চেলগিসের সন্ধানে যায় হারুত মারুতের শহরের শাহজাদার পাঠানো বুড়ি। বুড়ি এক রাতের কথা বলে তিন সপ্তা চেলগিসের বাসায় থেকে তার বিশ্বস্ততা অর্জন করে। সুযোগমতো তার কাছ থেকে আংটির রহস্য জেনে নেয়। বুড়ি আংটিটা তেখতে চাইলে চেহেলগিস বলে:আংটি তো আমার কাছে নেই, জাভনতিগের কাছে। বুড়ির কূটবুদ্ধিতে চেলগিস খানিকটা চিন্তায় পড়ে যায়। রাতে জাভনতিগ যখন বাসায় ফেরে চেলগিস আংটির ব্যাপারটা তোলে। জাভনতিগ আংটিটা চেলগিসের হাতে দিয়ে বলে যেন সাবধানে রাখে, কোনোভাবেই যেন না হারায়।

একরাতে চেলগিস এবং তার স্বামি দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে। এই ফাঁকে বুড়ি চেলগিসের পকেট থেকে আংটিটা বের করে নেয়। সেইসঙ্গে জাভনতিগের কোমর থেকেও ছুরিটা খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সমুদ্রে। তারপর আবার ফিরে এসে বসে চেহেলগিসের শিয়রে। বুড়ি বলে: হে সোলায়মানি আংটি! আমাদেরকে নিয়ে যাও হারুত ও মারুতের শহরে। সেখানে আমাদের নামিয়ে দাও। আংটি আদেশ পেয়েই বুড়ি এবং চেহেলগিসকে তুলে নিয়ে হারুত ও মারুতের শহরে নামিয়ে দিলো। বেড়াল, কবুতর এবং কুকুর শুধু থেকে গেল জাভনতিগের কাছে। জাভনতিগ বেহুশ হয়ে পড়ে ছিল মাটিতে। তার নক্ষত্রবিদ বন্ধু বুঝতে পেরেছিল যে আকাশ থেকে জাভনতিগের নক্ষত্রটি হারিয়ে গেছে।

নক্ষত্রবিদ বন্ধু বুঝতে পেরেই দ্রুত রওনা হলো দারিয়বোরের বাসার উদ্দেশ্যে। পৌঁছেই বললো: জাভনতিগ নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে। চলো দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব তার খোঁজে যাই। বলার সঙ্গে সঙ্গে দারিয়বোর উঠে দাঁড়ালো এবং দুজনেই এক সঙ্গে রওনা হলো জাভনতিগের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে যেতে তারা এক সময় পৌঁছে গেল জাভনতিগের বাসায়। বাসা যেতেই অদ্ভুত রকমভাবে বেড়াল কথা বলে উঠলো। বললো: তোমরা সমুদ্র থেকে ছুরিটা বের করে আনো। আমরা নিজেরাই যাবো চেহেলগিসের সন্ধানে। বলেই বেড়াল, কুকুর এবং কবুতর গেল চেহেলগিসের খোঁজে। যখন তারা হারুত ও মারুতের শহরে গিয়ে পৌঁছলো তাদের কানে এলো মিউজিকের শব্দ। বুঝতে পারলো যে চেহেলগিসের সঙ্গে শাহজাদার বিয়ের বাজনা বাজছে।

বেড়াল উপস্থিত অতিথিদের ভিড়ের ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গীদের নিয়ে পৌঁছে গেল চেলগিসের কাছে। চেলগিস বেড়ালকে দেখেই চিনতে পারলো এবং স্নেহের আদর বুলিয়ে দিলো তার গায়। বুড়ি বলে উঠলো: বেড়ালের গায়ে হাত দিয়ো না, অসুস্থ হয়ে পড়বে। চেহেলগিস আদেশ দিলো বুড়িকে যেন প্রাসাদ থেকে বের করে দেওয়া হয়। বেড়াল বুড়ির পেছনে পেছনে গেল। যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছলো একটা পরিত্যাক্ত স্থানে। বুড়ি কিছু খাবার কণের খাবার থেকে চুরি করেছিল সেই খাবারগুলো ওই পরিত্যাক্ত স্থানে মাটির নীচে পুঁতে রাখলো। তারপর আবারও যেতে লাগলো। কিন্তু বেড়াল সেখানেই থেকে গেল। একটু পরেই দেখলো ইঁদুরদের বাদশা এলো বুড়ির রেখে যাওয়া খাবারের খোঁজে।

বলছিলাম বিড়াল বুড়ির রেখে যাওয়া খাবারের কাছেই অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর ইঁদুররাজ এসে হাজির হলো খাবার খেতে। বেড়াল সুযোগমতো লাফ দিয়ে ইঁদুরের উপর পড়লো এবং ইঁদুরের ঘাড় কামড়ে বসলো। তারপর টেনে নিয়ে গেল বুড়ির থাকার ঘরে। সকল ইঁদুর সমবেত হলো যাতে বেড়াল তাদের রাজাকে খেতে না পারে। বেড়াল বললো: ঠিক আছে। তোমরা যদি আমাকে আমার মনিবের আংটিটা খুঁজে এনে দিতে পারো,যে আংটিটা ওই বুড়ি চুরি করে এনেছে, তাহলে তোমাদের রাজাকে খাবো না,ছেড়ে দেবো। ইঁদুরের দল বেড়ালের কথা শুনে হন্যে হয়ে ছুটলো এবং তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ালো, কিন্তু আংটির সন্ধান পেল না। অবশেষে খুব চালাক চতুর একটি ইঁদুর এলো। সে বললো: আমার মনে হয় বুড়ি আংটিটা উপরে ওই ঘরের পাটাতনের আড়ার নীচে রেখেছে। কেননা আমি একদিন বুড়িকে কিছু একটা লুকাতে দেখেছি ওখানে। আমি জিনিসটা নিতে চেয়েছি কিন্তু বুড়ি লাঠি দিয়ে এমন জোরে আঘাত করলো যে আমার একটা পা-ই ভেঙে গেল।

শোনামাত্র ইঁদুরের দল ছুটে গেল এবং একটা ছোট্ট পুটলি নিয়ে এলো। বিড়াল ওই পুটলিটা খুলে দেখলো-হ্যাঁ! সেই আংটিটাই। সঙ্গে সঙ্গে বিড়াল ওই ইঁদুররাজকে ছেড়ে দিলো। তারপর বিড়াল আংটিটা নিয়ে চলে গেল বিয়ের অনুষ্ঠানে এবং দ্রুত চেহেলগিসের হাতে দিলো। চেহেলগিস জামাইর কাছ থেকে অনুমতি নিলো দু'রাকআত নামাজ পড়ার জন্য। জামাই অনুমতি দিলো। চেহেলগিস জায়নামাজ নিয়ে চলে গেল ছাদের উপর। আংটিটা আঙুলে পরে বললো: হে সোলায়মানি আংটি আমাকে নিয়ে চলো সেই স্থানে যে স্থানটিকে তুমি ভালো করেই চেনো।

এদিকে জাভনতিগের বন্ধু দারিয়াবোর সারা সমুদ্র খুঁজে শেষ পর্যন্ত ছুরিটি পেলো। পানির ভেতর থেকে ছুরিটা বের করার সঙ্গে সঙ্গে জাভনতিগের হুঁশ ফিরলো। সে দ্রুত চেহেলগিসের সন্ধানে পা বাড়ালো। কিছুটা পথ গিয়েই দেখতে পেলো চেহেলগিস আর কবুতর উড়ে উড়ে আসছে আর কুকুর এবং বেড়াল আসছে লাফাতে লাফাতে, দৌড়াতে দৌড়াতে। চেহেলগিস তার স্বামিকে বললো: এখানে আর বসবাস করার সুযোগ নেই। চলো, জিনিসপত্র গুটিয়ে নিজেদের শহরে চলে যাই। জাভনতিগ রাজি হলো এবং ফিরলো যেভাবে এসেছিল। প্রথমে গেল বোনদের বাসায়। তাদেরকেও সঙ্গে নিলো। তারপর গেল দারিয়াবোরের বাসায়। তাকেও সঙ্গে নিলো। এরপর নক্ষত্রবিদের বাসায় গিয়ে তাকেও সঙ্গী করে সবাই মিলে রওনা হলো জাভনতিগের নিজের শহরে।

জাভনতিগের মা সন্তানদের কাছে না পেয়ে বুড়ি হয়ে গেল এবং অনেকটাই অন্ধ হয়ে গেল। সন্তানদেরকে তাই চিনতে পারলো না। চেহেলগিস তার হাত দিয়ে শ্বাশুড়ির মাথায় চোখে মুখে বুলিয়ে দিলো। অমনি বুড়ি আগের মতো তরুণী হয়ে গেল, দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। তারপর থেকে সবাই মিলে একসাথে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।* (সমাপ্ত)

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/টি-১১০.২/অ-১১৬/ই-৩২

 

২০১৭-০২-২২ ১৭:০১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য