• ইরানি গল্প ও রূপকথা: আহমাদ ও বাদশাহ-৪

আহমাদ খিজির পয়গাম্বরের নির্দেশনা অনুসারে সাদা কবুতরের দেখানো কেবলামুখি পথেই রওনা হলো। নদনদী, বনজঙ্গল, পাহাড় পর্বত আর বিচিত্র প্রান্তর পেরিয়ে আহমাদ পৌঁছে গেল তার গন্তব্যে অর্থাৎ সেই বেহেশত বাগানে। বাগানের মূল গেইটের উপর নজর পড়তেই আহমাদদ দেখলো সেখানে বসে আছে সেই সাদা কবুতরটি,যে তাকে সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়েছিল।

আহমাদকে দেখেই কবুতরটি বলে উঠলো: তুমি এখানে অপেক্ষা করো। আমি গিয়ে পরীরাজকন্যাকে নিয়ে আসছি। বলেই কবুতর চলে গেল। আহমাদ দরোজার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকলো, কোনো কথাই বললো না।

আশ্চর্যরকমভাবে সাদা কবুতরটি একটি সাদা ঘোড়ায় পরিণত হয়ে গেল। যাবার সময় ঘোড়াটি আহমাদকে বললো: পরীরাজকন্যাকে নিয়ে এলে পরী যাই জিজ্ঞেস করবে উত্তরে শুধু বলতে হবে: 'ওকে, জি'। এর বাইরে অন্য কোনো কথা বলা যাবে না। পরী যা করতে বলবে তাই করতে হবে।'

এই বলেই সাদা ঘোড়া ঢুকে গেল বাগানের ভেতর। কিছুক্ষণ পর পরীরাজকন্যা দরজার পাশে এলো। বললো: 'আমি এবং সাদা ঘোড়া তোমার সঙ্গে আছি। তুমি কোনোভাবেই মন খারাপ করবে না। আমি তোমারই হবো এবং শেষ পর্যন্ত তুমি হবে বাদশাহ'।

আহমাদ নিজেকে আপাদমস্তক দেখে নিলো একবার। ময়লা পুরানো  ছেঁড়া জামা কাপড় পরা সে। ক্ষণিক কল্পনায় ডুবে গেল সে। ভাবতে লাগলো পরী তার মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

না, হাত বুলানো আর হলো না। কল্পনা করতে না করতেই বেহেশত বাগিচার দরোজা খুলে গেল। পরীরাজকন্যা, সাদা কবুতর আর সাদা ঘোড়া বেরিয়ে এলো গেটের বাইরে। পরীকন্যা আহমাদকে বললো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হতে। আহমাদ ঘোড়ার পিঠে চড়লো। পরীকন্যা বললো রাস্তার মাথায় তিন মাথাওয়ালা এক দৈত্য আসবে। ওই দৈত্য একটি তলোয়ার দেবে। তলোয়ারটি নিয়ে নেবে। এরপর এক মাথাওয়ালা একটি দৈত্য আসবে এবং একটি খঞ্জর দিতে চাইবে। সেটি কিন্তু কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না। আহমাদ মেনে নিল এবং ঘোড়া চালালো তার পথে।

যেতে যেতে সামনে পড়লো সেই তিন মাথাওয়ালা দৈত্য। সামনে এসে দৈত্য আহমাদকে বললো: পরীরাজকন্যাকে যদি বাদশাহর জন্য নিতেই হয় তাহলে এই তলোয়ার সঙ্গে করে নিতে হবে যাতে বাদশাহকে হত্যা করা যায়। আহমাদ তলোয়ারটা নিয়ে পরীকন্যার হাতে দিলো। তারপর আবার চললো ঘোড়া নিয়ে। অনেকটা পথ পেরিয়ে যাবার পর এক মাথাওয়ালা দৈত্যের সামনে পড়লো তারা। দৈত্য খঞ্জর বাড়ালো আহমাদের দিকে। বললো যদি বাদশাহকে হত্যা করতে চাও তাহলে এই খঞ্জরটা নাও। আহমাদ দৈত্যের কথায় সাড়া না দিয়ে সোজা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। ঘোড়া দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় পৌঁছে গেল শহরে। বাদশাহর কানে খবর পৌঁছে গেল যে আহমাদ পরীরাজকন্যাকে নিয়ে এসেছে।

বাদশাহ আদেশ দিলো শহরকে জাঁকজমকপূর্ণ করে সাজাতে। আহমাদ ধীরে ধীরে গেল বাদশাহর প্রাসাদের দিকে। বাদশাহ এগিয়ে এলো। আহমাদ পরীরাজকন্যাকে বাদশার কাছে সঁপে দিলো। বাদশাহ এবার তার মন্ত্রীদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করলো আহমাদকে কী পুরস্কার দেওয়া যায়-সে ব্যাপারে। মন্ত্রীরা বাদশাহকে পরামর্শ দিলো এবার যেন আহমাদকে বারোটা বারাকাল্লাহ দেওয়া হয়। বাদশাহ মন্ত্রীদের পরামর্শ অনুযায়ী আহমাদকে বারোবার বললো: বারাকাল্লাহ...! আহমাদ ভীষণ কষ্ট পেলো মনে। কিন্তু পরীকন্যা আলতোস্বরে বললো: 'কোনো চিন্তা করো না! বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য চল্লিশ দিন সময় নেওয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে যা কিছু করার করবো'।

আহমাদ আজও মন ভার করে বাড়ি ফিরে গেল। এদিকে বাদশাহ পরীকন্যার কাছে উকিল পাঠালো। তারা এসে পরীকন্যাকে বললো যে বাদশাহ আগামিকালই বিয়ের আয়োজন করতে চায়। পরীকন্যা বাদশাহর উকিলদের বললো তারা যেন বাদশাহকে বলে তার জন্য হাতীর হাড় দিয়ে প্রাসাদ তৈরি না করতে। তার জন্য বরং এমন একটা প্রাসাদ যেন তৈরি করা হয় যে প্রাসাদে সে ইবাদাত করতে পারে। যতদিন না সেই প্রাসাদ তৈরি হচ্ছে,বাদশাহকে সে বিয়ে করবে না। প্রাসাদটি তৈরি হলে তাকে যেন জানানো হয়। উকিল ফিরে গিয়ে বাদশাহকে পরীকন্যার শর্তের কথা জানালো। বাদশাহ দেরি না করে প্রাসাদ নির্মাণ করার জন্য আদেশ দিয়ে দিলো এবং নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেল।

আহমাদ পরের দিনও বাদশাহর প্রাসাদে এলো এবং বাদশাহর গোলাম হলো। প্রাসাদ তৈরির কাজ চলছে। বেশ কিছুদিন যাবার পর পরীকন্যা সবার দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে দেখা করলো আহমাদের সঙ্গে। তিন মাথাওয়ালা দৈত্যের দেওয়া তলোয়ারটা তাকে দিলো পরীকন্যা। আস্তে আস্তে বললো তলোয়ারটা যেন তার বাসায় লুকিয়ে রাখে। আহমাদ এমনভাবে লুকিয়ে রাখলো যে তার মাও টের পেল না।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/২৯/ টি-১১৩/ই-৩৬

 

২০১৭-০৬-০৩ ১৬:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য