মানুষের জীবন যাপনের প্রণালী মানুষকে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের দিকে টেনে নেয়। মুক্তি ও সৌভাগ্যের পথ এবং দুর্ভাগ্য বা মন্দ পরিণতির পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। মানুষ তখনই পূর্ণতার পথ স্বাধীনভাবে ও সচেতনভাবে  নির্বাচন করতে পারে যখন সে জীবনের উত্থান-পতন এবং বিচ্যুতি সম্পর্কে সচেতন হয়।  আর এই সচেতনতা অর্জনের সুযোগ দেয়ার জন্যই নবী-রাসূলদের কাছে ধর্মগ্রন্থ পাঠিয়েছেন মহান আল্লাহ।

আর নবী-রাসূলগণ মানুষের পূর্ণতা ও সৌভাগ্য অর্জনের পথগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন বাস্তব কাজ এবং ব্যাখ্যা ও বর্ণনার মাধ্যমে যাতে জীবনের সব ক্ষেত্রে সঠিক পথের ওপর অবিচল থাকাসহ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ধরণ বা প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এভাবে নবী-রাসূলগণ মানুষকে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক ক্ষেত্রে পথের দিশা দিয়ে গেছেন। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন একের পর এক যাতে মানুষ তাদেরকে দেয়া আল্লাহর নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করে এবং তাঁরা বাস্তবতাগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুপথ দেখানোর জন্য করণীয় কাজ বা দায়িত্ব সম্পন্ন করেন যাতে কেউ বলতে না পারে যে আমার সামনে সত্যকে স্পষ্ট করা হয়নি।

অন্য কথায় নবী-রাসূলদের জীবনই হল মানুষের জন্য প্রকৃত মানুষ হওয়ার আদর্শ। পূর্ণ মানব হিসেবে তাঁরা কাজ ও শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে পরিশুদ্ধ এবং উন্নত করেন। যাই হোক, আজ আমরা কানাডার নওমুসলিম হানিফের মুসলমান হওয়ার কাহিনী তুলে ধরব।

হানিফ ছিলেন কানাডার অধিবাসী ও খ্রিস্টান। কয়েক বছর আগে তিনি মুসলমান হয়েছেন। তিনি মনে করেন একবিংশ শতকে আমেরিকা মহাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা বিপুল হারে বাড়বে। ইসলামের মূল কেন্দ্রগুলো থেকে অনেক দূরে থাকা সত্ত্বেও এই অগ্রগতি ঘটছে আমেরিকা মহাদেশে। আমেরিকায় মুসলমানদের মসজিদের সংখ্যা খুবই কম। তা সত্ত্বেও এই মহাদেশে অন্য যে কোনো ধর্মের চেয়ে দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করছে ইসলাম। হানিফের মতে, এর কারণ  হল, মানুষ তার প্রকৃতির দিকে ফিরে যেতে চায়। মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই ধর্ম ও প্রার্থনা ভালোবাসে। তারা আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে ভালোবাসে। মানুষ পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসার বন্ধনকে ভালোবাসে। কিন্তু পাশ্চাত্যে এই মূল্যবোধগুলো খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। এর কারণ, গত প্রায় ২০০ বছর ধরে পশ্চিমা সমাজ থেকে ধর্মকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে সেখানে এক ধরনের ধর্মহীন বা ধর্মের দিক-নির্দেশনাবিহীন স্যেকুলার সমাজ-ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

কানাডার নওমুসলিম হানিফের মতে, পাশ্চাত্যে মানুষের বস্তুগত সব সম্পদই আছে। কিন্তু নেই সামাজিক নিরাপত্তা এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সেখানকার নাগরিকদের নেই আত্মিক প্রশান্তি। পাশ্চাত্যের কেউ যদি নিজের পরিচিতিকে সত্যিকার অর্থে ব্যাখ্যা করতে চান তাহলে তিনি বলবেন যে শূন্যতাই আমার পরিচিতি। আর এ কারণেই পাশ্চাত্যে আত্মহত্যার হার এত বেশি বলে মনে করেন নওমুসলিম হানিফ।

তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "একই কারণে তথা আধ্যাত্মিক শূন্যটার কারণে পাশ্চাত্যের কেউ আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হতে চাইলে ইসলামের অনুপস্থিতির ফলে সৃষ্ট সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচ্যুতির দিকে এগিয়ে যায়। যেমন, এমন অনেককে দেখেছি যে তারা এখন শয়তানের পূজারি হয়েছেন। আমি বিস্মিত হই এটা দেখে যে, অনেকেই পশ্চিমা জীবন-পদ্ধতির গুণ-কীর্তন করছেন। তারা মনে করেন, সেখানে স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু তারা জানেন না যে, এই স্বাধীনতার গোড়া কোথায়। এই স্বাধীনতার অর্থ হল ধর্ম থেকে দূরে থাকা।"  

কানাডার নওমুসলিম হানিফ আরো বলছেন, "পাশ্চাত্য বলে ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার মাত্র, সামাজিক বিষয় নয়। অথচ ইসলামের একটি চমৎকারর বৈশিষ্ট্য হল ধর্ম ও পার্থিব বিষয়ের মধ্যে কোনো ব্যবধান নেই। ইসলামের বিধানগুলো মূলতঃ সমাজ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ইসলাম একটি বাস্তব ও একত্ববাদী ধর্ম। আর আমেরিকার জনগণের জন্য এটা খুব আকর্ষণীয় বিষয়।"

কানাডার নওমুসলিম হানিফের মতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিকসহ মানুষের জীবনের সব দিকের বিধান রয়েছে ইসলামে এবং এ ধর্ম সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। আর পশ্চিমা জনগণকে এ বিষয়টি খুব আকৃষ্ট করে। কারণ, ইসলাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো ধর্ম নয়। হানিফ বলেছেন,

"পশ্চিমা জনগণ আত্মিক বা আধ্যাত্মিক কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভব করছে তীব্র মাত্রায়। আর এই জন্যই তারা খুব দ্রুত ইসলামের শিক্ষায় মজে যাচ্ছেন। কারণ, ইসলাম খুব ভালোভাবে আধ্যাত্মিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় আমেরিকায় ইসলাম প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। কারণ, এতকাল পর্যন্ত আমেরিকায় বলা হয়েছে যে, ধর্ম রাজনীতি থেকে পৃথক। যখন বিশ্বের মানুষ এটা দেখল যে, ইরানের জনগণ ইসলামী শিক্ষার আলোকে বিপ্লব করেছে এবং একটি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করেছে তখন তারা গভীরভাবে এর মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে। এটা তাদের কাছে এক বিপুল বিস্ময়।"

এবারে আমরা পাশ্চাত্যের আরেকজন নও-মুসলিমের পরিচয় তুলে ধরব। নও-মুসলিম নারী ফাতিমা হল্যান্ডের অধিবাসী। মুসলমান হওয়ার আগে তার নাম ছিল কাটেরগি ভেন্ডারগ্রিন। ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেছেন:

"ইসলাম এমন একটি ধর্ম যার বৈশিষ্ট্য কেবলই আধ্যাত্মিকতা নয়। ইসলামে স্রস্টা বা খোদাকে কেবল কিছু ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতার জন্য দরকার হয় তা নয়, ইসলামে খোদা হচ্ছেন এমন এক মহান সত্ত্বা যিনি আমাদের কাছে ইসলামকে চিনিয়ে দেন এবং  যিনি সব সময় আমাদের সঙ্গে রয়েছেন সব স্থানেই। আল্লাহর ভালোবাসার বহ্নিশিখা আমাদের হৃদয়গুলোকে সব সময়ই উষ্ণ রাখে। ইসলাম একটি প্রগতিশীল ও বিশ্বজনীন ধর্ম। পবিত্র কুরআন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর বাণী। এই মহাগ্রন্থ হচ্ছে আল্লাহর নুরের উৎস যার থেকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে।"

পার্সটুডে/মু. আ. হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১৫

 

২০১৭-০২-১৫ ১৫:০০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য