• নূরনবী মোস্তফা (সা.) : পর্ব ৩৫

মানবতার মুক্তির দূত, অন্ধকারের আলোকবর্তিকা, মজলুম মানবতার ধ্যানের ছবি ও বিশ্বজগতের জন্যে মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবনধারা ছিল আলোকোজ্জ্বলতম জীবনধারা, যাতে রয়েছে জীবনের সবক্ষেত্রের পথনির্দেশনা ও সব সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান ৷

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় নীতিও ছিল পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ ৷ পবিত্র সেই জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও ন্যায়বিচারের মহত্তম আদর্শের দৃষ্টান্ত ৷ অথচ আজকের বিশ্বে এই দিকগুলোর বড়ই অভাব৷ বলতে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি থেকে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতা প্রায় পুরোপুরি নির্বাসিত হয়েছে ৷

সম্প্রতি ইরানের পবিত্র কোম শহরে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র রাজনৈতিক জীবন ও শাসন পদ্ধতি শীর্ষক এক সেমিনারে রাষ্ট্রনীতি বা রাজনীতিতে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ ইসলামী বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত একটি গবেষণা সংস্থা এ সেমিনারের আয়োজন করে৷ এ সেমিনারে বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর ইয়াজদানী মোকাদ্দাম রাসূলে পাক (সাঃ)'র প্রবর্তিত রাষ্ট্র বা সরকারে নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, মানবীয় ধর্ম মানুষের প্রকৃতিগত বাস্তবতাগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ৷

পবিত্র কোরআনের প্রখ্যাত তাফসীরকারক মরহুম আল্লামা তাবাতাবাইর মতে মানবীয় ধর্মের বা মানুষের জন্যে যে ধর্ম তার তিনটি মানদন্ড রয়েছে৷ প্রথমতঃ খোদায়ী বিধান বা বাস্তবতাগুলো সার্বজনীন হয়ে থাকে, এসব বিধান একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী বা গ্রুপের জন্যে সিমীত নয়৷ দ্বিতীয়তঃ খোদায়ী পথনির্দেশনা বা হেদায়াতের পথ যৌক্তিক ও সবার জন্যে সহজলভ্য হয়ে থাকে৷ অন্য কথায় ধর্ম অসম্ভব বা অযৌক্তিক কিছু হতে পারে না৷ কারণ যুক্তিহীনতা বা বিবেকহীনতা মানুষের অধঃপতনের সমতুল্য৷ তৃতীয়তঃ মানবীয় ধর্মের শিক্ষাগুলোকে সমাজে বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে৷ আর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ধর্ম ও জীবন পদ্ধতিতে এ তিন বৈশিষ্ট্য বা মানদন্ড ছিল স্পষ্ট৷

মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, পরিচালক ও নেতা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবদান প্রসঙ্গে ডক্টর ইয়াজদানী মোকাদ্দাম আরো বলেছেন, রাসূলে পাক (সাঃ) কাউকে বঞ্চিত করা ছাড়াই সাধারণ ও অসাধারণ শ্রেণী নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষকে পরস্পরের সাথে ঘনিষ্ঠ করেছেন৷ তিনি যুক্তি বা বিবেকের মর্যাদাও রক্ষা করেছেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেন, আমরা মানুষের বিবেকের কার্যক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের সাথে আচরণ করি৷ আর এটাই পরিপূর্ণতা বয়ে আনে৷ নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) জটিল ও অবোধগম্য বিষয়ের অবতারণা করতেন না৷

তিনি মানুষের প্রচছন্ন বা সুপ্ত বিবেক ও প্রতিভাগুলোকে খোদায়ী বিধানের কল্যাণে বিকশিত করতেন৷ স্থান ও যুগের চাহিদা এবং পারস্পরিক পরামর্শের নীতি ছিল আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ)'র কৌশলের মূল দিক৷কোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর আলী বেহরুজী বলেছেন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হলো তাঁর এই জীবন ছিল কল্যাণকামীতা ও মহৎগুণাবলী-কেন্দ্রীক৷ তাঁর শাসন পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল মানুষের উন্নতি ও মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ সাধন৷ রাসূলে পাক (সাঃ)'র সমস্ত রাজনৈতিক আচরণ এ লক্ষ্যেই কেন্দ্রীভূত ছিল৷ তাঁর মানবীয় গুণাবলীর মধ্যে দয়া, উদারতা, আন্তরিকতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, বিভিন্ন বিষয় স্বচছকরণ এবং সত্য ও ন্যায়বিচারকে সমুন্নত রাখার মত প্রভৃতি গুণ ছিল বিশ্বনন্দিত৷

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সমস্ত রাজনৈতিক চিঠিতে শান্তিকামীতা, নৈতিক শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা এবং ইসলামী দয়াশীলতার ছাপ ছিল অত্যন্ত জোরালো৷ এবারে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র দয়া সম্পর্কিত একটি ঘটনা শোনা যাক ৷ আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেছেন, একদিন নবী করিম (সাঃ)'র সাথে একটি পথ ধরে কোথাও যাচিছলাম৷ রাসূল (সাঃ)'র কাঁধে ছিলএকটি আলখাল্লা৷ আলখাল্লার প্রান্ত ছিল খসখসে ও মোটা৷ এ সময় এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)'র কাছে এসে ঐ কাপড় ধরে অত্যন্ত জোরে টান দেয়৷ এর ফলে ঐ আলখাল্লার প্রান্তভাগ রাসূল (সাঃ)'র কাধে টানের চিহ্ন বসিয়ে দেয়৷ এরপর লোকটি অত্যন্ত অভদ্রভাবে বললো, মোহাম্মাদ, আল্লাহ ও তোমার কাছে যে সম্পদ আছে তা থেকে আমাকে কিছু দেয়ার নির্দেশ দাও৷ দয়ার নবী (সাঃ) এই অভদ্র আচরণকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত মমতাভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন৷

এরপর তাকে চুমো খেয়ে বললেন, সে যা চাচেছ তাকে তা দিয়ে দাও৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র রাজনৈতিক জীবন ও শাসন পদ্ধতি শীর্ষক ঐ সেমিনারে ডক্টর মোঃ সুতুদেহ রাসূলুল্লাহর (সাঃ) রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে বলেছেন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নবুওত লাভের পর বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্যে প্রথমে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ও চারপাশের জনগণের কাছে এবং এরপর মক্কা নগরীর সবার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন৷ পরবর্তকালে মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি তাওহীদ বা একত্ববাদের বাণী বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) মুসলমানদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন ও তাদের কল্যাণের জন্যে প্রথমে ইসলামী রাষ্ট্রের ভেতরে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং মদীনার বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ঐক্যের বন্ধর গড়ে তোলেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ) মদীনা সনদে সরকারের সাথে জনগণের সম্পর্ক ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করেন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংহত করেন৷

এরপর তিনি মদীনাকে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের হুমকী থেকে নিরাপদ রাখার ওপর জোর দেন৷ মদীনার নতুন সরকার-কাঠামোয় রাসূল (সাঃ)'র চিন্তাগত, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপগুলো মুসলিম উম্মাহর শক্তি ও ঐক্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাঁর প্রচেষ্টার নিদর্শন৷ তিনি সব সময় সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন৷ আর এ বিষয়টি পররাষ্ট্রনীতি ও বিরোধীদের মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সাঃ)'র ডিপ্লোমেসি বা কৌশল ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করতো৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের জন্যে সে যুগের অন্যান্য দেশের সরকার ও সাম্রাজ্যগুলো সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখতেন৷ তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং ঐসব দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী ইসলামের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতেন বা নীতি নির্ধারণ করতেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর গবেষণা করলে দেখা যায় ইসলাম ধর্ম মানবপ্রেমের ধর্ম৷ কাফের ও মুশরিকরা তাদের কুফরী বা শির্কের মাধ্যমে নিজের ধবংস ডেকে আনছে বা সৌভাগ্য তথা মুক্তি থেকে বঞ্চিত হচেছ দেখে রহমতের নবী (সাঃ) যারপরনাই ব্যাথিত হতেন৷ তাই তিনি তাদেরকে সুপথে আনার জন্যে সচেষ্ট ছিলেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বলতেন, তোমাদের মধ্যে সে-ই নেতা হবার যোগ্য যে আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম ও মর্যাদাবান৷ আওস ও খাজরাজ গোত্র ছিল পরস্পরের ঘোর শত্রু ৷

কিন্তু ইসলামের ছায়াতলে আসার পর বিশ্বনবীর প্রচেষ্টায় এই ঘোর শত্রুতা রূপ নেয় প্রগাড় বন্ধুত্ব, ভাতৃত্ব ও ভালোবাসায়৷ আওস গোত্রের এক বৃদ্ধ তার কৃষিকাজে সহায়তার জন্যে খাজরাজ গোত্রের সাহায্য চেয়েছিলেন৷ বৃদ্ধ জানান তার সন্তান কলেরা রোগে মারা গেছে এবং দেনা পরিশোধ করতে না পারলে এক ইহুদি তার উট ও গরু নিয়ে যাবে৷ খাজরাজ গোত্র সাথে সাথে তার এ আহবানে সাড়া দিয়ে কয়েকজন শক্তিশালী খাজরাজ যুবককে আওস ঐ বৃদ্ধের কাছে পাঠিয়ে দেয়৷ এমনকি খাজরাজ গোত্রের দুই ব্যক্তি গরু ও উট রক্ষার জন্যে তাকে বেশ কিছু মুদ্রা দেন৷ এসময় এক ব্যক্তি কোরানের এই আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন যাতে বলা হয়েছে- কে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে যাতে আল্লাহ তা তার জন্যে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন? আল্লাহই বান্দাদের রিজিক হ্রাস ও বৃদ্ধি করেন এবং তোমাদেরকে তাঁর দিকেই ফিরে যেতে হবে৷ এভাবে খাজরাজ গোত্র আল্লাহর আহবান বাস্তবায়িত করতে পেরে খুশী হয়েছিল৷ অন্যদিকে আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে সংঘাত বা ফেতনা সৃষ্টির জন্যে সক্রিয় শা'স বিন ক্বেইস নামের এক ব্যক্তি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তার এক ইহুদি বন্ধুকে বললো, মুহাম্মাদ গোত্রগুলোর গণমাণ্য ব্যক্তিদের এতো ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছেন যে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা সম্ভব নয় ৷ দুই গোত্রের মধ্যে সংঘটিত এই ঘটনার কথা শুনে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে বলেছিলেন, ইসলামই এতসব দয়া ও সহমর্মিতা দান করেছে ৷#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আবু সাঈদ/২৭

২০১৭-১০-২৭ ২০:৪০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য