• ইরানি গল্প ও রূপকথা: রঙশিল্পী ও নাপিত (পর্ব-২)

আবু কির আবু সাবরকে বললো,নতুন কোনো শহরে গিয়ে দুজনেই মিশেমিশে কাজ করে নিজেদেরে ভাগ্য পরীক্ষা করবো। দুজনের কাজ থেকে যা উপার্জন হবে দুজন মিলেই খরচ করবে, অবশিষ্ট টাকা যা জমে তা একটি ব্যাগে জমা করবে। যখন তারা নিজেদের শহরে ফিরে আসবে তখন দু'জনে সেই জমা টাকা ভাগ করে নেবে। সেই টাকা দিয়ে তারা বাকি জীবন সুখে স্বাচ্ছন্দে কাটিয়ে দেবে। এই রকম পরামর্শ করে তারা দুজনেই রওনা হয়ে গেল নতুন কোনো শহরের উদ্দেশে। যেতে যেতে তারা গিয়ে পৌঁছলো একটি সমুদ্রের উপকূলে।

সেখানে আরও বহু মুসাফিরের সঙ্গে তারা দুজনও একটি জাহাজে উঠলো। পরে জানা গিয়েছিল তাদের সঙ্গে আরও এক শ বিশজন যাত্রী ছিল। ঘটনাক্রমে ওই জাহাজে আবু সাবর ছাড়া আর কোনো নাপিত ছিল না। যাই হোক, জাহাজে উঠেই আবু সাবর আবু কিরকে বললো: "আচ্ছা ভাইজান! আমার তো মনে হয় এই জাহাজে আমাদের লম্বা সময় কাটাতে হবে। ক্ষিদে লাগলে খাবো কী! খাবার দাবারের একটা ব্যবস্থা করতে হবে না? এক কাজ করি! আমি বরং জাহাজের ভেতরে একটা পাক দিয়ে আসি। দেখি কারো চুল কাটা বা শেভ হবার প্রয়োজন পড়ে কিনা! কাস্টমার পেয়ে গেলে তো বেঁচে গেলাম। চুল দাড়ি কেটে বিনিময়ে টাকা অথবা খাবার কিংবা পানির পাত্র নিয়ে নেবো। সেগুলোর সাহায্যে খোরাকের আয়োজন করে ফেলবো।"

আবু সাবরের কথায় সায় দিয়ে আবু কির বললো: "খুব ভালো একটা চিন্তা করেছো তুমি। তুমি তাহলে যাও! জাহাজের ভেতর গিয়ে একটা চক্কর মেরে আসো! কাস্টমার পেলে কাজ শুরু করে দাও!" এই বলেই আবু কির জাহাজের ফ্লোরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো।

বলছিলাম আবু কির জাহাজের ফ্লোরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে আর আবু সাবর জাহাজের ভেতর খাবারের সন্ধানে তৎপর হয়ে ওঠে। জাহাজের মুসাফিরদের মাঝে ঘুরেফিরে আবু সাবর দেখতে লাগলো কোনো কাস্টমার মেলে কিনা! ভাগ্য সুপ্রসন্ন। এক পাক দিতেই যাত্রীদের মাঝ থেকে একজন আবু সাবরকে ডেকে বললো তার মাথার চুলগুলো সুন্দর করে কেটে দিতে। আবু সাবর সুন্দর করে আন্তরিকতার সঙ্গে ওই লোকের মাথার চুল কেটে দেয় এবং বিনিময়ে একটি কয়েন মজুরি হিসেবে পায়। আবু সাবর খুশি হয়ে যায়। তবে সে কাস্টমারকে নি:সঙ্কোচে বলে: "পয়সা না দিয়ে যদি আমাকে সামান্য রুটি বা খাবার দিতেন তাহলে আমার ভীষণ উপকার হত"।

আবু সাবরের কথা শুনে কাস্টমার লোকটি পয়সা ফেরত নিলো এবং সামান্য রুটি এবং পণির তাকে দিলো। আবু সাবর সেগুলো পেয়ে খুশি হয়ে গেল এবং তার পানির পাত্রটিও খাবারের পানি দিয়ে ভর্তি করে নিলো। সেগুলো নিয়ে আবু সাবর হাজির হলো তার সঙ্গী আবু কিরের সামনে। কাছে যেতেই দেখে আবু কির এখনো ঘুমে অচেতন। আবু সাবর তাকে ঘুম জেগে জাগিয়ে তুলে বললো: 'তোমার জন্য রুটি পণির নিয়ে এসেছি। খাবারের জন্য মিষ্টি পানিও নিয়ে এসেছি'।

আব কির সেগুলো পেট পুরে খেলো, পানি খেলো এবং আবার আগের মতোই ঘুমিয়ে পড়লো।

আবু সাবর আবারও গেল কাস্টমারের সন্ধানে। এবারও দুজন কাস্টমার পেয়ে গেল সে। দুজনেরই মাথার চুল সুন্দর করে কেটে দিলো আবু সাবর। এবার এক কাস্টমারের কাছ থেকে নিলো রুটি আর অপর কাস্টমারের কাছ থেকে নিলো পণির। এভাবে তার কাজের চাহিদা আস্তে আস্তে বেড়ে গেল। এক ধরনের দেখাদেখি অন্যজনও চুল কাটতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। আগ্রহ এতোই বেড়ে গেল যে একজনের চুল কাটা শেষ না হতেই আরেকজন তাকে ডাকতে শুরু করে দিলো। সবাই চুল কাটাতে চায়। কারণ তারা দেখছিল আবু সাবরের চুল কাটার স্টাইলটা বেশ সুন্দর এবং পরিপাটি।

জাহাজের যাত্রীদের মাঝে মিশরের একজন যাত্রী ছিল। তার নাম ছিল কাবতন। সে ছিল যেই শহরে যাত্রীবাহী জাহাজটি গিয়ে ভিড়বে সেই শহরের বাদশার কর্মচারীদের একজন। সেই কাবতনও আবু সাবরকে ডাকলো চুল কাটাতে। আবু সাবর তার চুলও কেটে দিতে শুরু করলো। চুল কাটার ফাঁকে আবু সাবরের সঙ্গে কথাবার্তা হয়। কথাবার্তার মাঝে আবু সাবর তার এবং তার বন্ধুর সকল ঘটনা খুলে বলে। কাবতন ছিল বেশ উদার এবং সদয়। সে আবু সাবরকে বললো: "হে ভাই আমার! তুমি যতদিন এই জাহাজে আছো ততদিন খানাপিনা নিয়ে কোনো টেনশন করো না। প্রত্যেক রাতে তুমি তোমার বন্ধুকে নিয়ে চলে এসো! আমরা সবাই একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করবো"।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/১৪/টি-১১৪.২

২০১৭-০৮-১৪ ১৭:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য