• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-২৬

ইসলামী সভ্যতার উন্নয়নে দর্শন জ্ঞান এবং মুসলমান দার্শনিকদের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। মানব জ্ঞানের একটি সাম্রাজ্য হচ্ছে দর্শন।

 সৃষ্টিজগতের সামগ্রিক বিষয়ে জিজ্ঞাসা এবং তার সমাধান, সৃষ্টি বা সত্ত্বার শুরু এবং তার পরিসমাপ্তি বিশেষ করে সেখানে মানুষের স্থান ইত্যাদি বিষয়ে যৌক্তিক আলোচনা পর্যালোচনা করা হয় দর্শনে। এককথায় জগত এবং জীবন হচ্ছে দর্শনের আলোচ্য বিষয়। দর্শন শব্দটির মূল হচ্ছে ফিলেনসোফিয়া। এটি একটি গ্রিক যৌগিক শব্দ যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান বা প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসা।

প্রাচীন গ্রিসে সুফিবাদীরা নিজেদেরকে সুফিস্ট অর্থাৎ জ্ঞানী বলে অভিহিত করতো। তাদের লক্ষ্য ছিলো মানুষকে শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু সক্রেটিস তাদের চিন্তারীতির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বিরোধিতা করার কারণ ছিলো এই যে,সুফিরা যে অনেক বিষয়েই জানে না, সে ব্যাপারে তারা ওয়াকিফহাল নয়। তবে তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই জানেন যে তিনি জানেন না।

এ জন্যে তিনি নিজেকে দার্শনিক অর্থাৎ জ্ঞানপ্রেমী মনে করতেন। তাঁকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো-আপনি কি একজন জ্ঞানী মানুষ? জবাবে তিনি বলতেন-না, আমি একজন জ্ঞানপ্রেমী অর্থাৎ জ্ঞানকে ভালোবাসি।তো এ থেকে দর্শনের অর্থ সেই শুরু থেকেই জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা বা আকর্ষণকেই বোঝায়। অর্থ যাই হোক না কেন, দর্শনের সংজ্ঞা কিন্তু বিভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ সত্ত্বার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বা জ্ঞানকে দর্শন বলেছেন আবার কেউবা বলেছেন মানুষের সামর্থ অনুযায়ী বস্তুর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানাকে। তবে ইসলামী বিশ্বে দর্শনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ইসলামী দর্শনের একটি বিভাগ হলো মাশায়ী দর্শন বা পেরিপ্যাথেটিক ফিলোসফি যা চিন্তা-যুক্তি এভং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলায় পেরিপ্যাথেটিক ফিলোসফির অনুবাদ করা যেতে পারে ভ্রাম্যমান দর্শন।

এই দর্শনটি অবশ্য এরিস্টটলের মতাদর্শ ভিত্তিক। তিনি নিজের চিন্তাদর্শনকে ছাত্রদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে সবসময় পথে হাঁটতেন এবং ছাত্ররা তাঁর কথা গভীর মনোযোগের সাথে শুনতো। এজন্যেই তাঁর দর্শনকে ভ্রাম্যমান দর্শন বলা হয়। এই ভ্রাম্যমান দর্শন এসহাক কেন্দি, ফারাবি, আবু আলি সিনা, ইমাম ফাখরে রাযি এবং ইবনে রুশদের মতো জ্ঞানী-গুণী দার্শনিক ও মনীষীগণ অনুসরণ এভং চর্চা করেছেন এবং তারপর এই দর্শন পাশ্চাত্যে চর্চিত হয়েছে।

ইসলামী দর্শনের আরেকটি বিভাগ হলো বোধি বা সজ্ঞাবাদী দর্শন। আরবি ভাষায় একে বলে আশরাক। আশরাফ শব্দটির অর্থ হচ্ছে আলোকিত হওয়া,উজ্জ্বল হওয়া এবং সুস্পষ্ট হওয়া। এই সজ্ঞাবাদী দর্শন কালের বিবেচনায় সবচেয়ে প্রাচীন দর্শন। স্পষ্টতা এবং সহজতার কারণেই দর্শনটির এরকম নামকরণ করা হয়েছে। সজ্ঞাবাদী দর্শন হচ্ছে প্লেটোর দর্শন। মুসলিম বিশ্বে এই দর্শনের ক্ষেত্রে সবার চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন মুহাম্মাদ সোহরাওয়ার্দি। মুহাম্মাদ সোহরাওয়ার্দির অনুসৃত দর্শনের চর্চা যাঁরা করেছেন তাদের মধ্যে শাহরুযি এবং আল্লামা কুতুবুদ্দিন শিরাযির নাম উল্লেখযোগ্য।

হিজরি একাদশ শতাব্দির বিখ্যাত আরেফ এভং দার্শনিক সাদরুদ্দিন মুহাম্মাদ শিরাযি যিনি মোল্লা সাদরা নামেই বেশিরভাগ পরিচিত, তিনি দর্শনের জগতে নতুন একটি মাত্রার সংযোজন করেন। তাঁর ঐ দর্শনের নাম দেওয়া হয়েছে উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা। ইসলামী দর্শনের তৃতীয় বিভাগে রয়েছে এই সাদর দর্শন।

দর্শনের ক্ষেত্রে তিনি যে কেবল প্লেটো এভং এরিস্টটলের দর্শনের মাঝে একধরনের সমন্বয় সৃষ্টি করেছেন তা-ই নয়, বরং তিনি সামগ্রিকভাবে দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এবং ইসলামী কালামের মধ্যে সমন্বয় আনার চেষ্টা করেছেন।এর মাধ্যমে মোল্লা সাদরা দর্শনশাস্ত্রে যেসব মতপার্থক্য বিরাজমান ছিল সে সবের সমাধান করেছিলেন। মোল্লা সাদরার পরবর্তীকালেও মুসলমান দার্শনিকদের মাঝে তাঁর উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা দর্শনের ব্যাপক প্রভাব ছিল।আব্বাসীয় শাসনামলে যখন অনুবাদের ধারার সৃষ্টি হয়েছিল তখন মুসলমানরা গ্রিক দর্শন সংক্রান্ত বইপুস্তকগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। যার ফলে মুসলমান দার্শনিকগণ গ্রিক দর্শনের সাথে পরিচিত হন।

মুসলমান দার্শনিক ও মনীষীগণ অবশ্য দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে এবং দর্শন বিদ্যার উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।আবু ইউসূফ ইসহাক কেন্দিকে মনে করা হয় সর্বপ্রথম মুসলিম দার্শনিক। তাঁর জীবনকাল হলো হিজরি ১৮৫ থেকে ২৬০।তিনিই সর্বপ্রথম কোনো মুসলমান যিনি দর্শন শাস্ত্র নিয়ে পড়ালেখা এবং গবেষণায় লিপ্ত হয়েছিলেন।

এজন্যে তাকেঁ আরব দার্শনিক বলে অভিহিত করা হয়।হিজরি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শতকে কুফা শহরে বুদ্ধিবৃদ্ধিক জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার জন্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। পড়ালেখার জন্যে উপযুক্ত এইসব প্রতিষ্ঠানে তিনি জ্ঞান চর্চায় অবতীর্ণ হন এবং দর্শন বিষয়ে গবেষণা চালান। তিনি গ্রিক ভাষা এভং সুরিয়ানি ভাষা শিখেছিলেন এভং আরবি ভাষায় বহু মূল্যবান গ্রন্থ অনুবাদও করেন। তিনি তাঁর সমকালীন প্রায় সকল বিদ্যঅতেই পারদর্শী ছিলেন।কেন্দি আধ্যাত্মিকতার প্রায় সকল দিকেই মনোযোগী ছিলেন।

বৃটেনের বিখ্যাত দার্শনিক ও রাজনীতি বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস বেকন কেন্দি এবং ইবনে হিশামকে টলেমির সমমানের দার্শনিক বলে গণ্য করতেন। এমনকি বাগদাদের বিশিষ্ট গবেষক ইবনে নাদিমও তাঁর সম্পর্কে বলেছেনঃ ‘কেন্দি প্রাছীন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে তাঁর সমকালে ছিলেন অনন্য।' অনুবাদ ব্যতীত তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা, সংলাপ আর দর্শন চর্চায়।

আলহুদুদ নামে তাঁর একটি রচনা সংকলন রয়েছে। এই সংকলনে কেন্দির দার্শনিক দৃষ্টির বর্ণনা রয়েছে। কেন্দি বলতেন ধর্ম এভং দর্শনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই যদি সেই দর্শনের লক্ষ্য হয় সত্য অনুসন্ধান। তিনিই সর্বপ্রথম কোনো মনীষী যিনি ধর্মের সাথে দর্শনের সমন্বয় চিন্তা করেছেন। তিনি ঐশী ধর্মকে নবী রাসূলদের ওপর নাযিলকৃত ওহীর শক্তিকে পূর্ণ বলে মনে করেন। সেজন্যে সেইসব ধর্ম প্রকৃত সথ্য ধর্ম। কেননা আল্লাহ যা কিছু বলেছেন বা নির্দেশ করেছেন নবী নরাসূলগণ অবিকৃতভাবে সেগুলোই প্রচার করেছেন। কেন্দির পর ফারাবি, ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদও একই রকম চিন্তার পোষণ করেছিলেন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আবু সাঈদ/১১

২০১৭-০৯-১১ ১৭:০৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য