কিছু কিছু ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করা খুবই দুরূহ কাজ। কারণ তাদের জীবনের এমন কোনো দিক নেই যা আলোচ্য নয়। সব্যসাচী চরিত্রের অধিকারী তারা। কি ব্যক্তি জীবন, কি সামাজিক জীবন, কি পারিবারিক জীবন কি রাজনৈতিক জীবন এমনকি ধর্মীয় জীবনেও তাঁরা অনন্য সাধারণ ও অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। এরকমই একজন মহান মনীষী ছিলেন ইমাম খোমেনী (রহ)।

বিশ্ববাসী তাঁকে চেনে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি তথা একজন সফল রাজনীতিক হিসেবে। অথচ তিনি শুধু সফল বিপ্লবের একজন নায়কই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। ধর্মীয় উচ্চ পর্যায়ের একজন শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ছিলেন তিনি।

এত বড় একজন আলেমে দ্বীন এবং বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো বিপ্লবের রূপকারের ব্যক্তি জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। তেহরানের জামারানে যারা ইমামের বাড়িতে গেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই দেখেছেন এতো বড় একজন ধর্মীয় নেতা এবং বিশ্বব্যাপী জাগরণ সৃষ্টিকারী একটি বিপ্লবের নেতা কত ছোট্ট একটি বাড়িতে কতোটা সাধারণ জীবনযাপন করতেন। অথচ তিনিই ছিলেন জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের প্রতীক। এ কারণেই মৃত্যুর ঊনত্রিশ বছর পরও ইরানি জাতির কাছে তো বটেই এমনকি জুলুম ও আধিপত্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতাকামী জনতার স্মৃতিতে তিনি আজও অম্লান। ১৯৮৯ সনের ৪ জুনে মহান এই ইমাম ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেছেন তাঁর প্রিয় স্রষ্টার সান্নিধ্যে। আমরা তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করার মধ্য দিয়ে এবং তাঁর বিচিত্রমুখী জীবন থেকে খানিকটা আলোচনা করার মাধ্যমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার চেষ্টা করব।

ইমাম খোমেনী (রহ.)

বর্তমান বিশ্ব অন্যায় আর বিচিত্র জুলুমে পরিপূর্ণ। সকল প্রকার অন্যায়, জুলুম, আগ্রাসন আর বৈষম্যের মোকাবেলায় কী করে বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে দাঁড়াতে হয় সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন ইমাম। সেই আদম (আ) এর পৃথিবীতে আগমনের শুরু থেকেই ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝে দ্বন্দ্ব চলে এসেছে। তবে ইমাম মনে করতেন জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবোর্ত্তম সংগ্রাম হলো ইসলাম প্রদর্শিত আন্দোলন। ইসলামে একেবারে সুস্পষ্টভাবে জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পন্থা ও কর্মসূচিগুলো নির্দেশিত হয়েছে। তিনি বলেছেনও: যারা আমাদের দেশে আগ্রাসন চালাতে চায়, আল্লাহর ওপর ভরসা করে কুরআন নির্দেশিত এবং বিশ্বনবী (সা) প্রদর্শিত পন্থায় আমরা সেইসব আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। দাঁড়িয়েছেনও ঠিকঠাকমতো। ইরানের স্বৈরাচারী পাহলাভি শাহীর বিরুদ্ধে যেমন দাঁড়িয়েছেন তেমনি ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি জুলম-নির্যাতনকে নীরবে সহ্য করাকে অন্যায় মনে করতেন বলেই যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তাঁর প্রতিটি কর্মসূচি ও পদক্ষেপ ছিল কুরআনের আলোকে।

সূরা মুহাম্মাদের সাত নম্বর আয়াতের ওপর গভীর আস্থা পোষণ করতেন তিনি। ওই আয়াতে বলা হয়েছে: 'হে ঈমান গ্রহণকারীগণ,তোমরা যদি আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করো তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপকে সুদৃঢ় করে দেবেন'। এ কারণেই তিনি শাহ বিরোধী আন্দোলনে কখনো দমে যান নি, হতাশ হন নি। মার্কিন বিচিত্র ষড়যন্ত্রের মুখেও বিন্দুমাত্র ভীত ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রকৃত শক্তির অধিকারী হলেন আল্লাহ। আর আল্লাহই ইসলামপ্রিয় জনতার প্রকৃত সাহায্যকারী। এই শক্তিবলেই তিনি আন্দোলনকারীদেরকে সবসময় অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর মাজার

আল্লাহর পর ইমামের ভরসা ছিল জনগণের ওপর। ইমাম সবসময় ঐক্যের প্রবক্তা ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সচেতন জনতার ঐক্যের যে শক্তি তার সামনে পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে না। ইসলামি বিপ্লবে জনগণের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে ইমাম বলেছেন: ইসলামি বিপ্লব বেঁচে থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে বিজয়ের গোপন রহস্যের মধ্যে। সেই রহস্যটা জনগণ জানে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই একদিন ইতিহাসের পাতায় পড়বে যে ওই রহস্যের একটি হলো ঐশী সাহায্য আর দ্বিতীয়টি হলো দেশবাসীর সুদৃঢ় ঐক্য। ইমাম শত্রুদের বিরুদ্ধে ছিলেন কঠোর আর নিজেদের মধ্যে অসম্ভব মেহেরবান। এ প্রসঙ্গে কুরআনের সূরা ফাতহের শেষ আয়াতের প্রথমাংশের কথা মনে পড়বে: 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল! আর যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে আপোষহীন এবং নিজেরা পরস্পর দয়া পরবশ'। ইমামকে এজন্যই লোকেরা ভালোবাসতো, পছন্দ করতো এবং তিনি যে নির্দেশ দিতেন তা বাস্তবায়ন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতো। শাহ বিরোধী আন্দোলন, আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলন এমনকি সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।

ইমাম খোমেনী (রহ) সবসময় মুসলমান জাতির ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলতেন: 'মুসলিম দেশগুলোর সকল সম্পদই রয়েছে, তারা যদি ঐক্যবদ্ধ হতো তাহলে ওই ঐক্যের ছায়াতলে অন্য কোনো কিছু বা অন্য কোনো দেশের কিংবা অন্য কোনো শক্তির আর প্রয়োজনই পড়তো না..'। অথচ দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে কোনো কোনো মুসলিম দেশ এই ঐক্য ও সংহতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ঐক্যহীনতার সুযোগ নিচ্ছে ইসলামের শত্রুরা। ওই দেশের নেতৃবৃন্দ ওহাবি হিসেবে পরিচিত। যে ওহাবি মতবাদ স্বয়ং সুন্নি ভাইদের কাছেও অগ্রহণযোগ্য। যাই হোক ইমাম খোমেনী (রহ) সর্বপ্রকার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই শাসনব্যবস্থা ৪০ বছর পর আজও সমগ্র বিশ্বে শক্তিশালী একটি ব্যবস্থা হিসেবে স্বমহিমায় ভাস্বর। ইসলামের শত্রুরা যতই চেষ্টা করেছে, ষড়যন্ত্র করেছে কোনো কাজ হয় নি। ইমামের সঠিক নেতৃত্বই ছিল তার কারণ।  

লোকে লোকারণ্য ইমাম খোমেনীর মাজার কমপ্লেক্স

আসলে ইমাম যেমন জনগণকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন, তাদের ওপর আস্থা রাখতেন এবং তাদেরকে ভালোবাসতেন জনগণও যে কী পরিমাণ ভালোবাসতো ইমামকে তা বোঝা গেছে মৃত্যুর পর তাঁর জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠানে। ইমামের দাফন অনুষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতেই সেই বার্তাই ঘোষিত হয়েছে। ইমাম আজ নেই। কিন্তু আজও আছে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ। সেই আদর্শকে লালন করে সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামি জাগরণ আসুক। প্রতিষ্ঠিত হোক কালেমার ঝাণ্ডা এই হোক ইমামের মৃত্যু দিবসে আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আশরাফুর রহমান/৫

ট্যাগ

২০১৮-০৬-০৫ ২০:৪৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য