গত পর্বের আলোচনায় আমরা মুহাম্মাদ নামের একজন ইরানি হাজির স্মৃতিচারণ শুনেছি। তিনি পবিত্র মদিনায় সৌদি নিরাপত্তা কর্মীদের নৃশংসতা ও পবিত্র মক্কার কাবাঘর-সংলগ্ন মসজিদুল হারামের আঙ্গিনায় হজযাত্রীদের মাথার ওপর ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। আজ আমরা তার স্মৃতিচারণের বাকি অংশ শুনব।

জনাব মুহাম্মাদ বলছিলেন: মসজিদুল হারামের আঙিনায় হজযাত্রীদের মাথার ওপর ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার ঘটনার পর এই মসজিদে গিয়ে ও কাবা ঘরের চারদিক প্রদক্ষিণ করে এবং ক্রেন-ট্র্যাজেডির শহীদদের জন্য নামাজ পড়ে ও দোয়া করে নিজেকে প্রশান্ত করার চেষ্টা করি। কিন্তু যতবারই  মসজিদুল হারামের দিকে যেতাম ততবারই এই পবিত্র মসজিদের চারদিকে থাকা বহু ক্রেন দেখে এই ভয়ে থাকতাম যে আবারও হয়তো কোনো একটি ক্রেন নিরপরাধ হজযাত্রীদের মাথার ওপর ভেঙে পড়বে!

গত বছরের হজযাত্রী জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন, "দিনগুলো খুব দ্রুত অতিক্রান্ত হল। ওমরা হজ শেষ করার পর এবার আসল হজ পালনের সময় এলো। সবাই একসঙ্গে ইহরাম বাধলাম ও সবার সঙ্গে দল-বেঁধে পবিত্র আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হলাম। এখানে সব কিছুতেই রয়েছে খোদার রঙ এবং ছড়িয়ে পড়ছিল আধ্যাত্মিকতার আলো। নয়ই জিলহজ আরাফা-দিবসে হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র বিখ্যাত আরাফার দোয়া পড়া হল। আধ্যাত্মিক বরকতে সমৃদ্ধ এ দোয়া বয়ে আনলো এক ভিন্ন অনুভূতি ও পরিবেশ। বিশেষ করে মোহসেন হাজি হাসানির কণ্ঠে পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াত  গোটা আরাফাতের পরিবেশকে ভরিয়ে দিল পবিত্র আধ্যাত্মিক সৌরভে। সূর্যাস্তের দিকে হজযাত্রীরা ধীরে ধীরে ‘মাশারাল হারাম’ বা মুজদালিফা নামের পবিত্র স্থানের দিকে রওনা হলেন। সেখানেও সবাই ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল হলেন। আর কেউ কেউ ছোটো ছোটো পাথরের টুকরো সংগ্রহ করছিলেন যাতে পরের দিন মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে সেগুলো নিক্ষেপ করা যায়।"

গত বছরের হজযাত্রী জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন: "পরের দিন পবিত্র ঈদুল আজহা। হজযাত্রীদের মধ্যে দেখা গেল ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। সবাই দলে দলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন পুন্যভূমি মিনার দিকে। পথ বেশ দীর্ঘ। কিন্তু হজের মত এক পবিত্র ইবাদত সম্পন্ন করার প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একান্ত বাসনা পথের সমস্ত কষ্ট ও ক্লান্তিকে সহজ করে দিচ্ছিল। অবশেষে পৌঁছলাম সেই মহল্লাটিতে যে মহল্লাটিকে সৌদিরা প্রতি বছর হজের সময় ছেড়ে দেয় ইরানি হজযাত্রীদের কাছে। এলাকাটি ছিল নোংরা ও শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করার স্থান থেকে সবচেয়ে দূরে। সকালে নাস্তা খাব খুব কম। ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও মিনার প্রচণ্ড গরম এড়ানোর জন্য ভোরেই রওনা দেব। আমাদের এটাও জানা ছিল যে সৌদিদের অব্যবস্থাপনার কারণে বিগত বছরগুলোতে মিনায় ঘটেছিল নানা দূর্ঘটনা। কিন্তু এ বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা লক্ষ্যনীয় হারে কমে যাওয়ায় আবারও কোনো দূর্ঘটনা এখানে ঘটবে- এমন আশঙ্কা খুব কমই করা হচ্ছিল। অবশ্য সৌদিদের অযোগ্যতার কারণে মসজিদুল হারামে ক্রেন ভেঙে পড়ার মত অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছিলাম না কেউই।"

গত বছরের হজযাত্রী জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন: "সৌদি পুলিশ ইরানি হজযাত্রীদেরকে ২০৪ নম্বর সড়কের দিকে নিয়ে যায়। সড়কটি সংকীর্ণ ও শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের স্থানে গিয়ে শেষ হয়েছে। সকাল আটটা বেজে যাওয়ার পর ভীড়ের কারণে হজ-যাত্রীদের পথ-চলার গতি ধীর হয়ে আসে। এ অবস্থায় সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম যে সৌদি পুলিশ আফ্রিকান হজযাত্রীদেরকেও অন্য এক সড়ক দিয়ে এই সংকীর্ণ পথে নিয়ে আসছে। ফলে হজযাত্রীদের এগুনোর গতি হয়ে পড়ে শম্ভুক গতির মত ধীর। আর প্রতি মুহুর্তে বাড়ছিল গরম। আমাদের কাফেলার প্রধান বলছিলেন, অন্য বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে আশা করছি যে সৌদি কর্মীরা অনেকগুলো সিসি টিভিতে হজযাত্রীর গতিবিধি লক্ষ্য করে থাকেন। তাই হাজিদের চলমান প্রবল ভিড় ও ধীর-গতির কথা বিবেচনা করে ভিড় কমানোর জন্য কোনো শাখা-পথ বা সড়ক খুলে দিয়ে ভিড় কমানোর পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু মহাবিস্ময়ের ব্যাপার হল ২০৪ নম্বর সড়কে হজযাত্রীদের এত ভিড়  দেখা সত্ত্বেও এ সড়কের সঙ্গে যুক্ত শাখা-সড়কগুলো ও এমনকি ২০৪ নম্বর সড়কের শেষ মাথাটিও বন্ধ রেখেছে সৌদি হজ-ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ফলে আমরা হাজার হাজার হজযাত্রী যেন একটি ফাঁদে আটকা পড়লাম।

"প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছিল হজযাত্রীর সংখ্যা। তাদের খাবার পানির রিজার্ভ কমে যাওয়ায় প্রতি মুহূর্তে অবস্থার অবনতি ঘটছিল। প্রচণ্ড গরম, তৃষ্ণা ও ক্লান্তি কমিয়ে দিচ্ছিল দেহের শক্তি। দু’টি সৌদি ত্রাণ-কেন্দ্র ছিল কাছেই। সেখান থেকে আসতে পারতো খাবার পানি বা অন্তত হাজিদের গায়ে ছিটানো যেত পানি। কিন্তু তা ঘটেনি। মনে হচ্ছিল যেন সৌদিরা আল্লাহর ঘরের মেহমান তথা হজযাত্রীদেরকেই ঈদের দিন কুরবানি দিতে চেয়েছে। সকাল নটা বেজে গেল। দুর্বল হাজিরা বেহুঁশ হচ্ছিলেন একের পর এক। মহান  আল্লাহর নির্দেশে হজ করতে এসে সবাই আল্লাহর ওপরই ভরসা করছিলেন, কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের অযোগ্যতার কারণে তারা দুঃসহ বিপদের শিকার হলেন। যাদের কণ্ঠে কিছু শক্তি ছিল তারা তখনও মহান আল্লাহর নাম জপছিলেন গুনগুনিয়ে। অবশেষে এ বিশ্বাসই টিকে রইল যে ভীড়ের ক্রমবর্ধমান তীব্র চাপ ও গরমে মৃত্যু অত্যাসন্ন এবং কেবল কোনো অলৌকিক ঘটনাই আমাদের রক্ষা করতে পারে।"# 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৮

ট্যাগ

২০১৬-০৯-০৮ ১৮:১৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য