নামাজ আদায় মসজিদ তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হলেও ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিশ্বনবী (সা.)’র রেসালাতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কেন্দ্র হিসেবে মসজিদ ব্যবহৃত হতো।

এ লক্ষ্যে মসজিদে আয়োজন করা হতো ওয়াজ মাহফিলের মতো নানা ধর্মীয় সভা। মহানবী (সা.) নিজে যেমন জনসভা করে মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন তেমনি নিজ উম্মতকে উপদেশ দিয়ে গেছেন এ ধরনের মাহফিলের আয়োজন করতে। তিনি বলেছেন: তোমরা জান্নাতের বাগানের দিকে ছুটে যাও। জান্নাতের বাগান বলতে কি বোঝানো হয়েছে- সাহাবীরা এমন প্রশ্ন করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ওয়াজ ও জিকিরের মাহফিল বা যেখানে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা হয় সে জায়গাই জান্নাতের বাগান।

যাদের অন্তরে সত্য গ্রহণের জন্য সামান্যতম প্রস্তুতি ছিল রাসূলের মাহফিলে অংশগ্রহণ করামাত্র সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যেত। ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করত। রাসূলুল্লাহ (সা.)’র দ্বীন প্রচারের পদ্ধতি শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তিনি জীবনের প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনের পদ্ধতি মানুষকে বাতলে দিয়েছেন। রাসূলে খোদা (সা.)’র আচার ব্যবহারে মানুষ এতটা মুগ্ধ হতো যে অনেকে তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মসজিদে আসলেও তাঁর আচরণে মুগ্ধ হয়ে উল্টো ইসলাম গ্রহণ করে বসত। যেসব ব্যক্তি মহানবী (সা.)কে হত্যার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মসজিদে নববীতে ছুটে গিয়েছিল তাদের অন্যতম ছিল উমাইর বিন ওহাব।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, বদর যুদ্ধে মক্কার কাফেরদের শোচনীয় পরাজয়ের পর উমাইর বিন ওহাব এবং সাফওয়ান বিন উমাইয়া কাবাঘরের পাশে বসে আলাপ করছিল। মদীনায় হিজরত করার আগে উমাইর বিশ্বনবী (সা.)  ও তাঁর সাহাবীদের অনেক কষ্ট দিয়েছিল। বদর যুদ্ধে তার ছেলে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দি হয়। সাফওয়ানের সঙ্গে আলাপের সময় উমাইর বদর যুদ্ধে নিহতদের প্রসঙ্গ তোলে।  সাফওয়ান বলে: খোদার কসম! বদরে নিহতদের হারিয়ে আমাদের জীবন সত্যিই অচল হয়ে পড়েছে।

এ সময় উমাইর বলে ওঠে: ঠিক বলেছ। খোদার কসম! যদি আমার ঋণের অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য থাকত এবং আমি চলে গেলে আমার সন্তানদের ভরণ-পোষণের চিন্তা করতে না হতো তাহলে আমি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম।  সুযোগ বুঝে সাফওয়ান আসল কথায় আসল।  বলল: তোমার ঋণ আমি পরিশোধ করে দেব। আর আমার সন্তানদের মতোই আমি তোমার সন্তানদের লালন পালন করব। উমাইর একথা শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে সাফওয়ানকে বলল: তাহলে আমি মদীনায় যাই। আর তুমি এই গোপন পরিকল্পনার কথা কাউকে বলে দিও না যেন।  

এরপর উমাইর নিজের ধারালো তরবারীতে বিষ মাখিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।  মদীনায় পৌঁছে সে সোজা মসজিদে নববীতে চলে যায়।  আগে থেকে সাহাবীরা তাকে চিনত বলে তারা তাকে মসজিদে ঢুকতে বাধা দিতে যান। কিন্তু রাসূলে খোদা (সা.) তাদেরকে নিষেধ করেন।  তিনি বলেন, ওকে ছেড়ে দাও। এরপর উমাইর আল্লাহর রাসূলের সামনে গিয়ে বলে: সুপ্রভাত। এই সম্ভাষণটি ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের সংস্কৃতি।  এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: মহান আল্লাহ এর চেয়ে সুন্দর সম্ভাষণ আমাদের শিখিয়েছেন এবং সেটি হচ্ছে সালাম। এরপর তিনি উমাইরের কাছে জিজ্ঞাসা করেন সে কি উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে এসেছে? উমাইর উত্তর দেয়, আপনাদের হাতে আটক আমার ছেলেকে মুক্ত করার সুপারিশ নিয়ে এসেছি।

এ সময় মহানবী (সা.) বলেন, না, তুমি এ কারণে আসোনি। তুমি এবং সাফওয়ান কাবাঘরের পাশে বসে বদর যুদ্ধে নিহতদের বিষয়ে কথা বলেছ। এরপর তিনি সাফওয়ান ও উমাইরের মধ্যে যেসব কথা হয়েছে তার সব বলে দেন।  তারপর বলেন, তুমি কি কারণে আমার কাছে এসেছ তাও আল্লাহ তায়ালা আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। একথা শুনে উমাইর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।  সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। নিঃসন্দেহে আপনি আসমানের খবর পান।  সাফওয়ানের সঙ্গে আমার কি কথা হয়েছে তা আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ জানে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। আমি আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাকে ইসলামের দিকে হেদায়েত করেছেন। এরপর উমাইর কলেমায়ে শাহাদাৎ পড়ে মুসলমান হয়ে যায়। মহানবী (সা.) সাহাবীদের উদ্দেশ করে বলেন, উমাইরকে কুরআন ও ধর্মীয় বিধিবিধান শিক্ষা দাও এবং তার ছেলেকে মুক্ত করে দাও।

আসরের এ পর্যায়ে আমরা সিরিয়ার অন্যতম বিখ্যাত মসজিদ- ‘জামে উমাইয়া’ মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করব। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পুরনো অংশে অবস্থিত এই মসজিদ এক সময় ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সুন্দর মসজিদ।  হিজরি ৮৭ সালে উমাইয়া রাজবংশের ৬ষ্ঠ খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক এটি নির্মাণ করেন।  ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই মসজিদের জায়গায় এক সময় অগ্নি উপাসকদের মন্দির ছিল। রোমানরা সিরিয়া দখল করে মন্দিরটিকে প্রশস্ত করে এটিকে তাদের ঈশ্বরের উপাসনালয়ে পরিণত করে। হযরত ঈসা (আ.)’র আবির্ভাবের পর উপাসনালয়টিকে গির্জায় পরিণত করা হয়। এক পর্যায়ে ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলমানরা সিরিয়া দখল করেন এবং গির্জাটিকে নামাজ আদায়ের ঘর হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। অবশ্য গির্জার একাংশকে তারা গির্জা হিসেবেই রেখে দেন খ্রিস্টানদের উপাসনা করার জন্য।

দীর্ঘ ৭০ বছর পর্যন্ত মুসলমান ও খ্রীস্টানরা এখানে পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতেন।  ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক খলিফা হওয়ার পর গির্জাটিকে মসজিদের সঙ্গে একীভূত করে ফেলেন এবং নতুন করে এটি নির্মাণের আদেশ দেন। তার নির্দেশে গির্জায় রোমানদের তৈরি টাওয়ার ভেঙে মিনার নির্মাণ করা হয় এবং সেই মিনার থেকে আজান দেয়া হয়। মুসলিম বিশ্বে তখন পর্যন্ত মসজিদে মিনার নির্মাণের রেওয়াজ ছিল না। উমাইয়া খলিফারা প্রথম এটি নির্মাণ করেন এবং এর নকশা নেয়া হয় সিরিয়ায় রোমানদের তৈরি উপাসনালয়গুলোর টাওয়ারের অনুকরণে।

খলিফা ওয়ালিদ এই মসজিদ নির্মাণের জন্য ইরানি ও ভারতীয় নির্মাণশিল্পীদের সিরিয়ায় আমন্ত্রণ জানান। মসজিদ নির্মাণের জন্য তিনি মরমর পাথরসহ অন্যান্য মূল্যবান পাথর কেনার নির্দেশ দেন। মসজিদের স্তম্ভগুলোতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের কারুকাজ করা হয় এবং এর মেহরাব সাজানো হয় নানা রকমের মূল্যবান ধাতব পদার্থ দিয়ে।

মসজিদের বারান্দায় স্থাপন করা হয় ৪৪টি স্তম্ভ। এগুলোর ২০টি ডানদিকে এবং ২০টি মসজিদের বামদিকে অবস্থিত। আর ঠিক মাঝখানে রয়েছে মূল চারটি স্তম্ভ যেগুলোর উপর মসজিদের মূল মিনারটি অবস্থিত।

ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় যুগে যুগে মসজিদটিতে নানা রকমের সংস্কার কাজ করা হয়েছে। মসজিদের আঙিনায় তিনটি ‘কুব্বাহ’ বা গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে।  আঙিনার ডানদিকে ‘কুব্বাতুল মাল’ বা ‘অর্থ গম্বুজ’ তৈরি করা হয়। ১৭২ হিজরিতে দামেস্কের গভর্নর ফজল বিন সালেহ এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের অর্থসম্পদ এই গম্বুজের মধ্যে রাখা হতো বলে এর নাম দেয়া হয় কুব্বাতুল মাল।

হিজরি ৩৬৯ সালে মসজিদের আঙিনার ঠিক মাঝখানে নির্মাণ করা হয় ‘কুব্বাতুল ওজু’। মুসল্লিদের ওজু করার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়। হিজরি পঞ্চম শতকে আঙিনার বামদিকে স্থাপন করা হয় ‘কুব্বাতুস সাআত’ বা ‘ঘড়ি গম্বুজ’। এখানে স্থাপন করা হয় একটি সুদৃশ বড় ঘড়ি।   

আগেই যেমনটি বলেছি, উমাইয়াদের খেলাফতকালে মুসলিম বিশ্বে প্রথম মসজিদের মিনার নির্মাণ করা হয়। জামে উমাইয়া মসজিদে রয়েছে তিনটি বড় মিনার। চতুর্কোণ আকৃতির মিনারগুলো মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। পূর্বদিকের মিনারটিকে মিনারে ঈসা বলা হয়। অনেক বিশ্বাস করেন, শেষ জামানায় আল্লাহর নবী হযরত ঈসা (আ.)আসমান থেকে এই মিনারের উপর নেমে আসবেন। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/৮

২০১৭-০৯-০৮ ১৭:৪০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য