মহররম সম্পর্কিত গত কয়েকদিনের আলোচনায় আমরা মহান কারবালা বিপ্লবের প্রেক্ষাপট ও নানার উম্মতের হাতেই ইমাম হুসাইন (আ)'র মর্মবিদারী শাহাদতের শোকাবহ ঘটনা ঘটার কারণগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। এ পর্বে আমরা কারবালার ঘটনা-প্রবাহ ও ইমাম হুসাইন (আ)'র আন্দোলনের নানা বৈশিষ্ট আর গতি-প্রকৃতির ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করব।  

এটা সুস্পষ্ট যে, কারবালা বিপ্লবের স্মৃতি অমর এবং চিরজাগরুক হওয়ার মূল কারণ হল এটা ছিল এক শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয় বিপ্লবএটা ছিল ইতিহাসের এমন এক জ্বলন্ত অধ্যায় যা থেকে অনাগতকালের মুক্তিকামী মানুষ শিক্ষা নিয়ে লাভবান হবে

ইয়াজিদের পক্ষ থেকে বাইয়াত নেয়ার জন্যে ইমামের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের বাইয়াতের প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এরপর আসে সমর্থকদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি। কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে ইমামের (আ.) কাছে পৌঁছে যায় কুফাবাসীদের হাজার হাজার চিঠি। আর এক্ষেত্রে তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ইমাম হুসাইন (আ.) ইতিবাচক সাড়া দিলেন। আবার অন্যত্র তিনি ইয়াজিদের বাইয়াতের আদেশ কিংবা কুফাবাসীদের দাওয়াত-কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ না করে সরাসরি স্বৈরাচারী সরকারের বিরোধিতায় নামেন।

মুসলিম শাসন ক্ষমতায় বসে যারা ইসলামের মূলেই কুঠারাঘাত করছিল, মুসলিম উম্মাহকে যারা-সংঘাতে জর্জরিত করে দিচ্ছিল, হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল বানাচ্ছিল-ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। মুসলমানদের দীন-ঈমানের আশু বিপদ সম্পর্কে তিনি সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিলেন।

সবশেষে তিনি বললেন, আজ আর কোনো মুসলমানের মুখ বুজে বসে থাকা উচিত নয়। সাথে সাথে তিনি কারো সাহায্যের আশা বাদ দিয়েই আন্দোলনে নেমে পড়লেন।

হুসাইনি আন্দোলনের একটা অংশ বাইয়াত প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে, একটা অংশ আমন্ত্রণ প্রসঙ্গ নিয়ে এবং অপর অংশটি উদ্ভূত সামাজিক ফেতনা-ফ্যাসাদ ও বিদআতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের মুসলিম খিলাফত লাভের তিক্ত অভিজ্ঞতার সাথে আমরা সবাই কম-বেশী পরিচিত। ইমাম হাসানের (আ.) সহযোগীরা যখন তীব্র অনুৎসাহ প্রকাশ করল তখন তিনি মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হতে মনস্থ করলেন। কিন্তু সন্ধি সনদের কোথাও মুয়াবিয়ার খেলাফতকে স্বীকৃতি প্রদান সূচক কোনো বাক্যের উল্লেখ ছিল না! বরং বলা হয়েছিল যে, মুয়াবিয়া একান্তই যদি হুকুমত করতে চায় তাহলে তা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত করুক। কিন্তু তারপর ক্ষমতা থাকবে মুসলমানদের হাতে। তারা যাকে উপযুক্ত মনে করবে তাকেই শাসক নির্বাচন করবে।

মুয়াবিয়ার সাথে সম্পাদিত সন্ধিপত্রে ইমাম হাসান (আ.) প্রদত্ত বিভিন্ন শর্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল যে, মুয়াবিয়া মুসলমানদের ভবিষ্যত নিয়ে নাক গলাবে না। তার জন্যেই ইসলামকে যে মূল্য দিতে হয়েছে এতটুকুই যথেষ্ট। এরপর থেকে মুসলমানরা যেন দম ছেড়ে বাঁচতে পারে। মোট কথা মুয়াবিয়া যে ক দিন আছে সে ক দিন কষ্টে-শিষ্টে পার হলেই রক্ষা। এরপরে মুসলমানদের ভাগ্য নির্ধারণে মুয়াবিয়ার হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার থাকবে না।

কিন্তু মুয়াবিয়া তার চিরকালের স্বভাব অনুযায়ী এবারও ইমাম হাসানের (আ.) সাথে প্রতিশ্রুত সন্ধির প্রতিটি শর্তকেই পদদলিত করে তার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে থাকে। এমনকি বিষ প্রয়োগে ইমাম হাসানকে (আ.) শহীদ করার মতো অমানুষিক কাজ করতেও সে দ্বিধা বোধ করেনি। মুয়াবিয়ার মূল অভিসন্ধি ছিল যেকোনো মূল্যে খেলাফতের চাবি উমাইয়া বংশের হাতছাড়া করা যাবে না।

ঐতিহাসিকরা বলেন, মুয়াবিয়া এ লক্ষে এমন কিছু করে যেতে চেয়েছিল যাতে খেলাফতকে সুলতানি আকারে গড়ে তোলার পক্ষে গ্যারান্টি হয়ে থাকে। কিন্তু মুয়াবিয়া বুঝত যে, এ কাজ আপাতত সম্ভব ছিল না। তাই অনেক চিন্তা-ভাবনা এবং একান্ত বিশ্বস্তদের সাথে শলা-পরামর্শের পরও মুয়াবিয়া কোনো সুনির্দিষ্ট উপায় খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়। সে এ ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী ছিল না। আর তার এ মতলব জনগণের সকাশে প্রকাশ করতেও সাহস পাচ্ছিল না। মুগাইরা ইবনে শুবার পরামর্শে ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে মুয়াবিয়া।

মুগাইরার এ উদ্যোগের পিছনেও একটা দুরভিসন্ধি ছিল। সে আগ কুফার গভর্ণর ছিল। কিন্তু মুয়াবিয়া তাকে বরখাস্ত করায় সে খুব অসন্তষ্ট হয়। ধোঁকাবাজি ও ফন্দিবাজিতে ইতোমধ্যেই সে 'আরবের চাম্পিয়ন' খ্যাতি লাভ করেছিল। শাসনযন্ত্রের এহেন সংকটাবস্থায় সে কুফার গভর্ণর পদ পুনরায় হাতে পাবার আশা নিয়ে এক ফন্দি করে বসল। শামে এসে সে ইয়াজিদকে বলল- কেন যে মুয়াবিয়া তোমার ব্যাপারে কুণ্ঠা করছে বুঝতে পারছি না, আর কত দেরি করবে? ইয়াজিদ বলল, 'আমার বাবা ভয় পায়, কেননা এ কাজ হয়তো সফল নাও হতে পারে।

সাথে সাথে মুগাইরা বলে উঠল: "না-না, অবশ্যই সম্ভব। ভয় কিসের? তোমাদের কথার অবাধ্য হবে এ সাহস কার আছে? শামের লোকজন মুয়াবিয়ার কথায় ওঠে আর বসে। মদীনায়ও যদি অমুককে পাঠানো হয় তাহলে সব শায়েস্তা হয়ে যাবে। আর বাকী থাকে কেবল কুফা। ঠিক আছে আমি নিজেই ওখানকার ভার নিচ্ছি।"

একথা শুনে ইয়াজিদ উৎসাহিত হলো এবং মুয়াবিয়ার কাছে ব্যাপারটা খুলে বলল। মুয়াবিয়া মুগাইরাকে ডেকে পাঠাল। বাকপটু মুগাইরা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তীক্ষ্ণ যুক্তি দিয়ে মুয়াবিয়াকে কাবু করে ছাড়ল। সে মুয়াবিয়াকে বোঝাতে সক্ষম হল যে, সবকিছুই অনুকুলে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। আর কুফার ব্যাপারটা একটু জটিল হলেও তা দেখার ভার আমার ওপরই রইল। অবশ্য এসব ষড়যন্ত্র ইমাম হাসানের (আ.) শাহাদাতের পর ও মুয়াবিয়ার শেষ বয়সেই সংঘটিত হয়।

কিন্তু আগাম বাইয়াত নিতে গিয়ে দেখা গেল কুফা ও মদীনার জনগণ মানতে রাজী হল না। অগত্যা মুয়াবিয়া নিজে মদীনায় গিয়ে গণ্যমান্যদের, যেমনঃ ইমাম হুসাইন (আ.), আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর প্রমুখের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। মুয়াবিয়া তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, "ইয়াজিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়াটাই এখন ইসলামের জন্যে কল্যাণকর। কেননা ইয়াজিদ খলীফা হলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ও বিদ্রোহ দেখা দেব না। তাই আপনারা এ প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান। কার্যত শাসন ক্ষমতা আপনাদের হাতেই রইল। কাজেই আপনারা আর দেরী না করে ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করে ফেলুন।"

এভাবে নানা কথা বলে মুয়াবিয়া তাদেরকে রাজী করাতে চাইল। কিন্তু কোনোমতেই সে তাদেরকে রাজী করাতে পারল না। মুয়াবিয়া বিফল হল। এবার মদীনার মসজিদে গিয়ে তার শেষ প্রচেষ্টা চালালো। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মসজিদে দাঁড়িয়ে বলল, "তোমাদের গণ্যমান্যরা আমার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। সুতরাং তোমরাও ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করে ফেলো।" কিন্তু তারাও মুয়াবিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে।

এই বিফলতার জন্যে মুয়াবিয়া মৃত্যুকালে ইয়াজিদ সম্পর্কে খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। সে ইয়াজিদকে নসিহত করে যায়- আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের কাছ থেকে বাইয়াত নেয়ার জন্যে এভাবে আচরণ করবে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের সাথে ওভাবে আচরণ করবে, ইমাম হুসাইনের (আ.) সাথে এভাবে আচরণ করবে ইত্যাদি। মুয়াবিয়া বিশেষ করে ইমাম হুসাইনের (আ.) সাথে কোমল ব্যাবহার করার জন্যে ইয়াজিদকে নসিহত করে। কেননা ইমাম হুসাইন (আ.) নবীর সন্তান। জনগণ তাকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তাই তার সাথে কোনো সংঘাতে যাওয়া আদৌ ঠিক হবে না। মুয়াবিয়া ভালোভাবেই অবগত ছিল যে, যদি ইমাম হুসাইনের (আ.) সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয় এবং তার রক্তে হাত লাল করে তাহলে ইয়াজিদের রাজত্বের আয়ু শেষ হয়ে যাবে। মুয়াবিয়া ধুর্ত বুদ্ধি দিয়ে বেশ ভবিষ্যৎ বাণীও করতে পারত এবং খ্যাতিমান রাজনীতিকদের মতোই তা ফলে যেত। পক্ষান্তরে, ইয়াজিদ ছিল বয়সে অপরিপক্ক, বুদ্ধিতে আমড়া কাঠের ঢেঁকি আর রাজনীতিতে পুরোপুরি অনভিজ্ঞ। রাজকীয় ভোগ বিলাসে জীবন যাপন করে সে আরাম-আয়েশ ছাড়া কিছুই জানে না, যৌবনের অহংকারে ছিল গদগদ। পাশাপাশি ক্ষমতার লোভও তাকে আবিষ্ট করে ফেলে এবং এজন্য বিন্দুমাত্র ধৈর্য ধরার অবস্থাও তার ছিল না। তাই মুয়াবিয়ার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সে এমন এক কাজ করে বসল যাতে উমাইয়া খান্দানই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হল। ইয়াজিদ দুনিয়া ছাড়া কিছুই বুঝতো না। কিন্তু এ ঘটনার পরিণতিতে দুনিয়াও হারিয়ে বসে। অপরপক্ষে ইমাম হুসাইন (আ.) শহীদ হয়ে তার মহান লক্ষ্যে পৌঁছেন। তার আত্মিক-আধ্যাত্মিক সমস্ত লক্ষ্যই অর্জিত হয়। আর উমাইয়ারা সবকিছু হারিয়ে চরমভাবে পতনের সম্মুখীন হয়।

যদিও ইসলামকে ভাঙিয়েই তাদের এই আমীর-ইমারত। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন জাতির অসংখ্য মানুষ বাগদাদ কিংবা শামের শাসনকে মেনে নিয়েছিল কেবল ইসলাম ও কোরআনের খাতিরেই। এ কারণে মুয়াবিয়ার মত চালাক রাজনীতিবিদরা বুঝতে পেরেছিল যে, এই মুসলিম সমাজকে দাবিয়ে রাখতে হলে তাদেরকে অন্তত জাহেরী চেহারাকে ইসলামী করে রাখতে হবে। নতুবা যদি ফাঁস হয়ে যেত যে, মুসলমানদের রক্ষকরা নিজেরাই ভ্রান্ত তাহলে সেদিনই তারা রুখে দাঁড়াতো।

ইয়াজিদের আদেশ পেয়ে মদীনার গভর্ণর ইমাম হুসাইনকে (সা.) ডেকে পাঠাল। উমাইয়া গভর্ণররা সচরাচর নিষ্ঠুর প্রকৃতির হলেও মদীনার গভর্ণর ওয়ালিদ ছিল একটু ব্যতিক্রম। ইমাম হুসাইন (আ.) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের সঙ্গে মসজিদুন্নবীতে বসে ছিলেন। খলীফার দূত এসে তাদের দু জনকেই গভর্ণরের সাথে দেখা করতে বলে। তারা দূতকে বললেন, ঠিক আছে, তুমি ফিরে যাও। আমরা পরে আসছি। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ইমাম হুসাইনকে (আ.) জিজ্ঞাসা করলো, হঠাৎ করে গভর্ণর আমাদেরকে ডেকে পাঠাল যে! আপনার কি ধারণা? ইমাম জবাবে বললেন :

 আমার মনে হচ্ছে মুয়াবিয়া মারা গেছে এবং ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করার জন্যেই আমাদেরকে ডাকা হয়েছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর সেদিনই রাতের অন্ধকারে অচেনা পথ ধরে মক্কায় এসে আশ্রয় নেয়। এদিকে ইমাম হুসাইন (আ.) বনী হাশিম বংশের কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে দরবারে গেলেন। দরবারে ঢোকার আগে তিনি তাদেরকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে বললেন, আমার ডাক না শোনা পর্যন্ত তোমাদের কেউ ভেতরে ঢ়ুকবে না।

দরবারে ওয়ালিদের সাথে পাপিষ্ট মারওয়ানও ছিল। মারওয়ান এক সময় মদীনার গভর্ণর ছিল। ইমাম হুসাইনকে (আ.) দেখে ওয়ালিদ ইয়াজিদের চিঠি বের করল। ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, কি চাও?

ওয়ালিদ অত্যন্ত কোমলভাবে কথা বলতে শুরু করল,  জনগণ ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করেছে। মুয়াবিয়ার বহু দিনের খায়েশও ছিল এটা হোক। তাছাড়া, বর্তমানে ইসলামের জন্যেও এটা কল্যাণকর। তাই আপনিও ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করে ফেলুন। পরে আপনার কথামতো সব কিছুই চলবে। ত্রুটি-বিচ্যুতি সমাধান করে ফেলা হবে।

ইমাম বললেন, তোমরা কেন আমার কাছে বাইয়াত চাচ্ছ? আল্লাহর জন্যে তো নয়, আমার বাইয়াতের মাধ্যমে তোমাদের শরীয়ত বিরোধী খিলাফতকে শরীয়তসিদ্ধ করার জন্যেও তো নয়, বরং জনগণের জন্যেই তো? ওয়ালিদ বলল, হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন।

ইমাম বললেন, তাহলে এই ফাঁকা দরবারে তিনজনের উপস্থিতিতে আমি যদি বাইয়াত করি এতে তোমাদের কি লাভ হবে? বরং পরে হবে।

ইমাম হুসাইন (আ.) যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মারওয়ান আর সহ্য করতে না পেরে তেড়ে উঠল এবং ওয়ালিদকে দোষারোপ করে বলল, কি বলছ! এখান থেকে চলে যাবার অর্থ তিনি বাইয়াত করবেন না। পরে আর বাইয়াত আদায় করাও সহজ হবে না। তুমি এক্ষুণি খলিফার আদেশ পালন করো।

মারওয়ানের একথা শুনে ইমাম হুসাইন (আ.) ফিরে দাঁড়ালেন এবং তার জামার কলার ধরে উঁচু করে ফেলে দিলেন। অতঃপর রাগের স্বরে বললেন, এ ধরনের কথা বলার কোনো অধিকার তোমার নেই। ( দ্র. তারিখে তাবারী;  / ১৮৯, কিতাবুল ইরশাদ ২/৩৩ )

এদিকে ৬০ হিজরীতে মুয়াবিয়ার মৃত্যু হলে কুফাবাসীরা ইমাম হুসাইনকে (আ.) নিজেদের ইমাম বলে মেনে নেয় এবং সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তাকে কুফায় আসতে আমন্ত্রণ জানায়। ইমাম হুসাইনও তাদের দাওয়াত কবুল করেন এবং মক্কা ছেড়ে কুফাভিমুখে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু চপলমতি কুফাবাসীরা ইমামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং শেষ পর্যন্ত তারাই ইয়াজিদি বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে ইমাম হুসাইনকে (আ.) হত্যা করল।

এ ইতিহাস যখন পড়া হয় তখন অনেকের মনে এ ধরনের ধারণা জন্মে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) মদীনায় চুপচাপ বসেছিলেন, ভালোই ছিলেন কোনো ঝুঁকি -ঝামেলা ছিল না। শুধুমাত্র যে কারণে তিনি মদীনা ছেড়ে বেরিয়ে আসনে তা হলো কুফাবাসীদের আহ্বান। তবে, এ ধারণা একবারেই ভিত্তিহীন। কেননা ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদ ক্ষমতাসীন হবার অব্যবহিত পরেই অর্থাৎ ঐ রজব মাসেরই শেষার্ধ নাগাদ মক্কার পথে রওয়ানা হন এবং তখন কুফাবাসীদের কোনো চিঠিতো পৌঁছেইনি উপরন্তু মদীনায় কি ঘটছে এ সম্বন্ধে তারা (কুফাবাসীরা) কোনো সংবাদই তখনো জানতো না। ইমাম হুসাইন (আ.) বাইয়াত করতে অস্বীকার করার পর যখন মক্কায় এসে প্রবেশ করেন তার অনেক পরে কুফাবাসীরা এ সংবাদ শুনতে পায়। তারপরেই তারা ইমাম হুসাইনকে (আ.) সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পত্র পাঠায়। তাদের সমস্ত পত্র মক্কায় থাকাকালীন সময়েই ইমাম হুসাইনের (আ.) হাতে পৌঁছে।

অপরদিকে ইমাম হুসাইন (আ.) মদীনা ছেড়ে মক্কায় এসেছিলেন দুটো কারণে:

প্রথমতঃ মক্কায় আল্লাহর ঘর অবস্থিত। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই মক্কার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাই ইমাম হুসাইন (আ.) অধিকতর নিরাপত্তার জন্যে মক্কাকেই বেছে নিলেন।

দ্বিতীয়তঃ মক্কা ছিল দেশ-বিদেশের অসং মুসলমানের সমাগমস্থল। আর বিশেষ করে তখন ছিল রজব মাস। রজব ও শাবান এ মাসসমূহ ওমরাহর মাস। তাছাড়া আরও কিছু দিন পরে শুরু হবে হজের সমাগম। তাই ইমাম হুসাইন (আ.) মানুষের মধ্যে সত্য ইসলাম প্রচারের জন্যে এটাকে অত অল্প সময় বলে গণ্য করলেন।

কুফাবাসীর চিঠি আসে ইমামের মক্কা নিবাসের দু মাস অতিক্রান্ত হবার পর। অথচ এর মধ্যে কতকিছূ ঘটে গেছে। বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে ইয়াজিদি গুপ্তচররা তাকে খুঁজে ফিরছিল। তাই, কুফাবাসীদের দাওয়াতই যে ইমাম হুসাইনের (আ.) আন্দোলনে মূল অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল একথা কোনোক্রমেই ঠিক নয়। এটা বড়জোর একটা উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ইতিহাসের বিচারে বলা যায় যে, ঐ তীব্র চাপের সময় কুফাবাসীদের সাহায্যের আশ্বাস ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্যে কিছুটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল মাত্র।

কুফা ছিল মুসলিম সাম্রাজ্যের বৃহত্তর প্রদেশগুলোর অন্যতম। হযরত ওমরের সময় স্থাপিত এ নগরী ছিল মূলতঃ মুসলিম বাহিনীরই নিবাস। তাই সামরিক দিক দিয়ে এ নগরীর গুরুত্ব ছিল অত্যাধিক। ইসলামী ভূ-খণ্ডের ভাগ্য নির্ধারণে এ নগরীর ভূমিকা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। তাই, সেদিন কুফাবাসীরা যদি ইমাম হুসাইনের (আ.) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করত তাহলে হয়তো তিনি সশস্ত্র যুদ্ধেও জয়লাভ করতে পারতেন।

তখনকার কুফার সাথে মক্কা-মদীনার তুলনাই হতো না। এমন কি খোরাসানেরও না। কুফার মোকাবিলায় কেবল শামই ছিল শক্তিশালী। তাই কুফাবাসীদের দাওয়াত ইমামকে কেবল মক্কা ছেড়ে কুফায় যেতেই উদ্বুদ্ধ করে। অবশ্য মক্কাতেও কিছু সমস্যা ছিল। এ কারণে ইমাম হুসাইন (আ.) কুফাকেই মক্কার চেয়ে বেশী অনুকূল মনে করেন। মোট কথা কুফাবাসীদের দাওয়াত যেটুকু করতে পেরেছিল তাহলো ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কার বদলে কুফাকেই তার আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিলেন। কিন্তু এর বেশী কোনো অবদান এ প্রসঙ্গে ছিল না।

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা ছেড়ে কুফায় রওয়ানা হলেন। কুফার সীমান্তে এসে তিনি হুরের বাহিনীর হাতে বাধাগ্রস্থ হন। তিনি কুফাবাসীদেরকে বললেন: তোমরা আমাকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছ। যদি না চাও তাহলে আমাকে ফিরে যেতে দাও।

এই ফিরে যাবার অর্থ এটা ছিল না যে, তোমরা আমাকে সাহায্য করছো না, সুতরাং অগত্যা আমি ইয়াজিদের হাতে বাইয়াতই করে ফেলি, কখনই না। তিনি ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে বাঁচাতেই ঘর ছেড়ে পথে নেমেছেন। কুফাবাসীরা বিশ্বাসঘাতকতা করলেও ইমাম হুসাইন (আ.) তার লক্ষ্যকে পরিত্যাগ করতে পারেন না। তিনি এই সীমালংঘনকারী ও স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত না করে ক্ষান্ত হতে পারেন না। তার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। যেকোনো মূল্যেই তিনি এ দায়িত্ব পালন করতে চান। এ কারণে কুফাবাসীরা বিশ্বাসঘাতকতা করলেও ইমাম অন্য কোনো জায়গায় গিয়ে তার আন্দোলন অব্যাহত রাখতেন।

অবশ্য এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে,কুফাবাসীরা যদি ইমাম হুসাইনকে (আ.) আহবান না করত তাহলে তিনি মক্কা কিংবা মদীনায়ই থেকে যেতেন। এমন হয়তো নাও করতে পারতেন। কেননা এ উভয় জায়গায়ই ইয়াজিদি গুপ্তচররা ষড়যন্ত্রের জাল বুনে রেখেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সে বছের হজের সময় ইমাম হুসাইন (আ.) কে গুপ্তহত্যা করার জন্যে ইয়াজিদি গুপ্তচররা ইহরামের মধ্যেই অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিল। তবে, ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের অভিসন্ধি বুঝতে পারেন। নবীর (সা.) সন্তানকে আল্লাহর ঘরে ইবাদতের হালে, ইহরাম বাধা অবস্থায় হত্যা করবে-ইসলাম এবং মুসলমানদের জন্যে এর চেয়ে অবমাননাকর আর কি হতে পারে? এ কারণে ইমাম হুসাইন (আ.) হজব্রত অসমাপ্ত রেখেই মক্কা ত্যাগ করে কুফা অভিমুখে রওয়ানা হন। তাছাড়া অসংখ্য হাজীর মধ্যে একটা গুপ্ত হামলায় যদি ইমাম হুসাইন (আ.) নিহত হতেন তাহলে প্রসঙ্গে রক্ত বৃথা যাবার সম্ভাবনাই ছিল বেশী। কেননা পরে প্রচার চালানো হতো যে, ইমাম হুসাইনের (আ.) সাথে হয়তো কারো কুক্ষিগত মনোমালিন্য ছিল, সে-ই তাকে হত্যা করে আত্মগোপন করেছে।

ইমাম হুসাইন (আ.) যে এসব দিক সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন একথা তার বিভিন্ন ভাষ্য থেকে পরিস্কার ধরা পড়ে।

৬০ হিজরীর ১৫ই রজব মুয়াবিয়ার মৃত্যু হলে ইয়াজিদ মদীনার গভর্নরকে চিঠি লিখে বাবার মৃত্যুর খবর জানায় এবং জনগণের কাছ থেকে তার অনুকূলে বাইয়াত নেবার আদেশ করে। ইয়াজিদ জানতো যে, মদীনাই সবকিছুর কেন্দ্র এবং সবাই মদীনার দিকে তাকিয়ে আছে। এ কারণে সে ঐ চিঠির ভিতরে একটা চিরকুটে ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছ থেকে বাইয়াত নেবার জন্যে কড়া আদেশ দিয়ে পাঠায়। আরও বলে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) যদি বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তার মস্তক ছিন্ন করে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। এভাবে ইমাম হুসাইন (আ.) সরাসরি বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হলেন। যে বাইয়াতের অর্থ হতো সকল ইয়াজিদি কার্যকলাপের স্বীকৃতি দেবার পাশাপাশি আরও দুটো নতুন বিদআত প্রথার স্বীকৃতি দেবারই নামান্তর। এক হল: ইয়াজিদকে মেনে নেবার প্রশ্ন নয়, বরং একটা বিদআত প্রথা বা রাজতন্ত্রকে মেনে নেয়া। দ্বিতীয়ত: ইয়াজিদ শুধু ফাসেক বা লম্পটই ছিল না-প্রকাশ্যে এবং জনগণের সকাশেই সে এসব ক্রিয়াকলাপ চালাতো। এরূপ ব্যক্তিকে মুসলিম খিলাফতে বসানো অর্থাৎ ইসলাম ও কোরআনের মুখেই কলংক লেপন।

মুয়াবিয়াও ফাসেক ছিল বটে। কিন্তু সে একটা জিনিস ভালোভাবেই অনুধাবন করতো যে, যদি তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে হয় তাহলে বাহ্যিকভাবে অন্তত ইসলামী বেশভূষা বজায় রাখতে হবে।

কিন্তু ইয়াজিদের এ জ্ঞানটুকুও ছিল না। বরং প্রকাশ্যে ইসলাম ও মুসলমানদের অপমান করে কিংবা শরীয়তের বিধান লংঘন করে সে তৃপ্তি পেত। মদ্যপান, কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে আবোল-তাবোল বকা, বানর নিয়ে খেলা করা এ ধরনের অগণিত হারাম কাজকে সে হালাল মনে করতো। এ কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছিলেন:

ইয়াজিদের মতো লোক যদি উম্মতের রক্ষক হয় তাহলে এখানেই ইসলামের বিলুপ্তি ঘটবে । (মাকতালুল মোকাররাম)

এককথায় ইয়াজিদ ও অন্যদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। অন্যকথায় তা প্রকাশ করতে হলে বলতে হয় যে, স্বয়ং ইয়াজিদের অস্তিত্বই ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রচার। আর এই ইয়াজিদ চায় ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছ থেকে বাইয়াত নিতে! ইমাম হুসাইন (আ.) বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলতেন: আমি কোনোক্রমেই ওদের হাতে হাত দেব না- আর ওরাও আমার থেকে বাইয়াত চাইতে নিরস্ত হবে না।

এভাবে বাইয়াত করাতে বা করার জন্যে তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়। ইমাম হুসাইনের (আ.) মতো ব্যক্তি বাইয়াত না করে স্বাধীনভাবে জনগণের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে এর চেয়ে বিপজ্জনক ওদের জন্যে আর কি হতে পারে? তাই ইমাম হুসাইনকে (আ.) ক্ষমা করা ইয়াজিদের জন্যে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেননা বাইয়াত না করে তিনি বুঝাতে চান যে, আমি তোমাদেরকে মানি না, তোমাদের আইন-কানুন মেনে চলারও কোনো প্রয়োজন বোধ করি না। শুধু তাই নয়, এজন্যে আমি চুপ করে বসে থাকব না, বরং তোমাদেরকে সমূলে উৎখাত করেই তবে ছাড়ব। আর উমাইয়াদেরকে সমূলে উৎখাত করার মতো ক্ষমতা একমাত্র ইমাম হুসাইনেরই (আ.) ছিল। এ সত্য বুঝতে পেরে ইয়াজিদ মদিনায় ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছে বাইয়াত চেয়ে জোর তাগাদা পাঠায়। ইমামকে ইয়াজিদি শাসক গোষ্ঠীর পক্ষ হতে বলা হল: যদি বাইয়াত না করেন তাহলে মৃত্যু অনিবার্য। ইমাম জবাবে বললেন, মৃত্যু বরণ করতে রাজী আছি কিন্তু বাইয়াত করতে পারব না।

এ ঘটনার পর থেকে ইমাম হুসাইন (আ.) মাত্র তিনদিন মদীনায় কাটান। রাতের বেলায় তিনি রাসূলের (সা.) কবরে এসে দোয়া কালাম পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে বলতেনঃ হে মাবুদ, আমার সামনে এমন রাস্তা খুলে দিন যে রাস্তা আপনার পছন্দনীয়। তৃতীয় তথা শেষের দিন রাতে ইমাম হুসাইন (আ.) যথারীতি নবীজির (সা.) রওযায় এলেন, অনেক দোয়া-কালাম পড়ে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন এবং ক্লান্ত অবস্থায় এক সময় ওখানেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের ভিতরে স্বপ্নে দেখলেন যা প্রকৃতপক্ষে ইমাম হুসাইনের (আ.) চলার জন্যে পথের দিশা দিল। রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে প্রথমে তিনি জোর জবরদস্তি এবং অত্যাচার করার জন্যে উম্মতের বিরুদ্ধে নালিশ করলেন এবং এহেন দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্যে তিনি মৃত্যু কামনা করলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) জবাবে বললেন :

হে হুসাইন! আল্লাহর কাছে তোমার জন্য একটি মর্যাদা রয়েছে যা শাহাদাত ছাড়া তুমি অর্জন করতে পারবে না।

এবার ইমাম হুসাইন (আ.) তার করণীয় স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন। পরের দিন ভোরেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মক্কাভিমুখে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি কোনো আঁকা-বাকা বা অচেনা পথ বেছে নিলেন না বরং মদীনা থেকে মক্কায় যাবার সুপরিচিত পথ ধরেই এগিয়ে চললেন। তার সঙ্গীদের অনেকেই উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন:

হে ইমাম! আপনি সোজা পথে না গিয়ে বরং কোনো অচেনা পথ দিয়ে চললেই বোধহয় ভালো করতেন। কেননা ইয়াজিদি গুপ্তচররা যে কোনো মুহূর্তে আপনার পথ রোধ করে একটা কলহ-বিবাদের সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন বীরের বীর, তাঁর সাহস ছিল খোদায়ী বিশ্বাসে ভরপুর। তাই সঙ্গীদের এ ধরনের কোনো আশংকায় দৃষ্টিপাত না করে তিনি চেনা পথেই অগ্রসর হলেন এবং বললেন, আমি পলাতকের বেশ পরতে মোটেই আগ্রহী নই। এই চেনা পথেই যাব- আল্লাহ যা চায় তা-ই হবে।

ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছ থেকে বাইয়াত আদায় করার আদেশ জারী করে ইয়াজিদ বিশেষ চিঠিতে লিখেছিল:   ইমাম হুসাইনকে (আ.) কঠোরভাবে ধরে বাইয়াত আদায় করে ছাড়বে। 

অপরদিকে ইমাম হুসাইন (আ.)ও কঠোরভাবে এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তার এ সিদ্ধান্ত ছিল পাহাড়ের মতো অটল। তাই কারবালার ময়দানে চরম দুর্দশায় ফেলে ইবনে সাদ ভেবেছিল এখন হয়তো ইমাম হুসাইন (আ.) আপোষ-রফা মেনে নেবেন। এ উদ্দেশ্যে এক আলোচনায় সে ইমাম হুসাইনকে (আ.) আপোষ করতে উদ্বুদ্ধ করে কিন্তু কোনো প্রলোভনই ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতিজ্ঞায় ফাটল ধরাতে পারেনি।

আশুরার দিনের বিভিন্ন ভাষ্য থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, শেষ মুহুর্ত পর্যন্তও ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি এক ভাষ্যে বলেন, না। আল্লাহর কসম করে বলছি যে, কিছুতেই আমি তোমাদের হাতে হাত মেলাবো না। এমনকি আজ- এ দূরবস্থার মধ্যে পড়েও, নিজ সঙ্গী সাথীদের মৃত্যু নির্ঘাত জেনেও, পরিবার-পরিজনদের বন্দীদশা অনিবার্য জেনেও আমি আমার মহান লক্ষ্যকে তোমাদের কাছে বিকিয়ে দেব না। 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২৫

২০১৭-০৯-২৫ ১৮:১৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য