রংধনু আসরের এ পর্বে আমরা ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ উপলক্ষে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। অনুষ্ঠানের প্রথমেই রয়েছে নওরোজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা। এরপর নওরোজ ও বসন্ত ঋতু সম্পর্কে একটি ফার্সি গান। এছাড়া থাকবে দুটি ছোট গল্প এবং হুদহুদ পাখি সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, নওরোজ হচ্ছে ইরানের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ‘নওরোজ’ একটি ইরানি উৎসব হলেও ভারত উপমহাদেশে বিশেষকরে মোগল আমলে জাঁকজমকের সাথে তা পালিত হতো। এখনও আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, আযারবাইজান, কুর্দিস্তান এবং কোনো কোনো আরব ও ইউরোপীয় দেশে নওরোজ উৎসব পালন করা হয়ে থাকে।

নওরোজ উৎসব বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য শান্তি, মৈত্রী ও সুখ-সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে আনে। আর এ কারণেই জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১০ সালে নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। ওই সংস্থা নওরোজ উৎসবের প্রথম দিনকে 'বিশ্ব নওরোজ উৎসব' হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানতে চাচ্ছো 'নওরোজ' শব্দটির অর্থ কী? ফার্সি ‘নওরোজ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে 'নতুন দিন'। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ‘নওরোজ’ সম্পর্কে বলেছেন, ‘নওরোজ বা নববর্ষ মহান প্রতিপালকের সামনে মানুষের দাসত্ব ও বিনম্রতা প্রকাশের মাধ্যম। নওরোজ হল নব-উদ্ভাবন বা সৃষ্টিশীলতা, সজীবতা, তারুণ্য ও প্রফুল্লতার প্রতীক। একইসঙ্গে এই উৎসব পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও ভাইয়ে-ভাইয়ে হৃদ্যতা, আত্মীয়-স্বজনের পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি, পরিচিতজন ও বন্ধুদের মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার প্রতীক।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে, কোনো কোনো দেশে নওরোজ উৎসব কেবল একটি প্রাচীন উৎসব মাত্র। ইরানে ইসলাম-পূর্ব যুগেও এই উৎসবের ছিল বেশ কিছু সুন্দর প্রথা ও আনুষ্ঠানিকতা। অবশ্য এর পাশাপাশি কিছু কুসংস্কারও প্রচলিত ছিল। ইরানে ইসলাম আগমনের পর নওরোজের মধ্যে বেশ কিছু মূল্যবান আচার-অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এবং এ উৎসব পরিণত হয় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক মোক্ষম সুযোগে।

আয়াতুল্লাহিল উজমা আরও বলেছেন, ‘বর্তমানে নওরোজ ইরানি জাতির জন্য আল্লাহকে স্মরণের মাধ্যম। নতুন বছর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানিরা আল্লাহকে স্মরণ করে বলেন: হে অবস্থাসমূহের পরিবর্তনকারী আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করুন। এভাবে ইরানিরা নওরোজের সময় আল্লাহর স্মরণ বা আল্লাহর দিকে মনোযোগ জোরদার করেন। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও ইরানিরা নওরোজ উপলক্ষে প্রিয়জন ও আত্মীয়-স্বজনদের দেখতে যান এবং এ সময় তারা গ্লানি, বিদ্বেষ ও মান-অভিমান দূর করেন ভালোবাসার মাধ্যমে।

নওরোজ উৎসবে শিশুরা

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছো যে, ইরানে নতুন বছর শুরু হয় বসন্ত ঋতুর প্রথম দিনে। ইরানি জনগণ, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে বসন্ত ঋতু হচ্ছে ন্যায়-ইনসাফ ও ভারসাম্যের মওসুম। ইরানে বসন্ত নাতিশীতোষ্ণ। শীতের প্রকোপ যেমন থাকে না, তেমনি থাকে না গ্রীষ্মের দাবদাহ। মহাকবি ফেরদৌসী নওরোজের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- 

বসন্তের মেঘমালা থেকে নেমে আসে বৃষ্টির ফোঁটা

মাটির বুক থেকে ধুয়ে ফেলে যতসব দুশ্চিন্তা

পৃথিবী পূর্ণ হয় সবুজের সমারোহে এবং পানিতে নদী

দুঃখীর জীবনে এখন থাকে না কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

ধরাতল সজ্জিত হয় যেন এক বেহেশত রূপে

ইনসাফ ও দানের মহিমায় পৃথিবী পূর্ণ হয়

আর কল্যাণ ও নিরাপত্তায়, আর

দুষ্ট ও দুরাচারের হাত হয় অবরুদ্ধ।

ভারবাহী একটি গাধা

এক ব্যবসায়ী ও তার গাধার গল্প

বসন্তকালে এক সুন্দর সকাল। এক ব্যবসায়ী তার গাধার পিঠে কয়েক বস্তা লবণ নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। বাজারে নিয়ে সে এগুলো বিক্রি করবে। ব্যবসায়ী এবং গাধা এক সাথে হাঁটছে। কিছু দূর গিয়ে পথে একটি নদী পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত গাধাটি পা পিছলে নদীতে পড়ে গেল। তখন গাধা বুঝতে পারল যে, তার পিঠের বোঝা হালকা লাগছে। মূলত বস্তায় পানি লেগে লবন গলে যাওয়ার কারণে বোঝা হালকা হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী আর কোনো উপায় না দেখে বাড়ি ফিরে এলো এবং গাধার পিঠে আরো কয়েক বস্তা লবন নিয়ে আবার বাজারের পথে রওয়ানা হলো। তারা যখন নদীর পিচ্ছিল তীরে পৌঁছে তখন গাধাটি ইচ্ছে করে নদীতে পড়ে গেল। ফলে লবণগুলো আবার নষ্ট হয়ে গেল।

ব্যবসায়ী কিন্তু গাধার কৌশল বুঝে ফেলেছে। তাই এবার বাড়ি ফিরে সে স্পঞ্জ ভর্তি বস্তা দিয়ে গাধার পিঠ বোঝাই করল। বোকা গাধা পথ চলতে চলতে নদীর কিনারে এসে পুনরায় নদীতে পড়ে গেল। কিন্তু হায়, তার পিঠের বোঝা হালকা না হয়ে এবার ভারী হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী তখন গাধার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘হে বোকা গাধা! তোমার কৌশল আমি বুঝে নিয়েছি। কিন্তু তোমার জেনে রাখা উচিত, অতি চালাকের গলায় দড়ি।

গম খাচ্ছে ইঁদুর

এক লোভী ইঁদুরের গল্প

অনেক দিন আগের কথা। একটি ছোট গ্রামে বাস করত এক বৃদ্ধ চাষী। তার ছিল কিছু কৃষি জমি। এ জমিতে সে গমের চাষ করত এবং গম থেকে তৈরি রুটি খেয়ে জীবনধারণ করত। প্রতিবছর তার জমিতে প্রচুর গম হতো। কৃষক তার উৎপাদিত গম বড় বড় বস্তায় ভরে ঘরের এক কোনায় রেখে দিত।

একদিন দুটি ইঁদুর এই গম দেখতে পেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই তারা একটা পরিকল্পনা আঁটলো। তারা ঘরের দেয়ালে একটি গর্ত করল। কৃষক বাইরে চলে গেলেই ইঁদুর দুটি গর্ত থেকে বেরিয়ে আসত এবং বস্তা ছিদ্র করে গম বের করে নিজেদের গর্তে নিয়ে যেত। এভাবে দিন যেতে থাকল এবং একসময় অনেক গম তাদের গর্তে জমা হলো।

একদিন এক ইঁদুর অপর ইঁদুরকে বলল: ‘শোন বন্ধু! আমরা অনেক গম জমা করেছি। কৃষক জানার আগেই আমাদের গম নেয়া বন্ধ করা উচিত। আর তা না হলে আমরা বিপদে পড়ে যেতে পারি।

দ্বিতীয় ইঁদুরটি বলল: ‘তুমি এসব কি বলছ? আমরা কখনো এমন সুযোগ আর পাব না। কৃষক জানার আগেই চলো আমরা আরো গম মজুদ করি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

প্রথম ইঁদুরটি বলল: ‘আমি আর তোমার সঙ্গে আসতে চাই না। কারণ, আমি আমার জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাই না।

জবাবে দ্বিতীয় ইঁদুর বলল: ‘তুমি আস্ত একটা ভীতু। আগামীকাল থেকে আমি একাই এখানে আসব এবং গম নিয়ে গর্ত ভর্তি করব। তোমার মতো একজন ভীতু বন্ধুর আমার প্রয়োজন নেই।

পরের দিন থেকে লোভী ইঁদুরটি তার নিজের জন্য আরো গম সংগ্রহ শুরু করল।

একদিন কৃষক মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যে, তার গমের বস্তাগুলো পরীক্ষা করে দেখবে। গমের বস্তার কাছে গিয়ে কৃষক দেখতে পেল সবগুলো বস্তাতেই শুধু ছিদ্র আর ছিদ্র। এতে তার খুব রাগ হলো। সে ইঁদুর ধরার জন্য একটি ফাঁদ বস্তার কাছে পেতে রাখল। লোভী ইঁদুরটি যখন গম নিতে বস্তার কাছে এল অমনি সেই ফাঁদে আটকা পড়ে গেল।

এ গল্প থেকে আমরা শিখতে পারলাম যে, পৃথিবীর ধন-সম্পদের প্রতি লোভীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে গুটি পোকার ন্যায়। সে যতই তার চারিদিকে রেশম সুতা জড়াতে থাকে ততই সে নিজে বন্দি হয়ে পড়ে এবং এভাবেই তার মৃত্যু ঘটে।

হুদহুদ পাখি

পৌরাণিক পাখি হুদহুদ

বন্ধুরা, গল্পের পর এবার তোমাদের জন্য রয়েছে পৌরাণিক পাখি হুদহুদ সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। অনন্যসুন্দর এই পাখিটিকে একবার দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। মনটা অন্য রকম এক ভালো লাগার আবেশে ভরে যায়। বাংলাদেশে এই পাখিটি ‘মোহনচূড়া’ নামে পরিচিত। ইংরেজিতে একে হুপো বা হুপি বলে ডাকা হয়। আরবির মতো উর্দুতেও একে হুদহুদ নামে ডাকা হয়। মূলত ইউরেশিয়া এলাকার এই পাখিটি ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড বার্ড’ বলে পরিচিত।

হুদহুদ পাখির কথা আসলে হযরত সোলাইমান (আ.)-এর নাম মনে পড়ে। হযরত সুলাইমানের একটি পোষা হুদহুদ পাখি ছিল,  নাম ছিল ইয়াফুর। এই ইয়াফুরের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর নিয়মিত সোলাইমান (আ.)-এর কাছে চলে আসত। পবিত্র কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি যে, সোলাইমান নবী রানি বিলকিসের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন তা পৌঁছে দিয়েছিল হুদহুদ পাখি।  

শুধু পবিত্র কুরআনে নয়, বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ইতিহাসে হুদহুদ পাখির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন পারস্যে এই পাখিকে সততার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

হুদহুদ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ এবং আফ্রিকার মিশর, চাদ, মাদাগাস্কার, এমনকি ইউরোপের কয়েকটি দেশ, এশিয়ার ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশেও অতিপরিচিত পাখি। সাধারণত মরুভূমিসংলগ্ন এলাকায় থাকতে অত্যন্ত ভালোবাসে। মাটিতে ঠোঁট ঢুকিয়ে পোকা খেয়ে জীবনধারণ করে।

বন্ধুরা, এবার আমরা হুদহুদ বা মোহনচূড়া পাখির সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণ তুলে ধরছি।

এ পাখির মাথায় খুব সুন্দর একটা ঝুঁটি আছে, ঝুঁটিটি হলদে-বাদামি পালকের, চূড়াটি কালো। মজার কথা হল রেগে গেলে পাখিটি ঝুঁটি প্রসারিত করে, তখন পাখিটিকে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। তখন দূর থেকে মনে হয় মাথার ওপর ফুল ফুটে আছে।

হুদহুদ পাখির দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৫-৩২ সে.মি. পর্যন্ত লম্বা হয়, সম্পূর্ণ পাখা মেলা অবস্থায় দৈর্ঘ্য ৪৪-৪৮ সে.মি. পর্যন্ত লম্বা হয়। ওজন ৬৫ গ্রাম হয়ে থাকে। ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারা প্রায় একই রকম। বাদামি শরীর রঙের, পিঠ, ডানা ও লেজে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ। এদের মুখ, গলা ও বুক কমলা-পীতাভ বা লালচে-কমলা। 

পাখি বিশেষজ্ঞরা দাবি করে থাকেন, হুদহুদ পাখির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ। পাখিটি আকাশে উড়ার সময় মাটির অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত পানির ধারা কিংবা অন্যান্য খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকা চিনতে পারে। এই হুদহুদ পাখি এতো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু তাকে শিকারের জন্যে পেতে রাখা ফাঁদ দেখতে পায় না।

বন্ধুরা, ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ উপলক্ষে আমাদের সব আয়োজন একে একে ফুরিয়ে গেল। পুরোনো দিনের সব মলিনতা, জড়তা, গ্লানি ও হতাশা আমাদের জীবন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক এবং নতুনত্বের প্রাণ-প্রবাহে গড়ে উঠুক উন্নত, সফল ও স্বার্থক মানবজীবন- এ প্রত্যাশা করে আজকের আসর থেকে বিদায় নিচ্ছি।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪

 

ট্যাগ

২০১৭-০৩-২৪ ১৮:৪৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য