ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বয়স ৩৯ বছর পার হয়ে চল্লিশে পা দিয়েছে। কিন্তু আজও সেই মহা-বিপ্লবের নানা মহা-বিস্ময় অব্যাহত রয়েছে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নানা সাফল্যের কীর্তি-গাঁথায় উৎকীর্ণ এ মহা-বিপ্লব হাতছানি দিচ্ছে অচিরেই বিশ্ব-সভ্যতার উজ্জ্বলতম মহাকাব্যিক অধ্যায় গড়ার। 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব তার উচ্চতর মানবীয় ও আদর্শিক লক্ষ্যগুলোর দিকে আগের চেয়েও জোরালো গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রকৃত মুহাম্মাদি ইসলামের অনুসরণই ছিল এ বিপ্লবের অভাবনীয় সাফল্যগুলোর রহস্য। ইসলামের এই অতুলনীয় শক্তির বলেই মুসলিম বিশ্বে  মার্কিন সরকারের সবচেয়ে বড় মিত্র শাহের সরকারকে উৎখাত করেছিলেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী (র)। অথচ সেনা ও সামরিক শক্তির দিক থেকে শাহের সশস্ত্র বাহিনী ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ শক্তি। ইসলামের সেই অনন্য শক্তির সুবাদেই ইসলামী বিপ্লব এ পর্যন্ত বানচাল করতে পেরেছে দাম্ভিক শক্তিগুলোর  জটিল ও কুটিল নানা ষড়যন্ত্র। 

ইরানের ইসলামী বিপ্লব স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদের ওপর কঠোর আঘাত হানায় এবং মজলুম জাতিগুলোর সহযোগী হওয়ায় এরসঙ্গে স্থায়ী শত্রুতায় জড়িয়ে আছে বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী জোট। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী (র) ও তাঁর ইন্তেকালের পর ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী মোট প্রায় চার দশক পর্যন্ত ইরানি জাতিকে ইসলামী বিপ্লবের আদর্শের পথে আপোষহীন, অবিচল এবং ঐক্যবদ্ধ রেখে নানা ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য ও শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। 

কিন্তু প্রশ্ন হল কেনো আঞ্চলিক এবং বিশ্ব-অঙ্গনে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রভাব দুর্বল না হয়ে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে?  

আসলে ইসলামী ইরানের বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ ও জনগণের আদর্শিক ঐক্য ছিল এই মহা-বিপ্লবকে দুর্বলতা ও বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করার অন্যতম প্রধান কারণ। বহু দেশের বিপ্লবই চিন্তাগত বা আদর্শিক ঐক্যের অভাবে আপোষকামিতা আর নানা ধরনের ঘরোয়া দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে কিছুকাল পরই নিষ্ক্রিয় ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর মতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের টিকে থাকা এবং অব্যাহত সাফল্য ও অগ্রগতির কারণ হল এ বিপ্লবের বাণীগুলোর সত্যতা বা বাস্তবতা। কুরআনের বর্ণিত ইসলামের পবিত্র বাণীর মতই এ বিপ্লবের বাণীগুলোও যেন এক পবিত্র বৃক্ষের মত। এ বৃক্ষের সব শেকড় বা মূল নীতিগুলো শক্ত ও স্থায়ী শেকড়ের মতো মাটির অতি গভীরে প্রোথিত এবং শাখা-প্রশাখা আর কাণ্ডগুলো আকাশের উচ্চ সীমায় উন্নত। এ গাছের ফলগুলোও চিরস্থায়ী ও সারা বছর জুড়েই ফল দেয়। (সুরা ইব্রাহিম ২৪-২৫) দুনিয়ার বহু বিপ্লব বা অভ্যুত্থানই ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট জাতিগুলোর অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে বা তারা আগের মন্দ অবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সত্যের বাণী এমন নয়। তা চিরস্থায়ী হয়।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের কার্যকারিতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিমা মতাদর্শগুলোর ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে  ইসলাম যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রসহ জীবনের সবক্ষেত্রে সংকট ও অচলাবস্থা দূর করতে পারে তা তুলে ধরেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব। 

'ওয়ালিয়ে ফকিহ' বা সর্বোচ্চ ইসলামী আইনবিদের নেতৃত্বে ধর্ম-ভিত্তিক জন-শাসন-ব্যবস্থার যে মডেল ইসলামী ইরান উপহার দিয়েছে তা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শক্তিমত্তা ও দৃঢ়তাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ধরনের নেতৃত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের স্থায়িত্বকে করেছে নিশ্চিত ও দেশটিকে সম্ভাব্য সব বিচ্যুতি হতেও রেখেছে মুক্ত। মরহুম ইমাম খোমেনীর পর ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা দূরদর্শী ও বিচক্ষণ পরিচালনার মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লবকে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি রাজনীতি, প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক অর্থনীতির ক্ষেত্রে জাতিকে শক্তিশালী করার নীতি অনুসরণ করে বিজাতীয় শক্তিগুলোর নানা বাধা আর ষড়যন্ত্রকে বানচাল করেছেন এবং নানা সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি ইসলামের বিপ্লবী মূল্যবোধগুলোকেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন। আর এভাবে তিনি হয়ে উঠেছেন দ্বিতীয় খোমেনী এবং ইসলামী ইরানের শত্রুরা হয়ে পড়েছে হতাশ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের আরও একটি বড় কারণ হল মানুষের প্রকৃতি বা ফিতরাতের সঙ্গে সমন্বয়। কোটি কোটি মানুষের অন্তরকে একটি বিশেষ আদর্শের দিকে আকৃষ্ট করা সহজ কাজ নয়। যখন কোনো নেতা মানুষের অন্তরের প্রিয় কথাটি বলেন ও খোদার পক্ষ হয়ে কথা বলেন তখন মানুষের মন সেদিকে আকৃষ্ট হয়। (সুরা আনফাল-৬৩) খোদায়ি শক্তি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে একমুখী করলেই তখন ঘটে যায় বিপ্লব। গত প্রায় ৪০ বছর ধরে ২২ শে বাহমান তথা ১১ ফেব্রুয়ারিতে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়-বার্ষিকীর শোভাযাত্রায় বেশিরভাগ ইরানির অংশগ্রহণ তথা কয়েক কোটি মানুষের শোভাযাত্রা এবং প্রতি বছর এ শোভাযাত্রায় ইরানিদের অংশগ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধির কারণও  হল এটা যে এ বিপ্লবের নীতি ও শ্লোগান জনগণের তথা মানবীয় প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আর তাই এই বিপ্লবের নীতি ও শ্লোগান স্থায়ী হচ্ছে এবং আগের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। 

প্রখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের ইসলামী বিপ্লব পরিদর্শনে এসেছিলেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ইরানী জনগণের ঐক্য ও সংহতি দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন। তিনি তাঁর 'নিষ্প্রাণ বিশ্বের প্রাণ ইসলামী বিপ্লব' নামক গ্রন্থে লিখেছেন-"বাস্তবতা হল এই বিপ্লবী ঘটনার উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতাম, জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যয় অনেকটা খোদা কিংবা আত্মার মতোই অদৃশ্য, চোখে দেখা যায় না...কিন্তু আমরা তেহরানে এবং সমগ্র ইরানে একটি জাতির সামষ্টিক ইচ্ছা লক্ষ্য করেছি। এটা খুবই প্রশংসনীয় এবং বিরল একটি ঘটনা। কারণ এই বিপ্লবে পুরো একটি জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।" তিনি আরো বলেছেন, "আধ্যাত্মিকতা ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মূলভিত্তি। এ বিপ্লব পুরনো চিন্তাধারার প্রতি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছে। এ বিশেষত্ব ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লব থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে এবং নিজেই একটি আদর্শে পরিণত হয়েছে।"

সামরিক শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্রেও ইসলামী ইরান আজ আলোচনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ইরান নিজের তৈরি একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে মহাকাশে।

সামরিক শক্তিতে ইরান আজ এত উন্নত যে শত্রুরা সাদ্দামকে দিয়ে ইরানে হামলা চালানোর যুগের পর কখনও ইরানে প্রকাশ্যে কোনো অভিযান চালানোর কথা চিন্তাও করতে পারেনি।

ইরান আজ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের শহরগুলোতে একজন যুবতীও গভীর রাতে চলাফেরা করতে পারেন নিরাপদে। ইরানের আশপাশের নানা রাষ্ট্রে বিদেশী মদদে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত নিয়মিত বিষয় হয়ে থাকলেও ইসলামী এই রাষ্ট্রে এসব নেই বললেই চলে। 

ব্যবসায়ী, পুঁজি-বিনিয়োগকারী, বিদেশী পর্যটক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকসহ সব শ্রেণীর জনগণের জন্য নিরাপত্তার দ্বীপ হল ইরান। 

বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির অধিকারী হল ইরান। দেশটি আজ পরিপূর্ণ অর্থেই স্বাধীন। ইরানের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি শান্তির জন্য নিবেদিত। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও গবেষক একেএম আনোয়ারুল কবির বলেছেন: 'গত ৪০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায় ইসলামী ইরান স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির আওতায় সব সময়ই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে চেয়েছে। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসির একটি স্বাধীন সদস্য হিসেবে সব সময় ভূমিকা পালন করেছে ইরান। এমনকি যেসব সরকার এক সময় ইরানের বিরুদ্ধে প্রবল শত্রুতা করেছে ও ইরানকে একঘরে করতে সমবেত প্রচেষ্টা চালিয়েছে সেসব দেশের বিরুদ্ধে সুযোগ পেয়েও ইরান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সাদ্দাম যখন কুয়েত দখল করে তখন বহু আরব দেশ চেয়েছিল সাদ্দাম ও ইরাকের বিরুদ্ধে ইরানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে। কিন্তু ইরান তাতে সায় দেয়নি। যখনই কোনো মুসলিম দেশ সাম্রাজ্যবাদের হামলার শিকার হয়েছে তখনই ইসলামী ইরান তার প্রতিবাদ করেছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনী (র) কড়া প্রতিবাদ ছিল এর দৃষ্টান্ত।' 

ইসলামী ইরানের ক্ষমতার কাঠামো, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বাইরের শক্তিগুলোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্ষমতাধর দেশের শক্তিশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, প্রেসিডেন্ট এবং শীর্ষস্থানীয় নেতারা সবচেয়ে বিনয়ী ও জনদরদি। ইরানের সংসদ ও সরকারের রয়েছে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র প্রকাশ্যেই প্রেসিডেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে তার নানা কার্যক্রমের সমালোচনা করতে পারেন। 

সামাজিক নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দিক থেকেও ইরান আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ। দেশটির নেতৃবৃন্দের খোদাভীতি ও সততাও শীর্ষ পর্যায়ের। 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী যদি চাইতেন তাহলে তার সন্তানদেরকে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, বরং রাষ্ট্রীয় বড় কোনো পদ গ্রহণ না করতে সন্তানদেরকে উপদেশ দিয়ে গেছেন।     

ইরানই বিশ্বের একমাত্র ইসলামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে প্রতি বছর কোনো না কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ বা ইসলাম বিরোধী কোনো দল গঠন নিষিদ্ধ। ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও এর স্থপতি মরহুম ইমাম খোমেনী দেশটির শাসন ব্যবস্থা ইসলামী প্রজাতন্ত্র-ভিত্তিক হবে কিনা এবং নতুন সংবিধানের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কিনা তা গণভোটের মাধ্যমে যাচাই করে নিয়েছিলেন। ইরানের ভোটারদের ৯৮ শতাংশই ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও সংবিধানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।  এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে প্রকৃত ইসলামী ব্যবস্থা বা ইসলামী শাসনও জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না জনগণের ওপর।

ইসলামী ইরানের জনগণের প্রতি ইসলামী সরকারের অশেষ শ্রদ্ধাবোধের কারণে জনগণও এই বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছে।  এই দেশটিতে নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও ধারা বা উপধারা থাকলেও সব ধারার অনুসারী জনগণ ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সমর্থক। আর তারই প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতি বছর ইসলামী বিপ্লবের বিজয়-বার্ষিকীতে গণ-শোভাযাত্রায় সারা দেশের সব শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণ থেকে। এমনকি ইরানের অমুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরাও এই শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে থাকেন।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলো এই শোভাযাত্রায় সর্বস্তরের কোটি কোটি ইরানির অংশগ্রহণের খবরকে যথাযথভাবে প্রচার করে না। ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের প্রচার যুদ্ধের আওতায় এটা করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ একেএম আনোয়ারুল কবির বলেছেন: 

''এটা হচ্ছে একটি বাস্তবতা যখন আমরা দেখি যে ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সবকিছুতে সফলতার পরিচয় দিয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তি, পরমাণু প্রযুক্তি, স্টেম-সেল বা মৌলিক কোষ সংক্রান্ত প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র- এসব বিষয়েই বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সাহায্য ছাড়াই ইরানের নিজস্ব বিজ্ঞানী ও গবেষকরা অত্যন্ত সফল হয়েছেন। পশ্চিমা সরকারগুলো কখনও এটা চায় না যে একটি মুসলিম দেশ (ও তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশ) এসব ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হবে এবং এসবক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসবে। ইরানিদের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস জন্মেছে তা পশ্চিমা শক্তিগুলোকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। তাদের আতঙ্ক এটা যে ইরান এসব ক্ষেত্রে রাশিয়া, চীন বা ভারতের মত নিজেরাই উন্নতি করছে অন্যের সাহায্য ছাড়া—যদিও এসব দেশের পশ্চিমা-শিক্ষিত ব্যক্তিরাই ওইসব উন্নতি করেছে, কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের নিজস্ব শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরাই এইসব সাফল্য অর্জন করেছেন। তাই পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ও জাতি হিসেবে তুলে ধরার জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ আমরা দেখি যে ১৯৮৭ সালেই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর আলী আকবর বেলায়েতি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একটি দীর্ঘ-মেয়াদি একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা যদি সেদিন গৃহীত হত তাহলে ইরান যে শান্তির আহ্বায়ক সেটাসহ তার কথাগুলো আজ তুলে ধরতে পারত। ইরান গত দুই-এক বছরে বিশ্ব-শান্তির জন্য জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ দু'টি প্রস্তাব দিয়েছে: প্রথমতঃ পরমাণু অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য গড়া ও দ্বিতীয়তঃ বিশ্ব থেকে গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র নির্মূল করা। এ থেকেই বোঝা যায় যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কত নিবেদিত। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। ... ইরানের বিরুদ্ধে এই যে কোমল বা প্রচার যুদ্ধ (soft war) তার মোকাবেলায়ও ইরান যে সফল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরমাণু চুক্তিতেও তারা প্রমাণ করেছে যে ইরান কখনও পরমাণু শক্তিকে ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করতে চায়নি।"          
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবেই গড়ে উঠেছে ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা আন্দোলন এবং হামাস ও ইসলামী জিহাদের মত সংগ্রামী দল। লেবাননের হিজবুল্লাহর ইসরাইল-বিরোধী কিংবদন্তীতুল্য সাফল্যের মূলেও রয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী চেতনার সেই জনপ্রিয় ঐতিহাসিক শ্লোগান: প্রতিটি দিনই আশুরা ও প্রতিটি ময়দানই কারবালা। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/১০ 
 


 

ট্যাগ

২০১৮-০২-১০ ১৯:১৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য