জিলক্বদ মাসের শেষ দিন ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়স্ক মজলুম ইমাম হযরত জাওয়াদ আততাকি (আ)'র শাহাদত বার্ষিকী।২৩০ হিজরির এই দিনে তিনি শাহাদত বরণ করেছিলেন।

এ উপলক্ষে সবাইকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাওয়াদ (আ.)'র  জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক ও অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করবো আজকের এই আলোচনায়। 

ইমাম জাওয়াদ (আ.)'র জন্ম হয়েছিল ১৯৫ হিজরিতে পবিত্র মদীনায়। তার মায়ের নাম ছিল সাবিকাহ। পিতা ইমাম রেজা (আ.)'র শাহাদতের পর তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে ইমামতের দায়িত্ব পান এবং ১৭ বছর এই পদে দায়িত্ব পালনের পর মাত্র ২৫ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। মজলুম ও দরিদ্রদের প্রতি ব্যাপক দানশীলতা ও দয়ার জন্য তিনি 'জাওয়াদ' উপাধি পেয়েছিলেন। তাকি বা খোদাভীরু ছিল তাঁর আরেকটি উপাধি।

আহলে বাইতের অন্য ইমামগণের মত ইমাম জাওয়াদ (আ.)ও ছিলেন উচ্চতর নৈতিক গুণ, জ্ঞান ও পরিপূর্ণতার অধিকারী। ইসলামের মূল শিক্ষা ও সংস্কৃতির  পুনরুজ্জীবন এবং  বিকাশ ছিল তাঁর তৎপরতার মূল লক্ষ্য বা কেন্দ্রবিন্দু।  সেযুগের সব মাজহাবের জ্ঞানী-গুণীরা ইমাম জাওয়াদ (আ.)'র উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এই মহান ইমামের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম এবং সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা।  

সমসাময়িক যুগের প্রখ্যাত সুন্নি চিন্তাবিদ কামালউদ্দিন শাফেয়ি ইমাম জাওয়াদ (আ) সম্পর্কে বলেছেন, "মুহাম্মাদ বিন আলী তথা ইমাম জাওয়াদ (আ.) ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মর্যাদা ও গুণের অধিকারী। মানুষের মুখে মুখে ফিরত তাঁর প্রশংসা। তাঁর উদারতা, প্রশস্ত দৃষ্টি ও সুমিষ্ট কথা সবাইকে আকৃষ্ট করত। যে-ই তাঁর কাছে আসতো নিজের অজান্তেই এই মহামানবের অনুরাগী হয়ে পড়ত এবং তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করত।"

মালিকি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকীহ ইবনে সাব্বাগ ইমাম জাওয়াদ (আ) এর জীবন-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখেছেন: কী বলবো! সবার চেয়ে কম বয়স অথচ তাঁর মান-মর্যাদা ছিলো সবার উপরে। তিনি তাঁর খুব অল্প সময়ের জীবনকালে অনেক বেশি কেরামতি দেখিয়েছেন। তাঁর জ্ঞান, তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সংক্রান্ত বহু মূল্যবান অবদান এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি শত্রু পক্ষের বক্তব্যকে অকাট্য যুক্তি দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ও মিষ্টি ভাষায় খণ্ডন করে নিজস্ব বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সে সময়কার যতো তর্কবাগীশ আর আলঙ্কারিক ভাষাবিদ ছিলেন সবাইকে তিনি হার মানিয়েছেন। অথচ তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী। তবে যা বলতেন তা ছিল অকাট্য। 

রাজা-বাদশাহদের জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে  আহলে বাইতের ইমামদের সংগ্রামের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত ইসলাম ও এর শিক্ষাকে রক্ষা করা। আব্বাসীয় শাসক মামুন ও মুতাসিম ছিল ইমাম জাওয়াদ (আ.)'র যুগের দুই বাদশাহ। ইমাম পবিত্র মদিনা ছাড়াও   সময় মক্কায় গমন উপলক্ষে সেখানে ইসলামের ব্যাখ্যা তুলে ধরতেন এবং বক্তব্যের পাশাপাশি নিজ আচার-আচরণের মাধ্যমে দিক-নির্দেশনা দিতেন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে। শাসকদের জুলুমের বিরুদ্ধেও থাকতেন সোচ্চার। এইসব শাসক বিশ্বনবী (সা.)'র আদর্শ ও সুন্নাতকে ত্যাগ করেছিল। ইমাম জাওয়াদ (আ.) শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসরদের প্রতিপালিত সাংস্কৃতিক বা চিন্তাগত হামলা মোকাবেলা করে আহলে বাইত (আ.)'র আদর্শকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন। 

ইমাম জাওয়াদ (আ) মাত্র আট বছর বয়সে ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে অনেকেই এ বিষয়ে সন্দেহ করতেন। অথচ আল্লাহ মানুষকে তার বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও পরিপূর্ণ বিবেক-বুদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন। কুরআনের আয়াতের এরকম কিছু দৃষ্টান্ত আছে। যেমন শিশুকালে হযরত ইয়াহিয়া (আ) এর নবুয়্যত প্রাপ্তি, মায়ের কোলে নবজাতক ঈসা (আ) এর কথা বলা ইত্যাদি আল্লাহর সর্বশক্তিমান ক্ষমতারই নিদর্শন।

ইমাম জাওয়াদ (আ) শৈশব-কৈশোরেই ছিলেন জ্ঞানে-গুণে, ধৈর্য ও সহনশীলতায়, ইবাদাত-বন্দেগিতে, সচেতনতায়, কথাবার্তায় শীর্ষস্থানীয় মহামানব। একবার হজ্জ্বের সময় বাগদাদ এবং অন্যান্য শহরের বিখ্যাত ফকীহদের মধ্য থেকে আশি জন মদীনায় ইমাম জাওয়াদ (আ) এর কাছে গিয়েছিলেন। তাঁরা ইমামকে বহু বিষয়ে জিজ্ঞেস করে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও সন্তোষজনক জবাব পেলেন। ফলে জাওয়াদ (আ) এর ইমামতিত্বের ব্যাপারে তাদের মনে যেসব সন্দেহ ছিল-তা দূর হয়ে যায়। 

ইমাম জাওয়াদ (আ) বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের সাথে জ্ঞানগত বিতর্কে অংশ নিয়ে তাদের হারিয়ে দিতেন। একদিন আব্বাসীয় খলিফা মামুন ইমাম জাওয়াদ (আ) এর জ্ঞানের গভীরতা পরীক্ষা করার জন্যে একটি মজলিসের আয়োজন করে। জ্ঞানী-গুণীজনদের ঐ মজলিসে নামকরা পণ্ডিত ইয়াহিয়া ইবনে আকসাম ইমামকে প্রশ্ন করেন: যে ব্যক্তি হজ পালনের জন্যে এহরাম বেঁধেছে, সে যদি কোনো প্রাণী শিকার করে, তাহলে এর কী কাফফারা হবে? ইমাম জাওয়াদ (আ) এই প্রশ্নটির উত্তর সংশ্লিষ্ট ২২টি অবস্থায় কি হবে তা সুদীর্ঘ বর্ণনার মাধ্যমে জানিয়ে দেন। উত্তর পেয়ে সবাই হতবাক হয়ে যান এবং ইমামের অলৌকিক জ্ঞানের প্রশংসা করেন।

ইমাম জাওয়াদ (আ) এর জীবনকাল পঁচিশ বছরের বেশি ছিল না। অথচ ইতিহাসে অন্তত তাঁর ১১০ জন ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যাঁরা তাঁরই জীবনাদর্শ ও শিক্ষার আলোকে সুশিক্ষিত হয়েছেন, সমৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে বহু মহান মনীষীর নাম ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে যাঁরা তাঁদের সমকালে ছিলেন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত, ফিকাহ ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁরা ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন।  

ইমাম জাওয়াদ (আ) জ্ঞানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেনঃ‌ ‘জ্ঞান অর্জন সবার জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ, জ্ঞান দীনি ভাইদের মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি করে এবং জ্ঞান হচ্ছে শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। জ্ঞান হচ্ছে মজলিসের জন্যে উপযুক্ত উপহার, ভ্রমণের সঙ্গী ও বিশ্বস্ত বন্ধু এবং নির্জন একাকীত্বে পরম সহচর।'

তিনি মানুষের উদ্দেশ্যে উপদেশ দিয়ে বলেছেনঃ ইহকালীন এবং পরকালীন সব বৈধ চাহিদা মেটাতে জ্ঞানের বাতিকে কাজে লাগাও।

ইমাম জাওয়াদ (আ.) মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করার ওপর গুরুত্ব দিতেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন: "কুপ্রবৃত্তির বাহনে যে আসীন হয়েছে ও খেয়ালীপনার চাবুক ব্যবহার করছে সে কখনও অধঃপতন থেকে মুক্ত হবে না।" কুপ্রবৃত্তির অনুসরণের ফলে যে ক্ষতি তা কখনও পূরণ হয় না বলে ইমাম জাওয়াদ (আ.) মনে করতেন।

এক ব্যক্তি ইমামের কাছে উপদেশ চাইলে তিনি তাকে বলেন: উপদেশ কি মেনে চলবে? সে বলল: জি। তখন ইমাম বললেন: "ধৈর্যকে বালিশ বানাও তথা নির্ভরতার মাধ্যম কর, দারিদ্রের পথ বেছে নাও  ও কাম-লিপ্সাকে বর্জন করো এবং রিপু কামনার বিরুদ্ধাচরণ করো। জেনে রাখ যে আল্লাহ সব সময় তোমাকে দেখছেন। এরপর দেখ কেমন থাকো।"

ইমাম জাওয়াদ (আ.) বুঝে-শুনে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিতেন। ইমাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন: "যে কোনো কাজে প্রবেশের পথ চেনে না সে সেখান থেকে বের হতেও পারবে না। যেকোনো কাজ করার আগে সে বিষয়ে পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল ঠিক করা হলে সে বিষয়ে মানুষকে অনুশোচনা করতে হয় না।" 

মানুষের সঙ্গে নমনীয় আচরণ করা ও তাদের ক্ষমা করা ইমাম জাওয়াদ (আ.)'র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। ইমাম জাওয়াদ (আ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন:"যে অন্যদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয় না, তাকে তিক্ততার শিকার হতে হবে। দেখা-সাক্ষাত ও আচার-আচরণে ন্যায়-নিষ্ঠ হওয়া, সুখ ও দুঃখের শরিক হওয়া এবং সুস্থ মনের বা হৃদয়ের অধিকারী হওয়া বন্ধুত্ব অর্জনের জন্য জরুরি।" 

ইমাম জাওয়াদ (আ) বলেছেনঃ ‘পুণ্য ও কল্যাণমূলক কাজগুলো করতে চারটি ক্ষমতা সহায়ক। এসব হলো: সুস্থতা, সক্ষমতা বা সম্পদ, জ্ঞান এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া তৌফিক।' 

অনেকে দুনিয়াবি জীবনকে তুচ্ছ বলে মনে করেন। ইমাম জাওয়াদ (আ ) এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ ‘দুনিয়া হচ্ছে একটি বাজারের মতো, অনেকই এখানে লাভবান হয়, মুনাফা অর্জন করে,আবার অনেকে এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।'

আল্লাহর ওপর ভরসা করা ইমাম জাওয়াদ (আ.)'র অন্যতম বড় উপদেশ। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাওয়াদ (আ.) বলেছেন: "যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহই তার কাজকর্মকে সফল করে তোলেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা সব ধরনের মন্দ ও অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকার মাধ্যম।" 

একবার একটি কাফেলা অনেক দূর থেকে ইমামের জন্যে বহু উপহার নিয়ে আসছিলো। পথিমধ্যে সেগুলো চুরি হয়ে গেল। কাফেলার পক্ষ থেকে ঘটনাটা ইমামকে লিখে জানানো হলো। ইমাম উত্তরে লিখলেনঃ আমাদের জান এবং মাল আল্লাহর দেওয়া আমানত। এসব থেকে যদি উপকৃত হওয়া যায় তো ভালো, আর যদি এগুলো হারিয়ে যায় তাহলে আমাদের ধৈর্য ধারণ করা উচিত। কারণ তাতে সওয়াব রয়েছে। সঙ্কটে যে ভেঙ্গে পড়ে তার প্রতিফল বিফলে যায়।

ইমাম জাওয়াদ (আ) এক বক্তৃতায় বলেছেনঃ ‘আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে যাদেরকে তিনি প্রচুর নিয়ামত দান করেছেন যাতে তাঁরা সেসব নিয়ামত আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পথে দান করতে পারে। কিন্তু তারা যদি তা থেকে বিরত থাকে অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় দান না করে তাহলে আল্লাহ তাঁর নিয়ামত ফিরিয়ে নেন।'

ইমাম জাওয়াদ (আ) দুনিয়াকে পুণ্য অর্জনের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করলেও কখনোই দুনিয়ামুখী ছিলেন না। ইতিহাসে এসেছে তিনি তাঁর অর্জিত সম্পদ বহুবার মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর উপাধি হয়েছিলো জাওয়াদ। 

ইমাম জাওয়াদ তাকি (আ.)'র জীবনের শেষ দু'বছরে আব্বাসীয় শাসক ছিলো মুতাসিম। মুতাসিম জনগণের মাঝে ইমামের জনপ্রিয়তায় উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইমামের বক্তব্যে জনগণের মাঝে এক ধরনের জাগরণ সৃষ্টি হয়। যার ফলে মুতাসিমের ভেতর ঈর্ষার আগুণ জ্বলতে থাকে। তাই সে ইমামের বিরুদ্ধে শুরু করে নানা ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের ফলেই মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইমাম জাওয়াদ (আ.) শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শাহাদাত-বার্ষিকীতে আবারো সবার প্রতি রইলো আন্তরিক সমবেদনা। ইমামের একটি বাণী শুনিয়ে শেষ করবো আজকের আলোচনা।

"বাজে লোকের বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকো, কারণ, তার বন্ধুত্ব হলো তলোয়ারের মতো, যার বাহ্যিক দিকটা বেশ চকচকে আর কাজটি খুবই জঘন্য।" #

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/১১

২০১৮-০৮-১১ ১৯:৫৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য