গত কয়েক পর্বের আলোচনায় আমরা কারবালা বিপ্লবের প্রেক্ষাপট, ঘটনা-প্রবাহের গতি-প্রকৃতি এবং এ বিপ্লবের নানা বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আজও আমরা এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করব। 

ইমাম হুসাইন (আ)'র বিপ্লবী আন্দোলনের আরও এক বৈশিষ্ট্য যা হোসাইনী আন্দোলনকে মহতী ও পবিত্র করেছে তা হলো ইমাম হোসাইনের (আ.) দুরদর্শিতা ও উন্নত চিন্তাধারা। অর্থাৎ এ আন্দোলন এ কারণেই মহান যে,আন্দোলনকারী যা বুঝতে ও দেখতে পারেছন তা অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না। ঐ প্রবাদ বাক্যেটির মতো বলতে হয় যে,অন্যরা আয়নায় যা দেখতে পাচ্ছে না তিনি খড়কুটোর মধ্যেই তা দেখছেন। তিনি তার একাজের সুদূর প্রসারী ভাব দেখতে পাচ্ছেন। তার চিন্তাধারা সমসাময়িক যেকানো চিন্তাশীল লোকের উর্ধ্বে । ইবনে আব্বাস,ইবনে হানাফিয়া,ইবনে উমর প্রমুখ হয়তো পুরোপুরি নিষ্ঠার সাথে ইমামকে (আ.) কারবালায় যেতে নিষেধ করিছিলেন। তাদের চিন্তার মান অনুযায়ী ইমামকে বাধা দেয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু হোসাইন (আ.) যা দেখেছিলেন তারা তা দেখতে পাচ্ছিলেন না। তারা অত্যাসন্ন বিপদকেও যেমন অনুভব করছিলেন না তেমনি এ ধরনের আন্দোলন ও বিদ্রোহের সুদুরপ্রসারী ভাবকেও অনুধাবন করতে পারছিলেন না। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ.) সবকিছুই দিনের আলোর মতো দেখছিলেন। তিনি একাধিকবার বলেছেনঃ ওরা আমাকে হত্যা করবেই;আর আল্লাহর শপথ করে বলছি যে,আমার হত্যার পর ওদের অবস্থা বিপন্ন হবে। এ ছিল ইমাম হোসাইনের (আ.) তীক্ষ্ণ দুরদর্শিতা।

ইমাম হোসাইন (আ.) এক মহান ও পবিত্র আত্মার নাম। মূলত যখন কোন আত্মা মহান হয় তখন তা বেশী কষ্টের সম্মুখীন হয়। কিন্তু ছোট আত্মা বেশি নির্ঝঞ্জাটে থাকে। এ এক সার্বিক নিয়ম। ইবনে আব্বাসরা যদি ইমাম হোসাইনকে (আ.) বাধাও দেয় তবুও কি তিনি বিরত হতে পারেন! আরবের খ্যাতনামা কবি‘ মোতানাববী’ এ প্রসঙ্গে সুন্দর একটি উক্তি করেছেন,তিনি বলেন :
‘‘যখন কোনো আত্মা মহান হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সে অন্যদের পরিত্রাণে ছোটে,অন্যদের জন্যে কষ্ট ও যন্ত্রণা বরণ করে নেয়। কিন্তু যার আত্মা ছোট সে কেবল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ নিয়েই থাকে।’’ 

ছোট আত্মা একটু ভালো খাবারের জন্যে চাটুকারও হতে রাজি। ছোট আত্মা ক্ষমতা বা খ্যাতির লোভে হত্যা-লুন্ঠনও করতে রাজি। কিন্তু যার রয়েছে মহান আত্মা ,সে শুকনো রুটি খেয়ে তৃপ্ত হয়,তারপর ঐ সামান্য আহার শেষে সারারাত জেগে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়। নিজের দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র গাফলতি করলে ভয়ে তাঁর শরীর কাঁপতে থাকে। যার আত্মা মহান সে আল্লাহর পথে ও স্বীয় মহান লক্ষ্যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে চায়। আর এ পথে যখন সফলকাম হয় তখন আল্লাহকে শোকর করে। আত্মা মহান হলে আশুরার দিনে,এক শরীরে তিনশ’ ক্ষত সহ্য করতে হয়। যে শরীর হয় ঘোড়ার পায়ে পদদলিত সে একটি মহান আত্মার জরিমানা দেয়,একটি বীর,সত্য পূজারী এবং শহীদের আত্মার জরিমানা দেয়। এই মহান আত্মা বলে ওঠে আমি আমার রক্তে মূল্য দিতে চাই।

শহীদ কাকে বলে? প্রতিদিন কত মানুষ নিহত হচ্ছে। কিন্তু তাদেরকে কেন শহীদ বলা হয় না? শহীদ শব্দটি ঘিরে কেন এক পবিত্রতার আবেশ পাওয়া যায়? কারণ শহীদ সেই ব্যক্তি যার এক মহান আত্মা আছে সে আত্মা এক মহান লক্ষ্যকে অনুসরণ করে। শহীদ সে ব্যক্তি যে নিজ ঈমান ও আকীদা রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে,যে নিজের জন্যে তো নয়ই বরং মনুষ্যত্ব ও মানবতার স্বার্থে, সত্য ও হাকিকতের স্বার্থে চরমদুঃখ-দুর্দশা এমন কি মৃত্যুকেও সাদরে বরণ করে নেয়। শহীদ তার বুকের রক্ত দিতে চায় যেমনভাবে একজন ধনী তার ধনকে ব্যাংক বন্দী না করে তা সৎপথে দান-খয়রাত করে স্বীয় ধনের মূল্য দিতে চায়। সৎপথে ব্যয়িত প্রতিটি পয়সা যেমন লক্ষ -কোটি পয়সার মতো মূল্য লাভ করে তেমনি শহীদের প্রতি ফোটা রক্ত লক্ষ-কোটি ফোটায় পরিণত হয়। অনেকে হয়তো নিজ চিন্তাশক্তির মূল্য দেয় ও একটি আদর্শিক গ্রন্থ মানবকে উপহার দেয়। কেউ কেউ নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একটি উপকারী শিল্প মানুষকে উপহার দেয়। কিন্তু শহীদরা তাদের রক্ত দিয়ে মানবের শান্তি ও কল্যাণের পথকে মসৃণ ও সুনিশ্চিত করে।

এখন প্রশ্ন হলো: এদের মধ্যে কে মানবতাকে সবচেয়ে বেশী সেবা করল? অনেকে হয়তো ধারণা করতে পারে যে, একজন লেখক বা একজন ধনী কিংবা একজন শিল্পীর সেবাই সবচেয়ে বেশী। কিন্তু আসলে এ ধারণা একবারেই ভুল। শহীদদের মতো কেউই মানুষকে তথা মানবতাকে সেবা করতে পারে না। শহীদরাই সব কন্টকময় পথ পেরিয়ে মানবতার মুক্তি ও স্বাধীনতাকে বয়ে নিয়ে আসে। তারাই ন্যায়-নীতিবান ও শান্ত সমাজ গড়ে দিয়ে যায় যাতে জ্ঞানীর জ্ঞান,লেখকের কলম,ধনীর ধন,শিল্পীর শিল্প সুস্থ পরিবেশে বিনা বাধায় বিকাশ লাভ করতে পারে এবং মানবতা নিশ্চিন্তে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। শহীদরাই প্রদীপের মতো একটি পরিবেশকে আলোকিত করে রাখে যাতে সবাই অনায়াসে পথ চলতে পারে।   

পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে একটি প্রদীপের সাথে তুলনা করেছে। জগতে অবশ্যই প্রদীপ থাকতে হবে। অন্ধকার জগত নীরব-বধির, জীবনযাত্রা সেখানে অচল। এ সম্বন্ধে প্রখ্যাত কবি পারভীন এ’ তেসামী সুন্দর একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি একজন দক্ষ শিল্পী ও একটি প্রদীপের কথোপকথনকে এভাবে চিত্রিত করেছেন-

শিল্পী প্রদীপকে বলেঃ ‘তুমি জান না, আমি গত রাতে এক মুহূর্তও ঘুমাইনি। সারা রাত জেগে কত সুন্দর সুন্দর ফুল তুলেছি। আমার জামাটিকে ফুলবাগিচা বানিয়েছি। তুমি কখনোই আমার মতো ফুল তুলতে পারবে না। আমি আমার শরীরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে অসামান্য দক্ষতা খরচ করেছি।’
শিল্পীর এ কথা শুনে প্রদীপ একটু মুচকি হেসে বলল:
তুমি যে দাবি করছো সারা রাত জেগে তোমার রুচি ও দক্ষতাকে ফুটিয়ে তুলেছো-এসবই ছিল আমার আত্ম-নিঃশেষ করার ফল। আমি তিলে তিলে ক্ষয় হয়েছি ও তোমাকে আলো দিয়েছি বলেই তো তুমি তোমার দক্ষতাকে সুঁই ও সুতোয় আঁকতে পেরেছো। তোমার এসব দক্ষতা আমার জীবনের বিনিময়েই সম্ভব হয়েছে। তারপর বলছে
‘তাই তুমি সারা রাত ধরে যা করেছ বলে দাবি করছো- এসবই আমি করেছি।’

আজকে ইবনে সিনা-ইবনে সিনা হতো না, শেখ সাদী-শেখ সাদী হতো না, জাকারিয়া রাজী-জাকারিয়া রাজী হতে পারতো না যদি শহীদরা তাজা রক্ত খরচ করে ইসলামের চারাগাছকে সজীব না করতেন, ইসলামী সভ্যতাকে বাঁচিয়ে না রাখতেন। তাদের সমস্ত অস্তিত্বে একত্ববাদ, খোদাভীতি, ন্যায়পরায়ণতা, সৎসাহস আর বীরত্বে ভরপুর। তাই আমরা আজ যারা মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি তারা সবাই এ শহীদদের প্রতি ঋণী। ইমাম হোসাইনের (আ.) রক্তের প্রতি নবীজীর (সা.) উম্মত ঋণী।

ইমাম হোসাইনের (আ.) ব্যক্তিত্বের চাবি হল পৌরুষত্ব, বীরত্ব,বিচক্ষণতা, মহত্ত্ব, দৃঢ়তা, অটলতা এবং সত্যকামিতা। একবার ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করা হলো যে, আপনি যেসব কথা নিজ কানে রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছ থেকে শুনেছেন তার থেকে দু’ একটি আমাদেরকে বলুন। তখন ইমাম হোসাইন (আ.) রাসূলুল্লাহর (সা.) শত-সহস্র বাণীর মধ্যে কোন বাণীটি নির্বাচন করলেন তা থেকেই সহজে ইমাম হোসাইনের (আ.) ব্যক্তিত্বের ধরন অনুধাবন করা যায়। ইমাম হোসাইন (আ.) বললেন, আমি নিজ কানে রাসূলুল্লাহর (সা.) মুখ থেকে যা শুনেছি তা হলোঃ
‘‘আল্লাহ বড় এবং মহান কাজকে পছন্দ করেন এবং নীচ কাজকে তিনি ঘৃণা করেন।’’ 

ইমাম হোসাইনের (আ.) মর্যাদা এবং মহত্ত্ব কোথায়! রাসূলুল্লাহর (সা.) বাণী থেকে কোন্‌টি নির্বাচন করে নিলেন? মূলত তিনি নিজেকেই তুলে ধরেছেন।
ইমাম হোসাইনের (আ.) প্রতিটি কথায় মনুষ্যত্ব ও মানবতার ইজ্জত সম্মান এবং মর্যাদা প্রতিফলিত হয়েছে।  তিনি বলেছেন, ‘‘সম্মানের মৃত্যু অপমানের জীবনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’’

অন্য এক বাণীতে তিনি বলেন : ‘যা কিছুর উপর সূর্য আলো দান করে-সারা দুনিয়া এবং তার বাসিন্দারা,সাগর-মাটি, পাহাড়-পর্বত-মরুভূমি এসব কিছুই একজন খোদাভক্ত এবং খোদা-পরিচিত ব্যক্তির কাছে একটি ছায়ার চেয়ে মূল্যবান কিছু নয়। এরপর তিনি বলেন :
 ‘এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে না যে দুনিয়া ও তার মধ্যে যা আছে তার প্রতি অনাসক্ত থাকবে?’  

যারা দুনিয়া নিয়ে মত্ত এং দুনিয়ার দাসত্ব করে তারা আসলে জানে না যে,এমন কিছু ‘লুমাযাহ’ র মতো। মানুষ যখন ভাত খায় তখন তার দাঁতের ফাঁকে হয়তো এক টুকরো গোস্ত কিংবা এক টুকরো খাবার বেঁধে থাকে। যা খুঁচিয়ে বের করতে হয়। এই বেঁধে যাওয়া খাদ্য টুকরোকেই ‘লুমাযাহ’ বলে। ইমাম হোসাইনের (আ.) চোখে ইয়াযিদ,ইয়াযিদের হুকুমত, ইয়াযিদের দুনিয়া সবকিছুই ঐ এক টুকরো লুমাযাহর মতো। তারপর তিনি বলেনঃ ‘‘হে মানুষ! জেনে রেখো যে,জগতে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কিছু নেই যার কাছে তুমি নিজেকে সোপর্দ করতে পারো। যার কাছে তুমি নিজের আত্মা ও জীবনকে বেচে দিতে পারো। তোমরা দুনিয়ার কাছে নিজেকে বেচে দিও না,স্বাধীন ও মুক্ত মানুষ হও, দাসত্বের শৃঙ্খলে নিজেকে বেঁধে ফেলো না। ইসলামের অনুসারী হও। একমাত্র ইসলামই তোমাদেরকে মুক্তি ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে পারে। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। তাহলেই পরাধীনতার শৃঙ্খল তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই উপাসনার যোগ্য নয়। একমাত্র আল্লাহকে উপাসনা করো তাহলে দুনিয়া নিজেই তোমাদের পদতলে সমাহিত হবে।’’

কারবালার পথে অনেকেই ইমাম হোসাইনকে (আ.) বলেছে যে, এ পথ বিপজ্জনক? আপনি বরং ফিরে যান। ইমাম হোসাইন (আ.) তাদের জবাবে এ কবিতা পড়েনঃ
‘‘আমাকে যেতে নিষেধ করছো? কিন্তু আমি অবশ্যই যাবো। আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাও? একজন বীরের কাছে কি মৃত্যু অপমানজনক? যে ব্যক্তি অসৎ ও নীচ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করে এবং তাতেও পৌঁছতে পারে না, এদের জন্যে মৃত্যু অপমানের হতে পারে। কিন্তু যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম কাজ অর্থাৎ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে নিহত হয় তার জন্যে তো অপমানের হতে পারে না! তার রাস্তা সেই রাস্তা যেখান দিয়ে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ও সৎ বান্দারা চলেছেন। যেহেতু আমার এ পথ হতভাগ্য,পাপিষ্ট ও দুর্ভাগা ইয়াযিদের বিরোধী পথ তাই আমাকে আমার এ পথে চলতে দাও। হয় বাঁচবো না হয় মরবো-এ দুটোর বাইরে তো আর কিছু নয়। যদি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকি তাহলে কেউ তখন বলতে পারবে না যে,কেন বেঁচে আছেন? ‘‘আর যদি মারা যাই তাহলেও কেউ আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না যদি সে জানে আমি কি জন্যে নিহত হলাম ?’’ ‘‘কিন্তু জেনে রেখো যে জীবনের জন্যে সবচেয়ে অপমান হলো কেউ বেঁচে থাকবে বটে কিন্তু লোকে তার কান ধরে উঠাবে আর বসাবে।’’ এ বক্তব্যেও পৌরুষত্ব ও বীরত্বের ছাপ পরিস্কার চোখে পড়ে।  

পথিমধ্যে আরেকটি বক্তৃতায় ইমাম হুসাইন (আ)  বলেন : "তোমরা চোখে দেখছো না যে সত্যকে মেনে চলা হচ্ছে না ও বাতিলের বিরুদ্ধেও কেউ কিছু বলছে না?"  ‘‘ আমি মৃত্যুকেই আমার জন্যে কল্যাণকর এবং জালেমদের সাথে বেঁচে থাকাকে অবমাননা ও লজ্জাজনক মনে করি।"

ইতিহাসের সব স্মরণীয় পুরুষই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন,যে পরিস্থিতিতে ইমাম হোসাইন (আ.) পড়েন আশুরার রাত্রে । অর্থাৎ বস্তুগত দিক দিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন এবং শত্রুকে পরাজিত করার বিন্দুমাত্র আশা নেই বরং অতিশীঘ্রই তিনি তার সঙ্গী-সাথীসহ শত্রুদের হাতে খণ্ড-বিখণ্ড হবেন এটিই নিশ্চিত হয়ে ওঠে। অনেকেই এ ধরনের মুহুর্তে অভিযোগ করেন,আফসোস করেন ইতিহাস এ ধরনের বহু ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষী। বলা হয় যে,নেপোলিয়ন যখন ঐ পরিস্থিতিতে পড়লো তখন বলেছিল : হায় প্রকৃতি! তুমি আমাকে এভাবেই মারলে।

কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ.) সবকিছু বুঝতে পেরেও মৃত্যু নির্ঘাত জেনেও আশুরার রাতে কী বলছেন? তিনি সঙ্গী-সাথীদেরকে সমবেত করলেন যেন যে কোনো বিজয়ীর চেয়েও তার মানসিকতায় উজ্জ্বলতার ঢেউ খেলে যাচ্ছে । তিনি বললেন : যেন সবকিছুই ইমাম হোসাইনের (আ.) অনুকূলে আছে এবং সত্যি -সত্যিই সবকিছু তার অনুকূলে ছিল। কেননা এ পরিস্থিতি একমাত্র তার জন্যেই দুঃখবহ ও প্রতিকূল,যে কেবল দুনিয়া ও ক্ষমতা চায় আর ব্যর্থ হয়ে এখন মৃত্যুর প্রহর গুণছে। কিন্তু যার সবকিছুই আল্লাহর জন্যে,এমন কি যদি হুকুমতও চান তাহলেও তা আল্লাহর জন্যই চান এবং জানেন যে আল্লাহর পথেই এগিয়ে এসেছেন তাহলে তার কাছ তো এ পরিস্থিতি অবশ্যই অনুকূল। এজন্যে তিনি আল্লাহর কাছে শোকরগুজারী-ই তো করবেন।

তিনি বলেছেন: ‘আল্লাহকে সর্বোৎকৃষ্ট প্রশংসা জানাই এবং সুখে-দুঃখে সব অবস্থাতেই তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আল্লাহ আমাদেরকে নবুওয়াত দিয়ে সম্মানিত করেছেন,আমাদেরকে কোরআনের জ্ঞান দিয়েছেন এবং আপনার দীন পালনে আমাদেরকে সফল করেছেন-তাই আপনার লাখো শোকরিয়া আদায় করছি।’’

মোটকথা ইমাম হোসাইনের আন্দোলনের গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত কেবল পৌরুষত্ব, বীরত্ব, সত্যানুসরণ এবং সত্যপ্রেম। কিন্তু এ বীরত্ব কোনো গোত্র বা দেশ বিশেষে সীমাবদ্ধ নয়, এতে কোনো 'আমিত্ব' এবং আত্মস্বার্থ নেই। সবই ও সবকিছুই আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর পথে। তিনি এ পথে শেষ নিশ্বাস নেয়া পর্যন্ত ও অটল ছিলেন। যুদ্ধক্লান্ত ইমাম হোসাইন (আ.) যখন শেষ তীর খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন তখনও সে কেবলা থেকে কখনও পথভ্রষ্ট হননি যে কেবলার দিকে ফিরে পরম শান্তিতে বললেন, "আপনার বিচারে আমি সন্তুষ্ট, আপনার আদেশের প্রতি আমি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পিত, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই হে অসহায়দের সহায়।"

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১

২০১৭-১০-০১ ১৫:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য