২০১৮-১২-০৮ ১৮:২৩ বাংলাদেশ সময়

২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় ডিফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারইভালস বা ডিএসিএ প্রোগ্রামে প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছে, এর ৪০ শতাংশই হচ্ছে হাইস্কুল ও কলেজে অধ্যয়নরত । যারা ঝরে পড়ার আশংকায় রয়েছে।

সাক্ষাৎকারদাতা:

আমার একজন শিক্ষার্থী আমাকে জানাল, আমি ঘরে বসে ছিলাম, হঠাৎ দরজা ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম, লুকিয়ে জানালা দিয়ে দেখলাম পুলিশ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আর একজন (শিক্ষার্থী) কোন উপায় না পেয়ে দৌড়ে আলমারির মধ্যে গিয়ে লুকাল।

সাক্ষাৎকারদাতা:

যখন ওই শিক্ষার্থী আমার ক্লাসে আসল, তখন দেখলাম তার মন খুব খারাপ ও সে খুবই ক্লান্ত। আমি তার পাশে গিয়ে বললাম,ক্লাস শেষে তুমি আমার সাথে দেখা করতে পার।

এরপর আমি তাকে বললাম: কি হয়েছে মিহু?

সে জবাব দিল: বেনাবিদাস ম্যাডাম, আমি রাত ৩টায় ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য হয়েছিলাম।  

আমি (বেনাবিদাস) বললাম: কেন?

সাক্ষাৎকারদাতা:

সে (মিহু) কাঁদতে কাঁদতে আমার রুমের দিকে আসল।       

আমরা ঐ ছাত্রকে চিনতাম, আমরা তাকে ডাকতাম....

সাক্ষাৎকারদাতা:

আইলিন, একজন গরিব-অভিবাসী ছাত্র, সে আমার কাছে সাহায্যের আবেদন করে।

সাক্ষাৎকারদাতা:

ঐ ছাত্র তার বাবার সাথে থাকত। আমার মনে হয়, তার বাবার বাসা থেকে পাঁচটি ব্লক পার হলেই তার মায়ের বাসা। সম্ভবত সেটাই হবে।

কিন্তু ঐ ছেলে সবসময় একাই থাকত। আস্তে আস্তে তার খারাপ অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমি যখন ছাত্রদের হোমওয়ার্ক করতে দিলাম, দেখলাম সে হোমওয়ার্ক শেষ করে নি।

জান? আমি ধৈর্য ধরে এক সপ্তাহেরও বেশি তার কাজকর্ম পর্যব্ক্ষেণ করলাম, দেখলাম কোন উন্নতি হয়নি।

তারপর তার কাছে গেলাম এবং বললাম- দেখ, আমার সাথে কথা বল। আমাকে বল, তোমার কি হয়েছে?

সাক্ষাৎকারদাতা (রুথ ওয়াইজ):

আমার ক্লাসের একজন ছাত্র সে ৫ম শ্রেণীতে পড়ত, আমি অবশ্য আমার টেলিফোন নম্বর সবাইকে দিয়ে রেখেছিলাম, যাতে তারা কোন সমস্যায় পড়লে আমাকে জানাতে পারে।

সাক্ষাৎকারদাতা (ব্রুকস):

আমার একটা ক্লাসে শিক্ষার্থীরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসী সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করছিল। দেখলাম সে ট্রাম্পের এ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে খুবই চিন্তিত ছিল। বিশেষকরে যখন সে বুঝতে পারল সে নিরুপায়। হঠাৎ সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না বলে মনে করল।  

সাক্ষাৎকারদাতা (বেনাবিদাস):

আমি যখন বললাম: কেন তুমি রাত ৩টা থেকে জেগে আছ?    

তখন সে বলল: পুলিশ রাত ৩টায় আমাদের ঘরে আসে এবং আমার পিতাকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর আমি আর ঘুমাতে পারি নি।

আমেরিকায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুর বাবা-মায়ের অন্তত একজন অভিবাসী।

সাক্ষাৎকারদাতা: আমরা এখানে অভিবাসী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও বর্ণবাদের মধ্যে আছি। কিন্তু আমরা এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। মুক্তি পেতে চাই। আর মানুষকে দেখিয়ে দিতে চাই, অভিবাসীদের জন্য যে আইন করা হয়েছে সেটা সঠিক নয়।

সাক্ষাৎকারদাতা:

আমার বাবা-মা কারোরই কাগজপত্র নেই। তারা মনে করেন, পড়াশুনার মাধ্যমে জীবনে উন্নতি করা সম্ভব। কারণ পড়াশুনা করলে এর মাধ্যমে ক্ষমতা পাওয়া যায়। 

সাক্ষাৎকারদাতা:

আর তাই আমি তার পরিবারকে বেশি করে চেনার জন্য তার কাছে যেতাম ও তাকে প্রাইভেট পড়াতাম। তারাও আমার বাড়িতে আসত এবং বিভিন্ন রকমের দু:খ-কষ্টের কথা বলত। তারা এমনকি তাদের পরিবারের কথাও আমাকে বলত।

সাক্ষাৎকারদাতা:

টেকনিক্যাল দিক থেকে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাজ হল পাঠদান করা। আর তাদের কর্তব্য হল, প্রত্যেক বছর রুটিন মাফিক পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করবে। এ অবস্থায় যদি শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থাকে স্থায়ীভাবে ধরে না রাখতে পারি, তাদেরকে ভালবাসতে না পারি, তাহলে কিভাবে তাদেরকে পাঠদান করব?

সাক্ষাৎকারদাতা (ফাতিমা):

আমাদের দোকানের রাস্তায় একটি সন্দেহজনক গাড়ি দেখতে পেলাম। তারা ছিল পুলিশ। যখন আমার বাবা পুলিশকে বললেন- কেন আমার গাড়ী থামালেন, আমার অপরাধ কী? তারা বলল- চুপ থাক, গাড়ি থেকে নামো। তারা আটক করার জন্য এগিয়ে এলো এবং হ্যান্ডকাপ পরিয়ে ধরে নিয়ে গেল।

(ফাতিমার কান্নার শব্দ)

সাক্ষাৎকারদাতা:

ফাতেমা যে করুণ ভিডিও ধারণ করেছে তা আমরা দেখেছি।  তারপরও সে স্কুলে যেতে আগ্রহী ছিল। যখন স্কুলে ফাতেমার চোখে পানি দেখলাম,তখন আমার সামনে

আপার্টহাইট বা বর্ণ-বৈষম্যবাদের সময়ের  আচরণগুলো ভেসে উঠল। আমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে বর্ণবাদের যুগে বড় হয়েছি। তখনি বুঝতে পারি কিছু একটা করতে হবে। যেদিন বিকেলে স্কুলের শিক্ষার্থীরা ফাতিমার বাবাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পদক্ষেপ আটকে দিয়েছিল সেদিন আমিও তাদের সঙ্গে সেখানে ছিলাম।

সৌভাগ্যক্রমে ঘটনার আধাঘণ্টা আগে আমরা সেখানে পৌঁছে ওই পদক্ষেপ আটকে দিতে সক্ষম হই।

সাক্ষাৎকারদাতা:

আমরা শিক্ষক হিসেবে এসব শিক্ষার্থীকে পেয়েছি, যখন দেখি কোন অন্যায় হচ্ছে তখন আমরা কথা বলি।

সাক্ষাৎকারদাতা:

আমরা ঐসব শিক্ষার্থীর সম্পর্কে কথা বলছি, যাদের অভিভাবক আছে, তারা নিজেরা এখানে আসেনি যে তাদেরকে যেকেউ চাইলেই শাস্তি দিবে। আমাদের মধ্যে এমনও শিক্ষার্থী আছে যারা চেষ্টা করছে পৃথিবীকে ভাল অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্যদের মত নিজেদের জীবনকেও ভাল পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় তারা।

সাক্ষাৎকারদাতা:

আমার বা-মা আমাদের ভাল একটা ভবিষ্যৎ চায়। মেক্সিকোয় বাবা-মায়ের যা সম্পদ ছিল সবই তার সবই আমাদের জন্য ব্যয় করেছেন। বাবা-মায়ের এই আত্মত্যাগ আমাকে উৎসাহিত করে। আমাকে এগিয়ে যেতে সাহস যোগায় এই আত্মত্যাগ। এখন যখন আমার বাবা-মা আমাদের জন্য এমন উৎসর্গ করেছেন, আমাদেরও কাজ হল পড়াশুনা করে তার প্রতিদান দেয়া।  এজন্য যে আমার বাবা-মা আমাদের জন্যই এখানে এসেছেন।

সাক্ষাৎকারদাতা:

তারা যেখানে থাকে সেখানের পরিবেশে বা সমাজের সাথে মেশার এমনকি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের ব্যাপক যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। তারা এই ব্যবস্থা থেকে বিতাড়িত।

আমরা মানুষ। আমরা একই সমাজে বসবাস করি। আমরা সবাই একই মানব জাতি। সবার অধিকার সমান, সবারই স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ রয়েছে। তাদের স্বাধীনতাকে অবশ্যই খর্ব করা যাবে না। এ তরুণরা এখানে এসেছে জীবনে উন্নতি করার জন্য। জীবনে এ সুযোগটা কাজে লাগানোর জন্য তারা এখানে এসেছে। স

সাক্ষাৎকারদাতা:

একজন শিক্ষকের হিসেবে উচিৎ হবে কথায় নয় বরং কাজে প্রমাণ দেয়া। যদি কোনো কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে কর তাহলে তা কাজের মাধ্যমে তা তুলে ধর।

আর তাই, আমি শেখাই যে, যেহেতু পৃথিবীতে পরিবর্তন আনতে চাই সেহেতু পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষার্থীরা প্রথমে আমার কথায় হাসে, পরে  যখন তারা এখান থেকে বের হয়ে যায় তখন তারা এ কাজটি করে। প্রথম থেকেই বড় ধরণের অসঙ্গতি ও বৈষম্য রয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির সুযোগ নেই।  আমি মনে করি, শিক্ষা ক্ষেত্র এমনটি ক্ষেত্র যেখানে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। যেখান থেকে স্বাধীনতার অস্তিত্ব গড়ে উঠতে পারে।#   

পার্সটুডে/মো.আবুসাঈদ/সোহেল আহম্মেদ/৮

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য