“তীব্র ব্যথায় ঢেকে ফেলে মুখ দিনের সূর্য অস্তাচলে/ডোবে ইসলাম –রবি এজিদের আঘাতে অতল তিমির তলে, কলিজা কাঁপায়ে কারবালা মাঠে ওঠে ক্রন্দন লোহু সফেন/ওঠে আসমান জমিনে মাতম ; কাঁদে মানবতা হায় হোসেন” 

নিঃসন্দেহে কারবালার মর্ম বিদারী ঘটনা মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া অজস্র ঘটনাবলীর মধ্যে শিক্ষা ও গুরুত্বের দিক থেকে অনন্য। এটা এমন এক মহা-বিস্ময়কর ঘটনা, যার সামনে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ বিশ্বের মহান চিন্তাবিদরা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন, পরম বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তারা স্তুতি-বন্দনায় মুখরিত হয়েছেন এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগের। কারণ, কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের মহানায়করা ‘অপমান আমাদের সয় না’ -এই স্লোগান ধ্বনিত করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যায় হাতে গোনা হওয়া সত্ত্বেও খোদায়ী প্রেম ও শৌর্যে পূর্ণ টগবগে অন্তর নিয়ে জিহাদ ও শাহাদাতের ময়দানে আবির্ভূত হন এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার অধঃজগতকে পেছনে ফেলে উর্ধ্বজগতে মহান আল্লাহর সনে পাড়ি জমান। তারা নিজ কথা ও কাজের মাধ্যমে জগতবাসীকে জানিয়ে দিয়ে যান যে, ‘‘যে মৃত্যু সত্যের পথে হয়, তা মধুর চেয়েও সুধাময়।’’

কিংবা কবির ভাষায়: 

                        জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনি জানি

                        শহীদী রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানি।

১০ মহররমের রাত

কারবালা ঘটনার একপিঠে রয়েছে পাশবিক নৃশংসতা ও নরপিশাচের কাহিনী এবং এ কাহিনীর হোতা ছিল ইয়াজিদ, ইবনে সা’দ, ইবনে জিয়াদ এবং শিমাররা। আর অপর পিঠে ছিল একত্ববাদ, দৃঢ় ঈমান, মানবতা, সাহসিকতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় আত্মদানের কাহিনী। আর এ কাহিনীর হোতা আর ইয়াজিদরা নয়, বরং এ পিঠের নায়ক হলেন শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ.),তার ভগ্নি হযরত জাইনাব এবং তার ভাই হযরত আব্বাসরা,যাদেরকে নিয়ে বিশ্বমানবতা গৌরব করতে পারে। তাই কারবালা ঘটনার সমস্তটাই ট্রাজেডি বা বিষাদময় নয়।

কারবালা বিপ্লবের বহু বিষাদময় ও তিক্ত ঘটনা এবং অসহনীয় যাতনা সয়ে ইমাম হুসাইন (আ)'র বোন ধৈর্যের অবিচল পাহাড়ের মত মনোবল নিয়েই নবী পরিবারের ধৈর্য ও মহান আল্লাহর প্রতি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্টির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বলেছিলেন, এইসব ঘটনায় ইমাম শিবিরের দিক থেকে আমি বা আমরা সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।

মহান বীর হলো সেই ব্যক্তি সমস্ত মনুষ্যত্বও মানবতার জন্যে নিজের সাহস প্রয়োগ করে ঠিক যেভাবে সূর্য তার আলো দিয়ে সমস্ত জাতি ও সব মানুষকেই উপকার প্রদান করে।

কারবালা বিপ্লবের আরেকটি মহান বৈশিষ্ট্য হল এ বিপ্লব যে অনুষ্ঠিত হবে তা ছিল  মানুষের ধারণাতীত। এ ছিল ঘন অন্ধকারের মধ্যে এক খণ্ড আলোর ঝলকানি, ব্যাপক জুলুম-স্বৈরাচারের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার বজ্র আওয়াজ, চরম স্থবিরতার মধ্যে প্রকাণ্ড ধাক্কায় নিস্তব্ধ নীরবতার মধ্যে হঠাৎ গর্জে ওঠা। ঠিক যেভাবে  নমরুদের মতো একজন অত্যাচারী শোষক পৃথিবীকে গ্রাস করার পর হঠাৎ একজন ইবরাহীমের (আ.) আবির্ভাব ঘটে ও নমরুদের কাল হয়ে দাঁড়ায়।

আর আজ স্বৈরাচারী উমাইয়া সরকার স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্যে সকল সাজ-সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। এমন কি ধর্মকে ভাঙ্গিয়েও স্বৈরতন্ত্রের ভিত গাড়তে উদ্যত হয়েছে, দুনিয়ালোভী হাদিস বর্ণনাকারীদেরকে টাকা দিয়ে কিনে তাদের সপক্ষে হাদিস জাল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। 

বনি উমাইয়ার কেউ কেউ ইমাম হুসাইনকে (আ.) হত্যা করতে পারার জন্যে শোকর আদায়স্বরূপ একাধিক মসজিদ নির্মাণ করেছিল।মানুষকে কতো জঘন্য মাত্রায় বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।

আশুরার রাত

এ রকম এক বিপর্যয়ের মুহূর্তে ইমাম হুসাইন (আ.) মুক্তির মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে এলেন। যখন মানুষের বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, মানুষের মতামত প্রকাশের কোনো সাহস ছিল না। কোনো সত্যি কথা বলাও যখন কারও সাহসে কুলাতো না,এমন কি এর কোনো প্রতিরোধ অবাস্তবে পরিণত হয়-ঠিক সে মুহূর্তে ইমাম হুসাইন (আ.) বীরদর্পে বিরোধিতায় নামলেন, বজ্রকন্ঠে সত্যবাণীর স্লোগান তুলে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিলেন। খোদাদ্রোহী স্বৈরাচারীর মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দিলেন। আর এ কারণেই তার আন্দোলন মহিমা লাভ করেছে। তার আন্দোলন কালের গণ্ডী ছাড়িয়ে যুগ-যুগান্তরের মুক্তিকামী ও সত্যান্বেষী মানুষের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়েছে। 

তৃতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি হুসাইনী আন্দোলনকে মহতী ও পবিত্র করেছে তা হলো ইমাম হুসাইনের (আ.) দূরদর্শিতা ও উন্নত চিন্তাধারা। অর্থাৎ এ আন্দোলন এ কারণেই মহান যে, আন্দোলনকারী যা বুঝতে ও দেখতে পারছেন তা অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না। ঐ প্রবাদ বাক্যটির মতো বলতে হয় যে,অন্যরা আয়নায় যা দেখতে পাচ্ছে না তিনি খড়কুটোর মধ্যেই তা দেখছেন। তিনি তার একাজের সুদূর প্রসারী ভাব দেখতে পাচ্ছেন। তার চিন্তাধারা ছিল সমসাময়িক যে কানো চিন্তাশীল লোকের ঊর্ধ্বে। 

ইবনে আব্বাস, ইবনে হানাফিয়া,ইবনে উমর প্রমুখ হয়তো পুরোপুরি নিষ্ঠার সাথে ইমামকে (আ.) কারবালায় যেতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের চিন্তার মান অনুযায়ী ইমামকে বাধা দেয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হুসাইন (আ.) যা দেখেছিলেন তারা তা দেখতে পাচ্ছিলেন না। তারা অত্যাসন্ন বিপদকেও যেমন অনুভব করছিলেন না তেমনি এ ধরনের আন্দোলন ও বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী ভাবকেও অনুধাবন করতে পারছিলেন না। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) সবকিছুই দিনের আলোর মতো দেখছিলেন। তিনি একাধিকবার বলেছেনঃ ওরা আমাকে হত্যা করবেই;আর আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, আমাকে হত্যার পর ওদের অবস্থা বিপন্ন হবে। এ ছিল ইমাম হুসাইনের (আ.) তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতা।

ইমাম হুসাইন (আ.) এক মহান ও পবিত্র আত্মার নাম। মূলত যখন কোন আত্মা মহান হয় তখন তা বেশী কষ্টের সম্মুখীন হয়। কিন্তু ছোট আত্মা বেশি নির্ঝঞ্জাটে থাকে। এ এক সার্বিক নিয়ম। ইবনে আব্বাসরা যদি ইমাম হুসাইনকে (আ.) বাধাও দেয় তবুও কি তিনি বিরত হতে পারেন! আরবের খ্যাতনামা কবি ‘মোতানাববী’ এ প্রসঙ্গে সুন্দর একটি উক্তি করেছেন, তিনি বলেন :

‘‘যখন কোনো আত্মা মহান হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সে অন্যদের পরিত্রাণে ছোটে,অন্যদের জন্যে কষ্ট ও যন্ত্রণা বরণ করে নেয়। কিন্তু যার আত্মা ছোট সে কেবল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকে।’’ (দিওয়ানে মোতানাববীঃ ২/২৬৭) ছোট আত্মা একটু ভাল খাবারের জন্যে চাটুকারও হতে রাজি। ছোট আত্মা ক্ষমতা বা খ্যাতির লোভে হত্যা-লুণ্ঠনও করতে রাজি। কিন্তু যার রয়েছে মহান আত্মা, সে শুকনো রুটি খেয়ে তৃপ্ত হয়,তারপর ঐ সামান্য আহার শেষে সারারাত জেগে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়। নিজের দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র গাফলতি করলে ভয়ে তাঁর শরীর কাপতে থাকে। যার আত্মা মহান সে আল্লাহর পথে ও স্বীয় মহান লক্ষ্যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে চায়। আর এ পথে যখন সফলকাম হয় তখন আল্লাহকে শোকর করে। আত্মা মহান হলে আশুরার দিনে,এক শরীরে তিনশ’ ক্ষত সহ্য করতে হয়। যে শরীর ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয় সে একটি মহান আত্মার অধিকারী হওয়ার অপরাধেই জরিমানা দেয়, বীরত্ব,সত্য-প্রেম এবং শহীদী আত্মার জন্যই জরিমানা দেয়।

ইমাম হুসাইনের মত মহাপুরুষের মহান আত্মা বলে ওঠে: আমি আমার রক্তের মূল্য দিতে চাই। শহীদ সে ব্যক্তি যে নিজ ঈমান ও আকীদা রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, যে নিজের জন্যে তো নয়ই বরং মনুষ্যত্ব ও মানবতার স্বার্থে, সত্য ও হাকিকতের স্বার্থে মহান আল্লাহর পথে চরম দুঃখ-দুর্দশা এমন কি মৃত্যুকেও সাদরে বরণ করে নেয়। শহীদ তার বুকের রক্ত দিতে চায় যেমনভাবে একজন ধনী তার ধনকে ব্যাংক বন্দী না করে তা সৎপথে দান-খয়রাত করে নিজ ধনের মূল্য দিতে চায়। সৎপথে ব্যয়িত প্রতিটি পয়সা যেমন লক্ষ -কোটি পয়সার মতো মূল্য লাভ করে তেমনি শহীদের প্রতি ফোটা রক্ত লক্ষ-কোটি ফোটায় পরিণত হয়।

অনেকে হয়তো ধারণা করতে পারে যে, একজন লেখক বা একজন ধনী কিংবা একজন শিল্পীর সেবাই সবচেয়ে বেশী। কিন্তু আসলে এ ধারণা একবারেই ভুল। শহীদদের মতো কেউই মানুষকে তথা মানবতাকে সেবা করতে পারে না। শহীদরাই সমস্ত কণ্টকময় পথ পেরিয়ে মানবতার মুক্তি ও স্বাধীনতাকে বয়ে নিয়ে আসে। তারাই ন্যায়-নীতিবান ও শান্ত সমাজ গড়ে দিয়ে যায় যাতে জ্ঞানীর জ্ঞান, লেখকের কলম, ধনীর ধন, শিল্পীর শিল্প সুস্থ পরিবেশে বিনা বাধায় বিকাশ লাভ করতে পারে এবং মানবতা নিশ্চিন্তে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। শহীদরাই প্রদীপের মতো একটি পরিবেশকে আলোকিত করে রাখে যাতে সবাই অনায়াসে পথ চলতে পারে।

পবিত্র কোরআন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে একটি প্রদীপের সাথে তুলনা করেছে।

আজকে ইবনে সিনা-ইবনে সিনা হতো না, শেখ সাদী-শেখ সাদী হতো না, জাকারিয়া রাজী-জাকারিয়া রাজী হতে পারতো না যদি শহীদরা তাজা রক্ত খরচ করে ইসলামের চারাগাছকে সজীব না করতেন, ইসলামী সভ্যতাকে বাঁচিয়ে না রাখতেন। তাদের সমস্ত অস্তিত্বে একত্ববাদ, খোদাভীতি,ন্যায়পরায়ণতা,সৎসাহস আর বীরত্বে ভরপুর। তাই আমরা আজ যারা মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি তারা সবাই এ শহীদদের প্রতি ঋণী। ইমাম হোসাইনের (আ.) রক্তের প্রতি নবীজীর (সা.) উম্মত ঋণী।

ইমাম হোসাইনের (আ.) প্রতিটি কথায় মনুষ্যত্ব ও মানবতার ইজ্জত সম্মান এবং মর্যাদা প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ,‘‘সম্মানের মৃত্যু অপমানের জীবনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’’

অন্য এক বাণীতে ইমাম হুসাইন বলেছেন: যারা দুনিয়া নিয়ে মত্ত এবং দুনিয়ার দাসত্ব করে তারা আসলে জানে না যে, এসব কিছু‘লুমাযাহ’র মতো। মানুষের দাঁতের ফাঁকে গোস্ত কিংবা বেঁধে যাওয়া খাদ্য টুকরোকেই ‘লুমাযাহ’ বলে।  ইমাম হোসাইনের (আ.) চোখে ইয়াজিদ, ইয়াজিদের হুকুমত, ইয়াজিদের দুনিয়া সবকিছুই ঐ এক টুকরো লুমাযাহর মতো।

কারবালার পথে অনেকেই ইমাম হুসাইনকে (আ.) বলেছে যে, এ পথ বিপজ্জনক? আপনি বরং ফিরে যান। ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের জবাবে এ কবিতা পড়েনঃ

‘‘আমাকে যেতে নিষেধ করছো? কিন্তু আমি অবশ্যই যাবো। আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাও? ... শ্রেষ্ঠতম কাজ অর্থাৎ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যে মৃত্যু ঘটে তা অপমানের হতে পারে না! ... কিন্তু জেনে রেখো যে জীবনের জন্যে সবচেয়ে অপমান হলো কেউ বেঁচে থাকবে বটে, কিন্তু লোকে তার কান ধরে উঠাবে আর বসাবে।’’  ‘তোমরা চোখে দেখছো না যে সত্যকে মেনে চলা হচ্ছে না ও বাতিলের বিরুদ্ধেও কেউ কিছু বলছে না?’  ‘‘আমি মৃত্যুকেই আমার জন্যে কল্যাণকর এবং জালেমদের সাথে বেঁচে থাকাকে অপমানজনক ও লজ্জাজনক বলে মনে করি।’’

ইমাম হুসাইন (আ)'র শাহাদতের মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই তাঁর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। ইয়াজিদ বাহিনীর এক ঘাতক সেনা বলেছিল, জীবনের শেষ মুহূর্তে ইমামের চেহারায় প্রশান্তি ও ঔজ্জ্বল্যের দীপ্তি আমাকে অনেকক্ষণ উদাসীন করে রেখেছিল। 

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মানব জাতির মুক্তির দিশারী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, হুসাইন আমা থেকে ও আমি হুসাইন থেকে। বিশ্বনবী (সা.) আরো  বলেছেন, তাঁকে মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে শাহাদতের মাধ্যমে হুসাইন (আ.) এমন এক মর্যাদা পাবেন যে তার কাছাকাছি যাওয়া অন্য কারো জন্য সম্ভব হবে না"।মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে, তার উত্তাপ কখনও প্রশমিত হবে না।" যারা হুসাইনের জন্য কাঁদবে তাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও দিয়ে গেছেন বিশ্বনবী (সা.)।

ইমাম হুসাইনের জন্য সর্বপ্রথম শোকগাথা রচনা করেছিলেন হযরত জাইনাব (সা.)। ইমামের শাহাদত ও  নবী-পরিবারের সদস্যদের তাবুতে আগুন দেয়া এবং শহীদদের লাশের ওপর ঘোড়া দাবড়ানোর ঘটনার পর তিনি বলেছিলেন:

“হে মুহাম্মাদ (সা.)! হে মুহাম্মাদ(সা.)! আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা তোমার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠায়। আর এই তোমার আদরের হুসাইন, কী ভীষণভাবে লাঞ্ছিত, অবহেলিত, রক্তাপ্লুত খণ্ডিত লাশ হয়ে আছে!  আল্লাহর কাছে নালিশ জানাচ্ছি। হে মুহাম্মাদ (সা.)! তোমার কন্যারা আজ বন্দিনী, তোমার জবাই করা পরিবার আজ অপেক্ষা করছে পূবের হাওয়ার জন্য, কখন ধুলো এসে তাঁদের ঢেকে দেবে!”

হযরত জাইনাব (সালামুল্লাহি আলাইহার) মর্মভেদী বিলাপ শত্রু-মিত্র সবাইকে অশ্রু-সজল করে তুলেছিল। হযরত যেইনাব (সা.)’র বিলাপ ও বাগ্মীতাপূর্ণ ভাষণ কাঁপিয়ে তুলেছিল কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবার এবং দামেস্কে ইয়াজিদের দরবার। তাঁর ভাষণ জনগণের ঘুমিয়ে পড়া চেতনায় বিদ্যুতের প্রবাহ ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভীত-সন্ত্রস্ত ইয়াজিদ নবী-(সা.)’র পরিবারকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়।

নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া -

আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া,

কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে?

সে কাঁদনে আঁসু আনে সিমারেরও ছোরাতে।

রুদ্র মাতম ওঠে দুনিয়া দামেস্কে -

জয়নালে পরালো এ খুনিয়ারা বেশ কে ?

হায় হায় হোসেনা ওঠে রোল ঝঞ্ঝায়,

তলোয়ার কেঁপে ওঠে এজিদের পঞ্জায়

উন্মাদ দুল দুল ছুটে ফেরে মদিনায়

আলীজাদা হোসেনের

দেখা হেথা যদি পায়।

মা ফাতিমা আসমানে কাঁদি খুলি

কেশপাশ

বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের

শ্বেতবাস

রণে যায় কাসিম ঐ দু'ঘড়ির নওশা

মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা !

‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা----

‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেল সকীনা !’

কাঁদে কে রে কোলে ক’রে কাসিমের কাটা-শির ?

খান্ খান্ হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর !

কেঁদে গেছে থামি’ হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,

বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র !

গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,

“আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা !”

নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,

কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার !

দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস,

পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্ মনও ‘সাব্বাস্’ !

দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,

হাঁকে বীর “শির দেগা, নেহি দেগা আমামা ! #

..................................................

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১৩

 

২০১৬-১০-১৩ ২১:৩৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য