• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৩৬

মুসলমানদের মাঝে "বংশ পরিচিতির" ভিত্তিতেও ইতিহাস রচনা ও ইতিহাস পাঠের একটি পদ্ধতির প্রচলন ছিল। বংশ পরিচয় বিদ্যার ইতিহাস বেশ প্রাচীন।

ইসলাম-পূর্ব জাহেলিয়াতের যুগেও এই বিদ্যার প্রচলন ছিল। সেকালের আরব্য উপদ্বীপের রাজনৈতিক, সামাজিক ব্যবস্থায় উপজাতীয়দের বা গোত্রগুলোর গুরুত্বের কারণেই এই বিদ্যাটির রূপরেখা গড়ে ওঠে। আরবে ইসলামের আবির্ভাবের পর ইসলামী সংস্কৃতিতে বংশ পরিচয় বিদ্যার জ্ঞানের উন্নতি ঘটে এবং তা অব্যাহত গতি লাভ করে। ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে বংশ পরিচয় বিষয়টির ওপর বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বংশ পরিচয় বিদ্যা সংক্রান্ত প্রাচীন যে গ্রন্থটি এখনো পাওয়া যায় তা হলো "হাজফুম মিন নাসাবিন কুরাইশ"। লিখেছেন মুয়াররাজ বিন আমরু সাদুসি। এই গ্রন্থটি ছাড়াও "জামহারাত আন নাসাব" নামে আরেকটি বই আছে। এ বইটি লিখেছেন হিশাম বিন মুহাম্মাদ কালবি। দ্বিতীয় শতাব্দির বংশ পরিচয় বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোর মধ্যে এই গ্রন্থটিকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়।

হিশাম বিন মুহাম্মাদ কালবি ২০৪ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বংশ পরিচয় বিদ্যায় দ্বিতীয় শতাব্দির শ্রেষ্ঠতম মনীষী মুহাম্মাদ বিন সায়েব কালবি। হিশামের পিতা ছিলেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আবু মিখনাফ আযদি'র ছাত্র। সায়েব কালবি দ্বিতীয় শতাব্দির শেষ এবং তৃতীয় শতাব্দির প্রাথমিক পর্বের বিশিষ্ট একজন মনীষী ছিলেন, বিশেষ করে কারবালার ঘটনার ওপর যে কজন গুণীজন লেখালেখি করেছেন তাঁদের মধ্যে সায়েব কালবি অন্যতম। তিনি এবং তাঁর ছেলে হিশাম কালবি বংশ পরিচয় বিদ্যার জগতে তাঁদের সমকালীন জ্ঞানী-গুণীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ বলে পরিগণিত। কালবি (আ) এর খান্দানের বেশিরভাগই ছিলেন ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সাহিত্যানুরাগী। হযরত আলী (আ) এর খান্দানের অনুসারী ছিলেন তাঁরা। এজন্যে তাঁদেরকে বহুরকমের কটাক্ষও সহ্য করতে হয়েছে। হিশাম বহু বই লিখেছেন,সংখ্যার দিক থেকে দেড় শ' ছেড়ে যাবে। ইবনে সাদ তাঁর "তাবাকাত আল কুবরা" বইতে এবং মাসউদি তাঁর "মারভাজুজ জাহাব" গ্রন্থে আর তাবারি তাঁর "তারিখুল উমাম" গ্রন্থে হিশাম কালবির বই থেকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাঁদের সবাই হিশাম কালবি'কে একজন নির্ভরযোগ্যে ইতিহাসবিদ বলে উল্লেখ করেছেন।

একইভাবে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইয়াকুবি তাঁর ইতিহাস সমালোচনা'তেও হিশামের রচনা থেকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে তাঁর লেখা ইতিহাসের সূত্র হিসেবে হিশামের রচনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ইসলাম নিয়েও হিশাম অনেক লেখালেখি করেছেন। তিনি বিশেষ করে কারবালার ঘটনার ওপর একটি বই লিখেছেন। বলা হয়ে থাকে, কারবালা ঘটনা সম্পর্কে হিশামের রচনাগুলো বড়ো বড়ো মনীষীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে সংকলন করা হয়েছে। এমনকি বিশিষ্ট মুসলিম মনীষী শায়েখ মুফিদও কারবালা বিষয়ক বহু তথ্য হিশাম কালবি'র কাছ থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এভাবেই বংশ পরিচয় বিদ্যায় হিশাম কালবির পদ্ধতি লিখিত তথ্যপঞ্জীর ক্ষেত্রে এতোটাই প্রামাণ্য এবং গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে যে, পরবর্তীকালের ইতিহাস রচনায় যাঁরা এগিয়ে এসেছেন তাঁদের জন্যে হিশাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকে পরিণত হয়েছেন।

মুসলিম মনীষীদের মধ্যে অপর এক বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং বংশ পরিচয়বিদ হলেন আহমাদ বিন ইয়াহিয়া। তিনি অবশ্য বালাজুরি নামেই বেশি পরিচিত। এর বাইরেও তিনি একাধারে হিজরি তৃতীয় শতাব্দির একজন অনুবাদক, কবি, ইতিহাস এবং বংশ পরিচয় বিদ্যা বিষয়ক বহু গ্রন্থ প্রণেতা। ইসলামের বিজয় সংক্রান্ত ইতিহাস নিয়েও তিনি প্রচুর কাজ করেছেন। বালাজুরি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে সিরিয়া, হালাব, হোমস ও এন্তাকিয়াসহ বহু শহরে যান এবং সেসব শহরের বিখ্যাত মনীষীদের সাহচর্যে থেকে তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন। বালাজুরি ইরাকেও যান এবং সেখানকার বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ বিন সাআদ কাতেব ভাকেদি'র মতো মনীষীদের পাঠদান ক্লাসে অংশ নেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগান।

বালাজুরি ফার্সি ভাষা থেকে আরবি ভাষায় অনেক বই অনুবাদ করেছেন। এ কারণে অনেকেই তাকেঁ ইরানী বলে মনে করে। আবার ইরাক এবং সিরিয়ায় দীর্ঘদিন অবস্থান করার কারণে অনেকে তাঁকে আরব বলেও মনে করেন। যাই হোক বালাজুরি তাঁর "আনসাবুল আশরাফ" নামক বইতে বংশ পরিচয় বিদ্যার ক্ষেত্রে নবীন এক পদ্ধতির আশ্রয় নেন এবং এই বিদ্যাটিকে তিনি ইতিহাসবিদ্যার কাছাকাছি নিয়ে যান। বিশ খণ্ডে লেখা তাঁর এই বইটিকে ইতিহাস বিষয়ক একটি বিশ্বকোষ বলে মনে করা হয়। বালাজুরির আরেকটি সৃষ্টিকর্ম হলো "ফুতুহুল বালদান"। নবীজী (সা.) এর সময় থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে মুসলমানদের যতো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেইসব যুদ্ধের ঐতিহাসিক বর্ণনা সমৃদ্ধ একটি বই এটি। এছাড়াও সমকালীন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও বর্ণনা রয়েছে এ বইতে।

ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মুসলমান ঐতিহাসিকগণের আরেকটি পদ্ধতি হলো "স্তরভিত্তিক বর্ণনারীতি"। মুসলমান ইতিহাসবিদদের মাঝে ইতিহাস রচনার এই পদ্ধতিটি প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। বড় মাপের আরো একজন মুসলিম ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার হলেন আবু আব্দুল্লা মুহাম্মাদ বিন সাআদ। "কাতেব ভাকেদি" নামেই তিনি বেশিরভাগ পরিচিত। ২৩০ হিজরিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসের তিক্ত ঘটনাপঞ্জী সম্পর্কে তাঁর ছিল ব্যাপক জানাশোনা। ইতিহাস রচনাকারীদের অনেকেই তাঁর গবেষণা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন। ভাকেদি'র লেখা "আত তাবাকাতুল কুবরা" ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর মধ্যে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে। এই বইতে ভাকেদি নবী করিম (সা.), তাঁর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িনসহ সমকালীন আলেমদের অবস্থা ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি নারীদের অবস্থা ও পরিস্থিতিও ব্যাখ্যা করেছেন।

তাবাকাতুল কাবির বইতে ভাকেদি সাহাবা, তাবেয়িন এবং অন্যান্যদের বংশকে তাদের পিতা, মাতা এবং তাদের নিকটজনদের দিক থেকে কবিলার একজন প্রধান ব্যক্তি পর্যন্ত পৌছিয়েঁছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাকেদি বংশধারাকে তাদের পূর্ববর্তী বহু প্রজন্মের সাথে নিয়ে মিলিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রাসূলের সাহাবি যায়েদ বিন হারেসার বংশানুক্রম তার পূর্ববর্তী একত্রিশ প্রজন্ম পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে এ বইতে। ভাকেদির আরেকটি বিখ্যাত বই হলো তাবাকাতুস সাগির। এই বইটির অংশ বিশেষ তুরস্কের ইস্তাম্বুলের পুরাতত্ত্ব যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। হাদিস বর্ণনাকারীদের ধারাক্রম এবং বর্ণনাকারীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার জন্যে এই গ্রন্থটি বেশ সাহায্যকারী বলে বিজ্ঞজনদের কাছে বিবেচিত। চিন্তাবিদদের স্তরভিত্তিক বর্ণনার এই রীতিটি পরবর্তীকালেও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ১২

২০১৭-১১-১২ ১৮:৩৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য