ইরানের ইসলামি বিপ্লব কীভাবে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে জাগিয়ে তুলতে প্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই অন্যান্য দেশ ও জাতির ওপর ইসলামি বিপ্লবের প্রভাব পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে প্রভাবের এই ধারা আরও বিস্তৃতি লাভ করে।

এর কারণ হলো এই বিপ্লব মানুষের মনের কথা বলে, জীবনের কথা বলে, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা, জুলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রেরণা দেয়, স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে। মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যায় বলেই এই বিপ্লব এতো গ্রহণযোগ্য ও কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছে। 

আমরা যদি মুসলিম বিশ্বের দিকে একটু নজর বুলাই বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাহলে দেখতে পাবো এসব দেশের অভ্যন্তরে ইরানের ইসলামি বিপ্লব কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছে। ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে ইসলামি ইরানের দৃঢ় সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং দখলদার ইহুদিবাদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের কঠোর অবস্থান ফিলিস্তিনি জনগণের মনে অপরিসীম সাহস জুগিয়েছে। ইরানের বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কঠিন প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়ে তুলেছে। ইসরাইল ফিলিস্তিনকে গিলে ফেলার যে স্বপ্ন দেখে মনে মনে হাসছিল তাদের সেই স্বপ্নকে দু:স্বপ্নে পরিণত করে দিয়েছে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এবং জেহাদে ইসলামি ফিলিস্তিন দল।

অপরদিকে এই ইসরাইলই ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে রেখেছিল সেই ইসরাইল হিজবুল্লাহ নামের অপর এক লেবাননি প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখোমুখি হলো। ইরানের বিপ্লবী তরুণেরা যেভাবে বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঠিক সেভাবেই লেবাননের ইসলামপ্রিয় তরুণরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারাও তাদের আন্দোলনের আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছিল বিপ্লবী আদর্শপুষ্ট ইসলামকে। হিজবুল্লাহ সদস্যরা জেহাদি প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শাহাদাতকে তাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছিল। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রাহবারকেই তারা তাদের রাহবার হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল।

লেবাননের হিজবুল্লাহ আন্দোলনকে বলা যায় ইরানের বাইরে ইসলামি বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্টতার পরিচয় দিয়েছে। তারা বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দখলদার ইহুদিবাদি ইসরাইলকে বহুবার পরাজিত করেছে। এ কারণে আজ পর্যন্তও ইসরাইল এই হিজবুল্লাহকে তাদের সবচেয়ে কঠিন ও ভয়াবহ শত্রু বলে মনে করে।

২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে আরব দেশগুলোতে যে জাগরণ দেখা গেছে অনেকেই মনে করেন সেই জাগরণের পেছনেও রয়েছে ইরানি বিপ্লবের সুদূরপ্রসারি প্রেরণা।

আরব রাজাদের বিরুদ্ধে সেসব দেশের জনগণ যেভাবে সমবেত শ্লোগান দিয়েছিল সেইসব শ্লোগান ইরানের ইসলামি বিপ্লবী জনতার শ্লোগানের সঙ্গে ছিল অভিন্ন রকমের। সেইসব আরব দেশের কোনো কোনোটিতে গণঅভ্যুত্থান যদিও সমস্যার মুখে পড়েছে কিংবা বিচ্যুতির দিকে ধাবিত হয়েছে তারপরও অনেক দেশেই বিপ্লবী আন্দোলন সার্থক ও সফল হয়েছে। কোনো কোনো দেশে এখনও সেই আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলছে। বাহরাইনের জনগণ এখনও তাদের স্বৈরাচারী রাজা আলে খলিফার বিরুদ্ধে নিত্যই প্রতিবাদ বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো সেখানে একটি স্বৈরাচারী রাজার বিরুদ্ধে সেদেশের সাধারণ জনগণ  আন্দোলন চালাচ্ছে আর মানবাধিকার রক্ষার দাবিদার পশ্চিমা সরকারগুলো তো বটেই এমনকি বিশ্বসমাজও চুপচাপ থেকে স্বৈরাচারকেই পক্ষান্তরে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এতসব সত্ত্বেও গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাহরাইনের জনগণ রাজা আলেখলিফার বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই গণআন্দোলনের খবরাখবর বিশ্বমিডিয়ায় বিশেষ করে পশ্চিমা মিডিয়াগুলোতে তেমন একটা আসছে না। মিডিয়ার এই নিষ্ক্রিয়তার কারণে আলেখলিফার বাহিনী নিরীহ জনতার আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য ব্যাপকভাবে দমন পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও আন্দোলন থেমে নেই।

ইয়েমেন আরেকটি আরব দেশ যে দেশের জনগণ ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সেই গণআন্দোলনও ইয়েমেনের স্বৈরাচারী রাজার সেনাবাহিনীর দমসপীড়নের মুখে পড়েছে। পশ্চিমাদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় সৌদিআরবের রাজার বাহিনী আন্দোলন দমানোর অজুহাতে  নিরীহ জনতার ওপর নির্বিচারে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী আদর্শের প্রেরণায় উজ্জীবিত হবার কারণে এবং আমেরিকা ও ইসরাইলসহ বিশ্ব আধিপত্যবাদী পরাশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে ইয়েমেনের জনগণের ওপর সৌদিআরবের গণহত্যা ও অপরাধযজ্ঞের মুখেও তারা চুপচাপ রয়েছে,যেন তারা কিছুই দেখতেও পাচ্ছে না শুনতেও পারছে না। উল্টো বরং দমনপীড়নে তারা সৌদিআরবকেই সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

ইরাকের জনগণও ইরানের ইসলামি বিপ্লবী চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্বৈরাচারী সাদ্দামের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মেতে উঠেছিল। ইরাক দখলের পর তারা মার্কিন বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয় এবং মার্কিন সেনাদেরকে ইরাক ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। ইরানের বিপ্লবী চেতনায় এখনও ইরাকের জনগণ সেদেশের বিদ্যমান তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠি দায়েশের বিরুদ্ধে প্রাণপণে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এভাবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, সৌদিআরবসহ পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর কথা বলা যেতে পারে। তবে কেবল মুসলিম দেশেই নয় বিশ্বের অমুসলিম বহু দেশের অমুসলমান জনগণও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রেরণায় জেগে উঠেছে। এর একমাত্র কারণ হলো ইরানের বিপ্লব ছিল খাঁটি ইসলামি আদর্শের ওপর স্থিত। সুতরাং এই বিপ্লব বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মাঝে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে সেটাই স্বাভাবিক এবং সেটাই প্রত্যাশিত।*

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৬

২০১৭-০২-০৬ ১৯:৪০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য