ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অত্যন্ত স্বচ্ছ, অবাধ ও সফল। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মো. মুনীর হোসাইন খান। (নির্বাচনচলাকালীন সময় সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছিল) সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব মো: মুনীর হোসাইন খান, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। আপনি বহুদিন ধরে ইরানে বসবাস করছেন এবং এখানকার নির্বাচন অনেকটা কাছ থেকেই দেখেছেন। তো ইরানের র্বিাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মুনীর হোসাইন খান: ইমাম খোমেনী (রহ.)১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বে সর্বপ্রথম ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং দ্বিনি(ইসলামী)গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে আজ ২০১৭ সালের ১৯ মে পর্যন্ত ইরানে ৩০টিরও অধিক রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্টারি, নেতা নির্বাচনী পরিষদ, নগর ও গ্রাম পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে ইরানি জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপকভিত্তিক অংশ গ্রহণ করেছে এবং ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্ট, নেতা নির্বাচনী পরিষদ, নগর ও গ্রাম পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন করেছে। এ সব নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও ইসলামি বিপ্লবের দুশমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এবং তাদের ধামাধরা চরেরা ইরানি জনগণকে এসব জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অনুৎসাহিত করেছে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের সৃষ্টি করারও অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তারা তাদের এসব প্রচেষ্টায় বিন্দুমাত্র সফল হয়নি। ইসলামি ইরানের প্রতিষ্ঠাত ইমাম খোমেনী (রহ.) এবং তাঁরপর বর্তমান ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদেরকে নির্বাচিত করেন। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর ভাষায়, ‘এসব নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষ কেবল নির্বাচিত প্রার্থী নয় বরং ইরানি জনগণ হচ্ছে বিজয়ী।

আজ ১৯ মে ২০১৭ শুক্রবার- ইরানে একই দিনে ৩টি নির্বাচন অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি, নগর ও গ্রাম পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া ইরানের কোনো কোনো এলাকায় এ তিন নির্বাচনের পাশাপাশি মজলিস-ই শুরা-ই ইসলামি অর্থাৎ ইরানি পার্লামেন্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, আজকের এ নির্বাচনে ইরানি জাতির ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুসম্পন্ন হচ্ছে। ব্যাপকভিত্তিক এজন্য বলছি যে নির্ধারিত সময় সীমার  বাইরেও ভোট গ্রহণের সময়কাল বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ধারণা, আজকের নির্বাচনে ৭২ শতাংশেরও বেশি ভোটার অংশ গ্রহণ করছেন। তবে, ভোটারদের প্রকৃত সংখ্যা ও পার্সেন্টেজ নির্বাচনের চুড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পরই স্পষ্ট জানা যাবে।

রেডিও তেহরান: ইরানের নির্বাচন ব্যবস্থা কতটা অবাধ ও সফল? এখানকার নির্বাচন পদ্ধতি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুনীর হোসাইন খান: বিশ্বে যত নির্বাচন হয়ে থাকে তারমধ্যে ইরানের সব ধরনের নির্বাচন-অত্যন্ত স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অবাধ। অত্যন্ত সফল নির্বাচন। এতে  কোনো সন্দেহ নেই। এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সফল সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যাবস্থা। রাষ্ট্রপতি, নেতা নির্বাচনি পরিষদ(council of experts অর্থাৎ মজলিস-ই খুবরেগান-ই রাহবারী) ও মজলিস-ই শুরা-ই ইসলামি অর্থাৎ ইরানের জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিলের (শুরা-ই নেগাহবান) তত্ত্বাবধানে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিযুক্ত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

তবে নগর ও গ্রাম পরিষদের নির্বাচন ইরানের জাতীয় পার্লামেন্টের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, নেতা নির্বাচনি পরিষদ এবং জাতীয় পার্লামেন্টের সদস্য পদপ্রার্থীদের যোগ্যতা গার্ডিয়ান কাউন্সিলের দ্বারা নির্ণীত, নিরুপিত ও সমর্থিত হতে হয়। আর নগর ও গ্রাম পরিষদের সদস্য পদপ্রার্থীদের যোগ্যতা পার্লামেন্টের নিযুক্ত নির্বাচনি কমিটি দ্বারা নির্ণীত ও নিরুপিত হয়। পদপ্রার্থীদের যোগ্যতা ঘোষিত হলে তারা নির্বাচনি প্রচারাভিযান(election campaign) ও প্রচার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অনুমতি পান।

ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার ৬ জন পদপ্রার্থী অনুমোদন পান। তবে এদের মধ্য থেকে ২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ালে আজ ৪ জন পদপ্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।এরমধ্যে একজন পদপ্রার্থী- জনাব হাশেমী তাবা জনাব ড. হাসান রুহানীকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং নিজের ভোটটা যে তিনি তাকেই দেবেন এ কথাও স্পষ্টভাবে বলেছেন। তবে তিনি নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াননি। ফলে আজকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত ২ জন পদপ্রার্থী ড. হাসান রুহানী এবং হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ ইব্রাহীন রায়িসির মধ্য সীমাবদ্ধ ছিল।  

রেডিও তেহরান: আচ্ছা জনাব মো: মুনীর হোসাইন খান, এখানকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনিয়ম বা কারচুপি কী সম্ভব?

মুনীর হোসাইন খান: ইরানে নির্বাচনে কারচুপি, জ্বাল ভোট ও অনিয়ম সম্ভব নয়। কারণ গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সূক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নির্বাচন পরিচালনা কেন্দ্র আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তায় এবং প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পোলিং সেন্টারগুলোতে (ভোটগ্রহণ কেন্দ্রসমুহে) খালি ব্যালোট বাক্স ও ব্যলোট পেপার আনা-নেয়া, ভোট গ্রহণ ও ভোট গণনাসহ পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করেন।এরপর ভোটকেন্দ্র থেকে প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ফলাফল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিযুক্ত নির্বাচন পরিচালনা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে তা প্রকাশ করে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চূড়ান্ত বিজয়ী পদপ্রার্থীকে কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করবে। এর আগে স্বয়ং বিজয়ী পদপ্রার্থী তার নির্বাচনি প্রচার কমিটি বা কোনো সংবাদসংস্থা ও গণমাধ্যম নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার খবর প্রকাশ করতে পারবে না।

রেডিও তেহরান: জ্বি জনাব মুনীর হোসাইন খান, ইরানের নির্বাচন এবং অন্য দেশের বিশেষ করে পাশ্চাত্যের নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্যে কী পার্থক্য আপনার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে?

মুনীর হোসাইন খান: ইরান ও পাশ্চাত্যের নির্বাচন ব্যবস্থায় সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্বাচনি প্রচারণার(ইলেকশন ক্যাম্পেন)মধ্যে বেশ ভালোভাবে পরিলক্ষিত হয়। ২০১৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে্ও ইরানের রেডিও ও টেলিভিশনে সম্পূর্ণ ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে ৬ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে সমান সময় বরাদ্দ করে তাদের বিভিন্ন ইলেকশন ক্যাম্পেনের সমানসংখ্যক অনুষ্ঠানমালা প্রচারের সুযোগ দেয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরাও জাতীয় প্রচার মাধ্যম প্রদত্ত একসমান অনুষ্ঠানমালা প্রচারের এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও কার্যকর ছিল ৬ জন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর অংশগ্রহণে তিনটি ডিবেট অনুষ্ঠান যা জাতীয় টেলিভিশন ও রেডিওর বিভিন্ন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় প্রকাশ, ইরানের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ জনগণ উক্ত তিন ডিবেট অনুষ্ঠান দেখে নিজেদের কাঙ্খিত পদপ্রার্থীকে শনাক্ত (চিহ্নিত) করতে সক্ষম হয়েছেন। নির্বাচনি প্রচারণা (ইলেকশন ক্যাম্পেন) সংক্রান্ত ঘোষিত নীতিমালা অনুসারে পদপ্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পারবেন না। ক্যাম্পেনে (নির্বাচনি প্রচারাভিযান) ইসলামি আখলাক (নীতি-নৈতিকতা) বজায় রাখা অত্যাবশ্যক। তবে গঠনমূলক সমালোচনা ও প্রতিপক্ষকে শালীনতা বজায় রেখে জবাব দেয়া ও বক্তব্য খণ্ডন করা যাবে। অতিরিক্ত খরচ করাকে (অর্থোপচয়) নিরুৎসাহিত করা হয়েছে (বরং তা আইনতঃ নিষিদ্ধ) এবং তা নির্বাচনের নিয়ম-নীতির পরিপন্থি বলে গণ্য। ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ উজমা খামেনেয়ী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদেরকে তাদের নির্বাচনি প্রচারে দেশের অর্থনৈতিক (আর্থ-সামাজিক) সমস্যার সমাধান, জাতীয় সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। যে সব বিষয় জাতীয় ঐক্য ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরুপ সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং সেগুলো সমাধানের ব্যাপারে কথা বলার উপদেশ দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যে নির্বাচনে ন্যায়নীতি ও আখলাকের তেমন একটা ধার ধারা হয় না। আর এর প্রমাণ হচ্ছে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এছাড়া পুরো নির্বাচনটাই হচ্ছে টাকার খেলা এবং বিশাল ব্যায়বহুল।

আর যেহেতু নির্দিষ্ট গুটিকতক রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সিনেট ও পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচনের বিষয়টি এবং যেহেতু প্রভাবশালী পূজিপতিদের অর্থায়নেই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে সেহেতু পাশ্চাত্যে নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অবাধ ও স্বচ্ছ বলা যায় না। তা ছাড়া (পাশ্চাত্যে) অনেক সময় জনগণের অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশেরও কম হয়।

অন্যদিকে ইরানে বিপ্লববিরোধী (বা কোন অপরাধে অপরাধী, দোষী সাব্যস্ত ও দণ্ডিত) না হলে যে কোনো ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ধারা জাতীয় নির্বাচনে পদপ্রার্থী হতে ও অংশগ্রহণ করতে পারেন

অন্যান্য দেশে যেমন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে বিভিন্ন পদপ্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে মারামারি, হাতাহাতি, সহিংসতা হয়ে থাকে। এমনকি অনেক সময় হ্ত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়। তবে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা ইরানের নির্বাচনে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ইরানে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী পদপ্রার্থীদের প্রচারকেন্দ্র পাশাপাশি থাকা সত্ত্বেও এবং পাশাপাশি ইলেকশন ক্যাম্পেন পরিচালনা করা সত্ত্বেও প্রতিদ্বন্দ্বী পদপ্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে কোনো ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারি হয় না। সম্পূর্ণ আইনশৃংখলা বজায় রেখে ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী পদপ্রার্থীদের ইলেকশন ক্যাম্পেন বা নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

অনেক দেশের বিপরীতে ইরানে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটগ্রহণের সময় ব্যালোট বাক্স ও ব্যলোট পেপার ছিনতাই বা ভোটদাতাদের ভোটদানে বাধা দান, ভোটারদেরকে প্রভাবিত করার মতো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে না। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিত  মনে ভোট দেন।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২০

             

 

২০১৭-০৫-২০ ২১:২১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য