• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৩৭

মুসলমান ইতিহাসবিদ এবং মনীষীদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের জীবনী রচনা বা সংকলন করা। খলিফা, শাসকবৃন্দ এবং মনীষীদের জীবনীই এতে বেশি স্থান পেয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো এইসব জীবন কাহিনীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাসের বহু উপাদান। নবী করিম (সা) এর জীবন চরিত রচনা থেকে এই পদ্ধতিটি প্রভাবিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনাবলির লিখিত বর্ণনাতেও এই ধারার প্রচলন ঘটে। তবে ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জী, খলিফা, শাসকবৃন্দ এবং বিখ্যাত মনীষীদের জীবনীকে কেন্দ্র করেই এই ধারাটি গড়ে ওঠে। রাজা-বাদশা বা আমির ওমরাদের প্রশাসনে লেখক এবং ইতিহাসবিদদের উপস্থিতি ছিল। তাঁরা শাসকদের বিষয় আশয় এবং আদেশ নিষেধ মেনে চলতেন আর ঐসব আমির-ওমরা বা তাদেঁর খান্দানের ইতিহাস কিংবা জীবন চরিত লিখতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আব্বাসীয় খলিফা মুতাজিদ 'সাবেত বিন কুররা'কে আদেশ দিয়েছিলেন তার জীবনীগ্রন্থ লেখার জন্যে।

সাবেত বিন কুররা ছিলেন হিজরী তৃতীয় শতাব্দির একজন লেখক, অনুবাদক, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ।কথিত আছে যে, আলেম-ওলামা কিংবা অলি-আওলিয়ার জীবনী রচনার ধারা শুরু হয়েছিল হিজরি চতুর্থ শতাব্দি থেকে। যেমন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ 'সাখাভি' তাঁর শিক্ষক 'ইবনে হাজার আসকালানি'র জীবন বৃত্তান্ত লিখেছেন। সাখাভি'র লেখা ইতিহাস বিষয়ক শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি হলো 'আল এলানু বিততাওবিখে লেমান জাম্মাত তারিখ'। সাখাভি তাঁর এ বইটিতে ইতিহাসের চূড়ান্ত লক্ষ্য, এর উপকারিতা, ইতিহাসের বিচিত্র বিষয়-আশয়, ইতিহাস পরিচিতি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। সেইসাথে তিনি এ বইতে ইতিহাসের বিভিন্ন অর্জন ও ঐতিহাসিক সৃষ্টিকর্মগুলোকে বিষয় ভিত্তিক কিংবা ইতিহাসবিদ ও ইতিহাস লেখকদের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন। সপ্তম শতাব্দি থেকে জীবনীমালা বর্ণমালার অনুক্রমিক রূপ লাভ করেছে। আরব ইতিহাসবিদ 'ইবনে খাল্লাকন' এই পদ্ধতিতেই লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ওয়াফিয়াতুল আয়িআনা ও আনবাউ আবনায়িয যামান'।

মুসলমান ইতিহাসবিদদের জীবনী লেখার স্টাইলের আরেকটি উদাহরণ হলো "শতাব্দিনামা"গুলো। ইতিহাস রচনার এই পদ্ধতিটি হিজরি সপ্তম শতাব্দি থেকে প্রচলিত হয়েছে। মুসলমানরা এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট একটি শতাব্দির ব্যক্তিত্বদের জীবনী বর্ণনা করতেন। ইবনে আবি ওজাইবা কিংবা ইবনে হাজার আসকালানি'র শতাব্দিনামার কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এই শতাব্দিনামাগুলোকে হিজরি অষ্টম শতাব্দির চরিত বিশ্বকোষ বলা যায়। কেননা লেখকগণ হিজরি ৭০১ থেকে ৮০০ সাল পর্যন্ত সকল মনীষীর জীবনী তাদেঁর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আর এই বর্ণনারীতি ছিল বর্ণের অনুক্রমিক ধারার ভিত্তিতে। মুসলিম বিশ্বে স্থানীয় কিংবা অভিজাত বংশের ভিত্তিতেও ইতিহাস রচনার প্রচলন ছিল। স্থানীয় ইতিহাস রচনার ধারায় কোনো একটি শহর কিংবা এলাকার ইতিহাস তুলে ধরা হতো। তবে সাধারণত নির্দিষ্ট ঐ এলাকার রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানগত ইতিহাসকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো। হামযা বিন ইউসুফ সাহমি'র লেখা "জুরজানের ইতিহাস" এই শ্রেণীর রচনা।হিজরি ৪৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন হামযা বিন ইউসুফ সাহমি। ইতিহাসবিদ এই পদ্ধতিতে ইসলামের বিজয় থেকে পরবর্তীকালের গোরগানের ইতিহাসকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।

স্থানীয় ইতিহাস রচনার আরেকটি উদাহরণ হলো "তারিখে দামেশক"। আশি খণ্ডে লেখা এই বইটির রচয়িতা হলেন দামেশকের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিস 'ইবনে আসাকির'। ইবনে আসাকির প্রচুর হাদিস মুখস্থ করেছিলেন এবং জ্ঞানার্জনের জন্যে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। বিশেষ করে ইসলামী শহরগুলোতে গিয়ে বড়ো বড়ো মাশায়েখদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন। এইসব বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর বই "তারিখে দামেশ্‌ক"। বিশাল আকৃতির ইতিহাস গ্রন্থ লেখার জন্যে তাকেঁ যেমন একজন বড়ো ঐতিহাসিক বলে বিবেচনা করা হয় তেমনি প্রচুর হাদিস মুখস্থ করার কারণে তাকেঁ একজন মহান হাফেজে হাদিসও মনে করা হয়। স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এই গ্রন্থটি। ইসলাম পূর্বকাল থেকে শুরু করে হিজরি ষষ্ঠ শতকের ইতিহাস এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে।

দামেশকের ভৌগোলিক ইতিহাস এবং এই শহরের মুহাদ্দিসগণ ও জ্ঞানী-গুণী মনীষীদের জীবনী সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থ তারিখে দামেশক। আহমাদ ইবনে মুয়াল্লা এবং ইবনে হামিদ আবিল আযায়েযের মতো বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও মনীষীগণ এই গ্রন্থ রচনায় ইবনে আসাকিরকে সহযোগিতা করেছেন। ইবনে আসাকির তাঁর ক্লাসে এই বইটির ওপর পাঠ দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই গ্রন্থটি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একইভাবে ভৌগোলিক বিশ্বকোষ হিসেবে সবচেয়ে বড়ো "আল মুয়াজ্জাম আল বালদান" এর সংকলক ইয়াকুত হামাভিও আসাকিরের বই থেকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছেন। কায়রো, দামেশক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারগুলোতে তারিখে দামেশকের হাতে লেখা কপির নমুনা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে।

আরেক ধরনের স্থানীয় ইতিহাস রচনার ধারা রয়েছে। এই ধারাটি নির্দিষ্ট কোনো একটি শহরের ঘটনা-দুর্ঘটনা বা খবরাখবরের ওপর প্রতিবেদনধর্মী ইতিহাস। এই শ্রেণীর ইতিহাস সংকলনের উদাহরণ হিসেবে মক্কা ও মদিনা শহরের স্থানীয় ইতিহাসের কথা বলা যায়, এই ধারার প্রাচীনতম ইতিহাসগ্রন্থের দৃষ্টান্ত এটি। ওমর ইবনে সাইয়্যেহ নুমায়রি'র লেখা "আল মাদিনাতুল মুনাওয়ারা"র ইতিহাস গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা যায়। ২৬২ হিজরিতে ওমর ইবনে সাইয়্যেহ নুমায়রি জন্মগ্রহণ করেন। এই বইটিতে মদিনা শহর কেন্দ্রিক ইসলামের ইতিহাস এবং মদিনা শহরের বিশেষত্বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক বা নির্দিষ্ট কোনো শহরের ইতিহাস রচনাধর্মী লেখার আরো বহু উদাহরণ রয়েছে। ইসলামী শহরগুলো বিশেষ করে মিশর, ইয়েমেন, সৌদি আরব, সিরিয়া, বসরা, মৌসুল, ইরাকসহ আরো বহু শহরের ইতিহাসধর্মী বই রয়েছে।

"তারিখে বাগদাদ" এমন একটি বই যাকে আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার আরেকটি পদ্ধতি যেমন বলা যায় তেমনি বলা যায় জ্ঞানী গুণী মনীষীদের জীবনীও। খাতিবে বাগদাদি'র লেখা এই গুরুত্বপূর্ণ বইটি স্থানীয় ইতিহাস রচনা পদ্ধতির একটি বিশ্বকোষ বৈ ত নয়। বাগদাদের ঐতিহ্যবাহী সকল সৃষ্টিকর্মের চমৎকার বর্ণনা রয়েছে এতে। বাগদাদ শহরের ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা সমৃদ্ধ একটি ভূমিকাও রয়েছে গ্রন্থের শুরুতে। বাগদাদ ছিল সে সময়কার জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার মূল কেন্দ্র। অভিজাত বংশের ইতিহাস রচনাধর্মী আরেকটি ধারা ছিল ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে। আবু ইসহাক ইব্রাহিম বিন হেলাল সাবি এবং আহমাদ বিন আলি মিকরিযি এই শ্রেণীর ইতিহাসবিদ ছিলেন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ৩

২০১৭-১২-০৩ ২১:০৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য