নিঃসন্দেহে কারবালার মর্ম বিদারী ঘটনা হলো মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া অজস্র ঘটনাবলীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়।

এটা এমন এক বিস্ময়কর ঘটনা, যার সামনে বিশ্বের মহান চিন্তাবিদরা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন, পরম বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে স্তুতি-বন্দনায় মুখিরত হয়েছেন এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগের। কারণ, কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের মহানায়করা 'অপমান আমাদের সয় না- এই স্লোগান ধ্বনিত করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যায় হাতে গোনা জনাকয়েক হওয়া সত্ত্বেও খোদায়ী প্রেম ও শৌর্যে পূর্ণ টগবগে অন্তর নিয়ে জিহাদ ও শাহাদাতের ময়দানে আবির্ভূত হন এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার অন্ধকার জগতকে পেছনে ফেলে উর্দ্ধজগতে মহান আল্লাহর সনে পাড়ি জমান। তারা নিজ কথা ও কাজ দিয়ে জগতবাসীকে জানিয়ে দিয়ে যান যে, ‘‘যে মৃত্যু সত্যের পথে হয়,তা মধূর চেয়েও সুধাময়।’’

বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমানের জীবনপটে যেমন, তেমনি তাদের পবিত্র বিশ্বাসের পাদমূলেও আশুরার সঞ্জীবনী ধারা প্রবাহমান। কারবালার আন্দোলন সুদীর্ঘ চৌদ্দশ বছর ধরে-সুগভীর বারিধারা দিয়ে তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে প্রাণগুলোর। আজও মূল্যবোধ,আবেগ,অনুভূতি,বিচক্ষণতা ও অভিপ্রায়ের অযুত-অজস্র সুক্ষ্ণ ও স্থুল বলয় বিদ্যমান যা এই আশুরার অক্ষকে ঘিরে আবর্তনশীল। প্রেমের বৃত্ত অঙ্কনের কাটা-কম্পাস স্বরূপ হলো মহররম মাসের সেই কারবালা ও সেই আশুরা।

সেই কারবালাই পরবর্তীকালে জন্ম দিয়েছে তাওয়াবিন আন্দোলন ও মহামতি মুখতারের বিপ্লব, জন্ম দিয়েছে নফসে জাকিয়া ও ইমাম জায়েদের আন্দোলন। আর এইসব আন্দোলনের পরিণতিতেই ভেসে গেছে জালিম উমাইয়াদের রাজতন্ত্র এবং জোরদার হয় বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইতভুক্ত ইমামদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নানা আন্দোলন। যুগে যুগে দেশে দেশে নানা ইসলামী জাগরণ ও জুলুম বিরোধী গণ-বিদ্রোহ, যেমন সারবেদারান আন্দোলন এবং এমনকি সাম্প্রতিক যুগে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লবও কারবালার সেই মহাবিপ্লবের কাছে ঋণী। আজকের যুগেও শহীদ নাব্বাব সাফাভী, শহীদ চামরান, শহীদ ইমাদ মুগনিয়া ও অতি-সাম্প্রতিক সময়ের শহীদ হুজ্জাজিরাও সেই আশুরা এবং শাহাদতের অনুপম সংস্কৃতিরই সুফল। 

মহররম মাস বিশ্ব ইতিহাসের  গুরুত্বপূর্ণ বহু ঘটনার মাস হলেও কারবালার মহাবিপ্লব ও এ বিপ্লবের মহানায়ক শহীদ-সম্রাট হজরত ইমাম হুসাইন (আ) এবং তাঁর উৎসর্গকৃত-প্রাণ সঙ্গীদের শাহাদতের ঘটনাই এ মাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত ও সর্বোচ্চ মহিমায় চিরসমুজ্জ্বল। ইসলামের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে এক অমর মহাআদর্শ জড়িয়ে আছে এই পবিত্র মাসের সঙ্গে। খোদাপ্রেম, আত্মত্যাগ, ন্যায়কামীতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মতো নানা মহতী চেতনার সর্বোচ্চ প্রকাশ মহররমকে করেছে প্রকৃত খোদায়ী ধর্ম এবং সভ্যতার সবচেয়ে গৌরবময় পতাকা তুলে ধরার মাস।  

মহররম ও কারবালার মহাবিপ্লবকে বুঝতে হলে সব কিছুর আগে ভালোভাবে জানতে হবে প্রকৃত মুহাম্মাদি ইসলামের মূল কাণ্ডারিদের প্রকৃত মর্যাদা এবং বিশেষভাবে হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র প্রকৃত পরিচয় ও মর্যাদার স্বরূপ। একইসঙ্গে বুঝতে হবে প্রকৃত মুহাম্মাদি ইসলামের বিপরীত পথে চলা পশু-শক্তির মূল কূচক্রী ও তাদের কারসাজিগুলোকেও। আসুন আমরা আজকের এই পর্বে পরিচিত হই ইসলামের ইতিহাসের প্রবাদপুরুষ এবং মুহাম্মাদি ইসলামের সবচেয়ে দূর্যোগপূর্ণ মুহর্তের অনন্য কাণ্ডারি হযরত ইমাম হুসাইনের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে।

 চতুর্থ হিজরির ৩ শাবান মদীনা মুনাওয়ারায় বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দুহিতা হযরত ফাতেমা (আ.)-এর কোলে জন্মগ্রহণ করে এক পুত্রসন্তান। যাঁর জন্ম কেবল বিস্ময়কর ও অসাধারণই ছিল না, তাঁর গোটা জীবনকাল ও গৌরবময় শাহাদাত ছিল অশেষ রহস্যে পরিপূর্ণ। তাঁর মাতা যদি সক্ষম হতেন তাহলে তাঁকে দুধ পান করাতেন। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর নানা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জিহ্বা ও আঙ্গুল চুষেই পরিতৃপ্ত হতেন, শান্ত হয়ে যেতেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইমাম হুসাইনকে কাঁধে বসাতেন এবং বলতেন : এ বালক ও তার ভাই দুনিয়ায় আমার দুটি সুগন্ধী ফুল (রায়হান)।’ তিনি বারবার বলতেন : হুসাইন আমা থেকেআর আমি হুসাইন থেকে।’ আরও বলতেন : এরা দুভাই আমার আহলে বাইতের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁদের সম্পর্কে বলতেন : হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা।

তেহরানে মহররম মাসের প্রস্তুতি

ইমাম হুসাইন (আ.) ইসলামের মহাবিদ্যালয়ে অর্থাৎ যে গৃহে জিবরীল (আ.) আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হতেন সেখানেই মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কোলে এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের সান্নিধ্যে ও মা ফাতেমা যাহ্‌রার পবিত্র আঁচলের ছায়াতলে বড় হন। তাঁর শিক্ষার উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হন এ বিশ্ববিদ্যালয়েই। তাঁরই সহপাঠীবৃন্দ,যেমন হযরত সালমান ফারসি, হযরত মিকদাদ, হযরত আবু যার, হযরত ইবনে আব্বাস প্রমুখ তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন, কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে তাঁর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। যেমনটা আমরা জানি যে, ইবনে আব্বাস তাঁর নেতৃত্বে চলাকে নিজের জন্য গৌরবের কারণ বলে মনে করতেন এবং এ বিষয়টিকে নিজের জন্য সৌভাগ্য বলে ভাবতেন। 

মহানবীর (সা) সাহাবি আবু হুরায়রা ইমাম হুসাইনের পবিত্র পদধূলি নিজের জামা দিয়ে মুছেছেন এবং এ কাজের জন্য গর্বও করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন : ‘আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, হুসাইন তার দু’ পা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বুকের ওপরে রেখেছিল। আর রাসূল তাঁর জিহ্বায় চুমু দিচ্ছিলেন ও বলছিলেন : (اللهم احبه فانی احبهহে আল্লাহ্! একে তুমি ভালোবাস। কেননাআমি একে ভালোবাসি।’ 

ইমাম হুসাইন (আ.) প্রথম খলিফা আবু বকরের খেলাফতকালে যদিও মাত্র দশ বছরের এক বালক ছিলেন, তদুপরি বুজুর্গ সাহাবীবৃন্দের ফতোয়া ও জ্ঞান শিক্ষার আসরে অংশগ্রহণ করতেন। সাহাবীরা তাঁকে নিজেদের জায়গায় এনে বসাতেন এবং তাঁর প্রতি এতটা শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেন যা আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর কিম্বা আবদুর রহমান ইবনে আবু বকরের প্রতি করতেন না। ইমাম হুসাইন (আ.) এমন এক ঘরে বেড়ে ওঠেন যে ঘরের অধিবাসীরা তথা আহলে বাইত তাঁদের সর্বস্ব ধর্মের পথে উৎসর্গ করতেন এবং এ পথে তাঁদের কোন রকম কার্পণ্য বা ভণ্ডামি ছিল না।

ইবনে আসাকির তাঁর তারীখে কাবীর গ্রন্থে, আহমাদ ইবনে সুলায়মান তাঁর ইকদুল লিয়ালী গ্রন্থে, মুবাররাদ তাঁর কিতাবে কামিল-এ, ফাখরুদ্দীন রাযী তাঁর তাফসীরে و علم آدم الاسماء -এবং আদমকে শিক্ষা দিলেন নামসমূহ-এ আয়াতের ব্যাখ্যায়, মুহসিনুল হুসাইনী তাঁর লাওয়ায়িজুল আশজান গ্রন্থে, ইবনে কুতাইবা তাঁর উয়ুনুল আখবার গ্রন্থে, ইয়াকুত মুস্তাওসী তাঁর আল-জাওয়ায়িব গ্রন্থে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বদান্যতা ও দানশীলতার শত শত কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যেগুলো আগেকার দিনে মানুষের মুখে মুখে উদাহরণ হিসাবে উচ্চারিত হত। ইমাম হুসাইন (আ.) পূর্ণতা ও পবিত্রতার এমন চরম শিখরে পৌঁছেছিলেন যে, মুবাহালার সেই অগ্নি পরীক্ষায় খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে তিনি দ্যুতিময় চেহারা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। বিশ্বের সব ঐতিহাসিকের অকপট স্বীকারোক্তি মোতাবেক ইমাম হুসাইন (আ.) জ্ঞান, সংযমশীলতা, সত্যনিষ্ঠতা, সাহসিকতা,পরোপকার, দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের মাঝে ছিলেন হুজ্জাত বা আদর্শ। সবার আশ্রয়স্থলও ছিলেন তিনি। যেমনটা ‘আল হাসান ওয়াল হুসাইন’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে : ‘সবদিক বিচারে তিনি তাঁর নানা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে সবচেয়ে বেশি সদৃশ ছিলেন।’

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছ থেকে অনেক প্রসিদ্ধ দোয়া, অগণিত কারামাত ও অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ফলে তিনি অশেষ ও অফুরন্ত প্রশংসায় অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। মনে হয় ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর নিজের পরিচয় তাঁর শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্তে এ একটি বাক্যের মাধ্যমেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন : ‘হে আল্লাহ্! তুমি জান যে, এরপর জমিনের বুকে তোমার নবী-দুহিতার কোন পুত্রই আর রইল না।’#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২১

 

ট্যাগ

২০১৭-০৯-২১ ১৮:৫৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য