ঞানী এবং খিলাফত ও ইমামতের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত,যোগ্য,অগ্রাধিকারপ্রা্প্ত ও হকদার (أصلحهم و أولاهم و أحقُّهُم بِالخلَافَةِ وَ الإِمَامَةِ) হওয়ার মতো হযরত আলীর (আ.)  ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্য্যমণ্ডিত দিক ও বৈশিষ্ট্যাবলী প্রমাণিত হয়ে যায়।কারণ এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে,পবিত্র কুরআন এবং হযরত আলী (আ.) -এর মধ্যে চিরন্তন ও সার্বক্ষণিক ঐক্য, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং সহবিদ্যমানতা রয়েছে। আর এ হাদীসটি আমাদেরকে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে পরিচালিত করে এবং সেটা হচ্ছে: মহানবী (সা.)-এর পরে হযরত আলী (আ.)-ই হচ্ছেন এই উম্মতের হিদায়ত, পরিচালনা ও নেতৃত্বদানের জন্য একমাত্র উপযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ( الشَّخصِیَّةُ المِحوَرِیّةُ المَرکَزِیّةُ الوَحِیدَةُ الفَرِیدَةُ الصّالِحَةُ لِهِدَایَةِ الأُمَّةِ )।

তাই মহানবী (সা.) ১০ হিজরিতে বিদায় হজ্জ পালন করে মদিনায় ফেরার সময় মহান আল্লাহ পাকের নির্দেশে পথিমধ্যে যাত্রা বিরতি করে পবিত্র মক্কার অদূরে খুমের জলাশয় (গাদীর- ই খুম) নামক স্থানে এক বিশাল জনতার (লক্ষাধিক) সামনে হযরত আলী (আ.) কে সকল মুমিন মুসলিম নর-নারীর মওলা ( কর্তৃত্বশীল শাসক, অভিভাবক, তত্ত্বাবধানকারী কর্তৃপক্ষ,হাদী, পথপ্রদর্শক নেতা ও ইমাম) বলে ঘোষণা দেন একথা বলে: مَن کُنتُ مَولَاهُ فَهذَا عَلِیٌّ مَولَاهُ  অর্থাৎ আমি যার মওলা এই আলী তার মওলা যা মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে বরং এ হাদীসটি হচ্ছে মুতাওয়াতির হওয়ারও উর্ধ্বে ( فَوقَ التَّواتُرِ )। আর মওলা শব্দের অর্থ এখানে বন্ধু নয়। কারণ, ঈমানের ভিত্তিতে এক মুমিন মুসলমান অন্য মুমিন মুসলমানের দ্বীনী ভাই ও বন্ধু (ওয়ালী) যেমন, পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: নিশ্চয় মুমিনরা ভাই? ( إِنَّمَا المُؤمِنِونَ إخوَةٌ ?) সূরা-ই হুজুরাত: এবং মুমিন নর নারীরা পরস্পর বন্ধু (ওয়ালী, বহু বচন: আউলিয়া)? ( وَ المُؤمِنُونَ وَ المُؤمِنَاتِ بَعضهُهُم أَولیَاءُ بَعضٍ ?..) সুরা-ই তওবা: ৭১। তাই হযরত আলী (আ.) এ আয়াতগুলোর ভিত্তিতে যে প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের বন্ধু তা মহানবী(সা.)-এব় যুগে সবারই জানা ছিল।

আর সে সময় একমাত্র মুনাফিক ও কাফির ছাড়া এমন কোন মুমিন মুসলমান ছিল না যে বিশ্বাস করত: আলী (আ.) তার শত্রু। এ ছাড়াও আলীর প্রতি মুহব্বত ও বিদ্বেষ যে মুমিন ও মুনাফিক হওয়ার চিহ্ন ও নিদর্শন সে সংক্রান্ত মহানবী (সা.) এর  সর্বজনগৃহীত প্রতিষ্ঠিত সহীহ হাদীস এবং সাহাবারা যে মহানবীর (সা.) -এর যামানায় আলীর ( আ.)প্রতি মুহববত ও বিদ্বেষের ভিত্তিতে মুমিন ও মুনাফিকদের শনাক্ত করতেন এতদসংক্রান্ত সহীহ (বিশুদ্ধ), প্রামাণিক সূত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল ইসলামী ফির্কা ও মাযহাবের কাছে গৃহীত (মুত্তাফাকুন আলাইহি) হাদীস ও বর্ণনাগুলোর আলোকে সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে মহানবীর (সা.)-এর জীবদ্দশায় কোন মুমিন মুসলমান ছিল না যে বিশ্বাস করত যে হযরত আলী (আ.) মুমিন মুসলমানদের বন্ধু নন অথবা এ ব্যাপারে সে সন্দেহ পোষণ করত অথবা হযরত আলী (আ.) -এর প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করত।

তাই গুটিকতক ব্যক্তির আলী (আ.) -এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণের কারণে মহানবী (সা.) যে এ ধরণের ঘোষণা দেবেন তা অবাস্তব ও অবান্তর। কারণ, ঐসব বিদ্বেষ পোষণকারীদের মুনাফিক হওয়াটাই এতে করে প্রমাণিত হয়ে যায় যদি তারা তওবা না করে এবং ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন না করে এবং আলীর (আ.) -এর প্রতি মুহববত ও বিদ্বেষ যে ঈমান ও নিফাকের লক্ষণ এতদসংক্রান্ত মহানবীর (সা.)- এর পূর্ব হতে বিদ্যমান বাণী ও হাদীসগুলোর কারণে  নতুন করে ঐ গুটিকতক ব্যক্তির জন্য আমি যার  বন্ধু এই আলী তার বন্ধু --- এ ধরণের ঘোষণা দেয়ার কোন প্রয়োজনই হয় না। 

অধিকন্তু ঐ মুষ্টিমেয় ব্যক্তি বলা হয় যে আলী (আ.) -এর প্রতি যাদের বিদ্বেষ পোষণ করার কারণে মহানবী (সা:) নাকি গাদীর-ই খুমে এ ধরণের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা আসলে আলী (আ.) -এর নেতৃত্বাধীনে ইয়েমেনে পরিচালিত সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিল এবং এ ক্ষেত্রে আলী (আ.) ছিলেন তাদের আমীর, নেতা ও কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিযানের পর আলী (আ.) -এব় কিছু কর্মকাণ্ড তাদের পছন্দ হয়নি এবং  মহানবীর (সা.)-এর কাছে হযরত আলী (আ.) -এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে মহানবী (সা.)  তাদের প্রতি তীব্র ক্রুদ্ধ হন এবং বলেন:  তোমরা আলীর কাছ থেকে কী চাও ? তোমরা আলীর কাছ থেকে কী চাও ? তোমরা আলীর কাছ থেকে কী চাও ? নিশ্চয়ই আলী আমা থেকে এবং আমিও তার থেকে এবং আমার পরে সেই হচ্ছে প্রত্যেক মুমিনের ওয়ালী ( অভিভাবক, কর্তৃত্বশীল, কর্তৃপক্ষ, প্রশাসক,নেতা)(দ্র: আল-জামে আস সাহীহ সুনানুত তিরমিযী,হাদীস নং ৩৭২,পৃ:৯৭৭-৯৭৮,১ম সংস্করণ,দার ইহইয়ায়িত তুরাস আল-আরাবী ,বৈরুত, লেবানন। এ হাদীসটিকে হাকিম নিশাপুরী সহীহ বলে গণ্য করেছেন এবং যাহাবী, আবুহাতিম সুজিস্তানী, রিয়ায গ্রন্থে মুহিববুদ্দীন তাবারী, আল-ইসাবাহ গ্রন্থে ইবনে হাজর এবং আল-জাম গ্রন্থে সুয়ূতী  উক্ত হাদীসটি সহীহ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং মেনে নিয়েছেন। তারতীব ও নুযুলুল আবরার গ্রন্থেও আল্লামা সুয়ূতী এ হাদীস সহীহ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন।)

উপরিউক্ত হাদীস বা বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে মহানবী (সা.)-এর উক্ত বক্তব্যে ওয়ালী শব্দের অর্থ কেবল অভিভাবক, প্রশাসক, কর্তৃত্বশীল,কর্তৃপক্ষ,নেতার সাথে খাপ খায় এবং এ ক্ষেত্রে ওয়ালী শব্দের অর্থ বন্ধু সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ,বেমানান এবং অযৌক্তিকও বটে। কারণ, হযরত আলী (আ.) ছিলেন আমীর এবং এসব অভিযোগকারী ছিল তার অধীনস্থ এবং মহানবী(সা.)-এর কাছে অভিযোগ দায়ের করলে তিনি (সা.) তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হন এবং তাদেরকে স্মরণ করিয় দেন যে , আলী শুধু তাদেরই নেতা ও কর্তৃপক্ষ (ওয়ালী) নন বরং তিনি হচ্ছেন তাঁর (মহানবীর) পরে সকল মুমিনের নেতা ও কর্তৃপক্ষ (ওয়ালী)। তাই তাঁর  কার্যকলাপে কারও আপত্তি ও অভিযোগ থাকা ও করা সম্পূর্ণ অনুচিত।

আর নিশ্চয়ই আলী আমা থেকে এবং আমিও আলী থেকে –এ উক্তিটিও প্রমাণ করে যে মহানবী (সা.) এবং আলীর (আ.) -এব় মাঝে এ ক্ষেত্রে (উম্মতকে নেতৃত্বদান এবং তাদের যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করার ক্ষেত্র) কোনো পার্থক্য নেই এবং এ কারণেই তাঁর (আলীর) সকল কার্যকলাপ ও কর্মকাণ্ড প্রশ্নাতীত, সমালোচনা ও আপত্তি-অভিযোগের উর্ধ্বে। আর এজন্যই আলীই হবেন তাঁর (মহানবীর)পরে উম্মতের নেতা,অভিভাবক,কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসক(ওয়ালী)। আমার পরে ( مِن بَعدِی ) – এ বাক্যাংশ থেকেও স্পষ্ট হয়ে যায় হাদীসে উল্লিখিত ওয়ালী শব্দের অর্থ নেতা, কর্তৃপক্ষ, কর্তৃত্বশীল,অভিভাবক.শাসনকর্তা ইত্যাদি। কারণ এ শব্দটির অর্থ যদি বন্ধু হয় তাহলে মহানবীর (সা.) পরে তাঁর বন্ধু হওয়ার কোনো অর্থই হয় না। কারণ,আলী (আ.) মহানবীর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর অর্থাৎ সর্বাবস্থায় বন্ধু হবেনই।

যেহেতু মহানবী (সা.) নিজ জীবদ্দশায় ছিলেন কার্যত: মুসলিম উম্মাহর শাসনকর্তা, কর্তৃপক্ষ এবং কর্তৃত্বশীল নেতা এবং হযরত আলী (আ.)  ছিলেন তাঁর অধীনস্থ আমীর আর যেহেতু আলী (আ.)  মহানবী (সা.) থেকে এবং মহানবী (সা.)ও তাঁর থেকে সেহেতু হযরত আলীই (আ.) হবেন মহানবীর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর কর্ণধার, নেতা, কর্তৃপক্ষ, কর্তৃত্বশীল, শাসনকর্তা যা মহানবীর (সা.)- নিজেই উক্ত হাদীসে স্পষ্ট বলেছেন। তাই  সমগ্র  উম্মতের উপর তখন (মহানবীর অবর্তমানে অর্থাৎ ওফাতের পর) হযরত আলী (আ.) -এর নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও শাসন (বেলায়েত) কার্যকর ও বলবৎ হবে। বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে আলী (আ.)  মহানবীর (সা.) পরেই হবেন তাঁর খলিফা। 

আর তাকভীনী বেলায়েতের (মহান আল্লাহ-প্রদত্ত সৃষ্টি জগতের উপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য) অধিকারী হওয়া ছাড়াও হাদীসে উল্লেখিত হযরত আলী (আ.)-এর এ বেলায়েত  নিঃসন্দেহে হচ্ছে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বেলায়েত (বেলায়েতে তাশরীঈ)। এ হাদীসটি প্রশাসন,কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বর্ণিত হওয়ায় হাদীসে উল্লেখিত 'ওয়ালী' শব্দের অর্থ এই প্রশাসন, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কেন্দ্রিক এবং এব় সাথে সংশ্লিষ্ট হতেই হবে। তাই শাসনকর্তা, কর্তৃত্বশীল, নেতা, কর্তৃপক্ষ ছাড়া ওয়ালী শব্দের অন্য কোন অর্থ (যেমন, বন্ধু) সিদ্ধ হবে না।

কেউ কেউ বলতে চায় যে  মহানবী (সা.)  বিদায় হজ্জের শেষে মদিনায় ফেরার পথে হযরত আলীর প্রতি কতিপয় ব্যক্তির বিদ্বেষকে এবং যারা হযরত আলীকে নিজেদের শত্রু মনে করত তাদের এ ভুল ও ভ্রান্ত ধারণা অপনোদন করার জন্য গাদীর-ই খুমে এ ঘোষণা দেন।তাই আমি যার মওলা এই আলী তার মওলা – এ হাদীসে  মওলা শব্দের অর্থ নেতা , কর্তৃত্বশীল , কর্তৃপক্ষ, শাসনকর্তা (প্রশাসক) অভিভাবক নয় বরং তা হবে বন্ধু: (আমি যার বন্ধু এই আলী তার বন্ধু !!!))। প্রাগুক্ত হাদীস সংক্রান্ত যে আলোচনা করা হয়েছে তা এখানেও প্রযোজ্য। অধিকন্তু মওলা শব্দের অর্থ যদি বন্ধু হয়ে থাকে তাহলে মহানবী (সা.)  এ ভাবে না বলে অর্থাৎ প্রথমে নিজেকে মওলা বলে অভিহিত না করে ভিন্নভাবে বলতেন যেমন: নিশ্চয় মুমিন নরনারীরা পরস্পর বন্ধু এবং আলীও মুমিন বা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত। অতএব আলী সকল মুমিন নরনারীর বন্ধু ( إُنَّمَا المُؤمِنُونَ و المُؤمِنَاتُ بَعضُهُم أَولِیَاءُ بَعضٍ و عَلِیٌّ مُؤمِنٌ أَو مِنَ المُؤمِنِینَ فَهُوَ وَلِیُّ المُؤمِنِینَ أَو مَولَاهُم )

কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে মহানবী (সা.)  হযরত আলী (আ.) এর বেলায়েত ও মওলা হওয়ার বিষয়কে মুমিনদের পারষ্পরিক বন্ধুত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট না করে নিজের বেলায়েত ও মওলা হওয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন এবং আমি যার মওলা এই আলী তার  মওলা ( مَن کُنتُ مَولَاهُ فَهذَا عَلِیٌّ مَولَاهُ )-এ বাক্যটি শর্তবোধক বাক্য ( জুমলা-ই শর্তীয়াহ ) যার দুটো অংশ রয়েছে: শর্ত বাক্য (জুমলা-ই শর্ত) এবং শর্তের ফল বা প্রতিদান বাক্য (জুমলা-ই জাযা) এবং প্রতিদান বাক্য শর্ত বাক্য ছাড়া বাস্তবায়িত হয় না। তাই ফল বা পরিণতির বাস্তবায়ন ও সংঘটন শর্ত বাস্তবায়িত ও সংঘটিত হওয়ার উপর নির্ভরশীল। আর এই হাদীসে এই আলী তার মওলা প্রতিদান বাক্য (জুমলা-ই জাযা) এবং প্রতিদান, ফল বা পরিণতি হচ্ছে হযরত আলীর বেলায়েত ও মওলা হওয়া এবং  শর্ত বাক্য হচ্ছে: আমি যার মওলা এবং শর্ত হচ্ছে মহানবীর মওলা হওয়া, সুতরাং এই শর্তবোধক বাক্যে হযরত আলীর (আ.) বেলায়েত ও মওলা হওয়ার বাস্তবায়ন সম্পূর্ণরূপে মহানবীর (সা.)-এর বেলায়েত ও মওলা হওয়ার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং মহানবী (সা.) যে  অর্থে মুমিনদের  মওলা হবেন ঠিক সে অর্থেই হযরত আলী (আ.) ও তাদের মওলা হবেন কেবল নুবুওয়াত ও রিসালাত ছাড়া, এর অন্যথা নয়। 

এখন আমাদের দেখতে হবে মহানবী(সা.)-এর ক্ষেত্রে মওলা শব্দের অর্থ কী এবং তিনি (সা.) তাঁর মওলা হওয়ার অর্থ সম্পর্কে কী বলেছিলেন? এ ঘোষণা দেয়ার আগে মহানবী (সা.) সেদিন গাদীরে খুমের ভাষণে বলেছিলেন:  আমি কি তোমাদের  কাছে তোমাদের নিজেদের চেয়ে অধিক নিকটবর্তী (আওলা) নই? তখন উপস্থিত জনতা বলেছিল: জী হ্যাঁ। এরপর পরই তিনি (সা.) বললেন:  আমি যার মওলা এই আলী তার মওলা। উল্লেখ্য যে, মহানবী (সা.) নিজেই এখানে মওলা শব্দের অর্থ করেছেন অধিক নিকটবর্তী (আওলা) অর্থে।

আর মহানবী (সা.)  যে মুমিনদের নিজেদের চেয়ে তাদের বেশি নিকটবর্তী তা পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে: النَّبِیُّ أَولَی بِالمُؤمِنِینّ مِن أَنفُسِهِم  (সূরা-আহজাব, ৬ নম্বর আয়াত)  বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে এ ধরনের বেশি নিকটবর্তী হওয়া অবশ্যই মুমিনদের যাবতীয় ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে অধিক অগ্রাধিকারের অধিকারী, অধিক হকদার ( أَحَقُّ ) এবং অধিক কর্তৃত্বশীল হওয়ারই অনুরূপ যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে যে মহানবী (সা.) মুমিনদের উপর শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারী, তাদের কর্তৃপক্ষ এবং তাদের নেতৃত্বদানের জন্য সর্বাধিক অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। তাই হযরত আলী (আ.) ও মহানবীর (সা.)- এর অনুরূপ তথা প্রত্যেক মুমিনের নিজের চেয়ে তার কাছে বেশি নিকটবর্তী, তাদের যাবতীয় ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার-প্রাপ্ত বা বেশি হকদার এবং বেশি কর্তৃত্বশীল। তাই তিনি (আ.) মুমিনদের উপর শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারী, তাদের কর্তৃপক্ষ এবং তাঁদের নেতৃত্বদানের জন্য সর্বাধিক যোগ্য ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। 

সুতরাং মহানবীর (সা.)-এর ওফাতের পর হযরত আলী (আ.) ই হচ্ছেন খিলাফত, ইমামত(নেতৃত্ব) এবং উম্মতের শাসন-কর্তৃত্ব, হিদায়ত ও তাদের যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ও সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ( أصلحُهُم وُ أَولَاهُم وَ أَحَقُّهُم بِالخِلَافَةِ وَ الوِلَایَةِ و الإِمَامَةِ وَ السُلطَةِ و الهِدَایَةِ وَ تَدبِیرِ شُؤُونِ الأُمَّةِ )। আর এই বেশি নিকটবর্তী ও বেশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হওয়ার ভিত্তিতে মহানবী (সা.) এবং আলী (আ.) -এর মুমিনদের বন্ধু হওয়ার তাৎপর্য,পরিধি,গভীরতা,ব্যাপকতাও নির্ণীত ও নির্ধারিত হয়ে যায়। যেহেতু মহানবী (সা.) ও হযরত আলী (আ.) মুমিনদের নিজেদের চেয়ে তাদের বেশি নিকটবর্তী ও তাদের সবক্ষেত্রে তাদের চেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সেহেতু মহানবী (সা.) এবং আলী (আ.) হবেন মুমিনদের নিজেদের চেয়ে তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী ও প্রকৃত বন্ধু তথা তাদের নিজেদের চেয়েও তাদের সবচেয়ে প্রিয় এবং তাদের নিজেদের চেয়ে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত এবং এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।

তাই তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়াও হয় যে, এ হাদীসে মওলা শব্দের অর্থ বন্ধু তাহলে মহানবী (সা.) এবং হযরত আলী (আ.)  সকল মুমিন মুসলমানের কেমন বন্ধু হবেন? এর উত্তরে বলতে হয় যে এ বন্ধুত্ব সাধারণ মুমিনদের  মধ্যকার সাদামাটা বন্ধুত্বের মতো নয় বরং তা হবে নির্ভেজাল, পরম খাঁটি, গভীর আন্তরিক ও অসাধারণ বন্ধুত্ব অর্থাৎ তাঁরা হবেন সকল মুমিন মুসলমানের পরম খাঁটি আন্তরিক ত্যাগী বন্ধু যার ফলে তাঁরা হবেন তাদের প্রকৃত সাহায্যকারী, পৃষ্ঠপোষক, দয়ালু সুহৃদ পথ-প্রদর্শক (হাদী)নেতা এবং তাদের আন্তরিক তত্ত্বাবধায়ক, নিরাপত্তা বিধায়ক, তাদের ন্যায্য ও বৈধ অধিকার সংরক্ষণকারী,তাদের সকল বিষয় তদারক ও পরিচালনাকারী এবং তাদের হিতাকাঙ্ক্ষী, অনুগ্রহকারী, বিপদাপদ  প্রতিহতকারী এবং শত্রুর আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষাকারী ন্যায়পরায়ণ শাসনকর্তা। তাই এ রকম বন্ধু ও বন্ধুত্ব এবং নেতা ও নেতৃত্বের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অতএব হযরত আলী (আ.)  যদি সকল মুমিন মুসলমানের বন্ধু হবেন তাহলে একমাত্র তিনিই হবেন তাদের ইমাম , নেতা ও শাসনকর্তা। কারণ তিনি এ পদের জন্য  সবচেয়ে উপযুক্ত ও সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।

হযরত আলী (আ.)-এর বেলায়েত ও মওলা নিযুক্তির ঘোষণা দানের মাধ্যমে সূচিত হয় ইসলামের পূর্ণতা যা মহান আল্লাহ পাক (( আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন (ধর্ম) হিসেবে মনোনীত করলাম (সূরা-ই মায়েদা: ৩)।----পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন।

তাই আমরা দেখতে পাই যে হযরত আলী (আ.) ও পবিত্র কুরআনের মধ্যেকার চিরন্তন চিরস্থায়ী সার্বক্ষণিক ঐক্য, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ও সহবিদ্যমানতা অবধারিত করে দেয় যে হযরত আলীই (আ.)  হবেন মহানবীর (সা.) পরে মুসলিম উম্মাহর ওয়ালী – মওলা (( কর্তৃপক্ষ,অভিভাবক,তত্ত্বাবধায়ক, প্রশাসক ( হাকিম), নেতা (ইমাম) ও পথপ্রদর্শক (হাদী))) এবং হযরত আলী (আ.) -এর এই বেলায়েত এবং মওলা নিযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে সূচিত হয় দ্বীনের পূর্ণতা ( إِکمَالُ الدِّینِ ) এবং খোদায়ি নেয়ামতের চূড়ান্ত হওয়া। কারণ একমাত্র বেলায়েত ও ইমামত ছাড়া দ্বীন ও শরিয়তের সকল বিধান, শিক্ষা ও নীতিমালা ইতোমধ্যে বিধৃত ও বর্ণিত হয়েছিল এবং গাদীর-ই খুমে সর্বশেষ অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান বা বিষয় যা হচ্ছে হযরত আলী (আ.) -এর বেলায়েত ও ইমামত তা মহান আল্লাহ পাকের নির্দেশে মহানবী (সা:) ১০ হিজরির ১৮ যিল হজ্জ বিশাল জনতার উপস্থিতিতে ঘোষণা (ইলান) করেন। 

[কেউ কেউ বলেন, আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা বাক্যটিতে মাওলা বলতে সাধারণ বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু বোঝানো হলে আলী মহানবীর (সা.) সমান পর্যায়ভুক্ত হয়ে যান! কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। কারণ, মহানবী(সা.)  অন্য এক সময় আলীকে বলেছিলেন, মুসার সঙ্গে তাঁর ভাই হারুনের যে সম্পর্ক আলীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও অনুরূপ, শুধু পার্থক্য হল, আলী হারুনের মত নবী নন তথা মহানবীর (সা.) পর আর কেউ নবী হবেন না।]   

বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, ইসলাম এবং শরিয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার (ইকামাতুদ্দীন) জামানত বা নিশ্চয়তা বিধায়ক হচ্ছে হযরত আলী (আ.) -এর মতো মওলা ও ওয়ালীর বেলায়েত, ইমামত, খিলাফত ও নেতৃত্ব যার ও পবিত্র কুরআনের মাঝে রয়েছে চিরন্তন চিরস্থায়ী সার্বক্ষণিক ঐক্য, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ও সহবিদ্যমানতা। আর এ থেকে প্রমাণিত হয় যে হযরত আলী (আ.)-এর পথই হচ্ছে পবিত্র কুরআনের পথ অর্থাৎ সত্য সরল পথ ( সিরাত-ই মুস্তাকীম ) এবং সব মুসলমানের উচিত তা আঁকড়ে ধরা।
                                                                                                                                                                                          صِراطُ عَلِیٍّ حَقٌّ نُمسِکُهُ                           
লেখক: মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান 

পার্সটুডে/এমএএইচ/এআর/২৯  
       

ট্যাগ

২০১৮-০৮-২৯ ২১:২৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য