হযরত ইমাম হুসাইন (আ)'র কালজয়ী মহাবিপ্লব নানা কারণে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে এবং এইসব কারণে এই মহাপুরুষ ও তাঁর সঙ্গীরা মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার অক্ষয় আসন করে নিয়েছেন।  

এই কারণগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আন্তরিক চিত্তে যথাসময়ে জরুরিতম দায়িত্বটি পালন করা ও এ জন্য নিজের সন্তান ও জীবনসহ সব কিছু বিলিয়ে দেয়ার মত সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার। তাই মহান আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ এই খোদাপ্রেমিক ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য বিশ্বের সব যুগের মু'মিন মানুষের হৃদয়ে দান করেছেন অনন্য মমত্ববোধ আর শ্রদ্ধা। ইমামের অতুলনীয় বীরত্ব, সাহসিকতা ও আপোসহীনতাও এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

ইয়াজিদের মত বর্বর ও নিষ্ঠুর শাসকের আনুগত্য অস্বীকারের পরিণতি কি হতে পারে তা ভেবে যখন অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব আতঙ্কিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছিলেন অথবা আপোস বা নীরবতার পথ ধরেছিলেন তখন ইমাম হুসাইন (আ) প্রকাশ্যেই এই চরম জালিম ও তাগুতি শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জনগণকে জাগাতে সচেষ্ট হন। এ সময় ইমামের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক সাহাবি ও এমনকি তাঁর এক সৎ ভাইও বিপ্লবী তৎপরতা বন্ধের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাকে। কুফার পথে এক ব্যক্তি ইমামকে জিজ্ঞেস করেছিল; চলে এলেন যে!!। তার একথার অর্থ ছিল যে-মদীনায় আপনি শান্তিতে ছিলেন। সেখানে আপনার নানার মাজার। রাসূলুল্লাহর (সা.) মাজারের পাশে থাকলে কেউই আপনাকে বিরক্ত করতো না। অথবা মক্কায় আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নিলেই আপনি নিরাপদে থাকতেন, বেরিয়ে এসে আপনি বরং ভূল করেছেন এবং বিপদ বাড়িয়েছেন। জবাবে ইমাম বলেন, তোমার এ ধারণা ভূল। তুমি জান না যে,আমি যদি কোনো পশুর গর্ত গিয়েও আশ্রয় নেই তবুও ওরা আমাকে ছাড়বে না। ওদের সাথে আমার যে দ্বন্দ তার কোন সমাধান নেই। আপোষ-রফাও এখানে চলে না। ওরা আমার কাছ থেকে যেটা চায় কখনই তা আমি মেনে নিতে পারিনা আর আমি যেটা চাই সেটা ওদের পক্ষেও মেনে নেয়া অসম্ভব।  

হোসাইনী আন্দোলনের আরেক বড়  কারণ ছিল ‘‘ আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার’’ অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ। মদীনা থেকে বের হবার সময়েই তিনি তার এ লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। মোহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া ছিলেন ইমাম হোসাইনের (আ.) সৎ ভাই। তার একহাত পঙ্গু থাকায় জিহাদ করতে অসমর্থ ছিলেন বলে ইমাম হোসাইনের (আ.) সাথে আসতে পারেনিন। ইমাম হোসাইন (আ.) মদীনাতে একটা অসিয়তনামা লিখে তার হাতে দিয়ে এসেছিলেন। তাতে তিনি লেখেন,

 ‘এটা হল ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়ার কাছে লেখা হোসাইন ইবনে আলীর (আ.) অসিয়তনামা।

পরবর্তী কয়েকটি লাইনে ইমাম হোসাইন (আ.) আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসূলের (সা.) রিসালাতের প্রতি সাক্ষ প্রদান করলেন,কারণ ইমাম হোসাইন (আ.) জানতেন যে,তার হত্যার পর প্রচার করা হবে-ইমাম হোসাইন (আ.) দীন থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছিলেন। তাই প্রথমেই তিনি দীনের প্রতি তার অবিচল থাকার প্রমাণ রেখে এবার ইয়াযিদের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ এবং আন্দোলনের রহস্য বর্ণনা করলেনঃ

 ‘আমি যশ বা ক্ষমতার লোভে কিংবা ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করার জন্যে বিদ্রোহ করছি না। আমি আমার নানার উম্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই,আমি চাই সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং অসৎকাজে বাধা দিতে। সর্বোপরি,আমার নানা এবং বাবা হযরত আলী (আ.) যে পথে চলেছেন সে পথেই চলতে চাই।( দ্রঃ মাকতা লু খারাযমী ১ / ১৮৮ )

এখানে কিন্তু বাইয়াত প্রসঙ্গেরও কোনো উল্লেখ নেই,আবার কুফাবাসীদের দাওয়াত প্রসঙ্গেরও উল্লেখ নেই। অর্থাৎ,এর মাধ্যমে ইমাম হোসাইন (আ.) বোঝাতে চেয়েছেন যে,উপরোক্ত ইস্যু না থাকলেও তিনি ইয়াজিদকে সহ্য করতেন না। দুনিয়ার মানুষ জেনে রাখুক যে,এ হোসাইন ইবনে আলীর (আ.) খ্যাতি অর্জনের কোনো লোভ নেই,ক্ষমতারও কোনো লোভ নেই। বরং তিনি একজন সংস্কারক। যুগ যুগ ধরে ইসলামে যে বিদআতের আচ্ছাদন সৃষ্টি করা হয়েছে-তিনি সে সব আচ্ছাদন ছিন্ন করে ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে মুক্ত করতে চান।

ইমাম হোসাইন বলেছিলেন অধমের পুত্র আরেক অধম (ইবনে যিয়াদ) আমাকে আত্মসমর্পণ করা নতুবা যুদ্ধের হুমকি দেখাচ্ছে । নতি স্বীকার করা আমাদের কখনোই মানায় না। স্বয়ং আল্লাহ,তার রাসূল (সা.) ও মুমিনরা আমাদের নতি স্বীকারকে ঘৃণা করেন। 

ইমাম হোসাইনের (আ.) এই মহান ও ঐশী আত্মা তার সমস্ত প্রাণ ও রক্তমাংসের সাথে একাকার ছিল। হোসাইন (আ.) থেকে তা পৃথক করা আদৌ সম্ভব ছিল না। ইয়াযিদী কর্মকাণ্ড মেনে নেয়ার আর বিন্দুমাত্র সহ্য ক্ষমতা ইমাম হোসাইনের (আ.) ছিল না। তাই তিনি এবার আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন এবং ইয়াযিদী শক্তির উৎখাত করে ইসলাম এবং মুসলমানের মুক্তি দেয়াই তার এখন চুড়ান্ত লক্ষ্য ধার্য হল।

ওলিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে ইমামকে আহ্বান জানালে। ইমাম হুসাইন (আ) তাকে জানান যে:

'হে ওলিদ! আমাদের বংশ হল নবুওত ও রেসালতের খনি এবং ফেরেশতাদের আসা-যাওয়ার স্থান ও খোদায়ী রহমতের স্থান। মহান আল্লাহ নবী-পরিবারের মাধ্যমে ইসলামকে উদ্বোধন করেছেন এবং এই বংশকে সঙ্গে নিয়েই ইসলামকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেবেন। আর ইয়াজিদ যার আনুগত্য করতে তুমি আমায় বলছ সে হচ্ছে এমন এক মদখোর ও খুনি যার হাত নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত। সে হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহর বিধি-বিধানের সীমানা লণ্ডভণ্ড করেছে এবং জনগণের সামনেই নানা অশ্লীল কাজ ও পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অমন উজ্জ্বল রেকর্ড ও উন্নত পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমার মত একজন ব্যক্তি কী এই পাপিষ্ঠের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে বা তার নেতৃত্ব মেনে নেবে? তোমার ও আমার উচিত এ বিষয়ে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেয়া এবং তাহলে দেখতে পাবে যে খেলাফত বা মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাদের মধ্যে কে বেশি উপযুক্ত?'

এভাবে ইসলামের সেই চরম দুর্দিনে নানার ধর্ম ও সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন তাঁরই সুযোগ্য নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (অ)। মহানবী (সা) মুসলিম উম্মাহর এই অমর ত্রাণকর্তাকে 'উম্মতের নাজাতের তরী' ও 'হেদায়াতের প্রদীপ' বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর অর্থ ইমাম হুসাইনের (আ) দেখানো পথ ও আদর্শ অনুসরণ ছাড়া মুসলমানরা তাদের ঈমান ও পবিত্র ধর্মকে রক্ষা করতে পারবে না। 

বিশ্বনবী (সা) গোটা আহলে বাইতকে (আ) নুহের নৌকার সঙ্গে তুলনা করলেও ইমাম হুসাইনের (অ) ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ওই বিশেষণ যুক্ত করেছেন যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন ডুবন্ত বা আহত ব্যক্তিকে উদ্ধারেরর জন্য দ্রুত গতিশীল বাহন বা গাড়ি দরকার। অন্যদিকে সাধারণ রোগিকে ধীরে-সুস্থে বা কিছুটা পরেও সাধারণ কোনো গাড়িতে চড়িয়ে হাসপাতালে নেয়া যায়। কারবালার মহাবিপ্লবের আদর্শ ও ইমাম হুসাইনের (আ) ভূমিকা মৃতপ্রায় ইসলামকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত গতিশীল নৌকা বা বাহনের ভূমিকাই পালন করেছিল।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২৭

 

ট্যাগ

২০১৭-০৯-২৭ ২১:২৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য