• ইরানি গল্প ও রূপকথা: আহমাদ ও বাদশাহ-৩

অনেকটা পথ যাবার পর হাতীর পালের কাছে গিয়ে পৌঁছলো আহমাদ। শরাবের মশকের মুখ খুলে হাতীর পালকে খাওয়ালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতিগুলো লুটিয়ে পড়তে শুরু করলো মাটিতে। হঠাৎ করে এদিক ওদিক থেকে দশজন জল্লাদ এসে হাজির হয়ে গেল। তারা এক এক করে হাতীগুলোকে মেরে চামড়া এবং মাংসগুলোকে আলাদা করলো।

হাড়গুলোকে কয়েকটি হাতির পিঠে দিয়ে আহমাদের হাতে বুঝিয়ে দিলো তাদের লাগাম। জল্লাদেরা চলে গেল। আহমাদও ফিরে গেল যে পথে এসেছিল সেপথে। শহরের কাছাকাছি পৌঁছতেই জনগণ কৌতূহলী হয়ে পড়লো। ব্যাপক শোরগোল দেখা দিলো। এক কান দু'কান হতে হতে আহমাদের ফিরে আসার খবর পৌঁছে গেল বাদশাহর কাছে। আশ্চর্যরকমভাবে এবার কেউই তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এলো না।

অভ্যর্থনা না জানানোর কারণ হলো মন্ত্রীরা। তারা বাদশাহকে ভয় দেখিয়েছে এই বলে যে, আহমাদ হচ্ছে বাদশাহর প্রাণের শত্রু। সেজন্য তাকে তার মতোই যথাস্থানে রেখে দেওয়া উচিত। অভ্যর্থনা দেওয়ার দরকার নেই। এসব বলে বাদশার কান ভারি করে মন্ত্রীরা বললো: 'গতবার তো আহমাদকে ছয়টি বারাকাল্লাহ বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবার নয়বার বারাকাল্লাহ বলে বিদায় দিয়ে দেবেন'। যাই হোক, আহমাদ তার কাজ ঠিকঠাকমতো পালন করলো। হাতীর হাড়গোড়ের স্তুপ বুঝিয়ে দিলো বাদশাহর কাছে। বাদশাহ মন্ত্রীদের পরামর্শমতো নয়বার বারাকাল্লাহ বলে আহমাদকে বিদায় দিয়ে দিলো। কোনো পুরস্কার দিলো না।

আহমাদের মনটা আজও ভেঙে গেল। কী আর করবে সে। সোজা চলে গেল বাড়ির দিকে। মা আজও ছেলের মন খারাপ দেখে বুঝতে পারলো যে আজও কোনো পুরস্কার পায় নি। মা বললো: বুঝতে পেরেছি কোনো পারিশ্রমিক বা পুরস্কার দেয় নি বাদশাহ। ছেলে এবার বললো: 'মা আমি আর যাবো না ওই বাদশাহর কাছে কাজ চাইতে। আমি কাল সকালে বাজারে যাবো। কোনো কাজকাম খুঁজে পাওয়া যায় কিনা,দেখবো'।

কিন্তু মা আহমাদকে ঠাণ্ডা মাথায় উপদেশ দিলো। বললো: দেখো বাবা! বাদশাহ শেষ পর্যন্ত তোমাকে তোমার কাজের বিনিময় বা পুরস্কার না দিয়ে পারবে না,অবশ্যই তোমার পারিশ্রমিক দেবে। তুমি বরং রাতটা ভালো করে ঘুমাও। কাল দেখা যাক আল্লাহ কী রেখেছেন ভাগ্যে। বাদশার কাছে যেও হতেও তো পারে, বাদশাহর কাছ থেকে মূল্যবান কিছু পেয়ে যাবে।

মায়ের কথায় আহমাদ ঘুমিয়ে পড়লো। সকাল সকাল ঘুম থেকে জেগে উঠে মায়ের কথামতো বাদশাহর প্রাসাদে গেল। বাদশাহ আহমাদকে দেখেই বললো: 'শেষ কাজটিও করে ফেল, সফল হলে তোমার প্রাপ্য বুঝে নেবে দুহাতে। কাজটা হলো, পরীদের বাদশার কন্যা মানে পরীরাজকন্যাকে নিয়ে এসো আমার কাছে'।

আহমাদ এই আদেশ পেয়ে হতবাক হয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে গেল বাড়ির দিকে। চোখের ভেতর যত অশ্রু ছিল সবই ঝরালো। মা তাকে বহুভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো। বললো: আল্লাহ মহান। তিনি আমাদের সহায়। দেখো! এই যাত্রাও তুমি সফল হবে।

রাত ঘনিয়ে এলো। আহমাদ যথারীতি গেল বিছানায়। ঘুম গভীর হতেই খিজির পয়গাম্বর আবারও এসে হাজির তার স্বপ্নের ভুবনে। পয়গাম্বর বললো: কাল সকালে রওনা হয়ে যেও। যেতে যেতে একটা তেমুহনী পাবে। সেখানে তিনটি কবুতর দেখতে পাবে। একটি কবুতরের পাখা লাল রঙের। একটির রঙ সবুজ আর তৃতীয়টির রঙ সাদা। লাল আর সবুজ রঙের কবুতর যাই বলুক তাতে কান দেবে না। সাদা কবুতর যা বলে খুব মনোযোগের সাথে শুনবে এবং সে অনুযায়ী এগিয়ে যাবে। তাহলেই তুমি পৌঁছে যাবে তোমার গন্তব্যে।

যথারীতি রাত শেষে সকাল হলো। আহমাদ তার চাদর, মাথায় পরার ক্যাপ ইত্যাদি নিয়ে যাত্রা শুর করলো। যেতে যেতে যেতে স্বপ্নে দেখানো সেই তেমুহনিতে গিয়ে পৌঁছলো। সেখানে দেখতে পেল একটি গাছের ডালে বসে আছে তিন তিনটি কবুতর-লাল,সবুজ এবং সাদা। লাল রঙের কবুতরটি আহমাদকে দেখেই বলে উঠলো: ডান দিক দিয়ে আমার পিছে পিছে আসো। সবুজ কবুতর বললো: আমি বাম দিকে যাচ্ছি, তুমিও আমাকে অনুসরণ করো! সবশেভে সাদা কবুতর বললো: কেবলামুখি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাও!#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/টি-১১২/ ই-৩৫

 

২০১৭-০৬-০৩ ১৬:০৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য