১৯৬৩ সালের ৫ জুন মোতাবেক ফার্সি ১৫ খোরদদ ১৩৪২ ইরানের ইতিহাসে একটি স্বণোর্জ্জ্বল দিন। ঐতিহাসিক এই দিনটিতে ইরানি জাতি বলদর্পি শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের যে সূত্রপাত করেছিল ওই সংগ্রামই ছিল ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের সাহসী সূচনা। সেদিনের ভোর রাতের কথা। স্বৈরাচারী শাহের জুলুম নির্যাতন আর অপশাসনের বিরুদ্ধে কোমের ফয়েজিয়া মাদ্রাসায় বক্তব্য রাখার কারণে শাহী জান্তা ইমাম খোমেনি (রহ) কে গ্রেফতার করে তেহরানের কারাগারে পাঠায়।

ইমাম বলদর্পি শাহ এবং তার পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য রেখেছিলেন। ইমাম বলেছিলেন: 'আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি যে, শাহী জান্তা ইসলাম ও কুরআনের বিরোধী। শাহের বন্ধু ইসরাইল আমাদের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনকে হেয় করতে চায় এবং ধর্মীয় নেতৃত্বকে নির্মূল করতে চায়। ইসরাইল আমাদের অর্থনীতি, ব্যবসা ও কৃষিকে পাকাপোক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়'। এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে শাহ। ওই রাতেই ইমামকে গ্রেফতার করা হয়। ফল হয় উল্টো। ইমামের গ্রেফতারির ঘটনায় কোমের পথেপথে নেমে আসে বিপ্লবী জনতা। স্লোগান দেয়: হয় খোমেনি না হয় মৃত্যু। ওই মিছিল এবং শ্লোগান ছড়িয়ে পড়ে তেহরানেও। মুহূর্তেই সেই শ্লোগান আকাশে বাতাসে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সমগ্র ইরানজুড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শাহ সামরিক আইন জারি করে। কিন্তু কাজ হলো না। জনগণ রাস্তা ছাড়েনি। শাহী জান্তা শেষ পর্যন্ত মুক্তিকামী জনতার ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়।

ওই হত্যাযজ্ঞে সেদিন কেবল তেহরানেই ১৫ হাজার মুসলমানের রক্ত ঝরেছিল রাজপথে। কোমে শহীদ হয়েছিল চার শ'র বেশি। এভাবে সারাদেশেই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ইরানের মাটি রক্তে রঙীন করেছিল শাহের সেনারা। সেই ঘটনা থেকে 'পনেরো খোরদদ' ইরানের ইতিহাসের এক বিপ্লবী অধ্যায় হয়ে আছে। আমরা এই পনেরোই খোরদদের ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং জনতার স্বতস্ফূর্ত অভ্যুত্থান নিয়ে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো।  

পনেরো খোরদদের রক্তক্ষয়ী ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল স্বৈরাচারী শাহের অনুকূলেই গেছে, অথচ বাস্তবতা হলো ইরানের জনগণ সেদিনের ঘটনায় শাহের প্রকৃত স্বরূপ চিনতে পেরেছিল। শাহের এতোটা নগ্ন এবং রক্তখেকো চেহারা ইরানি জাতি ইতোপূর্বে আর দেখে নি। এ কারণেই বৃহত্তর ইসলামি বিপ্লবী আন্দোলন সেখান থেকেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে এবং মাত্র ১৫ বছরের মাথায় সেই বিপ্লবী আন্দোলন শ্বাশ্বত বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এই যে অভ্যুত্থানের সূচনা হলো এর পেছনে ইমামের লক্ষ্য কী ছিল? এরকম একটা প্রশ্ন সবার মনেই জাগতে পারে। ইমাম কি কায়েমি স্বার্থবাদীদের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছেন? না, মোটেই তা নয়। তিনি চেয়েছেন ইসলামি শাসন ব্যবস্থা এবং ইসলামি শরিয়তের বাস্তবায়ন। সেইসঙ্গে ইসরাইল ও আমেরিকার সঙ্গে ইরান যেন সম্পর্ক না রাখে।

১৫ খোরদদের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে 'শ্বেত বিপ্লব' নামের হোয়াইট হাউজের কর্মসূচিও অনেকটা প্রেরণা জুগিয়েছিল। ইরানের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদেরকে সংবিধান অনুযায়ী কুরআন হাতে নিয়ে শপথ নিতে হতো। ইরানের মন্ত্রিসভা প্রাদেশিক ও নগর কাউন্সিল সংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদন করে কুরআন হাতে নিয়ে শপথ গ্রহণের বিষয়টি ঐচ্ছিক করে  দেয়। অর্থাৎ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সদস্যরা যে-কোনো ধর্মগ্রন্থ নিয়ে শপথ করতে পারবেন। কোমের আলেমরা ঘোষণা দেন: প্রস্তাবিত বিলটি সংবিধান বিরোধী। ওই ইস্যুটি নিয়ে সারাদেশ জুড়ে আলেমরা সোচ্চার হন। ফলে জনগণ শাহের প্রকৃত চেহারা আরও ভালোভাবে জানতে পারে।  

জনগণ আসলে তখনও শাহের জঘন্য চরিত্র সম্পর্কে ততোটা সচেতন ছিল না। বিশেষ করে শাহের ইসলাম বিরোধিতার বিষয়ে খুব একটা ধারণা ছিল না মানুষের। ইমাম তাঁর বক্তব্যে ধীরে ধীরে শাহের ইসলাম বিরোধিতার কথা প্রকাশ করেন এবং জনগণও আস্তে আস্তে সচতেন হয়ে ওঠে। তারা জানতে পারে পাহলাভি শাসকগোষীর শয়তানি পরিকল্পনার কথা। এভাবে ইমাম জনগণকে ইহুদিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইসলামি ঐক্য সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দিতে থাকেন। ইমামের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কিন্তু শাহ কিংবা তার শাসনের অবসান ছিল না, বরং তাঁর আন্দোলন ছিল ইসলামের মূল শত্রু ইসরাইল ও আমেরিকার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। ইরানের মুসলিম জনতা ঐক্যবদ্ধ সেই লক্ষ্যে গণজাগরণ গড়ে তুলে ইসলামি বিপ্লবের বিজয় ছিনিয়ে এনিছিল।

এই যে ঐক্যের কথা বললাম একটি বিপ্লব সফল করার জন্য তথা জুলুমের বিরুদ্ধে কুরআনের নির্দেশিত পথে সংগ্রাম করার জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো পাশ্চাত্য তথা ইসলামের শত্রু আধিপত্যবাদ ও ইহুদিবাদীদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। ১৫ খোরদদের গণঅভ্যুত্থান থেকে এই সচেতনতা ও ঐক্যের শিক্ষা আমরা নিতে পারি।

Image Caption

 

মুসলিম উম্মাহর স্বার্থকে সবার উপরে গুরুত্ব দেওয়া এবং পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দেওয়াই ছিল ১৫ খোরদদ গণঅভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা। আসলে ১৫ খোরদদের আন্দোলন আরও  প্রমাণ করেছে ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর অটল থেকে কোনো জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে সেই জাতির ভূখণ্ডকে কিছুতেই ইসরাইল-আমেরিকার অবৈধ স্বার্থ হাসিলের ঘাঁটি বানানো সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাপী আজও যেসব দেশ জুলুমের শিকার বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো-তাদের ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে প্রযোজ্য। ১৫ খোরদদ তাদেরকে জালেমের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করে তুলুক,সমস্ত নির্যাতিত জাতি ফিরে পাক তাদের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার-এই হোক ১৫ খোরদদ বিপ্লবের অনিবার্য অঙ্গীকার।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আশরাফুর রহমান/৫

 

ট্যাগ

২০১৮-০৬-০৫ ২০:১৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য