• ইরানি গল্প ও রূপকথা: আহমাদ ও বাদশাহ-২

বলেছিলাম মা আহমাদের মনমরা অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করেছিলো: কী রে কী হয়েছে! মন খারাপ কেন? আহমাদ সব কথা মাকে খুলে বললো। বাদশার আচরণের কথা শুনে মায়ের মনটাও ভেঙে গেল। বললো: আল্লাহ মহান। কিচ্ছু ভাবিস না! রাতটা কাটুক। দেখা যাক কাল কী হয়।

মায়ের কথামতো আহমাদ সুন্দর করে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুম গভীর হতেই খিজির পয়গাম্বর আবার এলো তার স্বপ্নের ভেতর। খিজির আহমাদকে বললো: 'বাদশাহ কাল তোমাকে আবারও ডেকে একটা কাজের কথা বলবে। বলবে, চল্লিশ তোতা পাখিময় গাছ নিয়ে আসো!

বাদশাহর আদেশ পাবার পর তুমি এক ব্যাগ আরজান বা বাজরা জাতীয় শস্য নেবে। আরও নেবে এক মশক পানি। তারপর রওনা হয়ে যাবে। যেতে যেতে এক সময় দেখবে রাস্তার মাথায় কবুতর এবং চড়ুই পাখিরা হাটাহাটি করছে। শস্যগুলো তাদের খাবার জন্য ছিটিয়ে দিয়ে তুমি এগিয়ে যাবে সামনের দিকে।

খিজির পয়গাম্বর আরও বললো: অনেক দূর যাবার পর দেখতে পাবে একটি ডোবা। ডোবাটির পানি শুকিয়ে গেছে। যার ফলে দেখবে মাছগুলো মরে যাচ্ছে। পানিটুকু তুমি ওই ডোবায় ঢেলে দেবে যাতে মাছগুলো প্রাণ ফিরে পায়। তুমি ওই ডোবাটি অতিক্রম কর পৌঁছে যাবে 'বেহেশত বাগানে'। সেখানে গিয়ে এই চিঠিটা দেবে মালির হাতে। মালি তোমাকে চল্লিশ তোতাপাখি গাছটি দেবে'।

এই স্বপ্ন দেখার পর আহমাদের ঘুম ভেঙে গেল। এবারও ঘুম ভাঙতেই দেখতে পেল তার বালিশের কাছে একটি চিঠি পড়ে আছে। চিঠিটি হাতে নিয়ে আহমাদ বাদশার পেয়াদাদের আসার অপেক্ষায় বসে থাকলো।

বলছিলাম চিঠি হাতে নিয়ে আহমাদ অপেক্ষা করতে লাগলো। সকাল হতে না হতেই বাদ বাদশাহর গোলামেরা এসে হাজির। তারা এসেই আহমাদকে বললো যে বাদশাহ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। আহমাদ কোনো কথা না বলেই পেয়াদাদের সঙ্গে প্রাসাদে গেল। বাদশাহ আহমাদকে দেখেই বললো সে যেন চল্লিশ তোতা পাখির গাছ নিয়ে আসে।

আহমাদ বাসায় ফিরে গেল। পানি এবং শস্যদানা ব্যাগে ভরে নিয়ে রওনা হয়ে গেল। যেতে যেতে বহুদূর যাবার পর পথের মাথায় দেখতে পেল কবুতর আর চড়ুই পাখিদের। আহমাদ ব্যাগ খুলে শস্যদানাগুলো ছিটিয়ে দিলো। পাখিরা সেগুলো খেতে শুরু করলো আর আহমাদ যেতে লাগলো সামনের দিকে।

অনেকটা পথ সামনে যাবার পর দেখতে পেলো একটি শুকনো ডোবা। ডোবার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় মাছগুলো তড়পাচ্ছে। আহমাদ তাড়াতাড়ি করে পানির মশক খুলে পানি ঢেলে দিলো ডোবায়। মাছেরা সেই পানিতে ডুবে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো। আহমাদের বোঝা যেহেতু হালকা হয়ে গেছে সেজন্য দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলো। সামনে পড়লো তিন ব্যক্তি। তাদেরকে বেহেশত বাগানের পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। তারা তিনজন তিনদিকে যেতে বললো। একজন বলেছিলো কেবলার দিকে যাও। আহমাদ সেদিকেই এগিয়ে গেল। পাহাড় পর্বত, নদনদী, মরু প্রান্তর ইত্যাদি পেরিয়ে ঠিকঠাকমতো পৌঁছে গেল বেহেশত বাগানে। মালির হাতে চিঠি পৌঁছে দিলো। মালি চিঠি পড়েই চলে গেল এবং চল্লিশ তোতাপাখি বৃক্ষ এনে আহমাদের হাতে দিয়ে দিলো। আহমাদ যেপথে গিয়েছিল সেপথেই ফিরে গেল।

সেই পাহাড় পর্বত, সেই বন-জঙ্গল আর নদনদী পেরিয়ে ফিরে গেল নিজের শহরে। বাদশাহর প্রাসাদের দিকে যেতেই চারদিকে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। বাদশার কানে আহমাদের ফিরে আসার খবর পৌঁছতেই বাদশাহ অভ্যর্থনার আয়োজন করলো। ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতা শেষে আহমাদ বৃক্ষটি দিলো বাদশাহর হাতে। বাদশাহ কোনোরকম উপঢৌকন বা পুরস্কার না দিয়ে কেবল ছয়বার বললো বারাকাল্লাহ...! আহমাদ আজও খালি হাতেই ফিরে গেল বাড়িতে। মনটা আরও বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে গেল তার। মাকে গিয়ে বললো-আজও কিচ্ছু দেয় নি মা! মা বললো: কিচ্ছু ভেবো না বাপ! আমাদের কি খাবারের অভাব আছে! আহমাদ চুপ করে গেল।

রাতশেষে আহমাদ আবারও গেল বাদশাহর প্রাসাদে। বাদশাকে গিয়ে বললো তাকে যেন একটা কাজটাজ দেয়। বাদশাহ তাকে বললো: ঠিক আছে! যাও! এই পরিমাণ হাতির হাড্ডি নিয়ে আসো যেগুলো দিয়ে একটা নতুন প্রাসাদ বানানো যায়। আহমাদ কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ ফিরে গেল বাসায়। রাতে শোয়ার পর ঘুমের ভেতর আবারও খিজির পয়গাম্বর স্বপ্নযোগে এসে তাকে বললো: এক মশক শরাব নিয়ে রওনা হয়ে যাবে। যেতে যেতে যখন হাতীর পালের দেখা মিলবে শরাবের মশকটা তাদের জন্য মাটিতে রেখে দেবে। হাতীর পাল শরাবে শুঁড় লাগাতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। এরপর দশজন জল্লাদ এগিয়ে আসবে। তারা হাতীগুলোকে মেরে টুকরো টুকরো করে চামড়া আর হাড়গুলোকে আলাদা করে দেবে।

স্বপ্ন দেখা শেষ হলে আহমাদ জেগে ওঠে। জেগেই সে বিরাট একটা মশক শরাব দিয়ে ভর্তি করতে শুরু করে। ভর্তি করা হয়ে গেলে মশকটাকে কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু করে। রাত দিনের ভেদাভেদ জ্ঞানই যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। কখনো দ্রুত কখনোবা ধীরে সুস্থে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল আহমাদ।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/২৯/ টি-১১১.২/ই-৩৪

 

২০১৭-০৫-২৯ ১৭:৫৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য