গত পর্বের আলোচনায় আমরা ইরানি হাজি জনাব মুহাম্মাদের স্মৃতিচারণ শুনছিলাম। জনাব মুহাম্মাদ জানান যে, ভিড়ের চাপে ও প্রচণ্ড গরমের প্রভাবে তৃষ্ণায় কাতর হজযাত্রীরা একে একে জ্ঞান হারাচ্ছিলেন ও অনেকেই মারা যাচ্ছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে কয়েকজন হজযাত্রী দূর থেকে এসে তাকে ও আরও কয়েকজন হজযাত্রীকে ভিড়ের চাপে সৃষ্ট কয়েক-স্তরের মানব-স্তুপ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

ধীরে ধীরে কয়েকটি দেশের উদ্ধারকর্মীরা এসে মৃত্যুর মুখোমুখি বহু হজযাত্রীকে উদ্ধার করেন। কিন্তু এর আগেই ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে নিহত হন হাজার হাজার হজযাত্রী।

গত বছরের হজযাত্রী মুহাম্মাদ আরও জানান মিনা ট্র্যাজেডি ঘটার দুই ঘণ্টা পর সৌদি উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে আসেন। অথচ ঘটনাস্থল থেকে খুব কাছেই ছিল তাদের অবস্থান এবং এ ধরনের পরিস্থিতি বা সংকট সমাধানের উপায়-উপকরণও তাদের কাছে ছিল। মিনা ট্রাজেডি ঘটার তিন ঘণ্টা পর সৌদি পুলিশ বা নিরাপত্তা কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে বিদেশী ত্রাণকর্মীদের তাড়িয়ে দেয়। অথচ এই বিদেশী স্বেচ্ছাসেবীরা খুব কার্যকরভাবে উদ্ধার ও সেবা-তৎপরতা চালাচ্ছিলেন।  সৌদিরা মৃত ও আধা-জীবিত বা আহত নির্বিশেষে জমিনে পড়ে থাকা সব হজযাত্রীকে তালাবদ্ধ-কনটেইনার ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। অথচ আহত বা আধা-জীবিত হজযাত্রীদেরকে পানি দিয়ে ও সেবা-যত্ন দিয়ে বাঁচানো সম্ভব হত। 

আহত হাজিদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ ও শহীদ হাজিদের লাশ অনুসন্ধান ও তাদের লাশ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদি সরকারের হয়রানি, টালবাহানা ও অসহযোগিতাও ছিল লক্ষ্যনীয়। এ বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কঠোর হুঁশিয়ারির পর সৌদি কর্তৃপক্ষ একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইরানি হাজিদের লাশ দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়।  

মিনা ট্র্যাজেডিসহ পবিত্র হজের সময় মক্কা ও মদিনায় অতীতে সংঘটিত নানা বিপর্যয় প্রমাণ করেছে যে সৌদি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত অত্যাধুনিক যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হজ পরিচালনায় এবং হজের সময় দেখা-দেয়া কোনো সংকট মোকাবেলায় সক্ষম নয়। হজ পালনের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অতীতের বছরগুলোর তুলনায় হজযাত্রীর সংখ্যাও অর্ধেকে হ্রাস পেয়েছে।

হজযাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সহজ চলাচলের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হলে গত বছরের মিনা ট্র্যাজেডি ঘটতো না বলে নানা দেশের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মিনা ট্র্যাজেডিতে বিশ্বের নানা দেশের সাত হাজারেরও বেশি হজযাত্রী শহীদ হয়েছেন বলে মনে করা হয়। অথচ সৌদি সরকার নিহত হজযাত্রীর সংখ্যা প্রায় দশগুণ কমিয়ে উল্লেখ করছে। এই ট্র্যাজেডির জন্য কারা দায়ি তা তদন্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিকেও নাকচ করে আসছে সৌদি সরকার। মিনার সড়কগুলোতে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো থাকা সত্ত্বেও সৌদি সরকার এইসব ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছে।

বলা হয় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মারতে-আসা সৌদি ডেপুটি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান ও তার দেহরক্ষীদের গাড়িবহরকে যায়গা এবং নিরাপত্তা দিতেই ২০৪ নম্বর সড়কটির শেষ মাথা বন্ধ করে দেয়া হয় ও এই সড়কের আশপাশের শাখা সড়কগুলোও বন্ধ রাখা হয়। ফলে ঘটেছে বৃহত্তম হজ-বিপর্যয়। মিনায় ভিড়ের চাপে ও প্রচণ্ড গরমে আহত হজযাত্রীদের ওপর যদি হেলিকপ্টার থেকে পানি ছিটানো হত তাহলেও এত বেশি সংখ্যক হাজি শহীদ হতেন না। হজযাত্রীদের উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসা দক্ষ বিদেশী ত্রাণকর্মীদেরকে ঘটনাস্থল থেকে সৌদি পুলিশের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেয়া এবং ঘটনাস্থলের খুব কাছেই থাকা বহু সৌদি ত্রাণ ও উদ্ধার-কেন্দ্রগুলোর নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের বিষয়ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জানা গেছে সৌদি সরকার মিনা-ট্র্যাজেডিতে নিহত ও নিখোঁজ হাজিদের ব্যাপারে নীরব থাকার জন্য বিশ্বের বহু দেশের সরকারকেই বিপুল অংকের অর্থ ঘুষ দিয়েছে। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো দেশের সরকার, কর্মকর্তা ও হাজিদের প্রতিবাদ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কেবল ইরানের ইসলামী সরকারই মিনা-ট্র্যাজেডির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ও দোষীদের বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। 

ইরান মিনা ট্র্যাজেডির ক্ষতিপূরণ দিতে সৌদি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে ও সৌদি সরকারকে এ বিপর্যয়ের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করে আসছে। এ ছাড়াও ইরান ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার তত্ত্বাবধানে হজ পরিচালনার দাবি জানাচ্ছে। আর ইরানের এইসব দাবির কারণেই সৌদি সরকার এ বছর ইরানিদেরকে হজ করার সুযোগ দেয়নি।  এ ছাড়াও সৌদি সরকার এ বছরও বিগত কয়েক বছরের মতই সৌদি হস্তক্ষেপকামীতা ও ইসরাইল-বিরোধী হওয়ার কারণে ইয়েমেনি এবং সিরিয় মুসলমানদেরও হজে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে ।

সৌদি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে হজের সময় সংঘটিত নানা বিপর্যয় ও মহাবিপর্যয়ের দায় যে সৌদি সরকারকেই বহন করতে হবে সে বিষয়ে মুসলিম সরকার এবং জাতিগুলোর পক্ষ থেকে প্রবল চাপ সৃষ্টি জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে ইরান ছাড়া অন্য সরকারগুলোর দায়সারা ভূমিকার কারণে সৌদি সরকার মিনা বিপর্যয়ের ব্যাপারে ক্ষমা না চেয়ে বরং অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় ইরান ও ইরানি হাজিদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে এবং কোনো কোনো লেজুড়-বৃত্তিক প্রচার-মাধ্যমও সৌদি এ নীতির পক্ষে কাজ করেছে।

অন্যদিকে হারাম-অর্থ কামাইয়ে অভ্যস্ত সৌদি আরবের দরবারি আলেমরা বিবেকের মাথা খেয়ে এবং কুরআনের বিধান লঙ্ঘন করে সৌদি রাজ-সরকারের যে কোনো অন্যায় আচরণের সাফাই দিচ্ছেন। তারা বলছিলেন, মিনা-ট্র্যাজেডি ছিল হাজিদের জন্য খোদায়ি তকদিরের লিখন এবং এর সঙ্গে হজ-ব্যবস্থাপনার কোনো সম্পর্ক নেই!

স্বৈরতান্ত্রিক সৌদি সরকার ইসলামী মানবাধিকার ও ইসলামী বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় বলেই ইরান মিনা ট্র্যাজেডির বিচারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছে। তাই অন্যান্য সরকারেরও উচিত এ ব্যাপারে ইরানের সহযোগী হওয়া।

বাস্তবতার ময়দানে হজ পরিচালনায় সৌদি ব্যর্থতা বার বার প্রমাণিত হয়েছে। মক্কা ও মদিনার পবিত্র মসজিদের নামাজ ও হজসহ নানা ধর্মীয় কার্যক্রমের নেতৃত্বে রাখা হয়েছে ইসলামের নামে নানা বিভ্রান্ত মতবাদ ও বিকৃত চিন্তায় বিশ্বাসী ওয়াহাবি আলেমদেরকে যা ইসলামের প্রধান মাজহাবগুলোর দৃষ্টিতে সৌদি সরকারের অন্যায় ও পক্ষপাতমূলক নীতির দৃষ্টান্ত।

সৌদি সরকারের  উস্কানিতে ওয়াহাবিরা বিশ্বনবী (সা)’র জন্মস্থান এবং হযরত খাদিজা (সা.আ)’র স্মৃতি-বিজড়িত স্থানসহ নানা ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস করেছে। ধ্বংস করেছে বিশ্বনবীর আহলে বাইতের সদস্যদের পবিত্র মাজার ও অনেক সাহাবির মাজার। 

ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি সরকারের সব সময়ই গোপন সম্পর্ক ও সহযোগিতা ছিল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই সম্পর্ক প্রায় প্রকাশ্য বন্ধুত্বের রূপ নিয়েছে। তাই পবিত্র কুরআনে ঘোষিত মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু  ইহুদিবাদীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার কারণেই সৌদি সরকারকে আর পবিত্র মক্কা ও মদিনার ওপর কর্তৃত্ব করতে দেয়া যায় না।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৮

 

২০১৬-০৯-০৮ ১৮:২৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য