প্রিয় পাঠক! বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র 'ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কালজয়ী বিপ্লব'- শীর্ষক আলোচনার পঞ্চম পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

মহররমের চাঁদ এল ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়।

ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়।।

কাঁদিয়া জয়নাল আবেদীন বেহোঁশ হ’ল কারবালায়।

বেহেশতে লুটিয়া কাঁদে আলি ও মা ফাতেমায়।।

..কাঁদে বিশ্বের মুসলিম আজি, গাহে তারি মর্সিয়া।

ঝরে হাজার বছর ধরে অশ্রু তারি শোকে হায়।।

(কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী গান)

গত কয়েকটি আলোচনায় আমরা ইসলামের সঙ্গে ও নবী-বংশ তথা বনি হাশিম বংশের সঙ্গে বনি-উমাইয়ার জাত-শত্রুতা বা অতি পুরনো শত্রুতার নানা দিক তুলে ধরেছি। এ প্রসঙ্গে এটা উল্লেখ করা যায় যে, কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার মহান সঙ্গীরা যখন শাহাদত বরণ করেন তখন ইয়াজিদ খুশি হয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিল যেখানে সে স্পষ্টভাবে এটা উল্লেখ করে যে " হুসাইনকে হত্যার মাধ্যমে আমরা উমাইয়ারা মুহাম্মাদকেই হত্যা করেছি এবং বদর, উহুদ ও খন্দকের প্রতিশোধ নিয়েছি।" আসলে বনি উমাইয়াদের অনেকেই কেবল মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন জিহাদে, বিশেষ করে বদর, উহুদ ও খন্দকে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)'র হাতে তৎকালীন কাফিরদের বড় বড় ব্যক্তিত্বরা নিহত হওয়ায় এবং তাদের অনেকেই বনি উমাইয়া গোত্রের লোক ছিল বলে সেই বংশীয় বা গোত্রীয়-ক্ষোভ তাদের মধ্যে সুপ্ত ছিল। উমাইয়াদের অনেকেই বা বেশিরভাগই মক্কা বিজয়ের পর শক্তিহীন হয়ে পড়ায় প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে টিকে থাকার আশায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপায়হীন হয়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।

আবু সুফিয়ানসহ অনেক উমাইয়া নেতা ইসলামের সঙ্গে শত্রুতায় সবচেয়ে অগ্রণী ছিল। তাই তারা ভেতর থেকেই ইসলামের ওপর আঘাত হানার দীর্ঘ মেয়াদী ষড়যন্ত্র করে যাতে এক সময় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব তাদের হাতেই চলে আসে। 

ইসলামী বর্ণনায় এসেছে,  কোনো এক সময় মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, বনী উমাইয়্যা তাঁর মিম্বরে বানরের মত নাচানাচি করছে। এ স্বপ্ন দেখে তিনি এমনই শোকাহত হলেন যে, এরপর যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি আর হাসেননি। তাঁর এই স্বপ্ন দেখার পর পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ৬০ নম্বর আয়াত নাজেল হয়েছিল। ওই আয়াতে বলা হয়েছে:  

“এবং (স্মরণ কর) যখন আমরা তোমাকে বলেছিলাম যে, নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং আমরা তোমাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম  তা কেবল মানুষের জন্য পরীক্ষার মাধ্যম ছিল এবং কুরআনে বর্ণিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও। আমরা মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকি, কিন্তু তা তাদের চরম ঔদ্ধত্যকেই কেবল বৃদ্ধি করে।”

তাফসিরে তাবারিসহ কয়েকটি সুন্নি সূত্রমতে, কুরআনে উল্লিখিত ওই “অভিশপ্ত বৃক্ষ” বলতে আবু সুফিয়ানের বংশধর তথা উমাইয়াদের বোঝানো হয়েছে এবং রাসূল (সা.) স্বপ্নে তাঁর মিম্বরে বানরদের নাচানাচির যে ঘটনাটি দেখেছিলেন তার অর্থ উমাইয়াদের মাধ্যমে খেলাফত দখল করা হবে। 

ইমাম হুসাইন (আ) মদিনা থেকে মক্কায় আসার পর বসরার জনগণের উদ্দেশ্যেও এক চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিতে তিনি তার নানা বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা)'র সুন্নাত পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে তার পরিবর্তে বেদাআত বা কুপ্রথা চালু হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় তিনি সংগ্রাম বা বিপ্লবে অংশ নিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান যাতে ইসলামকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। তিনি জানতেন এই সংগ্রামের পথে পবিত্র ব্যক্তিদের রক্ত ও জীবন দান ইসলামের জন্য মহাকল্যাণ বয়ে আনবে, অন্যদিকে ইসলামের শত্রুদের ঘটবে নৈতিক পরাজয়।

কুফা ও বসরার জনগণ যদি ইয়াজিদি শাসকগোষ্ঠীর প্রচারণা ও হুমকিতে বিভ্রান্ত   না হয়ে ইমাম হুসাইন (আ) এবং তাঁর আন্দোলনের প্রতি তাদের আনুগত্য ও ভালবাসায় অবিচল থাকতো তাহলে ঘটে যেতো একটি সফল ইসলামী বিপ্লব। কিন্তু কুফা ও বসরার জনগণ ইমামের প্রতি যথাসময়ে আনুগত্য দেখাতে সক্ষম হয়নি। অথচ মূলত কুফার জনগণই হাজার হাজার চিঠি পাঠিয়ে ইমামকে  জালিম উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।  

ইমাম হুসাইন যখন ইরাকের দিকে যাচ্ছিলেন তখন এক স্থানে কবি ফারাজদাক ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইমাম তার কাছে কুফাবাসীদের মনোভাব সম্পর্কে জানতে চান। ফারাজদাক বলেন, তাদের হৃদয় আপনার সঙ্গে থাকলেও তরবারিগুলো রয়েছে উমাইয়াদের পক্ষে।  ইমাম বললেন, 'তুমি ঠিকই বলছ, সবই মহান আল্লাহর ওপর নির্ভর করছে। আমরা তারই সাহায্য চাই।' এরপর ‘জারুদ’ অঞ্চলে আসার পর তিনি কুফায় তার পাঠানো প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিল ও আহলে বাইতপন্থী নেতা হানি ইবনে উরওয়ার শহীদ হওয়ার খবর পান। ইমাম ও তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীরা শোকাহত হন। ইমাম এ দুই মহান শহীদের জন্য দোয়া করেন। 

‘জুবালাহ’ নামক স্থানে এসে ইমাম হুসাইন (আ) খবর পান যে কুফায় পাঠানো তার দ্বিতীয় প্রতিনিধি আবদুল্লাহ ইয়াকতারকেও ইয়াজিদের গভর্নর ইবনে জিয়াদ শহীদ করেছে। ইমাম এখানেই ঘোষণা করেন যে যারা তাঁর এই মিশন তথা ইসলামকে রক্ষার বিপ্লবের জন্য জীবন দেয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই কাফিলায় যোগ দিয়েছে তারা যেন এখনই সরে পড়ে। এরপর ‘শারিফ’ অঞ্চল হয়ে ইমামের কাফেলা পৌঁছে ‘দুহসম’ এলাকায়। এখানেই ইবনের জিয়াদের সেনা কর্মকর্তা  ‘হোর আর রিয়াহি’ (রা) এক হাজার সেনা নিয়ে ইমাম হুসাইনকে (আ) বাধা দেন। ইমাম হোরের সেনাবাহিনীকে পানি সরবরাহের নির্দেশ দিলে তা পালন করা হয়। হোর ইমামকে ইয়াজিদের গভর্নর ইবনে জিয়াদের একটি ফরমান দেখান যাতে বলা হয়েছে ইমামকে যেন মদীনায় ফিরে যেতে বাধা দেয়া হয় অথবা তাঁকে গ্রেফতার করে যেন কুফায় আনা হয়। ইমাম তাকে জানান যে কুফার জনগণই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাদেরকে নেতৃত্ব দিতে ও মুক্তি দিতে। তোমরা কুফার লোকেরা যদি আমাকে পছন্দ না কর তাহলে আমি ফিরে যাব। এরপর হোরের সেনাদল নীরব থাকে এবং ইমাম জোহরের নামাজ পড়তে চান। ইমাম হোরকে বলেন তুমি তোমার সেনাদের নিয়ে নামাজ পড়। কিন্তু  হোর বলেন আমরা আপনার পেছনেই জামাআতে নামাজ আদায় করব। এভাবে সম্মিলিতভাবেই আদায় করা হয় জোহরের নামাজ।  

নামাজ শেষে ইমাম নবীর আহলে বাইতের মর্যাদা ও যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন এবং কুফাবাসী তাদের সিদ্ধান্ত বদল করে থাকলে তিনি ফিরে যাবেন বলে আবারও জানান। ইমাম হুসাইন (আ) হোরকে কুফাবাসীদের পাঠানো চিঠির স্তূপ দেখান। হোর জানান যে ইমামকে কুফায় ইবনে জিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়াই তার দায়িত্ব। ইমাম বললেন, এর আগে মৃত্যুই উত্তম! এরপর ইমাম ফিরে দাঁড়ালেন ও সহযোগীদের যাত্রা শুরু করতে বললেন।  কিন্তু হোর তাদের বাধা দিলেন। ইমাম রাগ করে বললেন, তোমার মা তোমার জন্য শোক প্রকাশ করুক, কি চাও তুমি আমাদের কাছ থেকে? হোর বললেন, আপনি ছাড়া অন্য কেউ এভাবে আমার সঙ্গে কথা বললে আমি একইভাবে জবাব দিতাম। কিন্তু আপনি নবীর নাতি ও হযরত ফাতিমা আপনার মা বলে আমি তা করতে পারি না। আপনি এমন এক পথ ধরুন যা কুফাগামীও নয় ও মদিনাগামীও নয়। আর ততক্ষণে আমি ইবনে জিয়াদের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছি দেখি তিনি কি নির্দেশ দেন। আল্লাহ আমাকে এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা করুক।

ইমাম হুসাইন (আ)’র কাফেলা এগিয়ে যেতে থাকে। হুরের বাহিনীও চলছে এই কাফেলার পেছনে। ‘বায়জাহ’ নামক স্থানে ইমাম হোরের সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন: ‘হে জনগণ!।  মহান আল্লাহর রাসুল (সা) বলেছেন, যে কেউ একজন জালিম শাসককে এ অবস্থায় দেখতে পায় যে সে হারামকে হালাল করছে, ওয়াদা লঙ্ঘন করছে,নবী-রাসুলদের সুন্নাত-বিরোধী কাজ করছে, জুলুম ও অবিচার করছে। অথচ এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কথা বা কাজের কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সে। এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ সেখানেই প্রবেশ করাবেন যেখানে প্রবেশ করে জালিম। আসলে এই লোকেরা শয়তানের অনুসরণ করছে এবং আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে দিয়েছে। তারা অশান্তি বা নৈরাজ্য ছড়িয়ে দিয়েছে এবং ত্যাগ করেছে সব বিধান। তারা সম্পদের অপব্যবহার করছে এবং হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করছে। অন্য যে কোনো ব্যক্তির চেয়ে আমিই নেতৃত্বের জন্য বেশি উপযুক্ত। তোমাদের চিঠি আমার কাছে এসেছে। তোমাদের নানা প্রতিনিধি আমার কাছে এসে আনুগত্য করার প্রস্তাব দিয়েছে এবং তোমরা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না বলে তারা বলেছিল। আর আমি তোমাদের নেতৃত্ব দিলে তোমরা সফল হবে বলে তারা বলেছিল। আমি হুসাইন আলী ও আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার সন্তান। আমার প্রাণ তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, আমার পরিবার তোমাদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে এবং আমি তোমাদেরই একজন। তোমরা যা বলেছ তা যদি না কর ও তোমাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ ও আমার প্রতি আনুগত্য ত্যাগ কর তাহলে তা আমার জন্য বিস্ময়ের কিছু হবে না। তোমরা একই কাজ করেছ আমার বাবা, আমার ভাই ও আমার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। তোমরা যদি একই আচরণ কর তাহলে তোমরা তোমাদের সুযোগ হারালে ও ছেড়ে দিলে তোমাদের অংশ। যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সে নিজের বিরুদ্ধেই তা করে। তোমাদের প্রতি সালাম। ’  

এরপর ইমাম এলেন নেইনাভায়। এখানে  ইবনে জিয়াদের একটি ফরমান পেলেন হোর। ইমাম যেন মরুময় ও পানিশূন্য স্থান ছাড়া লোকালয়ের কোথাও শিবির প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন সে নির্দেশ ছিল এ ফরমানে।   এ অবস্থায় ইমাম বললেন, আমরা তাহলে নেইনাভা বা ক্বাজারিয়ায় যাই। ইমামের সঙ্গী জুহাইর বলেন, সেখানে ফোরাতের পাশে একটি গ্রাম আছে ও আছে একটি দুর্গ। আমরা সেখানে যেতে পারি। স্থানটির নাম ‘আক্ র’। ইমাম বললেন, আমি এই জায়গা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। এরপর ইমাম হোরকে বললেন আমাদেরকে আরেকটু এগিয়ে যেতে দাও। হোর রাজি হলেন। এরপর ইমামের কাফেলা পৌঁছল কারবালায়। পিছে পিছে এল হোরের বাহিনী। এখানে ইমামের কাফেলার ঘোড়াগুলো থেমে গেল। ইমাম হুসাইন (আ) জুহাইরকে প্রশ্ন করলেন: এই জায়গাটার নাম কি? জুহাইর বললেন, এই স্থানকে কারবালাও বলা হয়। শুনে ইমামের চোখ পানিতে ভরে গেলো। তিনি বললেন: ‘হে আল্লাহ আমি কার্ব বা দুঃখ এবং বালা বা দুর্যোগ থেকে তোমার আশ্রয় চাইছি। এখানেই আমাদের শিবির বা তাঁবু বসাব। এখানেই আমাদের রক্ত ঝরানো হবে। এখানেই হবে আমাদের কবর যা আমার নানা আমাকে বলেছিলেন’।  #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১০

২০১৬-১০-১০ ১৭:০৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য