সাদ ইবনে মায়ায (রা.)'র মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাসূল (সা.) সাহাবাদেরকে নিয়ে সেখানে গেলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে  মায়াযকে গোসল দেয়া হল। গোসল ও কাফন শেষে তাকে খাটিয়ায় রেখে কবরস্থানের দিকে নেয়ার সময় রাসূল (সা.) খালি পায়ে হাঁটছিলেন এবং কখনো খাটিয়ার ডানে আবার কখনো বায়ে ধরছিলেন। কবরে পৌঁছে রাসূল (সা.) নিজেই কবরের মধ্যে নেমে নিজের হাতে সুন্দরভাবে দাফন সম্পন্ন করেন। সাদের মা কবরের কাছে এসে বলল,“ সাদ তুমি বেহেশতে সুখে থাকো !”

রাসূল (সা.) বললেন, “সাদের মাতা! চুপ কর। এত দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বল না। এখন কবরে সাদের উপর আযাব হচ্ছে এবং সে কষ্ট পাচ্ছে।” অতঃপর কবরস্থান থেকে ফিরে এলেন।

সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি সাদের জানাজার নামাজ পড়ালেন, নিজ হাতে কবরে শোয়ালেন এবং নিজেই তার কবর বানালেন; তার পরও বলছেন কবরে তার ওপর আযাব হচ্ছে?” রাসূল (সা.) বললেন, “হ্যাঁ! সাদ তার পরিবারের (স্ত্রীর) সাথে খারাপ আচরণ করত এবং একারণেই কবরে তার উপর আযাব হচ্ছে।”

এক ব্যক্তি রাসূল (সা.) এর কাছে এসে দেখল তিনি একটি পুরাতন পোশাক পরে আছেন। লোকটি কাজ সেরে যাওয়ার সময় রাসূলকে (সা.) অনুরোধ করে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি এই বার দেরহাম হাদিয়া হিসাবে গ্রহণ করে একটি নতুন পোশাক কিনুন” রাসুল (সা.) আলীকে (আ.)বললেন,“ টাকাটা নিয়ে আমার জন্য একটা জামা কিনে নিয়ে এস।”

আলী (আ.) বলেন,“ আমি টাকাটা নিয়ে বাজারে গিয়ে বার দেরহাম দিয়ে একটা জামা কিনে আনলাম।” রাসূল (সা.) জামাটা দেখে বললেন,“আমার এটা পছন্দ হচ্ছে না একটা কম দামী জামা নিয়ে এস।”

আলী (আ.) বলেন, “আমি দোকানে গিয়ে জামাটা ফিরিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে এলাম। অতঃপর জামা কেনার জন্য রাসূল (সাঃ) এর সাথে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলাম।” পথে রাসূল (সা.) একজন দাসীকে কাঁদতে দেখলেন। রাসূল (সা.) তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,“কাঁদছ কেন?” দাসী বলল, “মনিব বাজার করার জন্য আমাকে চার দেরহাম দিয়েছিল কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি এখন বাসায় ফিরতে ভয় পাচ্ছি।”রাসূল (সা.) বার দেরহাম থেকে চার দেরহাম দাসীটিকে দিয়ে বললেন, “যা কেনার কিনে নিয়ে বাসায় যাও। আমরাও বাজারে গেলাম রাসূল (সা.) চার দেরহাম দিয়ে একটি জামা কিনে পরলেন।”

ফিরে আসার সময় রাসূল (সা.) একটি লোককে দেখলেন যার জামা ছিল না। রাসূল (সা.) জামাটি খুলে লোকটিকে দিয়ে আবার বাজারে গিয়ে বাকি চার দেরহাম দিয়ে আরো একটি জামা কিনে পরে বাড়ির দিকে রওনা হন। পথে আবার সেই দাসীটিকে দেখলেন ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বসে আছে। এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় দাসীটি বলল,“হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমার দেরী হয়ে গেছে তাই ভয় করছে, বাসায় গেলে আমাকে মারধর করবে।” রাসূল (সা.) তার জন্য সুপারিশ করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাসূল (সা.) দাসীসহ বাড়ির মালিকের বাড়িতে গিয়ে তাকে সালাম করলেন কিন্তু জবাব এল না। তৃতীয়বার সালামের পর জবাব শোনা গেল- ওয়া আলাইকুম আসসালাম ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)। রাসূল (সা.) বললেন, “কেন প্রথমে জবাব দিলে না?” বাড়ির কর্তা বলল,“আপনার সালামকে বারবার শোনার জন্য।” রাসূল (সাঃ) বললেন,“ তোমার দাসী দেরি করেছে আমি তাকে সাথে নিয়ে এসেছি তুমি তাকে কিছু বল না।” বাড়ির কর্তা বলল,“ হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনার জন্যে এই দাসীকে মুক্ত করে দিলাম।” এরপর রাসূল (সা.) নিজে নিজে বললেন,“এই বার দেরহাম খুবই বরকতময় ছিল। যার বিনিময়ে দুইজন জামা পরিধান করল এবং একজন দাসী মুক্তি পেল।” 

এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, “আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন।” হযরত তাকে এভাবে উপদেশ দিলেন, “আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যদি তোমাকে কেউ নির্যাতন করে এমনকি যদি তোমাকে আগুনেও পোড়ায় তার পরও তুমি শিরক কোরো না। বাবা-মাকে কষ্ট দিও না এবং তাদের সাথে ভাল আচরণ করো তাদের জীবিত অবস্থায় ও মৃত্যুর পর। তাদের আদেশ মেনে চল। যদি বলে যে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, তাই কর। কারণ তা হচ্ছে ঈমানের নিদর্শন। কিছু অবশিষ্ট থাকলে তোমার মোমিন ভাইকে দান কর। দ্বীনি ভাইদের সাথে হাসি মুখে ভাল আচরণ কর। মানুষকে হেয় কর না, তাদের প্রতি দয়ালু হও। কোন মুসলমানকে দেখলে সালাম করবে। মানুষকে সঠিক ইসলামের পথে আহবান কর। জেনে রাখ, কারও উপকার করলে একজন গোলাম মুক্ত করার সমান সওয়াব পাবে ! জেনে রাখ, মদসহ সব নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম।

একবার রাসূল (সা.) সাথীদেরকে নিয়ে বসেছিলেন। হঠাৎ করে হেসে উঠলেন। সাহাবারা রাসূল (সা.) এর হাসির কারণ জানতে চাইলে রাসূল (সা.) বললেন,“আমার উম্মতের দুই ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে একজন আর একজনকে দেখিয়ে বলবে: হে আল্লাহ আমার অধিকারকে ওর কাছ থেকে আদায় করে দিন!” আল্লাহ বলবেন, “তোমার ভাইয়ের অধিকার দিয়ে দাও !” 

সে বলবে, “হে আল্লাহ আমার ভালো আমল বলতে কিছুই নেই আর পার্থিব সম্পদও আমার নেই।” তখন হকদার বলবে, “হে আল্লাহ এমতাবস্থায় আমার গোনাহগুলোকে তার উপর চাপিয়ে দিন !” 

এ পর্যন্ত বলার পর রাসূল (সা.) এর চোখ মোবারক থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। তিনি বললেন, “সেদিন মানুষ তার গোনাহ'র বোঝা বহনের জন্য অন্যের সাহায্য চাইবে। সেদিন যে ব্যক্তি তার অধিকার চাইবে আল্লাহ তাকে বলবেন, “চোখ ফিরাও এবং বেহেশতের দিকে তাকাও, কি দেখছ? তখন সে বেহেশতের অফুরন্ত নেয়ামত দেখে অবাক হয়ে বলবে,“হে আল্লাহ এসব কাদের জন্য?”

আল্লাহ বলবেন, “বেহেশতের এইসব অফুরন্ত নেয়ামত তার জন্য যে তার মূল্য আমাকে দিতে পারবে?”সে বলবে, “কে পারবে তার মূল্য দিতে?”আল্লাহ বলবেন, “তুমি।”সে বলবে, “হে আল্লাহ কিভাবে তা সম্ভব?” আল্লাহ বলবেন, “যদি তুমি তোমার দ্বীনি ভাইকে ক্ষমা কর।”সে বলবে, “হে আল্লাহ আমি তাকে ক্ষমা করলাম।”

অতঃপর আল্লাহ বলবেন, “তোমার দ্বীনি ভাইয়ের হাত ধরে বেহেশতে প্রবেশ কর।” এরপর রাসূল (সা.) বললেন, “তাকওয়া অর্জন কর এবং নিজেদের সমস্যাগুলোর সমাধান কর !” 

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এইসব অমূল্য বাণী মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন। 

[সুত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার : "তুহাফুল উকুল আন আলের রাসূল (সা.)","আলে রাসূল (সা.) থেকে বুদ্ধিমানদের জন্য উপহার"। মূল: শেখ আবি মুহাম্মাদ আল হাসান ইবনে আলী ইবনেল হুসাইন ইবনে শুবাত আল-হাররানি (রহ.), হিজরী চতুর্থ শতকের প্রখ্যাত পণ্ডিত। বঙ্গানুবাদ: আব্দুল কুদ্দুস বাদশা, সম্পাদনা : এ কে এম আনোয়ারুল কবির। শেষের দিকে (উনিশতম পর্বের কয়েকটি ঘটনা ও বিশতম পর্বের সবগুলো ঘটনা)  উল্লেখিত বিশ্বনবী (সা.)'র জীবনের কয়েকটি ঘটনা নেয়া হয়েছে আল্লামা মাজলিসি (র.)'র "বিহারুল আনওয়ার কাহিনী সম্ভার" শীর্ষক বই থেকে। বইটির অনুবাদক মোহাম্মাদ আলী মোর্তজা, সম্পাদনা : এ কে এম আনোয়ারুল কবির। ] #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১০

 

২০১৭-০৪-১০ ১৭:৫০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য